সে এমন এক জায়গা, যেখানে মহাকর্ষ এতটাই প্রবল যে আলো পর্যন্ত পালাতে পারে না। আর তার কেন্দ্রে থাকে একটি ‘সিঙ্গুলারিটি’, যা হল অসীম ঘনত্বের এক বিন্দু, যার কোনও আকার নেই। স্থানটি ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর। এত দিন ধরে মনে করা হত, বিশাল ভরের কোনও নক্ষত্র ধ্বংস হলে তার অনিবার্য পরিণতি একটি কৃষ্ণগহ্বর। কিন্তু সাম্প্রতিক একটি গবেষণা দেখাচ্ছে, সেই ভয়ঙ্কর সমাপ্তির বিকল্প পথও থাকতে পারে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক ফারুক রহমানের নেতৃত্বাধীন গবেষণাটি সম্প্রতি ‘ফিজিক্স লেটারস বি’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। রহমানের গবেষকদলে রয়েছেন তাঁর গবেষক ছাত্র বিক্রমার্ক এস চৌধুরী, অরিত্র সান্যাল, আনিকুল ইসলাম এবং বিদিশা সামন্ত।
২০০১ সালে নক্ষত্রের মৃত্যুর বিকল্প পরিণতি নিয়ে একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন বিজ্ঞানী পাভেল মাজুর এবং এমিল মটোলা। সেই তত্ত্বকেই পাথেয় করে এগিয়েছিলেন রহমানরা। বিষয়টা এমন— সুবিশাল নক্ষত্রেরা সবচেয়ে নাটকীয় ভাবে মারা যায় সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে তাদের কেন্দ্রস্থলটি ধসে পড়ে। নক্ষত্রটির খোলস ভেতরে আছড়ে পড়ে এবং কেন্দ্রের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে বিস্ফোরণ ঘটে। এর পরে নক্ষত্রটি কতটা বিশাল ছিল তার ওপর ভিত্তি করে দু’টি ফলাফল হতে পারে: হয় এর কেন্দ্রস্থলটি সঙ্কুচিত হয়ে একটি প্রবল ঘনত্ববিশিষ্ট ‘নিউট্রন স্টার’ তৈরি হবে, অথবা এটি বাস্তবতা ভেঙে একটি ‘সিঙ্গুলারিটি’তে পরিণত হবে। সেই স্থান তৈরি হবে, যেখানে মহাবিশ্বের কোনও নিয়ম কাজ করে না— অর্থাৎ কৃষ্ণগহ্বর।
এত দিন ধরে মনে করা হত, বিশাল ভরের নক্ষত্র ধ্বংস হলে তার পরিণতি অনিবার্য ভাবে একটি কৃষ্ণগহ্বর। কিন্তু নতুন গবেষণায় বলা হচ্ছে, মহাকর্ষীয় পতনের শেষ পরিণতি সব সময় কৃষ্ণগহ্বর না-ও হতে পারে। তার বদলে তৈরি হতে পারে একটি বিশেষ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তু— ‘গ্রাভাস্টার’।
এটি এমন এক মহাজাগতিক বিন্যাস, যা দেখতে বাইরে থেকে কৃষ্ণগহ্বরের মতো হলেও ভিতরে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। একে তুলনা করা যায় এক ধরনের স্থিতিশীল ‘মহাজাগতিক সাবানের বুদবুদ’, যা বিশুদ্ধ শক্তিতে পূর্ণ এবং যারখোলসটি প্রকৃতির সবচেয়ে অদ্ভুত উপাদান দিয়ে তৈরি।
রহমানরা গ্রাভাস্টার-এর প্রেক্ষিতে আইনস্টাইনের ফিল্ড সমীকরণের-এর একটি সুনির্দিষ্ট সমাধান প্রস্তাব করেছেন, যা মাজুর এবং মটোলা দ্বারা প্রবর্তিত। ‘ফিজিক্স লেটারস বি’ জার্নালে প্রকাশিত ‘এগ্জ়্যাক্ট গ্রাভাস্টার সলিউশন’ শীর্ষক প্রবন্ধটিতে তাঁরা জানিয়েছেন— মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি নিয়ে প্রচলিত ধারণার বাইরেও সম্ভাবনা রয়েছে। এই ধারণাটি মহাকর্ষীয় পতনের চূড়ান্ত অবস্থার একটি বিকল্প চিত্র উপস্থাপন করে, যেখানে কৃষ্ণগহ্বরের পরিবর্তে অন্য ধরনের একটি সঙ্কুচিত বস্তুর গঠন হতে পারে।
রহমানদের পদ্ধতিতে গ্রাভাস্টারকে তিনটি স্বতন্ত্র অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি অঞ্চলই আইনস্টাইনের ফিল্ড সমীকরণের-এর সুনির্দিষ্ট সমাধান দ্বারা সংজ্ঞায়িত। বিজ্ঞানীরা গ্রাভাস্টার মডেলের প্রধান ভৌত বৈশিষ্ট্যগুলি বিশ্লেষণ করেছেন, যা কৃষ্ণগহ্বরের চিরাচরিত ধারণার সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে প্রস্তাবিত হয়েছে। এর কেন্দ্রে রয়েছে এক রহস্যময় অঞ্চল, যেখানে ঋণাত্মক চাপ সব কিছুকে বাইরে ঠেলে দিয়ে ‘সিঙ্গুলারিটি’-র জন্মই হতে দেয় না। এর চারপাশে থাকে একটি শক্ত, পুরু এবং গাণিতিক ভাবেনির্ধারিত খোলস (কেন্দ্রকে ঘিরে থাকা অত্যন্ত ঘন পদার্থের স্তর)— যা এই গবেষণার অন্যতম বড় সাফল্য। কারণ পূর্ববর্তী কাজগুলিতে এই অংশটি তুলনামূলক ভাবে দুর্বল ও অনুমান-ভিত্তিক ছিল। গ্রাভাস্টারের খোলসটি ভৌতিক ভাবে অভেদ্য। অর্থাৎ, বাইরে থেকে আসা কোনও পদার্থ এটিকে ভেদ করে ভেতরে যেতে পারে না। পরিবর্তে, পদার্থটি খোলসের বাইরে জমা হয়, সম্ভবত খোলসের পৃষ্ঠেই জুড়ে যায়। কৃষ্ণগহ্বরে কোনও তথ্য সীমানা পেরিয়ে গেলে আর ফিরে আসে না। এ ক্ষেত্রে খোলসটি এতই স্থিতিশীল যে এটি মহাকর্ষীয় পতন ঠেকিয়ে রাখতে পারে এবং তথ্য ধারণ করতে পারে। আর সবশেষে রয়েছে গ্রাভাস্টারের বাইরের অঞ্চল, যা আমাদের চোখে কৃষ্ণগহ্বরের প্রতিচ্ছবি তৈরি করে।
শুধু তত্ত্বগত নির্মাণেই রহমানরা থেমে থাকেননি; তারা এই ‘বুদবুদ’-এর বাস্তবতা যাচাই করতেও অগ্রসর হয়েছেন। তাঁরা বর্তমানে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করে গ্র্যাভাস্টারের অস্তিত্ব খোঁজার চেষ্টা করছেন। তবে বিজ্ঞানের তত্ত্ব এটাই বলছে, মহাবিশ্বের শেষ কথা শুধু কৃষ্ণগহ্বর নয়। বরং তার নীরব বিকল্প হিসেবে কোথাও লুকিয়ে আছে এই শান্ত, স্থির, অথচ গভীর রহস্যময় গ্রাভাস্টার।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)