E-Paper

সাহিত্য, সংস্কৃতি থেকে পুজোর নৈবেদ্য, সবেতেই অপরিহার্য বাঙালির পান্তাভাত

চণ্ডীমঙ্গল থেকে মনসামঙ্গল, ঠাকুরবাড়ির রান্না থেকে ছোটবেলার পান্তাবুড়ির গল্প— পান্তাভাতের আবেদন অপ্রতিরোধ্য। সারা রাত ভিজিয়ে রাখা ভাতে যে অম্ল তৈরি হয়, তাতেই আসে টক স্বাদ। আরও টক চাইলে আছে তেঁতুলের ছড়া, লেবু, দই। সঙ্গে খাওয়ার জন্য শাক-চচ্চড়ি, চিংড়ির ঝাল, বেগুনপোড়া, কী নয়! শরীর ঠান্ডা, মন তৃপ্ত, আরামের ঘুম। বাঙালি জীবনের এ এক আশ্চর্য সুস্বাদ।

আবীর কর

শেষ আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬ ০৬:৫০

যাহারা বলে, গুরুচরণের মৃত্যুকালে তাঁহার দ্বিতীয় পক্ষের সংসারটি অন্তঃপুরে বসিয়া তাস খেলিতেছিলেন, তাহারা বিশ্বনিন্দুক, তাহারা তিলকে তাল করিয়া তোলে। আসলে গৃহিণী তখন এক পায়ের উপর বসিয়া দ্বিতীয় পায়ের হাঁটু চিবুক পর্যন্ত উত্থিত করিয়া কাঁচা তেঁতুল, কাঁচা লঙ্কা এবং চিংড়িমাছের ঝাল-চচ্চড়ি দিয়া অত্যন্ত মনোযোগের সহিত পান্তাভাত খাইতেছিলেন। বাহির হইতে যখন ডাক পড়িল তখন স্তূপাকৃতি চর্বিত ডাঁটা এবং নিঃশেষিত অন্নপাত্রটি ফেলিয়া গম্ভীরমুখে কহিলেন, “দুটো পান্তাভাত যে মুখে দেব, তারও সময় পাওয়া যায় না।”’

‘রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা’ গল্পে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বরদাসুন্দরীর রসিয়ে পান্তাভাত খাওয়ার যে বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে কাঁচালঙ্কা, তেঁতুল আর চিংড়ির ঝাল-চচ্চড়ি দিয়ে পান্তাভাত খাওয়ার সুখস্বাদ অপূর্ব ফুটে উঠেছে। হয়তো বরদাসুন্দরীর পান্তাভাত খাওয়ার দৃশ্যে লেখকের ছেলেবেলার স্বাদু স্মৃতি উঁকি দিয়েছিল! জীবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছে কবির স্মৃতিচারণে উঠে এসেছিল— “বউঠাকরুণের আপন হাতের প্রসাদ স্বরূপ চিংড়ি মাছের চচ্চড়ির সঙ্গে পান্তাভাত, তার সঙ্গে একটু লঙ্কার আভাস মেখে দিলে তো কথাই নেই।”

গ্ৰামীণ প্রবাদ আছে, ‘মূলে মা রাঁধে না/ তায় আবার পান্তা!’ বা বলা হয়, ‘মূলে নাই রান্না/ তার আবার পান্না।’ ‘পান্না’ শব্দটি সম্ভবত পানি আর অন্ন মিলিয়ে তৈরি লোকশব্দ। সত্যিই তাই, আগে তো দুপুরের ভাত, তার পর তো এবেলার ভাত বাঁচলে তাতে জল ঢেলে ওবেলায় হবে জল-ঢালা বা ভেজা ভাত। গুমোট গরমে পেটকে প্রসন্ন রাখার জন্য রাত্রিকালীন সেরা খাবার এই জল-ঢালা ভাত। এই জল-ঢালা কিন্তু পান্তা নয়। একে বলা যেতে পারে প্রাক্-পান্তা বা পূর্ব-পান্তা, অপূর্ব স্বাদের পান্তা হতে গেলে ভাতকে অন্তত বারো থেকে চোদ্দো ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে। জলে-ভাতে দীর্ঘ সহবাসে ল্যাকটিক অ্যাসিড উৎপাদন হয়। পান্তাভাতে প্রচুর পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট, পটাশিয়াম, সোডিয়াম এবং আয়রন থাকে। যাতে ‘চমৎকার গন্ধ তার, অম্ন কিছু বেশি’। এই টক-টক স্বাদেই পান্তার জয়, গরমে শরীর জুড়ানোর সেরা খাদ্য।

তবে শুধু যে গরমকাল পান্তার কাল, তা নয়। পান্তাভাত এবং পান্তাভাত-চটকানো যে আমানি, তার সুখ্যাতি তথা সুস্বাদের গুণগান বহু পুরনো। কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের ‘চণ্ডীমঙ্গল’-এর কালকেতু উপাখ্যানে, গর্ভবতী নিদয়ার রসনাতৃপ্তিতে কবিকঙ্কণ লিখছেন, ‘পাঁচ মাসে নিদয়ারে না রুচে উদন/ ছয় মাসে কাঞ্জী করঞ্জায় মন।’ করঞ্জা তো করমচা, আর এই ‘কাঞ্জী’ হল বাসিভাত, গ্যাঁজানো টক ভাতের জল, যাকে বলে আমানি, যা গর্ভবতী মেয়েদের কাছে খুবই উপাদেয় ও রুচিকর। আবার মঙ্গলকাব্যের ধারায় দেখা যাবে, কবিকঙ্কণের ‘চণ্ডীমঙ্গল’ থেকে কেতকাদাস ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যে, পোয়াতি সনকার খাদ্যরুচি ওই একই— ‘পান্তা আমানি/ পাইলে এখনি/ সুখেতে আহার করি...’। কবিকঙ্কণ কালকেতুর বিটকেল ভোজনের বর্ণনা দিচ্ছেন— ‘মুচুড়িয়া গোঁফ দুটা বান্ধে নিঞা ঘাড়ে/ এক শ্বাসে তিন হান্ডি আমানী উজাড়ে।’ দেবী চণ্ডীর কাছে বারোমাস্যার বিবরণে ফুল্লরার আকুতি, ‘দুঃখ কর অবধান, দুঃখ কর অবধান/ আমানি খাবার গর্ত দেখ বিদ্যমান।’ বা তার আগে, অভাবের সংসারে ফুল্লরাকে কালকেতুর পরামর্শ, ‘খুদ কিছু ধার নিহ সয়্যের ভবনে/ কাঁচড়া খুদের কাঁজি রান্ধিবে যতনে।’ মধ্যযুগের বাংলা কাব্যের অজস্র দৃষ্টান্তে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ব্যাধের কুটির থেকে সওদাগরের অট্টালিকা পর্যন্ত পান্তাভাত ও আমানি খাওয়ার যথেষ্ট চল ছিল।

মঙ্গলকাব্যের সূত্র ধরে দেখা যাচ্ছে, পান্তাভাতকে ধর্মীয় অনুষঙ্গে বাঁধা আছে অনেক ক্ষেত্রে। যেমন কেতকাদাসের ‘মনসার ভাসান’ অংশে আছে, ‘পান্তা ওদন দিয়া পূজিবেক তোমা/ আশ্বিনে অনন্ত পূজা চিত্তে নাহি সীমা।’ যোগীন্দ্রনাথ সরকার সঙ্কলিত ‘খুকুমণির ছড়া’ গ্ৰন্থে আছে, প্রচলিত ছড়ার পঙ্‌ক্তি— 'শ্রাবণ মাসে ঢেলা ফেলা, ঘি আর মুড়ি/ ভাদ্রমাসে পচাপান্তা খান মনসা বুড়ি!’ এই ‘ঢেলা-ফেলা’ও শ্রাবণ সংক্রান্তির এক লোকাচার। আবার, কোনও কোনও জায়গায় মনসাপূজার লৌকিক আচার মেনে আষাঢ়ের পূর্ণিমা-পরবর্তী পঞ্চমী তথা নাগপঞ্চমীতে মনসার পূজা ও পরের দিন পালিত হয় ‘অরন্ধন’। এই অরন্ধন উৎসবকে পান্তা-পরবও বলে। এই পান্তা-পরবের পরিপূরক হল মাঘ-ফাগুনের বসন্তপঞ্চমী তথা সরস্বতীপুজো। সেই সময়েও পঞ্চমীর রাতে রান্নাবান্না করে পরের দিন খাওয়া হয়। অনেক জায়গায় এর আর এক প্রকার হল ‘গোটা-সিদ্ধ’, অর্থাৎ শাক-আনাজ কাটা হবে না, বাটা হবে না, তেল-হলুদে রান্না হবে না, হবে সম্পূর্ণ সিদ্ধ। এক দিনের জন্য উনুন ও শিল-নোড়ার ছুটি। আবার, সরস্বতীপুজোর পর চৈত্রে, নানা গ্ৰামেগঞ্জে শীতলা দেবীর পূজায় নিবেদন করা হয় পান্তাভাত। অন্য দিকে ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে, মূলত বাংলাদেশে এবং সীমান্ত সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গের কোথাও কোথাও আজও চৈত্রসংক্রান্তির দিন ভাত-তরকারি রান্না করে পরের দিন নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয় পান্তাভাতের ভোজ দিয়ে। চৈত্রের গাজন সম্পর্কে ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’য় আছে— ‘সন্ন্যাসীরা ক্লান্ত হয়ে ঘরে গিয়ে হাতপাখার বাতাস ও হাঁড়ি হাঁড়ি আমানি খেয়ে ফেল্লে।’ কোথাও কোথাও দুর্গাপুজোর বিসর্জনের দিন, মেয়ে উমাকে বিদায়বেলায় দেওয়া হয় পান্তাভাত। আর ব্যঞ্জন হিসেবে কোথাও কচুশাক, কোথাও বোয়াল বা ইলিশ মাছ। আবার কোথাও পুরনো ঐতিহ্য মেনে কলাইবাটা, পোস্তবাটা। তবে বিদায়মুহূর্তে ঘরের মেয়েকে পান্তাভাত খাওয়ানোর উদ্দেশ্য, যেতে হবে সুদূর কৈলাস, অনেকখানি পথ পাড়ি দিতে হবে, তার জন্য শক্তিদায়ী খাবার হল পান্তা। আর এ ছাড়াও কৈলাসে ফিরে মহাদেবের কাছে বাপের বাড়ির অবস্থাবৈগুণ্য বর্ণনায় পান্তাভাত বেশ মুখরোচক এবং চলনসই।

দুরবস্থার খাদ্য হিসেবে পরিচিত পান্তাভাত যে শুধুমাত্র প্রান্তিক বর্গের দেবী মনসা, শীতলারই উপভোগ্য তা নয়, বিদ্যাদেবী সরস্বতী এবং সর্বোপরি স্বয়ং দেবী দুর্গার প্রসাদধন্য হয়েছে পান্তাভাত। এই প্রসঙ্গে আর এক দেবতার পান্তা-প্রীতির কথাও উল্লেখযোগ্য, তিনি জগন্নাথদেব। ওড়িশার পুরীর মন্দিরে জগন্নাথদেবের জন্য আয়োজিত ছাপ্পান্ন ভোগের অন্যতম হল ‘পাখাল’ বা ‘পখলা’। যা দই-জল দিয়ে ভেজানো ভাত, এর পর তার সঙ্গে প্রয়োজনে আরও দই, তার পর লঙ্কাপোড়া, সর্ষের তেল, কারিপাতা যোগে গরম করে তাতে মেশানো। এই অধিক অম্লযুক্ত ‘দই-পাখাল’ নাকি জগন্নাথদেবের প্রিয় খাদ্য। পুরীর পান্ডারা বলেন, এতে প্রভুর ঘুম ভাল হয়। আমাদের পান্তাভাতের উৎসবের মতো ওড়িশায় আছে ‘পাখাল দিবস’। বৈষ্ণবরা বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের গরমে রাধাকৃষ্ণকে অনেক সময় পান্তাভোগ দেন। আসলে সব দেশে কালে ভক্তের রসনা-বাসনা অনুপাতেই দেবতাসমীপে সাজানো হয় নৈবেদ্য, রাখা হয় নিবেদন।

আর শুধু যে ধর্মীয় আচার-আচরণের পটভূমিতেই পান্তাভাতের কদর তা নয়, আমাদের খাদ্য-সংস্কৃতির অন্ন-তালিকায় পান্তাভাত যে অন্য মাত্রা এনে দেয়, সে তো আমরা গোড়াতেই রবিঠাকুরের লেখনী ও জবানিতে পেয়েছি। আর এই ‘রবীন্দ্র-সরণী’ বেয়ে যদি আমরা ঠাকুরবাড়ির অন্দরে ঢুকি, সেখানে স্মৃতিসঞ্জাত তথ্যের পাশাপাশি প্রামাণ্য রান্নার বইয়ে থাকা রকমারি ভাত-খিচুড়ি-পোলাওয়ের সারিতে পান্তাভাতের প্রকার ও প্রকরণ বিষয়েও জানতে পারি। বিশ শতকের গোড়ায় বাংলা ও বাঙালির রন্ধন বিষয়ে আলোকপাত করলেন প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী। তাঁর ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’ গ্ৰন্থে আছে বিস্তৃত অভিজ্ঞতা ও ভিন্‌রাজ্যের খাদ্য সংস্কৃতির সুলুকসন্ধান। এই গ্ৰন্থে ‘নানাপ্রকার ভাত রান্না’র মধ্যে ‘পোড়ের ভাত’ আদতে ফ্যান ভাত বা গলা ভাত, যা গাঁদাল পাতার ঝোল দিয়ে খেলে উদরাময় হয় নিরাময়। আর ভাল পান্তাভাত প্রস্তুতি বিষয়ে প্রজ্ঞাসুন্দরীর বক্তব্য, গরম ভাতকে সম্পূর্ণ ঠান্ডা করে, ‘গাঢ়া’ পাত্রে অর্থাৎ গভীর পাত্রে ভাতের উপরিভাগ থেকে এক গিরা উঁচু করে জল দিতে হবে। এক দিন পর সেই বাসিজল হবে আমানি। বেশি টক চাইলে লেবু কিংবা একছড়া তেঁতুল, সুগন্ধ চাইলে লেবু পাতা ফেলে রাখতে হবে পান্তাপাতার গাঢ়ায়। পান্তার সঙ্গী হিসেবে প্রজ্ঞাসুন্দরীর নির্বাচন উচ্ছের চচ্চড়ি, বেগুনপোড়া, মাছপোড়া। তাঁর বক্তব্য, মাঘ মাসে অনেকে পান্তাভাতের সঙ্গে কড়াইসেদ্ধ, কুলের অম্বল খান। তাঁর এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে বসন্তপঞ্চমীর গোটাসেদ্ধর মিল আছে। সাধারণ পান্তাভাতের পাশাপাশি প্রজ্ঞাসুন্দরী প্রদত্ত পান্তার দ্বিতীয় প্রকারে আছে, আধ হাঁড়ি ভাতকে এক হাঁড়ি জলে ভিজিয়ে হাঁড়ির মুখ কাপড় দিয়ে ভাল করে বেঁধে সকাল থেকে সন্ধে রোদে দাও। তার পর কোনও রকম আমানি না তুলে, প্রতিদিন সকালের রাঁধা ভাত ঠান্ডা করে এক-দু’মুঠো ভাত ওই জলীয় ভাতে মিশিয়ে দাও। দিন চারেক পর (হ্যাঁ, চার দিন) দ্যাখো তকতকে স্বচ্ছ আমানি, যা সুস্বাদু ও উপাদেয়। তবে ওই আমানির তলায় থাকা ভাত কেউ খায় না। এ ছাড়াও ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’ গ্ৰন্থের লেখিকার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভাত, জল, কমলালেবুর পাতা এবং নুন। পরের দিন ভাত কচলে ভাতের মন্ড ফেলে, তার পর আলাদা ভাবে লোহার হাতায় ঘি গরম করে তাতে সর্ষে, ফোড়ন ফুটিয়ে ওই আমানি-জলে হাতা-সুদ্ধ ডুবিয়ে দিলে, তৈরি হবে দুর্দান্ত মুখরোচক ‘হাতা-পোড়া সাঁতলানো’। পান্তা ও আমানি প্রস্তুতির এই রান্না-ঘরানার সঙ্গে মিল আছে ওড়িশার ‘পাখাল’ প্রস্তুতির।

বাঙালির খাদ্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর পূর্বে পান্তাভাতের উল্লেখ করেছেন বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘পাক-প্রণালী’ গ্ৰন্থে। যদিও সেখানে জল-ঢালা ভাত, লেবুর রস, তেঁতুল, টক-আমানির প্রসঙ্গ আছে, তবে পান্তাভাত শব্দটি অনুল্লিখিত, লেখা হয়েছে ‘পর্য্যুষিতান্ন’। তারই এক প্রকারের প্রকরণে আছে— এক সের চাল, এক পোয়া চিনি, মৃগনাভি, গোলাপ জল। প্রথমে এক পোয়া চিনির রসে গোলাপ জল ও মৃগনাভি যোগ করতে হবে, অন্য দিকে এক সের চালের ভাত ঠান্ডা করে ওই সুগন্ধ মিষ্টি জলে ঢালতে হবে। ছ’-সাত ঘণ্টা পর কাগজি লেবু দিয়ে এই ‘গোলাপী পর্য্যুষিতান্ন’ খেতে খুবই সুস্বাদু হবে।

এই পর্য্যূষিত অন্নকে নানা ভাবে খাওয়ার আরও অনেকগুলি ধরন বাতলেছেন ‘বরেন্দ্র রন্ধন’ (১৯২১) বইয়ের লেখিকা কিরণলেখা রায়। প্রখর গরমে বরেন্দ্রভূমি অর্থাৎ গৌড়বঙ্গজনের পছন্দ নুন-পান্তা, সঙ্গে ছোট পেঁয়াজ আর ঝাল-কাসুন্দি। ব্যঞ্জন হিসেবে কাঁচা আম দেওয়া মটরডালের চচ্চড়ি, কাঁঠালের ঝাল। কিরণলেখাও জানাচ্ছেন, দুর্গোৎসবের বিজয়াদশমীর দিনে দর্পণে দেবীর মুখাবলোকন হওয়ার পর, বিসর্জনের ঠিক আগে পান্তাভাত ও নালের বেসারি দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়। ‘নাল’ বলতে সাধারণত কোনও শাকের নাল বা ডাঁটাকে বোঝায়। আর ‘বেসারি’ হল সরষে ও মশলাবাটা দিয়ে তৈরি এক ধরনের ঝোল। এ ছাড়াও তাঁর দেওয়া তথ্যমতো, ঘোলে ভেজানো পান্তার সঙ্গে লেবুপাতার মিতালি পাতালে বাড়ে তার আস্বাদন। আর আম্বজল বা কাঁজি তৈরির আলাদা পাতিল (হাঁড়ি) ছিল, যেখানে পুরনো চালের ঝরঝরে ভাতকে পাঁচ থেকে সাত দিন রেখে, শুধু জলটুকু ছেঁকে নেওয়া হত। তা হল কাঁজি/কাঞ্জী, যা অম্লনাশক, গ্ৰীষ্মের দাবদাহে আরামদায়ক। কিরণলেখা বরেন্দ্রভূমের ‘কড়কড়া ভাত’ প্রসঙ্গে লিখেছেন, শীতকালে নতুন আমনের উষ্ণ চালের ভাত রোদে শুকিয়ে পরের দিন তেল, নুন, কাঁচালঙ্কা, মরিচবাটা দিয়ে মেখে খাওয়ার কথা। তার সঙ্গে যথাযথ সঙ্গতের জন্য থাকবে চিতল বা আড়মাছের বাসি সর-পড়া ঝোল‌।

বিভিন্ন খাদ্যরুচির পাশাপাশি পান্তাভাত যে এক শ্রেণির মানুষের অনেক পুরনো খাদ্যাভ্যাস, তার প্রমাণ আছে প্রচলিত ছড়ায়— ‘পান্তা খেয়ে শান্ত হয়ে/ কাপড় দিয়ে গায়/ গরু চরাতে পাঁচন হাতে/ রাখাল ছেলে যায়।’ এই রাখাল যেন অনাদিকালের অতীত হতে এই সেদিন পর্যন্ত সাতসকালে একপেট পান্তা-আমানি খেয়ে গাঁ-ঘরের সব গরু-বাছুরের পাল নিয়ে বেরিয়ে পড়ত গোচারণের জন্য। সকালের ভরপেট পান্তা তাকে দিনভর সতেজ রাখত। এর পর সূর্য যখন পাটে, তখন গোচারণের পাট চুকিয়ে রাখাল ফিরত গোধূলিবেলায়।

‘সহজ পাঠ’-এর দ্বিতীয় ভাগে উস্রি নদীর ঝর্না দেখতে যাওয়ার বেলায় কান্ত চাকরের খাবারে আগ্ৰহ নেই, কেননা ভোরের বেলায় তার বোন ক্ষান্তমণি তাকে পান্তাভাত খাইয়ে পাঠিয়েছে। এ ছাড়াও, প্রচলিত গল্পে আছে সেই অবিস্মরণীয় ‘পান্তাবুড়ি’, যাকে নিয়ে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ও যোগীন্দ্রনাথ সরকার উভয়ের কলমেই লেখা হয়েছে অসামান্য সেই গল্প। যেখানে পান্তা চুরির বিচার চাইতে রাজসভায় গেছে বুড়ি। পরিশেষে রাজার বিচার না-পেলেও শিঙিমাছ, বেল, গোবর, আর ক্ষুর সাহায্য করেছে বুড়িকে। চোরকে সমুচিত শাস্তি দিয়ে পান্তাবুড়িকে দিয়েছে পান্তাভাতের নিরাপত্তা, তার আহার্যের নিশ্চয়তা।

প্রাণধারণের জন্য যে অন্নসংস্থান, তার নিশ্চয়তা খুব জরুরি, এ তো যে কোনও মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। ‘নুন’ কবিতায় জয় গোস্বামী সেই সাধারণ ভাত-কাপড়ে খুশি হওয়া গরিবগুর্বো সামান্য লোকের হয়ে দাবি তোলেন, ‘আমাদের শুকনো ভাতে লবণের ব্যবস্থা হোক।’ সারা দেশের নিরিখে এই দাবি আজও প্রাসঙ্গিক। ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ প্রবাদটি আজও প্রচলিত। তবে প্রবাদ থেকে বাদ পড়েছে দারিদ্রের সঙ্গে পান্তাভাতের সংযোগ। বিশেষত আধুনিক ভ্রমণপিপাসু বাঙালি এখন বেড়াতে গিয়ে স্থানীয় খাবারের খোঁজ করেন। কলকাতাবাসী সপ্তাহান্তে জঙ্গলমহল বেড়াতে এসে খোঁজ করেন দেশি মুরগি, মহুয়া, পান্তাভাত, কুরকুটের চাটনি। তখন পান্তা ঝটপট তার জাত পাল্টে, জামবাটি বা কলাই-করা থালা সরিয়ে হয়ে ওঠে ‘ডিশ’, ডাকনাম ‘পান্তা-থালি’। ছ’-সাত রকম পদ দিয়ে সাজানো সেই থালির দাম তিনশো থেকে সাড়ে তিনশো টাকা। তাই চেটেপুটে খাচ্ছেন উচ্চ-মধ্যবিত্ত বাঙালি। সেই পান্তা-ভোজনে অনেকে নস্ট্যালজিক হয়ে পড়ছেন। স্বাদের স্মৃতি পেয়ে মনের মধ্যে উঁকি দিয়ে যাচ্ছেন তাদের জীবনের ‘ইন্দির ঠাকরুন’ থেকে ‘ইন্দুবালা’। কেননা জিভের স্বাদকোরকেই তো জমা থাকে জীবনের ভাল লাগা স্বাদের উপভোগ। তাই পান্তা একই সঙ্গে বাঙালির স্মৃতি, সত্তা ও সংস্কৃতি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Fermented Rice Panta Bhaat Summer Foods

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy