×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৫ মে ২০২১ ই-পেপার

কার টাইপ-টু ডায়াবিটিস হবে, বলা যাবে আগেই, পথ দেখালেন লাভপুরের ভবতোষ

সুজয় চক্রবর্তী
কলকাতা ১৩ এপ্রিল ২০২১ ২৩:৫০
গ্রাফিক- শৌভিক দেবনাথ।

গ্রাফিক- শৌভিক দেবনাথ।

ব্যাক্টেরিয়া দেখে এ বার ধরা যাবে ভয়ঙ্কর ‘টাইপ-টু ডায়াবিটিস’। অনেক আগেভাগেই। অন্ত্রে কোন কোন ধরনের ব্যাক্টেরিয়া কী পরিমাণে রয়েছে, তা পরীক্ষা করেই মিলবে উত্তর।

আর কয়েক মাসের মধ্যে কে বা কারা ‘টাইপ-টু ডায়াবিটিস’-এ আক্রান্ত হতে যাচ্ছেন, এ বার তার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হবে। এর আগে যা কার্যত অসম্ভই ছিল।

সেই পথ দেখালেন বীরভূমের লাভপুরের ভবতোষ দাস। ফরিদাবাদের ‘ট্রান্সলেশনাল হেল্‌থ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউট (টিএইচএসটিআই)’-এর মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক।

Advertisement

ভবতোষ, তাঁর ছাত্রী শ্রুতি সাক্সেনা ও তাঁদের সহযোগীদের আরও কৃতিত্ব, গবেষণাটি একই সঙ্গে চালানো হয়েছে দু’টি মহাদেশের দু’টি দেশ ভারত ও ডেনমার্কের নাগরিকদের উপর। একটি দেশের জলবায়ুতে শীতের প্রাধান্য। অন্য দিকে, ভারতের আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ। তাঁরা দেখেছেন আবহাওয়া বিপরীতধর্মী হলেও টাইপ-টু ডায়াবিটিস হওয়ার আগে দু’টি দেশের নাগরিকদেরই অন্ত্রে কয়েকটি বিশেষ ধরনের ব্যাক্টেরিয়ার সংখ্যা বেড়ে যায়। সঙ্গে উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যায় অন্য কয়েক ধরনের ব্যাক্টেরিয়া।

গবেষণাটি চালানো হয়েছে কেন্দ্রীয় বায়োটেকনোলজি মন্ত্রক (ডিবিটি) ও সুইডিশ সরকারের অর্থানুকুল্যে। গবেষকদলে রয়েছেন ফরিদাবাদের ‘টিএইচএসটিআই’, ম্যাড্রাস ডায়াবিটিস রিসার্চ ফাউন্ডেশন (এমডিআরএফ), টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (টিসিএস) এবং ডেনমার্কের কোপেনহাগেন বিশ্ববিদ্যালয়। গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে আম্তর্জাতিক বিজ্ঞান-গবেষণা পত্রিকা ‘বায়োমেড সেন্ট্রাল (বিএমসি) জিনোম মেডিসিন’-এ।

গ্রাফিক- নিরূপম পাল।

গ্রাফিক- নিরূপম পাল।


চিনের পরেই হু হু করে ডায়াবিটিস রোগী বাড়ছে ভারতে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (‘হু’)-র ২০১৯ সালের রিপোর্ট জানাচ্ছে, ডায়াবিটিসে আক্রান্ত নাগরিকের সংখ্যায় বিশ্বে চিনের পরেই রয়েছে ভারত। ১২৫ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতে ডায়াবিটিসে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ৭০ লক্ষ। যাঁদের বয়স ২০ থেকে ৭৯ বছরের মধ্যে। চিনে আক্রান্তের সংখ্যা ১১ কোটি ৬৪ লক্ষ। ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবিটিস ফেডারেশনের পূর্বাভাস, ভারতে ডায়াবিটিস রোগীর সংখ্যা ২৪ বছর (২০৪৫ সাল) পরে হবে প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি।

ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮ সালের ‘গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ’ শীর্ষক রিপোর্ট বলছে, ২০১৭-য় ভারতে যেখানে সন্ত্রাসবাদে মৃত্যু হয়েছিল ৭৬৬ জনের, সেখানে ডায়াবিটিসে প্রাণ হারিয়েছিলেন ২ লক্ষ ৫৪ হাজার ৫০০ জন। ম্যাড্রাস ডায়াবিটিস রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ২০১৮ সালের গবেষণা জানিয়েছিল, ভারতে ফিবছর ডায়াবিটিসে না ভোগা যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার ৩ গুণ ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হয় ডায়াবিটিসে আক্রান্ত হওয়ার পর। বিশ্বে ফিবছর গড়ে ৪২ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয় ডায়াবিটিসে।

ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবিটিস ফেডারেশনের রিপোর্ট জানাচ্ছে ভারতে ডায়াবিটিস রোগীদের বেশির ভাগই আক্রান্ত হন টাইপ-টু ডায়াবিটিস-এ। ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই। যা আরও ভয়ঙ্কর। সে ক্ষেত্রে রোগীর শরীর কোনও ইনস্যুলিনই তৈরি করে না, বা ইনস্যুলিন তৈরি হতে বাধা দেয়। টাইপ-টু ডায়াবিটিস ধরাও পড়ে অনেক দেরিতে। ১০ জনের মধ্যে ৯ জন রোগী বুঝতেই পারেন না, তাঁরা আক্রান্ত হয়েছেন টাইপ-টু ডায়াবিটিস-এ।

‘হু’ এবং আমেরিকার ‘সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)’-এর সাম্প্রতিক গবেষণা জানাচ্ছে, বিশ্বে ডায়াবিটিসে আক্রান্তদের ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই টাইপ-টু ডায়াবিটিস রোগী। ভারতেও তা-ই।

গবেষণাপত্র ও গবেষকদল। অধ্যাপক ভবতোষ দাস (ডান দিক থেকে পঞ্চম) ও গবেষক শ্রুতি সাক্সেনা (ডান দিক থেকে তৃতীয়)।

গবেষণাপত্র ও গবেষকদল। অধ্যাপক ভবতোষ দাস (ডান দিক থেকে পঞ্চম) ও গবেষক শ্রুতি সাক্সেনা (ডান দিক থেকে তৃতীয়)।


এই গবেষণার কৃতিত্ব কোথায়?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কে বা কারা কিছু দিনের মধ্যেই টাইপ-টু ডায়াবিটিস-এ আক্রান্ত হতে যাচ্ছেন, এই গবেষণার ফলে আগামী দিনে তার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হবে। চিকিৎসকরা আগেভাগেই সতর্ক করতে পারবেন। টাইপ-টু ডায়াবিটিস যাতে না হয়, সে জন্য খাদ্যাভ্যাসের কী কী পরিবর্তন করা প্রয়োজন, কোন কোন খাদ্য বেশি পরিমাণে খেতে হবে, কোনটা কম খেতে হবে, তা বলে দিতে পারবেন চিকিৎসকরা।

ভবতোষ ও তাঁর সহযোগীদের গবেষণার ফলাফল এ-ও জানাচ্ছে, টাইপ-টু ডায়াবিটিস হওয়ার আগে ভারতীয় ও ডেনমার্কের নাগরিকদের অন্ত্রে যে ব্যাক্টেরিয়াদের পরিমাণ বেড়ে যেতে দেখা গিয়েছে, ওই রোগে প্রায়শই ব্যবহৃত ওষুধ ‘মেটফর্মিন’ খাওয়ার পর অন্ত্রে সেই ব্যাক্টেরিয়াদের পরিমাণের পরিবর্তন হয়।

ফলে, টাইপ-টু ডায়াবিটিস-এর জন্য মানুষের অন্ত্রে আদতে কারা কলকাঠি নাড়ে, গবেষকরা তা শনাক্ত করতে পেরেছেন।

গ্রাফিক- নিরূপম পাল।

গ্রাফিক- নিরূপম পাল।


উপকারী ও অপকারী ব্যাক্টেরিয়া

মানুষের অন্ত্রে সাধারণত ৩টি গোত্রের ব্যাক্টেরিয়া থাকে। ‘কমেনস্যাল্স’, প্যাথোজেন্স’ এবং ‘সিমবায়োন্ট্‌স’।

এদের মধ্যে সাধারণত মানুষের পক্ষে অপকারী হয় প্যাথোজেন্স-ই।

এই ৩টি গোত্রের ব্যাক্টেরিয়ার মধ্যে সাধারণত ৪টি ব্যাক্টেরিয়া থাকে বেশি পরিমাণে। বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাদের বলা হয় ‘ডমিন্যান্ট ব্যাক্টেরিয়াল ফাইলা’। এরা হল ‘ফার্মিকিউট্‌স’, ‘ব্যাক্টেরয়েডেট্‌স’,অ্যাক্টিনোব্যাক্টেরিয়া’ ও ‘প্রোটিওব্যাক্টেরিয়া’।

পক্ষান্তরে এই ৩টি গোত্রের আরও ৪টি ব্যাক্টেরিয়া রয়েছে, যারা অন্ত্রে সাধারণত কম পরিমাণে থাকে। বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাদের বলা হয় ‘রেয়ার ব্যাক্টেরিয়াল ফাইলা’। এদের অন্যতম-‘ফিউসোব্যাক্টেরিয়া’, ‘টেনেরিকিউট্‌স’, ‘ভেরুকোমিক্রোবিয়া’ এবং ‘স্পাইরোকেট্‌স’।

কী কী দেখেছেন গবেষকরা?

মূল গবেষক টিএইচএসটিআই-এর মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ভবতোষ দাস ‘আনন্দবাজার ডিজিটাল’-কে জানিয়েছেন, অন্ত্রে কোন কোন ধরনের ব্যাক্টেরিয়া কী পরিমাণে থাকে, তা জানতে ১৫০ জন ভারতীয় ও ডেনমার্কের ১৫০ জন নাগরিকের উপর পরীক্ষা চালান গবেষকরা। তার পর ডায়াবিটিস হয়নি ভারত ও ডেনমার্কের এমন মোট ৩০০ জন নাগরিকের উপর চালানো হয় পরীক্ষা। তার পরের ধাপে পরীক্ষা চালানো হয় টাইপ-টু ডায়াবিটিস হয়েছে ভারত ও ডেনমার্কের এমন আরও ৩০০ জন নাগরিকের উপর। তার পর মেটফর্মিন খাচ্ছেন ভারত ও ডেনমার্কের এমন ২১০ জন নাগরিকের অন্ত্রে কোন ধরনের ব্যাক্টেরিয়া কী কী পরিমাণে রয়েছে, তা পরীক্ষা করে দেখেন গবেষকরা। সব মিলিয়ে ভারত ও ডেনমার্কের মোট ১ হাজার ১১০ জন নাগরিকের অন্ত্রে কী কী ধরনের ব্যাক্টেরিয়া থাকে, আর টাইপ-টু ডায়াবিটিস-এ কেউ আক্রান্ত হলে অন্ত্রে সেই সব ব্যাক্টেরিয়ার পরিমাণ কী ভাবে কতটা বদলে যায়, তা খতিয়ে দেখেছেন গবেষকরা।

গ্রাফিক- নিরূপম পাল।

গ্রাফিক- নিরূপম পাল।


ভবতোষের কথায়, ‘‘দেখেছি, টাইপ-টু ডায়াবিটিস রোগীর অন্ত্রে ‘ল্যাকনোস্পাইসিয়াই’ পরিবারের ৩টি ব্যাক্টেরিয়ার আপেক্ষিক পরিমাণ বেড়ে যায়। টাইপ-টু ডায়াবিটিস হলে আবার ভারতীয়দের অন্ত্রে ল্যাকনোস্পাইসিয়াই পরিবারের ৩টি ব্যাক্টেরিয়ার মধ্যে বিশেষ একটি ‘মেগাস্ফেরা’-র পরিমাণ বেড়ে যায় অনেক বেশি।’’

গবেষকরা এ-ও দেখেছেন, টাইপ-টু ডায়াবিটিস-এ আক্রান্ত হলে ভারতীয় ও ডেনমার্কের নাগরিকদের অন্ত্রে আরও ৩টি ব্যাক্টেরিয়ার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যায়। এরা হল ‘সাবডোলিগ্র্যানুলাম’, ‘বিউটিরিসিকক্কাস’ ও ‘অ্যানিরস্পোরোব্যাক্টার’।

গবেষকরা জানাচ্ছেন, রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়াতে মানুষের অন্ত্রে মেগাস্ফেরা গোত্রের ব্যাক্টেরিয়ার যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে, সেই সন্দেহই জোরালো হয়েছে গবেষণার ফলাফলে। যদিও ভবতোষ জানাচ্ছেন, মেগাস্ফেরা গোত্রের ব্যাক্টেরিয়া কিন্তু মানুষের পক্ষে অপকারী বা প্যাথোজেন্স গোত্রে পড়ে না। কিন্তু অন্ত্রে তাদের পরিমাণ একটি নির্দিষ্ট মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে তা মানুষের পক্ষে সমস্যার কারণ হয়ে ওঠে।

এই মেগাস্ফেরা গোত্রের ব্যাক্টেরিয়ার সংখ্যাধিক্য দেখা গিয়েছে শুধুই সেই সব ভারতীয়ের ক্ষেত্রে, যাঁরা টাইপ-টু ডায়াবিটিস-এ আক্রান্ত হয়েছেন। টাইপ-টু ডায়াবিটিস-এ আক্রান্ত ডেনমার্কের নাগরিকদের অন্ত্রে কিন্তু এই মেগাস্ফেরা গোত্রের ব্যাক্টেরিয়ার সংখ্যাধিক্য চোখে পড়েনি গবেষকদের।

কেন? ভবতোষের ব্যাখ্যা, ‘‘এর জন্য ডেনমার্কেনাগরিকদের কোনও জিনগত কারণ থাকতে পারে। এর জন্য দায়ী হতে পারে পরিবেশগত ভিন্নতাও।’’

গ্রাফিক- নিরূপম পাল।

গ্রাফিক- নিরূপম পাল।


লাভপুরের ভবতোষের পরিক্রমা

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেশ লাভপুরের কাছেই শীতল গ্রামের বুনিয়া ডাঙ্গাল হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক ও লাভপুর যাদবলাল হাইস্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর ভবতোষ এম এসসি করেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তার পর এম টেক খড়্গপুরের ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি)’ থেকে। পিএইচ ডি যাদবপুরের ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব কেমিক্যাল বায়োলজি (আইআইসিবি)’ থেকে। তাঁর পোস্ট ডক্টরাল প্যারিসের ‘সেন্টার ফর জেনেটিক্স অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজি (সিএনআরএস-আই২বিসি)’ থেকে।

কেন মেটফর্মিন?

টাইপ-টু ডায়াবিটিস রোগীদের উপর মেটফর্মিন ওষুধ প্রয়োগের ফলাফল জানতে কেন উৎসাহী হয়ে উঠলেন গবেষকরা?

ভবতোষ জানাচ্ছেন, টাইপ-টু ডায়াবিটিস-এ আক্রান্তদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মেটফর্মিন ওষুধ খেতে বলেন চিকিৎসকরা। সারা বিশ্বেই এই ওষুধের বহুল ব্যবহার রয়েছে।

ভবতোষের কথায়, ‘‘আমরা দেখতে চেয়েছিলাম মানুষের অন্ত্রে বিভিন্ন ব্যাক্টেরিয়ার পরিমাণের তারতম্য টাইপ-টু ডায়াবিটিসে আক্রান্ত হওয়ার জন্য হচ্ছে? নাকি তা হচ্ছে মেটফর্মিন ওষুধ খাওয়ার জন্য? এর আগে বিভিন্ন গবেষণা জানিয়েছিল অ্যান্টিবায়োটিক নয়, এমন নানা ধরনের ওষুধ খাওয়ার ফলে মানুষের অন্ত্রে বিভিন্ন ব্যাক্টেরিয়ার পরিমাণ বদলে যায়। আমরা দেখেছি, মেটফর্মিন না খেলে টাইপ-টু ডায়াবিটিসে আক্রান্তদের অন্ত্রে বিশেষ কয়েকটি ব্যাক্টেরিয়ার পরিমাণ বেড়ে যায়। আবার কমেও যায় কয়েকটি ব্যাক্টেরিয়া। মেটফর্মিন খেলে টাইপ-টু ডায়াবিটিসে আক্রান্তদের অন্ত্রে বিভিন্ন ব্যাক্টেরিয়ার পরিমাণে রদবদল ঘটে। তবে টাইপ-টু ডায়াবিটিস রোগীদের অন্ত্রে যে সব ব্যাক্টেরিয়ার পরিমাণ বেড়ে যায়, গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মেটফর্মিন খেলে তাদের পরিমাণ আবার কমে যায়। এর ফলে আমরা আরও নিশ্চিত হতে পেরেছি টাইপ-টু ডায়াবিটিসের ক্ষেত্রে রোগীদের অন্ত্রে কোন কোন ব্যাক্টেরিয়া আদতে কলকাঠি নাড়ে।’’

ফরিদাবাদে টিএইচএসটিআই-এর গবেষণাগারে অধ্যাপক ভবতোষ দাস। -নিজস্ব চিত্র।

ফরিদাবাদে টিএইচএসটিআই-এর গবেষণাগারে অধ্যাপক ভবতোষ দাস। -নিজস্ব চিত্র।


কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

দিল্লির ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি (আইসিজিইবি)’-র ট্রান্সলেশনাল হেল্‌থ গ্রুপের গ্রুপ লিডার রঞ্জন নন্দা ‘আনন্দবাজার ডিজিটাল’-কে বলেছেন, ‘‘ভারত-সহ গোটা বিশ্বেই টাইপ-টু ডায়াবিটিসে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা উত্তরোত্তর লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এই রোগ দেরিতে ধরা পড়ে। রোগী বা চিকিৎসক কেউই আগে বুঝতে পারেন না। ফলে যখন চিকিৎসা শুরু হয়, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। তাই এই রোগে মৃতের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলেছে। সে ক্ষেত্রে এই গবেষণা চিকিৎসকদের কাছে ব়়ড় হাতিয়ার হয়ে উঠবে টাইপ-টু ডায়াবিটিস রোগীকে আগেভাগেই শনাক্ত করতে। কেউ টাইপ-টু ডায়াবিটিসে আক্রান্ত হওয়ার আগেই তাঁকে সতর্ক করতে পারবেন চিকিৎসকরা। রোগীর চিকিৎসায় অযথা বিলম্ব হবে না। সেই বিলম্বের খেসারতও দিতে হবে না রোগীদের।’’

রঞ্জন এ-ও জানিয়েছেন, এই গবেষণা খুব প্রয়োজনীয় মূলত ৪টি তথ্য জানাতে পেরেছে।

প্রথমত, মানুষের অন্ত্রে কোন কোন ব্যাক্টেরিয়া কোন কোন প্রদাহ সৃষ্টিকারী প্রোটিন বেশি পরিমাণে তৈরি হতে সাহায্য করে। সেই প্রোটিনগুলির মধ্যে রয়েছে- ‘এইচএস-সিআরপি’, ‘টিএনএফ-এ’, ‘এলবিপি’।

দ্বিতীয়ত, ডায়াবিটিসে আক্রান্ত হওয়ার আগে ও পরে মানুষের অন্ত্রে কোন কোন ব্যাক্টেরিয়া কী কী পরিমাণে থাকে ভারতীয় ও ডেনমার্কের নাগরিকদের (দু’টি বিপরীতধর্মী আবহাওয়ার দু’টি মহাদেশের দু’টি দেশ) উপর পরীক্ষা চালিয়ে তা দেখাতে পেরেছেন গবেষকরা।

তৃতীয়ত, ডায়াবিটিস হওয়ার আগে মানুষের অন্ত্রে কোন কোন ব্যাক্টেরিয়ার সংখ্যা বেড়ে যায়, আর কোন কোন ব্যাক্টেরিয়ার সংখ্যা কমে যায় সেটাও এই প্রথম পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে দেখাতে পেরেছেন গবেষকরা।

চতুর্থত, ভারতীয়দের রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়ার ক্ষেত্রে কতটা সহায়ক ভূমিকা নেয় অন্ত্রে থাকা বিশেষ ধরনের ব্যাক্টেরিয়া মেগাস্ফেরা, গবেষকরা সেটাও প্রথম দেখাতে পেরেছেন।

‘‘তবে এই গবেষণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ারও কয়েকটি পথ খোলা রয়েছে’’, বলছেন রঞ্জন। জানিয়েছেন, ফলাফল যাতে আরও নিখুঁত হয়, সে জন্য এই গবেষণায় বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের বয়স ও লিঙ্গ-নির্ভরতার আরও বেশি তথ্যাদি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কাজটা সহজতর হতে পারে ডায়াবিটিস না হওয়া মানুষের বিভিন্ন ধরনের বিপাক প্রক্রিয়াগুলিকে (‘মেটাবলিক পাথওয়েজ’) খতিয়ে দেখা গেলে। যেমন, ‘টাইরোসিন মেটাবলিজম’, ‘অ্যাসকরবেট অ্যান্ড অ্যালডারেট মেটাবলিজম’, ‘জেনোবায়োটিক ডিগ্রেডেশন’ এবং ‘গামা অ্যামাইনো বিউটাইরিক অ্যাসিড (জিএবিএ)’।

মতামতে দুই বিশেষজ্ঞ। প্রিন্সিপাল সায়েন্টিস্ট দীপ্যমান গঙ্গোপাধ্যায়  (বাঁ দিকে) এবং অধ্যাপক রঞ্জন নন্দা। গ্রাফিক- নিরূপম পাল।

মতামতে দুই বিশেষজ্ঞ। প্রিন্সিপাল সায়েন্টিস্ট দীপ্যমান গঙ্গোপাধ্যায় (বাঁ দিকে) এবং অধ্যাপক রঞ্জন নন্দা। গ্রাফিক- নিরূপম পাল।


কলকাতার ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব কেমিক্যাল বায়োলজি (আইআইসিবি)’-র প্রিন্সিপাল সায়েন্টিস্ট অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর দীপ্যমান গঙ্গোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘ভবতোষদের গবেষণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হল অক্ষাংশের দিক থেকে বেশ কিছুটা আলাদা দু’টি দেশের ডায়াবিটিস রোগীদের নিয়ে তাঁরা একসঙ্গে কাজ করেছেন। আমাদের মতো ক্রান্তিবৃত্তের (‘ইকোয়েটর’) কাছের দেশের মানুষ যে ধরনের ‘বায়োডাইভার্সিটি’ বা জীববৈচিত্র্যের মধ্যে বেঁচে রয়েছি, সেটা ব্যাক্টেরিয়ার জগতেও একই রকম। কাজেই ধরে নেওয়া যায়, ভারতীয়দের অন্ত্রে থাকা ব্যাক্টেরিয়াও ডেনমার্কের মতো দেশের নাগরিকদের থেকে অনেকটাই আলাদা হবে। এ ছাড়াও আছে এই দু’দেশের মানুষের জিনের পার্থক্য।’’

সেই সব পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সেগুলিকে অতিক্রম করে ভবতোষরা যে ডায়াবিটিসের সঙ্গে একই ধরনের যোগাযোগ থাকা ব্যাক্টেরিয়াগুলোকে চিনে নিতে পেরেছেন, গবেষণার অভিনবত্ব সেটাই, জানাচ্ছেন দীপ্যমান।

তিনি বলছেন, ‘‘এই গবেষণা যে সব তথ্য দিয়েছে, তা আগামী দিনে গোটা বিশ্বের ডায়াবিটিস রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে কাজে লাগবে। এ ক্ষেত্রে আর একটি ব্যাপার আমার খুব উল্লেখযোগ্য মনে হচ্ছে। সেটি হল, পশ্চিমের দেশগুলিতে ডায়াবিটিসের সঙ্গে রোগীদের দেহের ওজন বেড়ে যাওয়ার একটা জোরালো যোগাযোগ দেখা যায়। কিন্তু ভারতীয়দের মধ্যে যাঁরা ডায়াবিটিসে আক্রান্ত হন, তাঁরা সকলেই যে এই দৈহিক ওজন-বৃদ্ধির শিকার, তা কিন্তু নয়। ভারতীয়দের মধ্যে আমরা অনেক কৃশকায় ব্যক্তিকেও এই রোগে আক্রান্ত হতে দেখি। ডায়াবিটিসের এই ধরনের রোগীদের (যাঁদের চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাযায় ‘নন-ওবেস ডায়াবিটিক পেশেন্ট’ বলা হয়), রোগাক্রান্ত হওয়ার আপাত-দুরূহ কারণ বোঝার ক্ষেত্রেও এই গবেষণা বেশ কিছুটা আলোকপাত করতে পারে।’’

গ্রাফিক-তথ্য সৌজন্যে- অধ্যাপক ভবতোষ দাস।

Advertisement