Advertisement
E-Paper

উত্তপ্ত, কালো বরফে ঢাকা সৌরজগতের দু’টি গ্রহ! খামখেয়ালি চৌম্বকক্ষেত্র চিনিয়ে দিল জলের নতুন রূপ, বিস্মিত বিজ্ঞানীরা

পৃথিবীর পরিচিত বায়ুমণ্ডলে জলের যে রূপ, তা কিন্তু সর্বত্র খাটে না। বাইরে বেরোলেই বদলে যায় পরিস্থিতি। জলও তার রূপ বদলে ফেলে। আমাদের সৌরজগতেরই দু’টি গ্রহ ছেয়ে রয়েছে অন্য ধরনের জলে।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৩
বিশেষ পরিস্থিতিতে জল উত্তপ্ত, কালো হয়ে ওঠে।

বিশেষ পরিস্থিতিতে জল উত্তপ্ত, কালো হয়ে ওঠে। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে নামলে তরল জল জমে কঠিন হয়। জলের কোনও রং নেই। বরফও তাই স্ফটিকস্বচ্ছ, কোথাও আবার দুধের মতো সাদা। কিন্তু পৃথিবীর পরিচিত বায়ুমণ্ডলে জলের এই রূপ কিন্তু সর্বত্র খাটে না। পৃথিবীর বাইরে বেরোলেই বদলে যায় পরিস্থিতি। জলও তার রূপ বদলে ফেলে। সম্প্রতি জলের তেমনই এক রূপের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। আমাদের সৌরজগতেরই দু’টি গ্রহ ছেয়ে রয়েছে উত্তপ্ত কালো বরফে। উত্তপ্ত এবং কালো, চেনা বরফের সঙ্গে দুইয়ের কোনওটিরই যোগ নেই।

সূর্যের সবচেয়ে দূরের গ্রহ ইউরেনাস এবং নেপচুন। উষ্ণতার উৎস থেকে দূরত্বের কারণেই এই দুই গ্রহ বরফাবৃত। বিজ্ঞানীরা দাবি করেন, ইউরেনাস বা নেপচুনের তাপমাত্রা, পরিবেশগত পরিস্থিতি আদৌ প্রাণের উপযোগী নয়। কিন্তু সাধারণ বরফ সেখানে নেই। প্রথম বার তার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল ১৯৮৯ সালে। আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ভয়েজার-২ মহাকাশযান নেপচুনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সেখানকার চৌম্বকক্ষেত্রের পরিচয় পেয়েছিল। তার মাধ্যমে ওই গ্রহে অস্বাভাবিক বরফের উপস্থিতির ইঙ্গিত পেয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধারণা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

১৯৭৭ সালে ভয়েজার-২ মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করেছিল নাসা। এটি একটি আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশযান, যা বর্তমানে সৌরজগতের বাইরে রয়েছে এবং ২১০০ কোটি কিলোমিটার দূর থেকে পৃথিবীতে তথ্য সরবরাহ করছে। এটি এখনও পর্যন্ত পৃথিবীর একমাত্র মহাকাশযান, যা সৌরজগতের দূরের চারটি গ্রহকেই কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছে। ইউরেনাস এবং নেপচুনকে অতিক্রম করার সময় যে তথ্য ভয়েজার-২ পাঠিয়েছিল, এখনও তা নিয়ে গবেষণা চলছে। নাসার এই মহাকাশযানটি ইউরেনাসকে অতিক্রম করে ১৯৮৬ সালের জানুয়ারি মাসে, নেপচুনকে অতিক্রম করে ১৯৮৯ সালের অগস্টে। এই সময়ে এই দুই গ্রহের খামখেয়ালি চৌম্বকক্ষেত্রের পরিচয় পেয়েছিল ভয়েজার-২। বিজ্ঞানীরা ওই চৌম্বকক্ষেত্রকে ব্যাখ্যা করেছেন ‘বন্য, অসংলগ্ন’ বলে। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, এই চৌম্বকক্ষেত্রের জন্য দায়ী নেপচুন এবং ইউরেনাসের কালো রঙের উষ্ণ বরফ।

বিশেষ পরিস্থিতিতে জল কালো, কঠিন এবং উষ্ণ রূপ ধারণ করে। একে তখন বলে সুপার-আয়োনিক জল। এই ধরনের জল নিয়ে ক্যালিফর্নিয়ার গবেষণাগারে দিনের পর দিন কাজ করেছেন বিজ্ঞানীরা। পূর্বের গবেষণার ফল একত্রিত করে এবং নিজেদের বক্তব্য জানিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন ‘নেচার কমিউনিকেশন্‌স’ পত্রিকায়। কী ভাবে সুপার-আয়োনিক জল থেকে অদ্ভুত চরিত্রের চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হয়, তার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, কঠিন, তরল, গ্যাসীয় এবং প্লাজ়মার বাইরেও জলের একটি রূপ রয়েছে। অস্বাভাবিক উচ্চ তাপ এবং চাপে জল সুপার-আয়োনিক অবস্থায় পৌঁছে যায়। কঠিন বরফের মতো দেখতে হলেও তখন আসলে এটি পরিণত হয় স্ফটিকাকার জালে। মূলত অক্সিজেনের অণু এই জাল তৈরি করে। জলের হাইড্রোজেন অণুগুলি মুক্ত ভাবে জালের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। তাতেই বিদ্যুৎ সঞ্চালিত হয়।

বিষয়টিকে আরও ভাল ভাবে বুঝতে হাতেকলমে পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। ক্যালিফর্নিয়ার গবেষণাগারে নেপচুনের পারিপার্শ্বিকের মতো পরিস্থিতি তৈরি করে তার মধ্যে জল ফেলে দেখেন তাঁরা। কিন্তু পৃথিবীতে বসে নেপচুনের মতো চাপ এবং তাপ আনা সহজ নয়। জলের অণুকে ২৫০০ কেলভিন তাপ দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় উচ্চ চাপ তৈরি করা গিয়েছিল বটে, তবে কাঙ্ক্ষিত ফল মেলেনি। দীর্ঘ ক্ষণ নেপচুনের মতো পরিবেশ পৃথিবীতে বজায় রাখা সম্ভব নয়। সুপার-আয়োনিক জল তৈরি হয়েছিল ক্যালিফর্নিয়ার গবেষণাগারে। কিন্তু তা মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয়। সেকেন্ডের অতি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশের মধ্যে জলের নমুনাটিকে এক্স রশ্মির সাহায্যে ভেদ করা হয়। অস্থির চৌম্বকক্ষেত্রের সামান্য ইঙ্গিতও তাতে মেলেনি। তবে বিজ্ঞানীদের দাবি, এখান থেকে কোনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসা উচিত হবে না। চৌম্বকক্ষেত্রের খামখেয়ালিপনার জন্য সুপার-আয়োনিক জল দায়ী নয়— এমন কোনও নিশ্চয়তা এখনও মেলেনি।

পৃথিবীতে এই ধরনের সুপার-আয়োনিক জল কখনও দেখা যাবে না। তবে সৌরজগতেরই দু’টি গ্রহে এমন জল রয়েছে দেখে বিজ্ঞানীরা একটি অনুমান করতে পেরেছেন— ব্রহ্মাণ্ডের অধিকাংশ গ্রহ, উপগ্রহই এই ধরনের জলে পরিপূর্ণ। কারণ নেপচুন এবং ইউরেনাসের পরিস্থিতির সঙ্গে সৌরজগতের বাইরের অনেক গ্রহের পারিপার্শ্বিকের মিল রয়েছে। এমনকি, বিজ্ঞানীদের একাংশের দাবি, মহাকাশে জলের বেশিরভাগ অংশ এই রূপেই পাওয়া যাবে।

Earth Neptune Uranus Scientific Research Space Science
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy