E-Paper

অনসূয়া

আবার কেউ বলেছে, “সত্যি-মিথ্যে জানি না, শুনেছি বেড়ালরা নাকি অনেক সময় বাড়ি ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যায়, শেষে আর পথ চিনে ফিরতে পারে না।” শুনে অনসূয়ার মুখখানি থমথম করছে।

অরুণাভ দত্ত

শেষ আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬ ০৭:৩৮

ছবি: মহেশ্বর মণ্ডল।

দু’দিন হল আদুরি বাড়ি ফেরেনি। উদ্বেগে দু’রাত্রি দু’চোখের পাতা এক করতেপারেনি অনসূয়া। নাওয়া-খাওয়া ভুলে শুধু ঘর-বার করছে। যে যে জায়গায় আদুরি ঘাপটি মেরে বসে থাকে— মিটারঘরের অন্ধকারে, সিঁড়ির নীচে ঘুপচিতে আরশোলার আস্তানায় কিংবা বাড়ির পিছনে ভাঙা বাথরুমের ভিতর ইঁদুরের ভরা সংসারে— আঁতিপাতি করে খুঁজে দেখেছে অনসূয়া। পাড়াপ্রতিবেশীদের কাছেও খোঁজ নিয়েছে। কিন্তু আদুরির কোনও খবর পায়নি।

কেউ কেউ বলেছে, “হতে পারে কুকুরের তাড়া খেয়ে কোথাও লুকিয়ে পড়েছে, ভয়ে বেরোতে চাইছে না।”

আবার কেউ বলেছে, “সত্যি-মিথ্যে জানি না, শুনেছি বেড়ালরা নাকি অনেক সময় বাড়ি ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যায়, শেষে আর পথ চিনে ফিরতে পারে না।” শুনে অনসূয়ার মুখখানি থমথম করছে।

বড্ড ঘরকুনো ছিল চার মাসের আদুরি। এর আগে সে কখনও অনসূয়াকে ছেড়ে এতক্ষণ বাড়ির বাইরে থাকেনি। ঘরের বাইরে সামান্য শব্দ হলেই ভয় পেয়ে ছুটে এসে খাটের নীচে লুকোত। সেই বিড়াল আজ দু’দিন হল নিখোঁজ!

আতান্তরে পড়ে অনসূয়া ভেবে পায় না, কোথায় তাকে খুঁজবে? কার কাছে সাহায্য চাইবে? মানুষ হলে তবুও আশা ছিল, কিন্তু একটা বিড়ালছানা হারিয়ে গিয়েছে শুনলে কার কী যাবে-আসবে? বিশেষ করে তার শ্বশুরবাড়ির লোকজনের— অনসূয়ার চোখে তারা এক-একটা অমানুষ; নইলে একটা অবোলা বিড়ালছানার ক্ষতি করবে বলে কেউ বাড়ির যেখানে-সেখানে ইঁদুর-মারার বিষ ছড়িয়ে রাখে! যদি খেলার ছলে আদুরি তাতে মুখ দিয়ে ফেলত! অনসূয়া সেই নিয়ে গলা ফাটালে তার সেজ জা আরতি অবশ্য বলেছিল, “কে তোর বেড়ালকে মারতে চায়? বাড়িতে ইঁদুরের উৎপাত বাড়লে তার একটা ব্যবস্থা নেব না?”

অনসূয়া ভুলতে পারে না যে, এককালে এই আরতি চোর সন্দেহে কত বিড়ালকে নির্মম ভাবে পিটিয়ে জখম করেছে। কে বলতে পারে, আদুরি নিখোঁজ হওয়ার পিছনে আরতি কিংবা এ বাড়ির অন্য কারও মদত আছে কি না! এখনও তার কোনও পোক্ত প্রমাণ পায়নি অনসূয়া। তবে সে আড়ি পেতে তার মেজ জা বনানীকে বলতে শুনেছে, “এর জন্য ঠাকুরের কাছে মানত করেছিলাম। তা ঠাকুর মুখ তুলে চেয়েছেন।”

ওইটুকু শুনেই অনসূয়া নিশ্চিত যে, আদুরিকে সরিয়ে দেওয়ার জন্যই বনানীর ওই মানত। কারণ বনানীর খুব ভয় ছিল যে, আদুরি কোন দিন তার নাতনিকে আঁচড়ে-কামড়ে দেবে। এখন নিশ্চয়ই তার হাড় জুড়িয়েছে! ভেবেই অনসূয়া তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে। ঈশ্বরের কাছে কেঁদেকেটে অনুযোগ করে, “তুমি আজকাল অসৎদের মন জুগিয়ে চলো!”

এ-বাড়ির সবার সঙ্গে অনসূয়ার সম্পর্ক তেল আর জলের মতো; কারও সঙ্গে তার মেশামিশি নেই, সদ্ভাব নেই। না বাড়ির অন্দরে, না বাড়ির বাসিন্দাদের অন্তরে— কোথাও সে এতটুকু শুচিতা খুঁজে পায় না। অনসূয়া পঞ্চাশোত্তীর্ণা বিধবা, সন্তান কিংবা সচ্ছলতা— এ জীবনে কোনওটারই মুখ দেখেনি। তার স্বামী সরোজ বেঁচে থাকতে সংসারের হাল ধরা তো দূর, অজগরের মতো শুধু খেয়েছে আর ঘুমিয়েছে। স্বামীর অকর্মণ্যতার খেসারত দিতে অনসূয়াকেই সেলাই মেশিন চালিয়ে সংসার টানতে হয়েছে, শোধ করতে হয়েছে স্বামীর এক গলা দেনা, হাত পাততে হয়েছে অন্যের কাছে। সরোজের জন্য কোনও দিন মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারেনি সে, তাই স্বামীর প্রতি অনসূয়ার তীব্র বিতৃষ্ণা।

এখন তার জায়েরাও বিধবা, অথচ তাদের ঘরের বাতাসে ম ম করছে টাকার গন্ধ। মাস গেলে স্বামীর পেনশন, উপরন্তু ছেলে কিংবা জামাইয়ের দেওয়া হাতখরচ, দেখে দেখে অনসূয়ার চোখ টাটায়। আরতির ঘরে নতুন রঙের গন্ধ, পচা গরমে বনানীর ঘরের এসি চলার শব্দ, নাতনির সঙ্গে তার খুনসুটি— এ-সব যেন অনসূয়ার ঘরের বাতাস দীর্ঘশ্বাসে ভারী করে তোলে। তার পর আদুরি এসে অনসূয়ার পায়ে মাথা ঘষে আর বাতাসের গুমোট ভাবটা যেন একটু একটু করে শুষে নেয়।

নিজের অনাগত কন্যাসন্তানের জন্য ভেবে রাখা নামটাই তাকে দিয়েছে অনসূয়া। আদুরি যেন তার সেই আত্মজা। পান থেকে চুনটি খসলেই অনসূয়ার মেজাজ সপ্তমে চড়ে, অথচ আদুরির বেলায় সাত খুন মাফ। বিড়ালের প্রতি এতখানি দরদ অনসূয়ার কোনও দিনই ছিল না। আজন্ম ওদের রোগবালাইয়ের ডিপো বলেই জেনেছে। তার উপর অনসূয়া নিজেও ভীষণ পিটপিটে। যত বার সে শৌচে যায় তত বার স্নান করে, রোজ বিছানার চাদর কাচে, অন্যের ঘরের পাপোশ মাড়ালে পায়ে যেন কাঁটা ফোটে; তাই তার বিড়াল পোষার বহর দেখে অনেকেরই চোখ কপালে।

গত পৌষের কথা। এক দিন নিশুতি রাতের বাতাসে স্পষ্ট শোনা গেল একটা মিউমিউ ডাক। এ বাড়িরই কোথাও বসে ডাকছে একটা বিড়ালছানা। ঘরের বিছানায় শুয়ে ডাকটা শুনতে শুনতে অনসূয়ার মনে হয় যেন বিড়ালটা তার দরজার বাইরেই বসে আছে। ক্রমে বাড়ির একটা-দুটো করে ঘরের দরজা খুলে যেতে ডাকটা থিতিয়ে গেল অন্ধকারে। তখন আলো জ্বেলে খোঁজাখুঁজি করে দেখা গেল, দোতলায় ওঠার যে সিঁড়ি, তারই নীচে অন্ধকারে দু’-আড়াই মাসের একটা বরফরঙা বিড়ালছানা জবুথবু হয়ে বসে শীতে কাঁপছে। বিড়ালটা কখন, কী ভাবে বাড়ির ভিতর ঢুকল, এ-সব নিয়ে অনেক জল্পনার পর তাকে বিদায় করার তোড়জোড় শুরু হল। সদর দরজা খুলে রেখে সবাই তাকে যত হুড়ো দেয়, লাঠি ঠুকে ভয় দেখায়, কিংবা সিঁড়ির নীচে অপ্রশস্ত স্থানে হাত গলিয়ে যতই তার নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করে, ততই সে ভয়ের চোটে আরও দেওয়াল ঘেঁষে বসে। আলোয়ানটা গায়ে জড়িয়ে দূরে দাঁড়িয়ে ছানাটাকে লক্ষ করছিল অনসূয়া। হাড় জিরজিরে ছোট্ট শরীর, ভয়ে নিজের সরু লেজখানা পেটের নীচে গুটিয়ে রেখেছে, দু’চোখে অসহায় দৃষ্টি। অনসূয়ার হঠাৎ মনে হল, বিড়ালছানাটার বুকেও যেন বিঁধে আছে কত উপেক্ষা আর একাকিত্ব। হয়তো তার মা নেই! তাই সে এই অসহ্য ঠান্ডায় আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছিল, খিদের জ্বালায় আর থাকতে না পেরে কাঁদছিল। এখন তাকে বার করে দিলে বিপদ কী কম! রাস্তায় ধেড়ে ধেড়ে কুকুর ঘুরছে, অদূরে মেন রোড দিয়ে ছুটে চলেছে ভারী ভারী ট্রাক! আবার এখন পৌষ মাসও বটে।

মুখ ফুটে আপত্তি জানাল অনসূয়া, “পৌষ মাসে কেউ বাড়ি থেকে কুকুর, বেড়াল খেদায় না।”

আরতি বিরক্ত মুখে জবাব দিল, “তা হলে এই হ্যাপা সামলাবে কে?”

অনসূয়া নিরুত্তর। সে জানে, এর পর কথা বাড়ালে সব দায় তার ঘাড়েই এসে পড়বে। ততক্ষণে ছানাটাকে কষ্টেসৃষ্টে সিঁড়ির তলা থেকে বার করা গেছে। প্রাণপণে চিৎকার করছে সে। হঠাৎ একটা কথা অনসূয়ার হৃদয়ে বজ্রের মতো আছড়ে পড়ল, ‘মানুষ নয় বলেই কি ওর জীবনটা মূল্যহীন!’

সঙ্গে সঙ্গে একটা অদম্য রোখ এসে গুঁড়িয়ে দিল তার মনের সব দ্বন্দ্ব। অনসূয়া মৌন ভেঙে বলল, “ওকে ছেড়ে দাও। ও আমার ঘরে থাকবে, আমার হাঁড়িতে খাবে।”

কিন্তু সবাই তা মানতে নারাজ। কারণ বিড়াল স্বভাবত চোর হয়, ওদের লোম থেকে রোগ ছড়ায়, ছোট ছেলেমেয়েদের আঁচড়ানো-কামড়ানোও অসম্ভব নয়, বাড়িতে একটা বিড়াল থাকলে বাইরের দশটা বিড়ালের আনাগোনা বাড়ে, বছর বছর বাচ্চা বিয়োয়। কিন্তু অনসূয়া সে-সব কানেই তোলে না। উল্টে মুখের উপর বলে দেয়, “মানুষই বা কী কম যায়? ওইটুকু বাচ্চা, এই মরণ ঠান্ডায় বাইরে বাঁচবে কী করে? তাতে যে ভিটেরও অমঙ্গল!”

বলা যায়, অনসূয়া এক রকম গা-জোয়ারি করেই বিড়ালটাকে রাখতে পেরেছে। এখন পৌষ কেটে গিয়ে চৈত্র মাস। এই কয়েক মাসের মধ্যে শুধু এ বাড়িতেই নয়, অনসূয়ার হৃদয়েও আদুরির স্থান পাকা।

অনসূয়ার ঘর জুড়ে শুধুই আদুরির স্মৃতি। তার খাবারের থালা, জল খাওয়ার বাটি, খেলার বল, সোফায় নখের আঁচড়ের দাগ— সে-সব চোখে পড়লেই কষ্টটা যেন বিড়ালের নখ শাণ দেওয়ার মতো অনসূয়ার বুক আঁচড়ায়।

পুরনো ক্যালেন্ডার কিংবা পঞ্জিকা, কালি-ফুরোনো কলম, নিঃশেষিত চায়ের ভাঁড়, গঙ্গাতীরে পড়ে থাকা প্রতিমার কাঠামো— এমন প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়া বস্তুর প্রতি এক অদ্ভুত মায়া আছে অনসূয়ার। সে জানে, অভাবই তাকে সবার কাছে খেলো করেছে, আর সন্তানহীনতাই তাকে দিয়েছে সমস্ত উৎসব-উল্লাস থেকে নির্বাসন। পুজোর সময় ননদেরা তাদের বৌদিদের নতুন শাড়ি দিলে অনসূয়ার সন্দেহ হয় যে, বেছে বেছে সবচেয়ে খেলো শাড়িটাই তার জন্য রাখা হয়েছে।

সবাই তাকে আড়ালে ‘শুচিবাই’ বললেও অনসূয়া জানে, সেটাই তার মস্ত গুণ। এ বাড়ির কেউ কোনও দিন আচার-বিচার মেনেছে? আরতি চা-পাউরুটি খেয়ে জপ করতে বসে, বনানীর ফ্রিজে আমিষ-নিরামিষ দুই-ই থাকে, তার পুত্রবধূ জয়ন্তী বিছানায় বসে রুটি-মাংস খায়। এত অনাচার দেখার পর নিজের ঘরের দিকে ফিরে তাকায় অনসূয়া। চটা-ফাটা দেওয়ালে পরিপাটি ঠাকুরের সিংহাসন, খুপরি হেঁশেলে আমিষ আর নিরামিষের আলাদা আলাদা বাসন— মনটা প্রশান্তিতে ভরে ওঠে তার। সে জানে, এ ভিটেয় যদি লক্ষ্মী অচলা থাকেন তবে তা তারই জন্য।

কিন্তু তার সেই শান্তিও ক্ষণস্থায়ী। সরোজ একটা স্ট্রোকের পর সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী হয়ে পড়ায় বেডপ্যান ব্যবহার করত। এই বন্দোবস্ত বজায় ছিল আমৃত্যু। তখন অনসূয়ার কাছে ঘরটা ছিল আস্তাকুঁড়। সর্বত্র গঙ্গাজলের ছিটে দেওয়া, মিনিটে-সেকেন্ডে ঘর মোছা, বারে বারে স্নান করা— এ-সব তো লেগেই ছিল। তবে সরোজের মৃত্যুর পরে এ ঘরের শুচিতা নষ্ট করতে যে আরও কয়েক কদম এগিয়ে গেল, সে হল আদুরি।

গোড়ায় আদুরিকে নিয়ে কম অশান্তি ছিল না অনসূয়ার। তারই চোখের সামনে আদুরি ঘরময় মাছের কাঁটা ছড়ায়, ঠাকুরের সিংহাসনে উঠে গঙ্গাজলের ঘটি উল্টে দেয়, দেখে রাগে তার গা রি-রি করত। তার পর আদুরি যখন মিষ্টি গলায় ডাকত, সর্বক্ষণ তার ছায়া হয়ে ঘুরত কিংবা তার কোলে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকত, তখন অনসূয়ার দেহে-মনে আনন্দের জোয়ার খেলত। মনে হত ভগবানকে সে বৃথাই দুষেছে, তার কোলও আর শূন্য নেই।

আজকাল অনসূয়ার সঙ্গে একটা আশ্চর্য ব্যাপার ঘটছে। ঘরের আয়নার সামনে দাঁড়ালে চেনা মুখটাকে রোজ একটু একটু করে নতুন লাগছে তার। হতে পারে তার চোখের ভুল। ইদানীং পুজোর জন্য রাখা ফুল আদুরির স্পর্শে আর অশুচি হয় না, কারণ খবরের কাগজে ছাপা ছবিতে অনসূয়া দেখেছে যে, ফুলের বাজারে কাদা, পাঁকের মধ্যে কী ভাবে ফুল-মালা বিক্রি হয়। এখন সে নির্দ্বিধায় একাদশীর দিন আদুরির জন্য মাছ ছোঁয়। এমনকি ঘরের এক কোণে গামলার মধ্যে বালি রেখে আদুরির শৌচের ব্যবস্থা করতেও কুণ্ঠা করেনি।

সকাল থেকে কাকটা জানলার বাইরে পাঁচিলে বসে অনবরত ডেকে যাচ্ছে। শুনে অনসূয়ার মনটা কেমন আনচান করে ওঠে। আদুরি ফিরলে সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরে পুজো দেবে বলে সে আঁচলের খুঁটে পয়সা বাঁধছিল। হঠাৎ বাইরে থেকে ভেসে এল এ বাড়ির পরিচারিকা বন্দনার চিৎকার, “বেড়ালটা তোমাদের দোরের কাছে শুয়ে কেমন করছে গো!”

অনসূয়ার বুকের ভিতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। নিজেকে সে স্মরণ করাল, ক’দিন আগে একটা হুলো বেড়াল অসুস্থ অবস্থায় ঘুরছিল না? তার পর ঘরের বাইরে পা রেখেই পাথর হয়ে গেল সে। আদুরি ফিরে এসেছে। নেতিয়ে পড়েছে সদর দরজার সামনে। তার শ্বাস চলছে এখনও, তবে চোখের কোণে ঘনিয়ে আছে গভীর ক্লান্তি। ধুলোমাখা গা, তৃষ্ণায় জিভটা শুকিয়ে কাঠ।

অনসূয়ার চোখের উপর নামছে অন্ধকার। কান্নাটা গলায় ধাক্কা মেরে বেরোনোর পথ খুঁজছে। আদুরি যেন তার কাছে ফিরেও ফিরল না। বন্দনার চিৎকার শুনে সদর দরজার সামনে জড়ো হয়েছিল সবাই। এখন বনানীকে সামনে পেয়েই অনসূয়া জ্বলে ওঠে, “এই জন্যই তো তুমি মানত করেছিলে? যাও, তুলসীতলায় হরির লুট দাও!” অনসূয়ার মুখ টকটকে লাল। উত্তেজনায় কাঁপছে থরথর করে।

বনানী উত্তর দেয়, “সন্তানের মঙ্গলের জন্য ষষ্ঠীর উপোস করে শেষে বেড়ালের মরণ কামনা করব?”

আরতি এবার বলে, “ওর ভাইয়ের হার্টের অপারেশন হয়েছে! সেই জন্যই মানত করেছিল। তুই শান্ত হ, ছোটবৌ!”

কিন্তু কী ভাবে শান্ত থাকবে অনসূয়া? তার পৃথিবীটাই যে হারিয়ে যেতে বসেছে। আরতি এক বাটি জল এনে চামচে করে অল্প অল্প আদুরির মুখে দিচ্ছে।

জয়ন্তী বলল, “যোগমায়া সিনেমা হলের সামনে পশুদের চিকিৎসার জন্য একটা সরকারি হাসপাতাল আছে। ওকে নিয়ে সেখানে এক বার যাও না ছোটকাকিমা!”

ওই হাসপাতালের কথা অনসূয়াও শুনেছিল বটে। তখনই বন্দনা ছুটল রাস্তা থেকে টোটো ধরে আনতে, আর বলে গেল সেও যাবে অনসূয়ার সঙ্গে। বনানী নিজের ঘর থেকে একটা ঢাকনা দেওয়া ঝুড়ি এনে অনসূয়ার উদ্দেশে বলল, “বাচ্চাটাকে এর মধ্যে ভরে নে।”

জেলা প্রাণী চিকিৎসা হাসপাতালের গেটের কাছে একটা রোয়াকে আদুরিকে কোলে নিয়ে বসে আছে অনসূয়া। তার চারপাশে মানুষ আর পশুর নিবিড় ভালবাসার ছায়া। অনেকেই তাদের প্রিয় পোষ্যদের এখানে নিয়ে এসেছে চিকিৎসার জন্য। নতুন পরিবেশ আর অচেনা মুখের ভিড়ে ভয় পাওয়া পোষ্যদের তারা সন্তানস্নেহে আগলে রেখেছে। তাদের কাউকে পর মনে হয় না অনসূয়ার, যেন এক অদ্ভুত নিঃস্বার্থ ভালবাসা সবাইকে এক সুতোয়বেঁধে রেখেছে।

আদুরি এখনও শ্বাস নিচ্ছে। ডাক্তারবাবু বলেছেন, “ভয় নেই, ও বেঁচে যাবে।”

এই দু’দিন হয়তো কোথাও আটকে পড়েছিল আদুরি। বেরোতে না পেরে দীর্ঘ সময় অনাহারে ছিল। অবশ্য স্যালাইন নেওয়ার পর সে ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকিয়েছে। তার পর থেকে অনসূয়ার হৃৎস্পন্দনের মতোই ধীরে ধীরে কমছে তার শরীরের কাঁপুনিটা।

টোটোচালক ভাইটিকে অনসূয়া ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন আর টাকা দিয়ে পাঠিয়েছে ওষুধের দোকানে। তারই অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে অনসূয়ার বার বার মনে পড়ছে বাড়ি থেকে বেরোনোর মুহূর্তটা। বাড়ির সবাই জোট বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিল অনসূয়া আর আদুরির জন্য। তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। এ দৃশ্য অনসূয়ার কাছে ভীষণ অচেনা, একেবারে অভাবনীয়।

বন্দনা বসে আছে অনসূয়ারই পাশে। সদ্য-কেনা বিস্কুটের প্যাকেট ছিঁড়ে একটা বিস্কুট অনসূয়ার মুখের সামনে ধরে সে বলছে, “একটু খেয়ে নাও ছোটবৌদি।”

বন্দনার হাতে খেতে সঙ্কোচ হচ্ছে অনসূয়ার। তার মনে পড়ছে, মাসের তিনটে দিন সে নিজে পুজো করতে পারত না, তখন বন্দনাই সকালে স্নান করে এসে বাইরের কাপড় ছেড়ে তার ঠাকুরকে জল-বাতাসা দিত। কিন্তু যেদিন অনসূয়া কানাঘুষোয় জানতে পারল যে, বন্দনা দুশ্চরিত্রা, সেদিন থেকে অনসূয়া তাকে আর ঘরের চৌকাঠ মাড়াতে দেয়নি। অথচ এখন খুঁটিয়ে দেখেও বন্দনার অপবিত্রতার চিহ্নগুলো খুঁজে পাচ্ছে না সে।

অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা গাড়ির কালো কাচে ভেসে উঠেছে অনসূয়ার মুখ। কাচে প্রতিফলিতসেই মানুষটার দু’চোখে সন্দিগ্ধ দৃষ্টি— যেন অনসূয়াকে সে আগে কখনও দেখেনি।


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Short Story Bengali Story

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy