E-Paper

মরা নদীর সোঁতায় আজ বসেছে মেট্রো রেলের স্তম্ভ

কালীঘাটের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সেই ক্ষীণতোয়ার নাম আদিগঙ্গা। এর সজীব প্রবাহে ভাসত বাণিজ্যতরী, লোকসমাগম হত বন্দরে। কালক্রমে মাহাত্ম্য হারাল নদী, আদিগঙ্গার স্থান নিল টালি নালা। ক্রমশ সেও হারাল। নদীর নানা স্মৃতি আর কাহিনি নিয়ে রয়ে গেল প্রাচীন ঘাটগুলি।

সুপ্রতিম কর্মকার

শেষ আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬ ০৬:৫৬
ক্ষীয়মাণ: দু’পাশের আবর্জনা ক্রমশ গ্রাস করে নিয়েছে আদিগঙ্গার প্রাচীন ধারা।

ক্ষীয়মাণ: দু’পাশের আবর্জনা ক্রমশ গ্রাস করে নিয়েছে আদিগঙ্গার প্রাচীন ধারা।

গড়িয়া মোড়ের ছ’নম্বর বাস স্ট্যান্ড। তার ঠিক পাশ দিয়ে একটা কালো পিচ ঢালা রাস্তা ধরে একটু এগোলে ‘বাসনা কালীবাড়ি’। কালীবাড়ির ঠিক উল্টো দিকেই একটা পুকুর। গড়িয়া মহাশ্মশান থেকে মৃতের সৎকার সেরে আসার পর বেশ কিছু মানুষ এই পুকুরে স্নান করেন। তার পর কাছা পরে নেন। পুকুরের ঠিক উল্টো পারে একটা সাইনবোর্ডে লেখা পুকুরটার নাম— ‘আদি কালীগঙ্গা’।

কালীর সঙ্গে কলিকাতা— কী ভাবে জুড়ে যায় দুই ভাবনা? প্রশ্নের উত্তর পেতে ফিরে যেতে হবে ‘ক’ উপাসকদের কাছে; বৌদ্ধ-পরবর্তী তান্ত্রিক যুগে। বাংলা জুড়ে তখন তন্ত্রের বহুমাত্রিক ধারায় নানা প্রান্তে সাধনা চলছে। গৌড়ীয় ‘কহাদি’ মতের তন্ত্রসাধকগণের সাধনক্ষেত্র ছিল এই অঞ্চল। এই তন্ত্রসাধনার বৈশিষ্ট্য, সব কিছুতেই তাঁদের ‘ক’ থাকতে হবে। তাঁদের মতে, ‘ক’-এর যে বাংলা ১-এর মতো আঁকশিটা রয়েছে; সেটা ‘কুলকুণ্ডলিনী’। আঁকশিটা বাদ দিলে পড়ে থাকে ‘ব’। মাত্রা মুছে দিলে এই ‘ব’ ত্রিভুজের মতো দেখতে। এই ত্রিকোণই তাঁদের কাছে শিব ও শক্তির স্বরূপ।

শিবসঙ্গম তন্ত্রে শিবশঙ্কর বলেছেন, মহেশ্বর রূপে তিনি পুরুষ। আর স্ত্রী রূপে তিনি দেবী। শিব ও শক্তির মধ্যে কোনও ভেদ নেই। কহাদি তন্ত্রমতে ‘ক’ সর্বদা প্রথমে থাকবে। তাই দেবীর নাম কালী। আর স্থানের নাম ‘কালীক্ষেত্র’। কালীক্ষেত্র আসলে ধনুকের আকারে আশ্চর্য দ্বীপ। ধনুকের মতো দু’যোজন দূরত্ব পর্যন্ত কালীক্ষেত্র। এই কালীক্ষেত্রের চার দিকেই জল। উত্তরে গঙ্গা বাঁক নিয়ে দু’ভাগে ভাগ হয়। পূর্বধারা লবণ হ্রদে পড়ে। আর পশ্চিমধারা সোজা প্রবাহিত হয়। আর দক্ষিণে প্রধান গঙ্গার ধারা; মানে গোবিন্দপুর খাঁড়ি বা আদি গঙ্গা! তা হলে ‘আদি কালীগঙ্গা’ কি আদিগঙ্গার অংশ?

‘আদি কালীগঙ্গা’ পুকুরের একটু পাশ দিয়েই তো আদি গঙ্গা বয়ে গেছে। পুকুরটা আদি গঙ্গার অংশ ছিল, এতটা চওড়া ছিল অতীতের আদিগঙ্গা! ভাবতেই সব যেন আস্তে আস্তে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। মনে হল ধীরে ধীরে সময়ের কাঁটা পিছন দিকে সরছে। মনে পড়ে যাচ্ছে পুরনো কলকাতা আর আদিগঙ্গার ইতিবৃত্ত।

সমগ্র আর্যাবর্তের উপর দিয়ে গঙ্গাকে বইয়ে এনে সুন্দরবনের নোনা জলের সাগরের সঙ্গে মিশিয়ে ভগীরথ তাঁর পূর্বপুরুষদের উদ্ধার করলেন। কালীঘাটের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া এক ক্ষীণতোয়ায় ভক্তিভরে মানুষ যখন স্নান করেন, তখন অবাক হয়ে দেখতে হয়। এটাই গঙ্গার আদি পথ। কলকাতা পেরোনোর পর ভাটির দিকে গেলে গঙ্গার আদিপথের কোনও খোঁজ মেলে না। কাজেই ভগীরথের আনীত ধারার আদি প্রবাহ খুঁজতে প্রয়োজন হয় জনশ্রুতি আর পুরনো গ্রন্থগুলোর।

ঐতিহাসিক তথ্য বলছে, অতীতে ভাগীরথী বেতড়কে দক্ষিণে রেখে কালীঘাটের কোল ঘেঁষে গড়িয়া, বৈষ্ণবঘাটা, রাজপুর, কোদালিয়া, মালঞ্চ, হরিনাভি, গোবিন্দপুর, বারুইপুর, সূর্যপুর, মূলটি, ছত্রভোগ হয়ে সাগরে পড়ত। এই পথই গঙ্গার পুরনো পথ। গঙ্গার প্রাচীন পথকে বোঝাতেই গঙ্গার নামের সঙ্গে জুড়ে যায় ‘আদি’ শব্দটি। জন জেফারনিয়া হলওয়েল তখন ভারতে। তিনি প্রথমে এক জন সার্জন হিসেবে ভারতে আসেন। তার পর ব্রিটিশ প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবেও কাজ করেন। ১৭৬০ সালে অল্প সময়ের জন্য বাংলার কার্যনির্বাহী গভর্নর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। হলওয়েল সাহেব লিখছেন, “কালীঘাটের মন্দির এক সঙ্কীর্ণ খাঁড়ির তীরে অবস্থিত এবং ব্রাহ্মণরা এই নদীকেই গঙ্গার আদি গতিপথ বলে মনে করেন।” হিন্দুদের কাছে আদিগঙ্গা গঙ্গার মতোই পবিত্র। ১৮৫৮ সালে শেরউইল সাহেব লিখছেন, “গঙ্গা বা ভাগীরথীর এই শাখাকে হিন্দুরা সবচেয়ে পবিত্র বলে মনে করে, অন্য কোনও নদী তাদের কাছে এত মর্যাদা পায় না।”

আজ গড়িয়ার দক্ষিণে আদিগঙ্গা একটি পুকুরে পরিণত হয়েছে। চেনাই যায় না এটি এক সময় নদী ছিল। সেই পুকুরগুলো যাঁদের দখলে, তাঁদের পদবি অনুসারে গঙ্গার নাম পাল্টে গেছে। সম্ভবত ১৯৪১ সাল। বিভূতিভূষণ দারভাঙ্গা থেকে কলকাতার কাছে রাজপুরে এসেছিলেন। এক পুকুরের ধারে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। পরে লোকমুখে জেনেছিলেন, তিনি গঙ্গার ধারে বসে আছেন। গঙ্গার এই অংশটি স্থানীয় জমিদার নবীন ঘোষের বলে নাম হয়েছে ‘ঘোষের গঙ্গা’। এই নদী কোথাও ‘বোসের গঙ্গা’, কোথাও আবার ‘করের গঙ্গা’ নামে পরিচিত।

আজ থেকে প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগের কথা। পর্তুগিজ নাবিক জোয়াও দা ব্যারোস এলেন বঙ্গদেশে। তৈরি করলেন বঙ্গদেশের এক মানচিত্র। তাতেই দেখা গেল হাওড়ার বেতড়ে, বন্দরের ঠিক বিপরীত দিক দিয়ে দক্ষিণ-পূর্বমুখী হয়ে কালীঘাটের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে আদিগঙ্গার ধারা। তার পর ১৬৬০ সালে বাংলায় এলেন ভেনে ডেন ব্রুক। তিনি ছিলেন মানচিত্রকার, খোদাইশিল্পী এবং প্রকাশক। তিনি ইউরোপীয় ভূগোল ও সমুদ্রযাত্রা সংক্রান্ত মানচিত্র তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর মানচিত্রে সমুদ্রপথ, উপকূলরেখা, বন্দর এবং বাণিজ্যপথগুলো স্পষ্ট ভাবে চিত্রিত থাকত। এমন এক মানচিত্রকারের মানচিত্রেও আদিগঙ্গার রেখাটি স্পষ্ট। ব্রুক সাহেব আদিগঙ্গার পথকে ভাগীরথীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হিসেবেই দেখালেন। এই সব মানচিত্র প্রমাণ করে, পঞ্চদশ থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত আদিগঙ্গা ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ।

দীর্ঘ যাত্রাপথে সমুদ্রস্রোত আর সমুদ্র জরিপের বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও পাঠ নিয়ে উনিশ বছর বয়সে ‘আমেরিকা’ নামের এক জাহাজে রেনেল এসে পৌঁছলেন মাদ্রাজ শহরে। তার পর ঘটনাচক্রে এসে পৌঁছনো কলকাতায়, পুরনো বন্ধু টপহ্যামের সুপারিশে ফোর্ট উইলিয়ামে প্রবেশনারি ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি। বিরল অভিজ্ঞতা আর যোগ্যতাবলে মাত্র চব্বিশ বছর বয়সেই বাংলার সার্ভেয়ার জেনারেল পদে নিযুক্ত হলেন জেমস রেনেল। তাঁর হাত ধরেই শুরু হল বাংলার সিস্টেম্যাটিক সার্ভে। দুনিয়াসুদ্ধ ভূগোলবিদরা এক কথায় মেনে নিয়েছেন, সর্বকালের সেরা মানচিত্র-বিশেষজ্ঞদের মধ্যে জেমস রেনেল অন্যতম। ১৭৮০ সালে তাঁর প্রকাশিত মানচিত্রে আদিগঙ্গা এক সঙ্কীর্ণ নদীপথ। রেনেল সাহেব আদিগঙ্গাকে বিদ্যাধরীর সঙ্গে যুক্ত করে দেখিয়েছিলেন। তাঁর মানচিত্রে আদিগঙ্গা ও বিদ্যাধরীর ধারাটি মাতলার মোহনার পথ ধরে সাগরের সঙ্গে মিশছে।

কলকাতা শহরের নির্মাণের সময় গোবিন্দপুর গ্রামের ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া আদিগঙ্গার নাম ছিল গোবিন্দপুর খাঁড়ি। আঠারো শতকের শুরুর দিকে এক জন রাষ্ট্রদূত দিল্লি থেকে আসেন কলকাতায়। আদিগঙ্গার তীরে খিদিরপুরের কাছে থাকতেন। তিনি গোবিন্দপুর খাঁড়ির কিছুটা অংশ সংস্কার করিয়েছিলেন। তাঁর নাম ছিল সুরমান। কাজেই খিদিরপুরের ওই এলাকা তখন পরিচিত হয়ে ওঠে সুরমান গার্ডেন নামে। আর গোবিন্দপুর খাঁড়ি পরিচিত হল ‘সুরমান নালা’ নামে। আদিগঙ্গার অবস্থা তখন খুবই খারাপ। কর্নেল উইলিয়ম টলি সাহেব তখন কলকাতায় বসবাস শুরু করেছেন। নৌ-চলাচলের সুবিধের জন্য খিদিরপুর থেকে গড়িয়া পর্যন্ত আদিগঙ্গা বা সুরমান নালা তিনি সংস্কার করেন। তার পর গড়িয়া থেকে শামুকপোতা বা তাড়দহ পর্যন্ত সাতাশ কিলোমিটার একটি খাল কেটে জুড়ে দেন বিদ্যাধরীর সঙ্গে। এই তাড়দহ ছিল পর্তুগিজদের ঘাঁটি। এই খালটি পরে পরিচিত হয় ‘টালি নালা’ নামে।

মতবিরোধের শুরু ছত্রভোগের পর থেকে আদিগঙ্গার অতীত প্রবাহপথ নিয়ে। বিভিন্ন গবেষক বিভিন্ন রকম মত প্রকাশ করেছেন। ১৮৪৭ থেকে ১৮৫১ সালে ক্যাপ্টেন স্মিথ যে রেভিনিউ জরিপ করেন, তাতে তিনি পুরনো সাহেবদের তৈরি মানচিত্রের সাহায্য নিয়েছিলেন। মরিসন, প্রিন্সেপ, হজ ও লয়েডের তৈরি মানচিত্রগুলোকেই তিনি প্রামাণ্য হিসেবে ধরেছিলেন। এই সব মানচিত্র তৈরি হয়েছিল ১৮১২ থেকে ১৮৩০ সালের মধ্যে।

স্মিথ সাহেবের তৈরি মানচিত্রের সঙ্গে কৃষ্ণরামের ‘রায়মঙ্গল’ গ্রন্থের বর্ণনা মিলে যায়; যার রচনাকাল সপ্তদশ শতক। এই মানচিত্রে আদিগঙ্গার ধারাটি কাকদ্বীপের পথে রওনা হয়েছে; যার উল্লেখ মানচিত্রে রয়েছে ‘চড়া গঙ্গা’ নামে। তবে আদিগঙ্গা সাগরদ্বীপের মধ্য দিয়ে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত গিয়েছিল, ভাবনাটি অনেক গবেষক মেনে নেননি। তাঁদের মতে আদিগঙ্গা সপ্তমুখী মোহনা পথ ধরে সাগরে মিশত। এখানেও নানা মুনির নানা মত।

বৈষ্ণবধর্মীয় মানুষদের চোখে আদিগঙ্গা অতিশয় পবিত্র জলের ধারা। চৈতন্যদেবের তখন মাত্র চব্বিশ বছর বয়স। কাটোয়া থেকে কেশব ভারতীর কাছে সন্ন্যাস গ্রহণ করে তিনি ফিরে এলেন শান্তিপুরের অদ্বৈত আচার্যের গৃহে। সেখান থেকেই তিনি নীলাচলের পথে যাত্রা করলেন। তার পর আদিগঙ্গার তীর ধরে গড়িয়া বৈষ্ণবঘাটাতে আসেন। প্রমাণ পাওয়া যায় বৃন্দাবন দাসের ‘শ্রীচৈতন্য ভাগবত’-এ। সেখানে লেখা হচ্ছে, ‘হেনমতে প্রভুতত্ত্ব কহিতে কহিতে/ উত্তরিলা আসি আটিসারা নগরীতে’। আটিসারা, অর্থাৎ আজকের বারুইপুর। বারুইপুরে ছিল অনন্ত সাধুর আশ্রম। চৈতন্যদেব আদিগঙ্গার তীরের নিকটবর্তী ছত্রভোগেও আসেন। সে কথারও উল্লেখ রয়েছে ‘শ্রীচৈতন্য ভাগবত’-এ। অনেক গবেষকের ধারণা, চৈতন্যদেব সমুদ্রপথেই নীলাচলে গিয়েছিলেন।

নদী মানেই নদীর পাড়ে ঘাট থাকে। ঘাট খুঁজলেই খোঁজা হয়ে যায় নদীর হারানো পথ। নদীর এক-একটা ঘাট মানে এক-একটা ইতিহাস। আদিগঙ্গার তীরে কালীঘাটের মন্দিরের পাশেই রয়েছে কালীঘাট। নীলাচলে যাত্রাপথে চৈতন্যদেব সপার্ষদ বিশ্রাম করেছিলেন, তাই এই ঘাটের নাম বৈষ্ণবঘাটা। টালিগঞ্জের কাছে আদিগঙ্গার তীরে, গঙ্গা যেখানে দক্ষিণে বাঁক নিয়েছে, সেখানে নৌকা থেকে ‘কুত’ বা ট্যাক্স আদায় করা হত, তাই ওই ঘাটের নাম কুতঘাট। গড়িয়া বাজারের পাশেই গড়িয়া মহাশ্মশান। এই পথেই বাণিজ্যডিঙা ভাসিয়ে চাঁদ সদাগর গিয়েছিলেন সুদূর সিংহলে। শ্রীমন্ত সদাগরের পূজিত শিবের মন্দির আজও রয়েছে নদীর ঘাটের পাশে। নদীটি আজ পুকুরে পরিণত হয়েছে। গড়িয়া মহামায়াতলার কাছে রয়েছে প্রায় নিশ্চিহ্ন বেহুলার ঘাট। জনশ্রুতি, আদিগঙ্গার স্রোতে ভেসে যাওয়ার পথে বেহুলার কলার মান্দাস গঙ্গার এই ঘাটে থেমেছিল।

করের গঙ্গার ঘাট রয়েছে রাজপুর বাজারের পাশেই, দুর্গারাম করচৌধুরী প্রতিষ্ঠিত শিবমন্দিরের গায়ে। এখানে আজও পুণ্যার্থীরা বিশেষ বিশেষ তিথিতে স্নান করেন। জল নিয়ে যান গৃহদেবতার পুজোর জন্য। রাজপুর শ্মশানঘাট রাজা মদন রায়ের আমল থেকেই আদিগঙ্গা তীরবর্তী। এই ঘাটটি দক্ষিণের সুবিখ্যাত মহাশ্মশান ঘাট। পাশেই নারায়ণী দেবীর মন্দির ছিল, তাই ‘নারায়ণতলা’ নাম।

হরিনাভির গঙ্গার ঘাট নবীন ঘোষ তৈরি করেছিলেন। বড়দহ বন্দরঘাট রাজপুর পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত। স্থানীয় নাম ‘বড়দার খোল’। কবি কৃষ্ণরাম দাসের ‘রায়মঙ্গল’ কাব্যে উল্লেখ রয়েছে বড়দহের। তবে ঘাটের চিহ্ন নেই। মজা খাতে জল জমে শুধু বর্ষায়। মালঞ্চের বন্দরঘাট কৃষ্ণকালী মন্দিরের কাছেই। কবিকঙ্কণের চণ্ডীমঙ্গলে আদিগঙ্গার তীরে ‘জগৎ ঘাট’-এর উল্লেখ আছে। গোবিন্দপুরে এর স্থানীয় নাম ‘জুগদো’। ঘাটের চিহ্ন নেই।

সদাব্রত ঘাটের অস্তিত্ব আছে আজও। কাছেই ছিল কোর্ট; সেই কোর্টে হাকিম ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। সেখানে কবি মধুসূদনও এসেছিলেন। বারুইপুরের কীর্তনখোলা শ্মশানঘাটের সঙ্গে জুড়ে আছে চৈতন্যদেবের স্মৃতি। নীলাচলে যাওয়ার পথে আদিগঙ্গাতীরে আটিসারা গ্রামে (বারুইপুর) সাধু অনন্তের কুটিরে শ্রীচেতন্যদেব একরাত্রি কীর্তন করেছিলেন। সেই স্থানটি বর্তমানে কীর্তনখোলা শ্মশানঘাট। প্রতাপাদিত্যের সেনাপতি সূর্যকান্ত গুহর নামে সূর্যপুরের ঘাট। ধপধপির কাছে চাঁদোখালি ঘাট। আদিগঙ্গায় ডিঙা করে বাণিজ্যযাত্রাকালে চাঁদ সদাগর এখানে ডিঙা ভিড়িয়ে গঙ্গাজল নিয়েছিলেন, তাই জায়গাটির নাম চাঁদোখালি।

মিত্রগঙ্গার গায়ে রয়েছে ক্ষেত্র মিত্রের ঘাট। ঘোষ, বোসেদের ঘাটও আছে জয়নগরে। প্রখ্যাত গুণানন্দ মতিলালের পরিবারের নামধারী মতিলাল গঙ্গার ঘাট আজও রয়েছে। মথুরাপুরের কাছে মজা গঙ্গার তীরে ছত্রভোগ মহাশ্মশান ঘাট। এখান থেকেই মহাপ্রভু নীলাচলের পথে যাত্রা করেছিলেন। ছত্রভোগের কিছুটা দক্ষিণে অম্বুলিঙ্গ ঘাট। মনসামঙ্গলে আছে, চাঁদ সদাগর ছত্রভোগে শিব ও ত্রিপুরসুন্দরী দেবীর পুজো দিয়ে অম্বুলিঙ্গ ঘাটে বাণিজ্যতরী ভিড়িয়েছিলেন।

আদিগঙ্গার পথ বাণিজ্যের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সরস্বতী ও আদিগঙ্গা, দুই নদীতেই বেশ সজীব প্রবাহ ছিল। অনেক বণিক দুটো নদী দিয়েই সাগরে যেতেন। ষোড়শ শতকের গোড়ায় কিছু কিছু পর্তুগিজ জাহাজ আদিগঙ্গার পথে প্রবেশ না করে সাঁকরাইলে এসে সরস্বতী নদীপথে প্রবেশ করত। ষোড়শ শতকের মধ্যভাগে জলের অভাবে সরস্বতীর অবনতি ঘটে। মোহনায় জলদস্যুদের দৌরাত্ম্যের জন্য সরস্বতী ছেড়ে হুগলি নদী ও আদিগঙ্গার পথ ধরে সাগরযাত্রা করতে বাধ্য হয় বাণিজ্যতরীগুলি। হুগলি নদী ও নিমকির খাল ক্রমশ প্রশস্ত ও গভীর হয়ে ওঠে। কলকাতার দিকে তখন গভীর জল পাওয়ায় বিদেশি জাহাজগুলি বেতড় ছেড়ে গার্ডেনরিচের দিকে নোঙর করতে শুরু করে। কাজেই সপ্তদশ শতক থেকে দেখা গেছে, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় সপ্তগ্রাম ছেড়ে সুতানুটি, গোবিন্দপুরের দিকে পসার জমাতে শুরু করেছে।

নবাব আলিবর্দি খাঁয়ের আমলে নিমকির খাল কেটে আয়তনে বড় করা হলে সরস্বতী ও আদিগঙ্গা শেষ হয়ে যায় জলের অভাবে। অষ্টাদশ শতক থেকে আদিগঙ্গা দ্রুত মজে গিয়ে খালে পরিণত হয়। টালি নালা কেটে বিদ্যাধরীর সঙ্গে যুক্ত করার পর আদিগঙ্গার নীচের অংশ জলের অভাবে দ্রুত মজতে থাকে। ১৭৭৭ সালে টালি নালা নৌকা চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। সরকারের সঙ্গে টোল আদায় করার জন্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় টলি সাহেবের সঙ্গে। প্রতি মাসে লাভ হতে শুরু করে চার হাজার তিনশো টাকা করে। কিন্তু এর কিছু দিনের মধ্যেই টলি সাহেব মারা গেলে তাঁর স্ত্রী ইজারার স্বত্ব বিক্রি করে দেন। অবশেষে ১৮০৪ সালে সরকার টালি নালার পরিচালনভার গ্রহণ করেন।

১৯০২ সালেও টালি নালা থেকে সত্তর হাজার টাকা আয় হয়েছিল। জনগণের ও যানবাহনের সুবিধার্থে, দীর্ঘ খালটি পারাপারের জন্য ক্রমে সাতটি পোল তৈরি হয়। ১৮৩২ সালে ক্যাপ্টেন শক সর্বপ্রথম কালীঘাটের পোলটি তৈরি করেন; খরচ হয় ষোলো হাজার আটশো টাকা। টালিগঞ্জের কাছে পোলটি তৈরি হয় ১৮২৭ সালে। ঠিক তার পরের বছর গড়িয়ার পোলটি তৈরি হয়; নির্মাতা ছিলেন ক্যাপ্টেন বেকার। আলিপুর জেলের কাছে পোলটি ক্যাপ্টেন জন টমসন নির্মাণ করেন ১৮৩৫ সালে। ১৮৩৩ সালে তৈরি হয় ষাট হাজার টাকা ব্যায়ে হেস্টিংস ব্রিজ। এই ব্রিজের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন ক্যাপ্টেন ফিটজ়েরাল্ড ও ক্যাপ্টেন জন টমসন।

সময়ের স্রোতে আদিগঙ্গা হারিয়ে যায়। টালি নালার গুরুত্ব বাড়ে বাণিজ্যিক কারণে। তাও ফিকে হয়ে যায় আস্তে আস্তে। হারিয়ে যাওয়া মরা নদীর বুকে যে দিন থেকে মেট্রোরেলের থামগুলো নির্মাণ হয়েছে, সেই থেকেই আদিগঙ্গার মৃত্যুর কফিনে শেষ পেরেকটি মারা হয়ে গেছে। তবু হাল ছাড়লে হবে না। কলকাতাকে বাঁচানোর জন্য আদিগঙ্গাকে বাঁচাতেই হবে। পরিবেশকর্মীদের এ বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Adi Ganga Tolly Nullah

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy