E-Paper

আমার মা, আমার ফুটবল

দারিদ্র। প্রতিবেশীদের উপেক্ষা, কটাক্ষ। মাঠে নেমে সব জবাব দেওয়া চামড়ার ওই গোলায়। বিশ্বকাপে ভোজ়িনা থেকে রাউল, জীবনজয়ীদের লড়াইয়ের কথা যত জানছেন, ফিরে আসছে নিজের জীবনের পুরনো পাতাগুলো। ফুটবল, জীবন আর মাকে নিয়ে লিখলেন ভারতীয় ফুটবল দলের সদস্য সঙ্গীতা বাসফোর।

সঙ্গীতা বাসফোর

শেষ আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬ ০৭:০৬

ছবি: কুনাল বর্মণ।

আমার মা।

আমার শক্তি।

আমার ক্যাপ্টেন।

বিশ্বকাপে স্পেনের বিরুদ্ধে কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজ়িনার লড়াই, আর তাঁর অতীত আমাকে নিয়ে গিয়েছিল প্রায় পনেরো বছর আগে। আমার জীবনের সঙ্গে কী আশ্চর্য মিল!

ভোজ়িনার বাবা সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। তাই বাড়িতে থাকতে পারতেন না। কর্মসূত্রে মা-ও থাকতেন অন্যত্র। দাদু-ঠাকুমাই বড় করেছেন কেপ ভার্দের গোলরক্ষককে।

আর আমার বাবা বন্দি ছিলেন বিছানায়। আমার বয়স তখন কতই বা হবে? খুব বেশি হলে বছর দুই। অসুস্থ হয়ে বাবা যে সেই শয্যাশায়ী হলেন, আর কোনও দিনই উঠে দাঁড়াতে পারেননি। বছর পাঁচেক আগে তো চলেই গেলেন। কী ভয়ঙ্কর সেই সময়টা কাটিয়েছি। ব্রাজিল সফরের জন্য ভারতীয় দলে সুযোগ পাই আমি। কিন্তু রওনা হওয়ার কয়েক দিন আগে হাঁটুতে চোট পেয়ে ছিটকে গেলাম দল থেকে। তাই অস্ত্রোপচারের পরে কল্যাণীর বাড়িতে এসেছিলাম। ইচ্ছে ছিল বাবার সঙ্গে সময় কাটাব ও রিহ্যাব করব দ্রুত মাঠে ফেরার জন্য। কিন্তু বাবার শারীরিক অবস্থার এতটাই অবনতি হয়েছিল, আমাকে চিনতেই পারেননি। এত কষ্ট হয়েছিল যে পরের দিনই কর্মস্থল শিলিগুড়ি ফিরে গিয়েছিলাম। আর চার দিনের মধ্যে হারালাম বাবাকে।

আমার মা, আমার ক্যাপ্টেন কল্যাণীর গান্ধী মেমোরিয়াল হাসপাতালের সাফাইকর্মী। খুব কমই সময় পেত বাড়িতে থাকার। ভোজ়িনার তবুও দাদু ও ঠাকুমা ছিলেন। আমাদের চার বোনের ছিলেন শুধুই ঠাকুমা। কার্যত তিনি একাই মানুষ করেছেন আমাদের। হাসপাতালের কোয়ার্টার্সের এক চিলতে ঘরে আমাদের বিরাট সংসার। অথচ রোজগার মাত্র এক জনের। উদয়-অস্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পরেও বিশ্রাম নেওয়ার কথা ভাবা? সে তো আমার মায়ের কাছে চরম বিলাসিতা। মা হাসিমুখে শুধু সংসারই সামলায়নি, আমাদের সব অভাব পূরণ করার যথাসাধ্য চেষ্টা করে গিয়েছে সব সময়।

মহালয়ার পর থেকেই বন্ধুরা নতুন জামা-জুতো দেখাত। আমরা চার বোন মনখারাপ করে বসে থাকতাম। হাসপাতাল থেকে ফিরলে রোজ মাকে জিজ্ঞেস করতাম, এ বার পুজোয় আমরা নতুন জামা পরব না? মা কোনও উত্তর না দিয়ে কখনও রান্নায়, কখনও আবার ঘর গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ত। আর আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছত। পঞ্চমী বা ষষ্ঠীর সন্ধেয় আমাদের জন্য নতুন জামা কিনে নিয়ে আসত। বন্ধুরা পুজোর পাঁচ দিনই নতুন জামা পরত। আমরা চার বোন একটা জামাই পাঁচ দিন ধরে পরতাম। ছোটবেলায় কোনও দিন মাকে পুজোর সময় নতুন শাড়ি পরতে দেখিনি। তখন বুঝতে পারিনি, এখন বুঝি। নিজের জন্য শাড়ি মা কিনবে কী করে? সব টাকা তো আমাদের জামা কিনতেই শেষ হয়ে যেত। আমরা চার বোন, বাবা এবং ঠাকুমাই শুধু নন, মাসিরাও তো নির্ভরশীল ছিল মায়ের উপরে। তাই হয়তো পুজোর মধ্যেও মা কখনও ছুটি নিত না। সকালে বেরিয়ে যেত, হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরত রাতে।

মেয়ে হয়েও ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলতাম বলে কম লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়নি আমাকে। মাকেও শিকার হতে হয়েছিল কটাক্ষের। কিন্তু মা কখনও পিছু হঠেনি। মায়ের নাম ফুলঝুরি হলেও তেজ মশালের মতোই। আমাকে বলত, “যে যা-ই বলুক, কারও কথায় কান দিবি না। কখনও খেলা বন্ধ করবি না। অন্য কোনও ব্যাপারে মাথা ঘামাবি না। মন দিয়ে খেলে যা। আমি তো আছি।”

২০১৫ সালে আমি যখন প্রথম বার ভারতের সিনিয়র দলে সুযোগ পেলাম, মা শুধু কাঁদছে। মনে হচ্ছিল যেন, সঙ্গীতা বাসফোর নয়, বাংলা থেকে ভারতীয় সুযোগ পাওয়া ফুটবলারের নাম ফুলঝুরি দেবী! মায়ের সেই কান্না ছিল আনন্দের। অপমানের জবাব দেওয়ার। জিজ্ঞেস করেছিলাম, “ভারতীয় দলে সুযোগ পেয়েছি। তুমি এ বার খুশি তো?” চোখের জল মুছে মা বলেছিল, “শুধু দলে সুযোগ পেলেই হবে না। সব ম্যাচে শুরু থেকে খেলতে না পারলে কোনও মূল্য নেই।” এই কি আমার সেই মা, যে একটু আগেই কেঁদে ভাসাচ্ছিল? মনে হচ্ছিল যেন মাঠের বাইরে থেকে এক জন কোচ চিৎকার করে বলে চলেছেন, ‘সঙ্গীতা, একদম ভয় পাবি না। এগিয়ে চল। স্বার্থপরের মতো একা গোল করার চেষ্টা করবি না। ওই দেখ, পেনাল্টি বক্সে ঢুকে পড়েছে আমাদের স্ট্রাইকার। ওকে বলটা দে...’

মেয়ে হয়ে খেলার জন্য সমস্যা শুধু আমার একার হয়নি। আসলে আমাদের দেশে মেয়ে হয়ে জন্মানো যেন অপরাধ। মেয়েরা কেন বাইরে বেরোবে? মেয়েরা শুধুই বাড়ির ভিতরে থাকবে। রান্নাবান্না করবে, ঘরের কাজ করবে। একটু বড় হলেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হবে। তখন শ্বশুরবাড়ির সংসার সামলাতে হবে। মেয়েদের আবার ইচ্ছে-অনিচ্ছের কোনও মূল্য আছে না কি? ভারতীয় দলে আমার সতীর্থ মনীষা কল্যাণের ফুটবল খেলা বন্ধ করতে তো পঞ্জাবের মুগোওয়াল গ্রামের সকলেই মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তবে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে গোল করে ফেরার পরে ওকে শোভাযাত্রা করে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন সেই গ্রামবাসীরাই!

শুধু ফুটবলাররাই নয়, অনেক ক্রিকেটারেরও একই অভিজ্ঞতা। বিশ্বকাপ পাওয়ার পরে জানতে পারলাম, হরমনপ্রীত কৌরের বাবা ও মাকেও কত যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছিল। পরিবারের সদস্যরাই হরমনপ্রীতের খেলা বন্ধ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। বিপক্ষের ডিফেন্ডাররা গোল আটকানোর জন্য কড়া ট্যাকল করবেই। কিন্তু নিজের দলের কেউ যদি ট্যাকল করে, তখন লড়াই অনেক কঠিন। আমাদের মেয়েদের প্রথম লড়াই তো শুরু হয় নিজেদের লোকেদের বিরুদ্ধেই।

একটু বড় হওয়ার পরে যখন বাস্তবটা বুঝতে পারলাম, সিদ্ধান্ত নিলাম, যে ভাবেই হোক মাকে সাহায্য করতেই হবে। কিন্তু ফুটবল খেলা ছাড়া অন্য কোনও কাজ তো আমি জানি না। খেলেই আমাকে রোজগার করতে হবে। কল্যাণীর বাইরে বিভিন্ন জায়গায় খেলতে যেতে শুরু করলাম। ফেরার সময় ট্রেনে বসে ভাবতাম, কল্যাণী স্টেশনে নেমে অত রাতে কী ভাবে বাড়ি যাব! দুরুদুরু বুকে প্লাটফর্মে নামতেই চোখে পড়ত, বেঞ্চে মাসিকে সঙ্গে নিয়ে মা বসে রয়েছেন।

মা যখন আছে, আর ভয় কী?

মায়ের হার-না-মানা মানসিকতাই আমাকে শক্তিশালী করে তুলেছে। উদ্বুদ্ধ করেছে লড়াই করতে। যখনই খেলতে নামি, নিজেকে উজাড় করে দিই। স্পেনের বিরুদ্ধে ভোজ়িনা যেমন করেছিলেন।

বিশ্বকাপ তো জীবনের জয়গান গাওয়ারই মঞ্চ।

বঞ্চনা, উপেক্ষার জবাব দেওয়ার ম্যাচ।

সব হারানো মানুষের সব পাওয়ার মুহূর্ত।

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকোর হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় গোল করা রাউল খিমেনেসের জীবনই তো শেষ হয়ে যেত বছর ছয়েক আগে। ২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে উলভারহ্যাম্পটন ওয়ান্ডারার্সের হয়ে আর্সেনালের বিরুদ্ধে খেলছিলেন তিনি। কর্নার থেকে ভেসে আসা বলে হেড করতে উঠে দাভিদ লুইসের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় তাঁর। সঙ্গে সঙ্গেই সংজ্ঞা হারান তিনি। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরে ধরা পড়ে, তাঁর মাথার খুলি ভেঙে গিয়ে মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। দ্রুত অস্ত্রোপচার করা হয়। ধরেই নেওয়া হয়েছিল, যদি বেঁচেও যান, ফুটবল হয়তো কোনও দিনই আর খেলতে পারবেন না।

রাউল কিন্তু হার মানেননি। অসাধ্যসাধন করে আট মাস পরে মাঠে ফেরেন। যদিও শুরুর দিকে একাই অনুশীলন করতেন। কারণ, দলের বাকি ফুটবলারদের সঙ্গে তাঁকে অনুশীলনের অনুমতি দেননি চিকিৎসকরা। ২০২১ সালে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে প্রত্যাবর্তন ঘটান রাউল। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই নিজেকে প্রমাণ করলেন মেক্সিকোর তারকা।

পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিরুদ্ধে গোল করা মরক্কোর ইসমায়েল সাইবারির লড়াইয়ের কাহিনিও আমাকে উদ্বুদ্ধ করছে। ওঁর ফুটবলজীবন মাত্র চোদ্দো বছর বয়সেই শেষ হয়ে যেত। মরক্কোজাত ইসমায়েলের জন্ম স্পেনে। তাঁর যখন ছয় বছর বয়স, পরিবারের সঙ্গে চলে যান বেলজিয়ামে। কিশোর ইসমায়েলের স্বপ্ন ছিল আন্দ্রেলেখত ক্লাবে খেলার। কিন্তু ওজন বেশি হওয়ায় তাঁকে নেয়নি কেভিন দ্য ব্রুইনের দেশের ক্লাব। ইসমায়েলের বয়স তখন চোদ্দো। আন্দ্রেলেখতের প্রত্যাখ্যানই মরক্কো তারকার অন্তরে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা আগুনকে আগ্নেয়গিরিতে পরিণত করেছিল। বঞ্চনার জবাব দেন পিএসভি আইন্দোভেনে গিয়ে। তবে কখনওই ভুলতে পারেননি আন্দ্রেলেখতের অপমান। তাই ২০২২ বিশ্বকাপের আগে রবার্তো মার্তিনেস ইসমায়েলকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন বেলজিয়ামের হয়ে খেলার। কিন্তু তিনি রাজি হননি। পূর্বপুরুষের জন্মভূমি মরক্কোর হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রথম ম্যাচেই নিজেকে প্রমাণ করলেন।

ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর পর্তুগালের বিরুদ্ধে গোল করার আগে কত জন জানতেন ডিআর কঙ্গোর ইওয়ানে উইসার নাম? কত জন শুনেছিলেন তাঁর জীবনের ভয়ঙ্কর কাহিনি? বাহান্ন বছর পরে বিশ্বকাপের মূল পর্বে ডিআর কঙ্গোর যোগ্যতা অর্জনের চেয়েও চমকপ্রদ এক ফুটবলার ও পিতা উইসার লড়াইয়ের কাহিনি। পাঁচ বছর আগে, জুলাইয়ের প্রথম দিনে ভয়াবহ অ্যাসিড হামলায় তিনি প্রায় অন্ধ হয়ে যাচ্ছিলেন। ঝলসে গিয়েছিল তাঁর মুখের অনেকটা অংশও। প্রায় শেষ হতে বসেছিল ফুটবল খেলা। উইসা কিন্তু হার মানেননি। আবার মাঠে ফিরে নিজেকে প্রমাণ করলেন।

২০২১ সালের ১ জুলাই। ফ্রান্সের লরিয়ঁ ছেড়ে উইসা তখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ব্রেন্টফোর্ডে যোগ দেওয়ার জন্য। এমন সময় বিপর্যয় নেমে এল ডিআর কঙ্গোর তারকার জীবনে। বাড়িতেই অ্যাসিড হামলার শিকার হন তিনি। এক মহিলা শুধু মুখে অ্যাসিডই ছোড়েনি, উইসার মেয়েকে অপহরণের চেষ্টাও করেছিল। গুরুতর আহত উইসাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অস্ত্রোপচার হয় চোখে। তাঁর ঘনিষ্ঠরা ভেবেছিলেন, আর কখনওই দেখতে পাবেন না। কিন্তু বিশ্বকাপে পর্তুগালের বিরুদ্ধে গোল করা তারকা রূপকথার মতোই প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছিলেন। চোখ ভাল রাখার জন্য আজীবন ওঁকে ওষুধ ব্যবহার করে যেতে হবে। তবে ফুটবলার নয়, আমাকে অভিভূত করেছিল বাবা হিসেবে উইসার দর্শন। পর্তুগাল বনাম ডিআর কঙ্গো ম্যাচের পরেই উইসাকে নিয়ে অনেক লেখা পড়ছিলাম। চোখ আটকে গিয়েছিল, অ্যাসিড হামলার পরে ওঁর দেওয়া সাক্ষাৎকারে। বলেছিলেন, ‘‘হামলার পর আমি এক জন ফুটবলারের চেয়ে বেশি ভাবছিলাম বাবার মতো করে। নিজেকে বলেছিলাম, আমার ক্ষতি হয়েছে ঠিকই, আমার সন্তানরা তো ভাল আছে।’’

বাবা-মা তো এরকমই হয়। হাসপাতাল থেকে ফেরা মায়ের শরীর থেকে ছড়িয়ে পড়া স্পিরিট, ফর্মালিনের ঝাঁঝালো গন্ধে আমাদের প্রতিবেশীরা অনেকে নাকে রুমাল চাপা দিতেন। আমাদের কাছে তা ফুলের সৌরভ। এখন আমি ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। সীমা সুরক্ষা বলে চাকরির সূত্রে শিলিগুড়িতে থাকতে হয়। কিন্তু ঘুমটা যেন আগের মতো হয় না। খালি মনে পড়ে কল্যাণীতে হাসপাতালের কোয়ার্টার্সের এক চিলতে ঘরে গাদাগাদি করে মায়ের সঙ্গে চার বোনের শোয়া। মায়ের শরীর থেকে ভেসে আসা স্পিরিট, ফর্মালিনের গন্ধে চলে যেতাম ঘুমের দেশে। এখন জীবনে অনেক স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে। তবুও শিলিগুড়িতে নিজের ঘরের নরম বিছানা যেন কাঁটার মতো হয়ে যায়। ঘুমের ঘোরে মাকে খুঁজি। কিন্তু পাই না। হিংসে হয় বোনদের জন্য। আহা... ওরা এখন কী সুন্দর ঘুমিয়ে রয়েছে মায়ের শরীর ছুঁয়ে। সব পেয়েও আমার যেন কিছু নেই। কল্যাণী ফিরলে মায়ের পাশে কাউকে শুতে দিই না। অনেক রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ত, মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করি, “ও মা, তোমার কী চাই বলো।” প্রত্যেক বারই আমার মা হেসে বলেন, “ফুটবলার হিসেবে তুই আরও উন্নতি কর। জাতীয় দলের হয়ে নিয়মিত খেল। আর কিছু চাই না।” তবে জানতাম, মা স্বপ্ন দেখত, এক দিন নিজের একটা বাড়ি হবে। মায়ের এই স্বপ্ন আমাকে পূরণ করতেই হবে।

অ্যাসিড হামলার পরে উইসা কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও নিজের এবং ফুটবল ভবিষ্যতের কথা ভাবেননি। শুধু ভেবেছিলেন তাঁর সন্তানদের কথা। হয়তো হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও একই কথা ভেবে গিয়েছিলেন। আমার মা-ও তো কোনও দিন নিজের কথা ভাবেননি। অসুস্থ স্বামীর অকালপ্রয়াণ। বিরাট সংসারের জোয়াল একার কাঁধেই বছরের বছর ধরে বয়ে চলেছেন। এমনিতেই আমাদের অভাবের সংসার। তার উপরে আত্মীয়স্বজনদের আসা-যাওয়া লেগেই থাকত। মায়ের নিজের জন্য কোনও কোনও দিন একবেলা খাবারও ঠিকমতো জুটত না। কিন্তু আমাদের থালা একবেলাও খালি থাকতে দেয়নি। ফুটবল খেলতাম বলে আমার পেটে যেন সব সময়ই আগুন জ্বলত। ছোটবেলায়বুঝতাম না, এই খিদের আগুন নেবানোর মতো ক্ষমতা আমার পরিবারের নেই। খুব রাগ হত। কষ্ট হত। আর এখন অপরাধবোধে ভুগি। আমার জন্য মা কষ্ট পেয়েছেন।

আমি নিজেকে খুঁজে পাই উজ়বেকিস্তানের বিরুদ্ধে গোল করা কলম্বিয়ার লুইস দিয়াসের মধ্যেও। কলম্বিয়ার গুয়াহিরা প্রদেশের বারাঙ্কাস শহরের উপকণ্ঠে এক গ্রামে ওয়াইয়ু সম্প্রদায়ে জন্ম দিয়াসের। ওঁদের দু’বেলা খাবার অধিকাংশ দিনই জুটত না। অপুষ্টির কারণে দিয়াসের চেহারা ছিল কাঠির মতো। তাই কোনও দলের কোচই নিতেন না। তাঁরা মনে করতেন, দুর্বল শরীর নিয়ে ফুটবল খেলতে পারবেন না দিয়াস।

আমার যেমন মা ছিলেন, তেমনই দিয়াসের ভরসা ছিলেন নির্মাণশ্রমিক বাবা। তাঁর নিজের ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নপূরণ হয়নি। তাই ছেলেকে ফুটবলার করাই ছিল পাখির চোখ। গড়ে তুলেছিলেন ‘ক্লাব বায়ের দে বারাঙ্কাস’ নামে একটি ফুটবল স্কুল। সব ক্লাব থেকে প্রত্যাখ্যাত দিয়াসের ফুটবল শুরু সেখানেই। মা সিলেনিস মারুলান্দার যে সামান্য কয়েকটি গয়না ছিল, বিক্রি করে দিয়েছিলেন ছেলের বুট কেনার জন্য। আমার মাকেও তো সব গয়না বিক্রি করতে হয়েছে সংসার চালানোর জন্য। রোনাল্ডিনহোর ভক্ত দিয়াস সারা দিন রাস্তায় ফুটবল খেলে বেড়াতেন।

২০১৫ সালে দিয়াসের বাবা খবর পান, প্রতিভাবান ফুটবলারের খোঁজে কলম্বিয়ার বিখ্যাত ক্লাব আতলেতিকো বারানকুইয়া শহরে ট্রায়াল নেবে। বারাঙ্কাস থেকে প্রায় ছয় ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে ছেলেকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন। তার পরে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি দিয়াসকে। আতলেতিকোর সহযোগী বারাঙ্কিয়া এফসি-তে সুযোগ পান কলম্বিয়ার তারকা। স্বাস্থ্যকর পরিবেশে পুষ্টিকর খাবার ও অনুশীলনের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়ে ওঠেন দিয়াস। কিন্তু জীবন যে কখনও মসৃণ ভাবে চলে না।

বছর তিনেক আগে দিয়াসের বাবা ও মাকে অপহরণ করে দুষ্কৃতীরা। কলম্বিয়ার পুলিশ তাঁর মাকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করতে পারলেও বাবার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। প্রায় সপ্তাহ দুয়েক পরে তিনি মুক্তি পান। ইরাকের আইমেন হুসেন আর এক জন তারকা, যিনি জীবনযুদ্ধে জয়ী। আমার বাবা অসুস্থতার কারণে শয্যাশায়ী ছিলেন। কিন্তু প্রত্যেক দিন বাড়ি ফিরে বাবাকে দেখতে তো পেতাম। আমি গোল করেছি শুনলে, মুখ হাসিতে ভরে উঠত।

কিন্তু আইমেনের কথা ভাবুন? ওঁর বাবা ছিলেন ইরাকি সেনাবাহিনীতে। আইমেনের যখন বারো বছর বয়স, ওঁর বাবা আল কায়দার জঙ্গিদের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যান। কিশোর আইমেনের জীবনে মুহূর্তের মধ্যে আঁধার নেমে এসেছিল। কয়েক বছর পরে তাঁর দাদাকে অপহরণ করে আইএস। তিনিও ছিলেন ইরাকি সেনাবাহিনীতে। সেই সময় আইমেন তুরস্কে ছিলেন। ইরাকে ফিরেই এই দুঃসংবাদ পান। প্রথমে বাবার ভয়াবহ মৃত্যু। তার পরে দাদার অপহরণ। মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত আইমেন ঠিক করলেন, আর ফুটবল খেলবেন না। নিজের স্বপ্ন পূরণ করার পিছনে না ছুটে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেবেন। বাধা দেন মা। ছেলেকে তিনি বলেছিলেন, “সংসার নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। ফুটবলার হওয়ার যে স্বপ্ন ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছ, তা পূরণ করতেই হবে।” মায়ের জন্যই ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে ফের ফুটবলে ফেরেন আইমেন।

কিন্তু এখনও তাঁর দাদার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। আদৌ তিনি বেঁচে আছেন কি না, জানেন না। আইমেন শুধু জানেন, তাঁকে মাঠে নেমে গোল করে যেতে হবে। ফুটবলই তাঁর বেঁচে থাকার একমাত্র মাধ্যম।

মায়েরা এ রকমই। আইমেনের মতো আমারও তো ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন শৈশবেই শেষ হয়ে যেত। বুটজোড়া খুলে ফেলে হাতে তুলে নিতে হত হাতা-খুন্তি। নিজের কথা ভাবাই হত তখন বিলাসিতা। সেই দিনগুলিতে চারপাশের অধিকাংশ চেনামুখই বদলে গিয়েছিল। ফুটবল খেলতাম বলে বিদ্রুপ করত। মা যদি তখন আমার পাশে না দাঁড়াত, কোথায় হারিয়ে যেতাম কে জানে। মা-ই আমার ক্যাপ্টেন। মায়ের জন্যই এক দিন ভারতের হয়ে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন দেখার সাহস পাই।

আলজিরিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে দেখছিলাম, লিয়োনেল মেসিকে সামনে রেখে বাকি ফুটবলাররা ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে মাঠে নামলেন। অথচ আর্জেন্টিনা দলে তারকা কিন্তু কম নেই। তবে সবার আগে জরুরি শৃঙ্খলা। ফুটবলের মতো দলগত খেলায় যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেসিকে দেখে মায়ের কথাই সব চেয়ে আগে মনে পড়ে। আমার মা-ও তো এভাবেই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে পুরো পরিবারকে বছরের পর বছর ধরে টেনে চলেছে। সমস্ত ঝড়ঝাপটা নীরবে একাই সামলে চলেছে। দিদিদের বিয়ে দিয়েছে। আমার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করেছে।

বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মঞ্চ নয়। বিশ্বকাপ তুলে ধরে অবিশ্বাস্য ও রোমাঞ্চকর বহু কাহিনিও। যেমন ফুটবল খেলার জন্যই শেষ হয়ে যেতে বসেছিল ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে গোল করা আইভরি কোস্টের আমাদ দিয়ালো ও তাঁর ভাই হামাদের জীবন। মাত্র দশ বছর বয়সে আমাদ ও তাঁর দাদা হামাদকে আফ্রিকা থেকে চুরি করে এনে ইটালিতে নিয়ে যায় মানুষ পাচারকারীরা। উদ্দেশ্য ছিল, ইটালির কোনও ফুটবল অ্যাকাডেমিতে চড়া দামে প্রতিশ্রুতিমান দুই ভাইকে বিক্রি করা। এর জন্য আমাদ ও হামাদের বাবা-মায়ের ভুয়ো পরিচয়পত্র পর্যন্ত বানিয়েছিল পাচারকারীরা। দুই ভাইকে বিক্রি করা হয়েছিল বোকা বার্কো ক্লাবে। কিন্তু ডিএনএ পরীক্ষায় ধরা পড়ে যায় এই জালিয়াতি। যেহেতু সেই দুই ভাই তখন নাবালক ছিল তাই তাদের বিরুদ্ধে কোনও ফৌজদারি মামলা করা সম্ভব হয়নি। ২০২১ সালে ইটালির ফুটবল ফেডারেশন ৪২ হাজার ইউরো জরিমানা করেছিল! অন্য কেউ হলে হয়তো আর কোনও দিন ফুটবলে পা-ই ছোঁয়াত না। কিন্তু আমাদ ও হামাদ জানতেন, ফুটবলই তাঁদের অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার রাস্তার সন্ধান দিতে পারবে। তাই নীরবে লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন তাঁরা। বোকা বার্কো থেকে আটলান্টা হয়ে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডে সই করেছিলেন আমাদ। হামাদ এখন খেলেন ফ্রান্সের মার্সেই-এ।

বিশ্বকাপ তাই আমি শুধু এক জন ফুটবলারের চোখ দিয়ে দেখি না। বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে বসি এক জন ছাত্র হিসেবে। খুঁজে বার করার চেষ্টা করি, আমার কোথায় কোথায় খামতি রয়েছে। নিজেকে প্রশ্ন করি, ওরা যদি পারে, তা হলে আমি কেন পারব না? আমাকে কোন কোন জায়গায় উন্নতি করতে হবে? মেসি বা রোনাল্ডো বিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে যে ভাবে ওঠেন, মাঠে নেমে আমিও তা নকল করার চেষ্টা করি।

এই অভ্যেসটা অবশ্য ছোটবেলা থেকেই আমার মধ্যে রয়েছে। তখন অনেকে আমাকে দেখে হাসাহাসি করত। খুব কষ্ট হত, কান্না পেত প্রায়ই। কিন্তু মা বলত, “সাফল্যের পথ কখনও সহজ হয় না। বাধাবিপত্তি আসতেই থাকবে। কিন্তু থামলে চলবে না। সব সময় লক্ষ্যে স্থির থাকতে হবে।”

ম্যাচের আগে টানেল থেকে বেরিয়ে মেসি-রোনাল্ডোরাও নিশ্চয়ই একই ভাবে উজ্জীবিত করেন সতীর্থদের। ক্যাপ্টেন মানে তো শুধু ‘আর্ম ব্যান্ড’ পরে মাঠে নেমে টস করা নয়, দলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। সকলকে আগলে রাখা। সব মায়েরাই তা-ই করেন।

ফুটবলের মতো জীবনও যে দলগত খেলা!

অনুলিখন: শুভজিৎ মজুমদার

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Sangita Basfore Indian Football Football World Cup 2026 fifa

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy