শীত আসতে তখনও অনেক দেরি। বাতাসে একটা চোরা হিম-হিম ভাব, অঘ্রানের পড়ন্ত বেলায় এলোমেলো হাওয়া দেয় মাঝে মাঝে। তবে দিনের আলো তাড়াতাড়ি চলে যাওয়াটা শুরু হয়ে গেছে। পাড়াগাঁ অঞ্চলে থাকি, আমাদের বাড়ির দিকটায় তখনও বিদ্যুৎ আসেনি। সম্বল বলতে শুধু কালি-পড়া হ্যারিকেন আর লম্ফ। আমরা হ্যারিকেনের নরম আলোয় দুলে দুলে পড়াশুনো করতাম, আর রান্নাঘরে লম্ফর টিমটিমে আলোয় মা’কে রাতের রান্নাবান্না সারতে হত।
একটু বেশি রাতের দিকে মাঝে মাঝে অমলেশদা আমাদের বাড়িতে আসতেন। ছ’ফুটের ওপর লম্বা, দেখতে-শুনতে ভালই। পড়াশুনোয় যদিও মাঝারি মাপের ছিলেন, কিন্তু ফুটবলটা খেলতেন জব্বর। টিমের ক্যাপ্টেন ছিলেন, মনে আছে। আর যে গুণটা ছিল, খুব ভাল কথা বলতে পারতেন। পড়াশোনা কেমন হচ্ছে, ফুটবলটা একটু নিয়মিত খেললে পারিস তো, এই জাতীয় মামুলি কথাবার্তাও যখন বলতেন, বলার ভঙ্গি আর উচ্চারণের জোরে কানে বাজত। অমলেশদার কথা হাঁ করে শুনতাম।
বাড়ি ঢুকে অমলেশদা বেশির ভাগ সময়েই বাবার খোঁজ করতেন। কী যে কথা বলতেন দুজনে তা জানি না, তবে দু-একটা টুকরোটাকরা কথা কানে আসত। এই স্বাধীনতাই কি চেয়েছিলাম, কবে আমরা আসল স্বাধীনতা পাব, এই জাতীয় শব্দগুচ্ছ আর বাক্যেরা ঘুরপাক খেত জানলাবন্ধ ঘরের মধ্যে। একটু যেন বিপ্লব-বিপ্লব গন্ধ পেতাম। মানে বুঝতাম না যদিও, কিন্তু ওই বয়সে কথাগুলো শুনে কেমন একটা রোমাঞ্চ হত, গায়ে কাঁটা দিত। আর অমলেশদা চলে যাওয়ার পর দেখতাম বাবাও কেমন যেন পালটে যেত। এই উদাস, আবার এই উসখুস।
বাবা ছাড়া বাড়ির আর একটা মানুষকে লক্ষ করতাম, আমার মেজদি। এমনিতে মেজদি খুব ধীরস্থির, কম কথা বলে। কিন্তু অমলেশদা এলে মেজদি যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। এমনিতে যে নিপাট শান্ত, ওই মিনিট কুড়ি-আধ ঘণ্টাটাক সময় সেই মানুষটাই অকারণে উচ্ছল। হয়তো দু’কাপ লাল চা বানাচ্ছে বাবা আর অমলেশদা খাবে বলে। তাতেও, কাপের মধ্যে চামচ নাড়ার ছন্দে, পিরিচে চলকে-ওঠা চা কাপড়ের খুঁট দিয়ে মুছে নেওয়ার যত্নে বোঝা যেত, ওর মনটা খুশি-খুশি। বাবার সঙ্গে কথাবার্তা শেষ হলে, অমলেশদাকে একটু এগিয়ে দিয়ে আসত মেজদি, খিড়কি দরজা অবধি। অমলেশদা শুধু বলতেন, আমার সঙ্গে বাড়ির বাইরে এসো না, তোমাদেরই বিপদ বাড়বে।
সে সময় অমলেশদা নানান জায়গায় বক্তৃতা দিচ্ছেন, ‘প্রকৃত স্বাধীনতা’ নিয়ে বক্তব্য রাখছেন। তবে আমার শোনার সুযোগ হয়নি খুব একটা। পাড়ার জটলায় শুনেছি লোকে খুব তারিফ করত। আমি এক বারই মেজদির একটা চিঠি অমলেশদাকে বাড়ি গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসি। সে বারও অমলেশদা বারণ করেছিলেন ও-ভাবে হুটহাট ওঁদের বাড়ি না আসতে। বারবার একটাই কথা বলতেন, তোদের বিপদ হতে পারে।
মা’র হাতের নারকেল নাড়ু খেতে অমলেশদা ভালবাসতেন। নাড়ু আমারও খুব প্রিয়, তাই ঘরে প্রায় সব সময়ই কৌটোয় রাখা থাকত চিনি আর গুড়ে পাকানো নারকেল নাড়ু।
আমাদের বাড়িতে অমলেশদার শেষ আসাটা স্পষ্ট মনে আছে। সামনেই আমার ফাইনাল পরীক্ষা, রাত জেগে পড়া তৈরি করছি। হঠাৎ খিড়কির দরজায় টোকা। মফস্সলের তুলনায় রাত একটু বেশিই, আশপাশ নিঝুম, তাই কাঠের দরজায় মৃদু টোকাও স্পষ্ট শুনতে পেয়েছিলাম। খুলে দেখি অমলেশদা। আমাকে দেখে বলে উঠলেন, হ্যাঁ রে, মেসোমশাই কোথায়? আমি বললাম, বাবা তো ঘুমোচ্ছে, ডেকে দেব? এক মুহূর্ত কী ভাবলেন, তার পর ‘না, ডাকতে হবে না’, বলেই ঘুরে হাঁটতে শুরু করলেন। মা ঘরের ভেতর থেকে দেখছিল, অমলেশদা চলে যাচ্ছে দেখে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, অমল, তোমার জন্য ক’টা নাড়ু রেখে দিয়েছি, নিয়ে যাও। সে কথা শুনে অমলেশদা আরও তাড়াতাড়ি হাঁটতে লাগলেন।
তত ক্ষণে মেজদিও দরজার কাছাকাছি চলে এসেছে। মেজদিকে দেখে অমলেশদা দূর থেকেই বললেন, কাজল, তুমি ভাল থেকো। ব্যস, এটুকুই, ওই চারটে শব্দ। আমাদের গলির বাঁকে, চাপ-চাপ অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল অমলেশদার শরীরটা। আমি আর দরজায় দাঁড়াইনি। উঠোনে শিউলি গাছের তলায় মেজদির ডুকরে ডুকরে কান্নার আওয়াজটা বহু ক্ষণ ধরে শুনতে পেয়েছিলাম। আমার কেমন যেন ভয়-ভয় করছিল।
কয়েকটা বছর পেরিয়ে গেছে তার পর। আমি তখন খালপাড়ের ধারে মেডিকেল কলেজে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। আবার একটা শীতের শুরু। অ্যানাটমি ক্লাসে ডিসেকশন করার সময় পাশের টেবিলে একটা বডি দেখে চমকে উঠলাম। ডিসেকশন মাথায় উঠল, খালি ভাবছি কত ক্ষণে ক্লাস শেষ হবে।
গভীর রাতে ডোমকে ম্যানেজ করে চাবি খুলে ডিসেকশন ঘরে গিয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগলাম হাতের সেই গভীর ক্ষতর দাগটা। গাছ থেকে পড়ে গিয়ে অমলেশদার হাতে ইনজুরির দাগ। আছে। এটা অমলেশদারই বডি! উলটে দেখি, বুকের বাঁ দিকে পাঁজরের কাছটায় আর একটা ছ্যাঁদা। উর্দিধারী পুলিশের অব্যর্থ নিশানার দাগ। হ্যাঁ, এটা এনকাউন্টারই তো। অন্তত খবরের কাগজে সেই রকম খবরই ছাপা হয়েছিল।
এর পরেও আমি গ্রামের বাড়িতে কয়েক বার গিয়েছি। কিন্তু মেজদিকে কিছু বলতে পারিনি। ভালবাসাটা অন্তত বেঁচে থাক।
শিবাজী চট্টোপাধ্যায়, হিদারাম ব্যানার্জী লেন, কলকাতা
hrishisivaji@gmail.com
সৎতরের দশকের কোনও ঘটনার সঙ্গে নাড়ির যোগ আছে?
লিখুন এই ঠিকানায়: হ্যালো 70’s, রবিবাসরীয়, আনন্দবাজার পত্রিকা,
৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০ ০০১। বা, লেখা pdf করে পাঠান
এই মেল-ঠিকানায়: robi@abp.in