Advertisement
E-Paper

রবিবাসরীয় ম্যাগাজিন

শেষ আপডেট: ১২ জুন ২০১৬ ০০:০৩

আম

পিনাকী ভট্টাচার্য

আমের প্রথম উল্লেখ মেলে ৩০০০ বছর পুরনো বৃহদারণ্যক উপনিষদে ও তার পরে শতপথ ব্রাহ্মণে। হিন্দু মতে, প্রজাপতি ব্রহ্মা সৃষ্টির কাজ ফুরোলে আমের রূপ নিয়েছিলেন। পুরাণ বলে, দেবরাজ ইন্দ্রের এক মেয়ের জন্ম আম থেকে। তাই আম পবিত্র ও শুভ। মঙ্গলঘট থেকে ছাঁদনাতলা— সবই আমপাতা ছাড়া অসম্পূর্ণ। বৌদ্ধদের কাছেও আম পবিত্র। বৌদ্ধ শাস্ত্রে আছে, বুদ্ধদেবকে এক অনুরাগী একটি আম বাগান উপহার দেন। বুদ্ধদেব প্রায়ই সেখানে বিশ্রাম নিতেন। সেখানে আম খেয়ে তিনি আঁটিটা বাগানের মাটিতে পুঁতে তার ওপর হাত ধুয়েছিলেন। সেই আঁটি থেকে প্রকাণ্ড সাদা রঙের আম গাছ জন্মেছিল। ভরহুত গ্রামের ভাস্কর্যে এই আম গাছকেই দেখা যায়। কালিদাস শকুন্তলায় আমের মঞ্জরীকে কামদেবের ‘মদনশর’-এর রূপক বলেছেন।

বিশ্ববিখ্যাত আমের জন্মস্থান যে ভারত, এটা সাহেবদের হজম করতে অসুবিধে হচ্ছিল— তারা প্রমাণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল যে আম দূর প্রাচ্যের ফল। মিলত শ্যামদেশে, কম্বোজ আর মালয়ের জঙ্গলে। সেখান থেকে মায়ানমার হয়ে এ দেশে পৌঁছেছিল। কিন্তু তাদের দাবি ধোপে টিকল না। জানা গেল, উত্তর-পূর্ব ভারত ও মায়ানমারের কাছাকাছি প্রথম আম গাছ জন্মায়। পরে সাহেবরা আরও অপদস্থ হল। কারণ এক দিন জানা গেল ‘ম্যাংগো’ শব্দটা পর্যন্ত ভারতীয়। তামিল ভাষায় আমকে ‘ম্যান-কে’ বা ‘ম্যান-গে’ বলে, সেই থেকে পর্তুগিজে ‘ম্যাংগা’ আর তার থেকেই ইংরেজি ‘ম্যাংগো’। এই আমকে বিশ্বের আমদরবারে নিয়ে যান হিউয়েন সাং।

কাবুল সমরখন্দে আম হত না। তাই ভারতের আম নিয়ে মুঘলরা ছিল মুগ্ধ। আকবর বাদশা এক লাখ আমের চারা দিয়ে তৈরি করেন একলাখি বাগ। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মুঘলরা আমের ফলন অক্টোবর পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছিল!

আম নিয়ে পাগলামিরও শেষ নেই, আমের রকম-সকমেরও ইয়ত্তা নেই। নানা আমের নামের সঙ্গে জুড়ে কত গল্প! বেশির ভাগ আমেরই নাম গাছের মালিককে মনে রেখে। মিথিলার ব্রাহ্মণ জমিদার কৃষ্ণপ্রসাদ ঠাকুরের নামে কিষাণভোগ আম। ফজলি’র গল্পটাও বেশ মিষ্টি। মালদহের বিখ্যাত কালেক্টর র‌্যাভেনশ’ সাহেব এক গরমের দুপুরে গৌড়ের পথে চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে এক গাছতলার ছায়ায় জিরিয়ে নিতে থামেন। তিনি জল চাইলে, এক মুসলমান কিশোরী জল দেয় আর রেকাবিতে করে একটা আম আনে। সে আমের স্বাদে সাহেব মজে গেলেন। মেয়েটা জানাল, এই আম তারই গাছের। তিনি অমনি ওই আমের নাম দেন ‘ফজলি’। সেই কিশোরীর নামে।

চৌসা, দশেরি আর রাত্নাল হল লখনউ-এর কাছে তিনটে গ্রামের নাম, যেখানে এই সব স্বর্গীয় আমের গাছ প্রথম পাওয়া যায়। আর ল্যাংড়া আমের জন্যে বিহারে প্রায় বিদ্রোহই হয়ে যাচ্ছিল। পটনার কাছে হাজিপুরে এক আমগাছের তলায় এক খোঁড়া ফকির থাকতেন। সেই গাছের আমের অপূর্ব স্বাদের খোঁজ পান পটনার ডিভিশনাল কমিশনার ককবার্ন সাহেব। ফকিরের সম্মানে সে আমের নাম দেন ল্যাংড়া। খবর পেয়ে, সেখানে বিহারের তামাম রাজা লশকর নিয়ে হাজির। প্রত্যেকে ওই গাছের একটা কলম নিয়ে নিজের বাগানে পুঁততে চান। শেষে সেনা মোতায়েন করে আইন-শৃঙ্খলা আর গাছটাকে রক্ষা করতে হল।

আমের মঙ্গলকাব্য হোঁচট খায় ইবন বতুতা-র কথায়। তিনি বলেছিলেন, আমের ছায়ায় বিশ্রাম করলে জ্বর হয়। জ্বর হয় কি না জানা নেই, তবে ব্যারাম নিশ্চয়ই হত, নয়তো পলাশির আমবাগানের যুদ্ধে মিরজাফরের দল ইংরেজদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল কেন!

pinakee.bhattacharya@gmail.com

টাকা মাখি, মাখি টাকা

স্বপ্নময় চক্রবর্তী

পিছনে দাঁড়ানো লোকটার কাছে একটা পেন চাই। উনি জিজ্ঞাসা করেন ‘ইংক না জেল? না কি বল পেন?’ বলি, যা খুশি। ‘ব্ল্যাক না ব্লু না ব্লু-ব্ল্যাক?’ বলি, যা আছে দিন না! উনি বলেন, ‘সব আছে। ওদের হাজার বায়নাক্কা। ভোটার, রেশন, প্যান— সব রকম কার্ড, সব রকম পেন, পিন— সব থাকে।’ কাউন্টারের ও-পার থেকে একটা কলম এগিয়ে এল, আর একটা বাক্য— ওকে বকাবেন না। আমি সই করে টাকা নিলাম। লোকটাও টাকা তুলল, কাউন্টারের পাশে দাঁড়াল। ব্যাগের ভেতর থেকে একটা গোল কৌটো বের করল এবং জলের বোতল। কৌটোতে এক টুকরো স্পঞ্জ। স্পঞ্জে জল ঢালল। এ বার আঙুল ভিজিয়ে একটা ৫০০ টাকার বান্ডিল গুনতে লাগল। এর পর ব্যাগ থেকে একটা টর্চ বের করল, এবং আলো ফেলে একটা একটা করে টাকা পরীক্ষা করতে লাগল। বৃষ্টি হচ্ছিল বলে ভিতরে আটকে গিয়ে লোকটার কর্মকাণ্ড দেখছিলাম। আমায় বলল, জাল নোটে ছেয়ে গেছে দেশ। সাবধানের মার নেই। নোট চেনেন? এই দেখুন, এখানে একটা মেটালের ইয়ে ঢোকানো। আমরা বলি সুতো। এই দেখুন, এখানে আলো পড়লে কালার পালটায়। এই যে, রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নরের সই। এটা সুব্বারাও সাহেবের সই। ২০০৯-এর টাকা। এখন রঘুরাম সাহেবের সই থাকে। এই যে ছবিটা, গাঁধীজি কোথায় যেন যাচ্ছেন, গাঁধীজির পিছনে ক’টা লোক বলুন তো? গোনেননি কখনও? টাকা সম্পর্কে কিছুই জানেন না। দশ জন। এই বাঁ দিকে দেখুন বাক্সটার ভিতরে নানা ভাষায় এই নোটের ভ্যালু লেখা আছে। বলুন তো, ক’টা ভাষার অক্ষরে? পারবেন না? পনেরোটা। বাংলা এক্কেবারে এক নম্বরে। আমাদের এই এক নম্বরে থাকাটা মুখ্যমন্ত্রী কখনও বলেননি।

এ বার লোকটা একটা টেবিলে গেল। বলল, এফডি করব, ছ’মাসের। ব্যাংকের লোকটা রেগে বলল, হবে না। যান, পারব না। লোকটা বলল, হবে না বলতে পারেন না স্যর, আপনি বাধ্য। তর্কাতর্কির মধ্যে বৃষ্টিটা কমে গেলে ব্যাংক থেকে বেরিয়ে আসি।

ক’দিন পর অন্য একটা বেসরকারি ব্যাংকে আবার দেখা। বাড়ির কাছাকাছি বলে এই ব্যাংকেই বেশি আসি। আমায় চিনতে পারলেন উনি। বললেন, সরকারি ব্যাংকে ঘেন্না ধরে গেল মশাই, বড় দুর্ব্যবহার। আমার টাকা, তিন মাসের জন্য রাখব না তিন বছরের জন্য, সেটা আমার ইচ্ছে। আমি যে’রম বলব, ওরা সে’রম করবে। আমি যদি ছ’মাসের এফডি তিন মাসে ভাঙাই সেটা আমার লস। তোর বাপের কী? অ্যাঁ? ওরা বড্ড ঝামেলা করে। সরকারি ব্যাংক কিনা, ম্যানেজারকে নালিশ করে লাভ নেইকো। তাই এখানে অ্যাকাউন্ট খুললাম একটা। এরা ভাল। বললে কথা শোনে। লোকটাকে সমর্থন করি। লোকটা সে দিনের মতোই টাকা ওঠায়, গোনে, আবার কিছুটা জমা দেয়।

পরের মাসে ওই ব্যাংকে গিয়েছি, সেই লোকটা ঢুকল। ব্যাংকের কমবয়সি স্মার্ট মেয়েটা বলল, ওহ্ শিট! আবার এসেছে! মাথা খারাপ করে দেবে। আমায় বলল, জানেন, এভরি উইকে মিনিমাম থ্রি ডেজ করে আসে, টাকা তোলে, পর দিনই আবার রাখে। শর্ট পিরিয়ডের এফডি করে ভাঙায়, আবার করে। কিছু বলতে পারি না, প্রাইভেট ব্যাংক তো... লোকটা ওর রুটিন কাজ করতে লাগল। ক্যাশেও ঝগড়া, ওর ছোট নোট চাই। দশ-বিশ টাকার বান্ডিল। আমি দেখেছি কেউ কেউ ভিখারিদের দশ টাকার বান্ডিল থেকে কিরিক কিরিক দান করেন। শার্ট-পাজামা পরা রুখা-শুখা লোকটাকে তেমন তো মনে হয় না। জিজ্ঞাসা করি, কিছু মনে করবেন না। খুচরো টাকা চান কেন? বলে, পাঁচ হাজার তো, দশের বান্ডিল নিলে ব্যাগটা একটু ভারী লাগবে হেঁহেঁ।

পরে এক দিন। টোকেন নিয়ে বসে আছি, টাকা তুলব। লোকটা বলল, টিভিতে দেখেছেন তো— এমএলএ-এমপি’দের সামনে টাকার বান্ডিল? খুব সুন্দর, না? আমার নীরবতার মধ্যেই লোকটা বলল, খুব তৃপ্তি পেয়েছি দেখে। ওদের সুখেই আমার সুখ। আমি তখন শতমুখে খাই। বুঝলেন, শ্রীরামকৃষ্ণের তখন গলায় অসুখ, শিষ্যরা সন্দেশ এনেছে, উনি খেতে পারবেন না। বললেন, তোমরা খেলেই আমার সুখ, তখন আমি শতমুখে খাই। আমারও সে’রম। ওই পোজটা আমার বেশ লেগেছে, নেতা দাদা লুঙ্গিতে, বিছানায় আধশোয়া, সামনে নোটের বান্ডিল রেখে গেল, উনি আড়চোখে চাইলেন শুধু, যেন ও কিছু না, মুখে কী শান্তি!

টাকা ছাড়া ফাঁকা লাগে। টাকা তো বেশি নেই, তাই টাকা মাখামাখিটা ভাল করে হয় না। চালের আড়তে যখন ম্যানেজারি করতাম, তখন খুব টাকা মাখামাখি করেছি। এখনও ওটুকু করতে চাই, নানা বুদ্ধি খাটিয়ে। ওরা করতে দেয় না।

বেশ কিছু দিন পর ব্যাংকে গেলাম। মেয়েটা বলল, ওই নোটারিয়ানটা আর আসে না। ওর বউ এক দিন এসেছিল, বলল বেড-রিড্‌ন। টাকাগুলো তুলে নিয়ে গেল। তিন ঘণ্টা বসে থেকে সব ছোট ছোট নোট...

শ্রীরামকৃষ্ণের বিছানার তলায় টাকা রাখা হয়েছিল বলে ওঁর গায়ে জ্বলুনি হয়েছিল।

সব ম্যাটারের একটা অ্যান্টিম্যাটার থাকে। হয়তো গল্পেরও অ্যান্টিগল্প থেকে যায় কোথাও।

নোটারিয়ান লোকটা কি নোট ছড়ানো বিছানায় বেড-সোরের জ্বলুনির শান্তি চেয়েছিল?

swapnoc@rediffmail.com

Rabibasariya Magazine Rabibasariya Magazine
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy