E-Paper

তবুও ‘মানব’ থেকে যায়

অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। আব্দুল জব্বার বলতে গেলে এই সে-দিনের মানুষ ও লেখক, ১৯৩৪-২০০৯ তাঁর জীবনকাল।

শেষ আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩৬
Abstract nature river landscape. Creative plain panorama flat vector illustration

Abstract nature river landscape. Creative plain panorama flat vector illustration Sourced by the ABP

আব্দুল জব্বার কে? বাংলা সাহিত্যচর্চা, এমনকি তার পঠনপাঠনের প্রবণতাটিও যে সময়ে হয়ে উঠেছে নিতান্ত নগরকেন্দ্রিক, হয় (উচ্চ)মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুম-লিটারেচার কিংবা তন্ত্র ভূত খুন রহস্য গোয়েন্দা যৌনতার মশলাদার আধসেদ্ধ লাবড়া, সেই ‘বাজার’-এ স্বাধীনতা-পূর্বকালের গ্রামবাংলার মানুষ ও প্রকৃতি নিয়ে লেখা সাহিত্য কে পড়বে, কেনই বা? যে ক’জন আজ তাঁর নাম জানেন, তাঁরা মনে করাবেন আব্দুল জব্বারের দু’টি সাহিত্যকর্মের কথা: ইলিশমারির চর উপন্যাস, আর দেশ পত্রিকায় একদা ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত গদ্য-আখ্যান বাংলার চালচিত্র। দু’টিই গত শতাব্দীর ষাটের দশকের ঘটনা— তার পরে, আজকের মূলধারার বাংলা গদ্য ও কথাসাহিত্যের আখ্যানশরীরে সোঁদা মাটি আর নোনাজলের গন্ধ অন্তত আর লেগে নেই— নাগরিক উন্নাসিকতায় মরমে মরে, মুছে গেছে। পরিস্থিতি যেখানে এই, সেখানে ছাপাই-বাঁধাইয়ের পারিপাট্যে, অলঙ্করণের সুষমায় এবং সর্বোপরি সম্পাদনার যত্নে এক বিস্মৃতপ্রায় বাঙালি কথাসাহিত্যিকের রচনা সংগ্রহ-এর প্রথম খণ্ডটি সামনে নিয়ে আসার ‘স্পর্ধা’ দেখে তাজ্জব বনতে হয়।

অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। আব্দুল জব্বার বলতে গেলে এই সে-দিনের মানুষ ও লেখক, ১৯৩৪-২০০৯ তাঁর জীবনকাল। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ বুভুক্ষা প্রকাশ পেয়েছিল কাজী আবদুল ওদুদের হাত ধরে। আবদুল আজীজ আল আমান সম্পাদিত জাগরণ পত্রিকায় ১৯৬০-এ বেরোয় ইলিশমারির চর, গ্রন্থাকারে প্রকাশিত পরের বছর; বাংলার চালচিত্র-ও এই দশকেরই শেষ দিকে লেখা। পঞ্চাশ, ষাট ও সত্তর দশকের কবিতা ও কবিদের নিয়ে আমরা বিপুল চর্চা করেছি, কথাসাহিত্যিকদের নিয়েও, সেই আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে এই মানুষটির ঠাঁই তত হয়নি, সে কি তাঁর দুর্ভাগ্য, না আমাদের? দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার প্রান্তবাসী লেখক বলেই কি নাগরিক অবহেলা নিক্ষিপ্ত হয়েছে তাঁর দিকে? এই রচনা সংগ্রহ-এর অন্যতম সম্পাদক মোস্তাক আহমেদ তাঁর সম্পাদকভাষের শিরোনামই দিয়েছেন ‘আমরা আপনাকে চিনতে পারিনি, ক্ষমা করবেন...’। লিখেছেন, আব্দুল জব্বারের প্রায় ৭৫টি বইয়ের খবর পাওয়া গেছে, আর তাঁরা এখনও পর্যন্ত জোগাড় করতে পেরেছেন ওঁর ৫০-৫৫টি বইয়ের মুদ্রিত কপি; কিছু পাণ্ডুলিপি এখনও পড়ে আছে ‘প্রকাশন সংস্থার আশ্চর্য অবহেলায়’, এই বইয়ের প্রস্তুতিপর্বে খোদ লেখকের বাড়িতে পাওয়া গেছে অপ্রকাশিত টুকরো লেখা, অজস্র চিঠি, অসংখ্য কবিতা ও গান, অগ্রন্থিত বহু প্রবন্ধ-নিবন্ধ। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, হুমায়ুন কবীর, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, আশাপূর্ণা দেবী-সহ তাঁর সময়ের প্রথম সারির লব্ধযশ লেখকদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগও ছিল, তবু তাঁর নাম আজকের গড় সাহিত্যপাঠক যে জানেন না, তার কারণ কি তিনি ‘কলকাতার লেখক’ নন বলে? এ কি সেই কেন্দ্র আর প্রান্তের ব্যাপার, উত্তরবঙ্গের যেমন এক প্রগাঢ় অভিমান আছে কলকাতার প্রতি? দূর সাতগাছিয়া-নোদাখালি তথা প্রান্তিক দক্ষিণবঙ্গের কলম বলেই কি আব্দুল জব্বারের প্রতি এতটা বিস্মৃতির অনাদর?

আব্দুল জব্বার রচনা সংগ্রহ ১: উপন্যাস

সম্পা: মোস্তাক আহমেদ, গৌতম সাহেদী

৯৫০.০০

খোয়াবনামা

পুনঃপ্রকাশ, পুনঃপ্রচারই তার একমাত্র প্রায়শ্চিত্র। সম্পাদকদ্বয় তো বটেই, এ বইয়ের প্রকাশককেও ভূরি অভিবাদন: আব্দুল জব্বারকে স্বমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন তাঁরা। আর পাঁচটা রচনা সংগ্রহ-এর থেকে এ বই আলাদা, কারণ এখানে সম্পাদকীয় কাজটি যে খুব কঠিন ছিল তা মালুম হয়: যে লেখক এই সময়ে বহুলাংশে বিস্মৃত, যাঁর সম্পর্কে মুদ্রিত তথ্য-উপাত্ত অনুপস্থিত, অসম্পূর্ণ বা অগোছালো, দু’মলাটে তাঁর কয়েকটি লেখা পুরে দিয়ে একটা সারগর্ভ ভূমিকা লিখে দিলেই চলে না, তিলে তিলে তাঁকে আবারও গড়তে হয় পাঠকের সামনে। এই বইয়ে তার পরিচয় মিলবে পদে পদে— যেমন জব্বারের নিজের হাতে লেখা ইলিশমারির চর-এর সংক্ষিপ্তসার, এই উপন্যাস পড়ে তারাশঙ্কর-প্রেমেন্দ্র মিত্র-হুমায়ুন কবীরের পত্র-মন্তব্য; আনন্দবাজার পত্রিকা, দেশ, দৈনিকমাসিক বসুমতী পত্রিকায় ‘পুস্তক/সাহিত্য পরিচয়’ অংশে এই উপন্যাস নিয়ে প্রকাশিত লেখা; বইয়ের বিজ্ঞাপন, এই উপন্যাস অবলম্বনে টিভি-সিরিয়াল ও সিনেমা তৈরির চুক্তিপত্র, এমনকি সিনেমার জন্য জব্বারের লিখে ফেলা গানও দেখতে-পড়তে পারবেন পাঠক। এই সবই, এবং ‘পরিশিষ্ট’ অংশটিও অত্যন্ত মূল্যবান। মোস্তাক আহমেদ তৈরি করেছেন আব্দুল জব্বারের জীবনপঞ্জি ও বর্ণানুক্রমিক গ্রন্থপঞ্জি; অন্যতম সম্পাদক ও আব্দুল জব্বারের পুত্র গৌতম সাহেদীর ‘স্মৃতির সরণি বেয়ে...’ লেখাটি বুঝিয়ে দেবে, কোন পর্যায়ের দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে উঠে এসেছিলেন, কলম ধরেছিলেন জব্বারের মতো লেখক।

ইলিশমারির চর, মাটির কাছাকাছি এবং বিদ্রোহী বাসিন্দা— জব্বারের এই তিনটি আখ্যান রয়েছে এই খণ্ডে। প্রথম দু’টি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস, শেষটি নভেলেট-চতুষ্টয়ের সমষ্টি। এর মধ্যে ইলিশমারির চর-ই সবচেয়ে বেশি খ্যাত ও পরিচিত, বজবজ ও তার দক্ষিণে গঙ্গার তীরে ও বুকে জেলে-মাঝিদের জীবনেতিবৃত্ত। কালরেখা ধরলে তা স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ের কথা, যদিও জব্বারের কলমে তা আবহমান গ্রামবাংলার ছবি হয়ে ওঠে। বর্ষার ভরা গঙ্গায় ইলিশ ধরতে যাওয়া মৎস্যজীবীদের পেশা ও জীবনের সংগ্রাম, মহাজন ও মধ্যস্বত্বভোগীদের শোষণ, গ্রামীণ সমাজের সংস্কার-কুসংস্কার, মানব-মানবীর প্রেম-ভালবাসা, দরিদ্রের শোষণমুক্তির স্বপ্ন সার্থক করে তুলতে কতিপয় শিক্ষিত মানুষের প্রয়াস ও শেষে তাঁদের সঙ্গে জেলে-মাঝিমাল্লাদের সমবায়— এই উপন্যাস স্থানে স্থানে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, অদ্বৈত মল্লবর্মণ ও সমরেশ বসুর কালজয়ী তিন উপন্যাসকে মনে পড়াতে বাধ্য। তবে জব্বারের স্বতন্ত্রতা ফুটে ওঠে তাঁর ভাষার ব্যবহারে— নিজে এই মাটি-জলের সন্তান বলেই তাঁর কলমে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার জেলে-মাঝির মুখের বাংলাভাষা গঙ্গার জলধারার মতোই অবাধ ও সাবলীল; এই ২০২৬-এ এবং বিশেষত ‘ভাষার মাস’ ফেব্রুয়ারিতে পড়তে গিয়ে মনে হয়, এই বাংলাকে আমরা সাহিত্যভাষা হিসেবে মর্যাদা দেওয়া দূরস্থান, কখনও বুঝতেও কি চেষ্টা করেছি?

জব্বারের চরিত্রচিত্রণ-দক্ষতাও চোখ এড়ানোর নয়। বিশেষত ইলিশমারির চর-এর জয়নদ্দি, সিন্ধু, পদী, তরব-দি, হরেন, রতন, কিংবা মাটির কাছাকাছি-র গৌর, বকুল, রেণু, চরণ দাসদের মধ্যে তারাশঙ্কর-মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়দের মাটি-জলে গড়া গ্রামীণ চরিত্রগুলির সুর ও বেসুর দুই-ই আছে। তবে তারাশঙ্কর যেখানে কোনও একটি চরিত্রের মানসিক অবস্থার সূত্র ধরে বৃহত্তর জীবনসত্য ও দর্শনের গভীরে চলে যান, জব্বার সেখানে অনেক বেশি বাস্তবমুখী, আক্ষরিক অর্থেই থাকতে চান ‘মাটির কাছাকাছি’। তাঁর লেখায় পাঠক দেখতে পাবেন কী করে গ্রামবাংলায়, বিশেষত নদীর বুকে বর্ষা নামে; বাংলার কৃষক কেমন করে ঘর করেন তাঁর ফসলের সঙ্গে, বৌ-ঝিয়েরা কী করে বেঁধে রাখেন স্বামী-সংসার-পারিবারিকতার আঁট। জব্বার খোলাখুলি ভাবে রাজনৈতিকতা এনে ফেলেন না তাঁর আখ্যানে, বরং শোষণবিরোধী আন্দোলনে গণ-এর শামিল হওয়াকে তিনি মানবিকতার দর্শন বেয়েই হাজির করেন— মহাজন বা আর্থিক ভাবে উচ্চবর্গের লোককে তাঁর উপন্যাসে দেখা যায় অন্যায় বখরা ছেড়েও দিতে। বাস্তবে এ কতটা বিশ্বাসযোগ্য তা অন্য প্রশ্ন, তবে জব্বারের কলমে, কাহিনি ও চরিত্রের সঙ্গে তা খাপ খেয়ে যায়।

আর সবচেয়ে বড় কথা, বাংলার গ্রামজীবনে হিন্দু-মুসলমান, উচ্চবর্গ-নিম্নবর্গের যে আবহমান সহাবস্থান, আব্দুল জব্বারের লেখনী তা তুলে ধরে ছবির মতো। গঙ্গায় ইলিশের মরসুমে, বর্ষার আগে ঘর ছাওয়ার কাজে, জমিতে শিম বেগুন ধান আখ চাষ বা গুড় জ্বাল দেওয়ার বিপুল পরিশ্রমসাধ্য কাজে জেলে কৃষক গৃহস্থের সঙ্গী জাত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সহমানুষ। তাড়ি গাঁজা নেশাভাঙের বিনোদনে, পরস্ত্রী কি পরপুরুষের প্রতি চোরা আকর্ষণে, জীবনের অগণিত স্খলন ও পতন সত্ত্বেও যে শেষাবধি ‘মানব’ই থেকে যায়— এই সত্যটি তুলে ধরে জব্বারের উপন্যাস। বাংলার কথাসাহিত্যে একদা নাগরিক ধুলো ধোঁয়া কোলাহলের পাশাপাশি গ্রামীণ প্রকৃতি, নদীর জোলো হাওয়া, ‘শুকটি’র গন্ধ মাখা ছিল। আজ সভা-সেমিনারে ‘ইকোক্রিটিসিজ়ম’ নিয়ে কত না চিৎকৃত সন্দর্ভ, সেই সাহিত্য-ভাবুকরা এক বার আব্দুল জব্বার ফিরে পড়তে পারেন। আপাতত এই বইয়ের পরবর্তী খণ্ডের অপেক্ষা।

শিশির রায়

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Review

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy