আমাদের পৃথিবী যে ছায়াপথের মধ্যে রয়েছে, সেই আকাশগঙ্গার (মিল্কিওয়ে) একেবারে কেন্দ্র বরাবর বিশাল কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্ব আগেই জেনেছিলেন বিজ্ঞানীরা। এ বার সেই অন্ধকারের রহস্য আরও ঘনীভূত হল। কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশের অঞ্চল থেকে বেরিয়ে আসা কণাপ্রবাহের হদিস পেলেন বিজ্ঞানীরা। দেখা গেল, সেই ‘রহস্যময়’ কণাপ্রবাহ বিরাট এক গহ্বরও তৈরি করে ফেলেছে মহাকাশে!
যে কোনও সক্রিয় কৃষ্ণগহ্বর থেকে নির্দিষ্ট গ্যাস এবং অন্যান্য পদার্থ নির্গত হওয়া স্বাভাবিক। কয়েক দশক আগেই বিজ্ঞানীরা সে কথা আন্দাজ করেছিলেন। কৃষ্ণগহ্বরের নিজস্ব পদার্থবিদ্যার নিয়মেই বেরিয়ে আসে সেই কণাপ্রবাহ। ইতিমধ্যে অন্য বেশ কিছু ছায়াপথের অতিবৃহৎ কৃষ্ণগহ্বরগুলিতে বায়ু নিঃসরণের আচরণ শনাক্তও করা গিয়েছে। বাকি ছিল আমাদের আকাশগঙ্গা। এই ছায়াপথের কৃষ্ণগহ্বরটি সক্রিয় হলেও কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশের অঞ্চল থেকে বেরিয়ে আসা কণাপ্রবাহ নিঃসরণের প্রমাণ এত দিন বিজ্ঞানীরা পাননি। অন্তত পাঁচ দশক ধরে সেই চেষ্টা চলছিল। এত দিনে মিলেছে সাফল্য।
আরও পড়ুন:
চিলির গবেষণাকেন্দ্রে রাখা আলমা টেলিস্কোপ এবং মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার চন্দ্রা এক্স-রে পর্যবেক্ষণাগার থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে সম্প্রতি গবেষকেরা আকাশগঙ্গার কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। ওই মহাজাগতিক অঞ্চলের নাম ‘স্যাজিটারিয়াস এ স্টার’। সেখানেই মিলেছে রহস্যময় কণাপ্রবাহের উপস্থিতির ইঙ্গিত। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ‘স্যাজিটারিয়াস এ স্টার’ অঞ্চলে একটি বিশাল শঙ্কু আকৃতির গহ্বর তৈরি হয়েছে। সেটি উত্তপ্ত এবং বৈদ্যুতিক ভাবে সক্রিয় গ্যাসে পরিপূর্ণ। কৃষ্ণগহ্বর থেকে বায়ুপ্রবাহের কারণেই এই গহ্বর তৈরি হয়েছে বলে অনুমান বিজ্ঞানীদের।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশের অঞ্চল থেকে বেরিয়ে আসা কণাপ্রবাহ এই অঞ্চলে থাকা শীতল গ্যাসকে সরিয়ে দিয়েছে। তার ফলে তৈরি হয়েছে বিশাল গহ্বর। মহাকাশে এই ধরনের গহ্বর তৈরির জন্য যে পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন হয়, তা সক্রিয়, বৃহৎ কোনও কৃষ্ণগহ্বরের উপস্থিতি ছাড়া সম্ভব নয়, মত বিজ্ঞানীদের। আসলে কৃষ্ণগহ্বরের ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি। তার মহাকর্ষ বল এতটাই শক্তিশালী যে, আলোও সেই নিকষ আঁধার ভেদ করতে পারে না। আশপাশের গ্যাস এবং অন্যান্য পদার্থকে নিজের দিকে টেনে নেয় কৃষ্ণগহ্বর।
আমেরিকার নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিদ্যার অধ্যাপক লেনা মুর্চিকোভা কৃষ্ণগহ্বর সংক্রান্ত এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁদের গবেষণার ফল সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে অ্যাস্ট্রোফিজ়িক্যাল জার্নাল লেটার্সে। লেনা বলেছেন, ‘‘অর্ধশতাব্দী পুরনো একটা রহস্যের সমাধান করল আমাদের এই আবিষ্কার।’’ কৃষ্ণগহ্বরের কাছাকাছি ‘স্যাজিটারিয়াস এ স্টার’ অঞ্চলটি পৃথিবী থেকে ২৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত (এক আলোকবর্ষ সাড়ে ৯ লক্ষ কোটি কিলোমিটারের সমান)। এখানে তৈরি হওয়া গহ্বরটি নিয়ে কৌতূহল রয়েছে। এই গহ্বরের ব্যাপ্তি সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নন। পৃথিবী থেকে যতটা অংশ পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে, গহ্বরের ব্যাপ্তি তারও বেশি। লেনার মতে, গহ্বরটি দৈর্ঘ্যে সাড়ে ছয় আলোকবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
আরও পড়ুন:
এর আগে যত কৃষ্ণগহ্বরের সামনে বায়ুপ্রবাহ টের পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, তার চেয়ে আকাশগঙ্গার কৃষ্ণগহ্বর কিছুটা ভিন্ন। কারণ, সাধারণ ভাবে কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশের অঞ্চল থেকে বেরিয়ে আসা কণাপ্রবাহের বেগ হয় প্রবল। ঝড়ের বেগে সেখানে বায়ু বইতে থাকে। এ ক্ষেত্রে কোনও ঝড়ের ইঙ্গিত মেলেনি। এখানে বায়ু প্রবাহিত হচ্ছে মৃদুমন্দ চালে। বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা, ‘স্যাজিটারিয়াস এ স্টার’ শান্ত অবস্থায় রয়েছে। তাই সেখানে প্রবাহিত কণাপ্রবাহও শান্ত। নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার অন্যতম কাণ্ডারি মার্ক গোরস্কি এই বায়ুকে পৃথিবীর আবহাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘এটা আমাদের কৃষ্ণগহ্বর থেকে আসা মৃদু কণাপ্রবাহ। তা ছায়াপথের কেন্দ্রস্থলকে পুনর্গঠন করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী বলে মনে হচ্ছে না।’’
বিজ্ঞানীদের মতে, অতিবৃহৎ কৃষ্ণগহ্বরগুলি বেশিরভাগ সময় এমন শান্ত অবস্থায় কাটায়। তবে কখনও কখনও সেখানকার পরিস্থিতি হয়ে ওঠে উত্তাল। তখন প্রবল ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয় কৃষ্ণগহ্বরকে কেন্দ্র করে। এই সমস্ত ক্ষেত্রে শক্তিশালী কণাপ্রবাহের তাণ্ডব সম্পূর্ণ ছায়াপথ, এমনকি, তার বাইরের অংশকেও তছনছ করে দিতে পারে। লেনা বলেন, ‘‘কৃষ্ণগহ্বরে যা প্রবেশ করে, তার চেয়ে বেশি গ্যাস বাইরে বেরিয়ে আসে। সেই বেরিয়ে আসা গ্যাস এবং অন্যান্য পদার্থের মিশ্র স্রোতই বায়ুপ্রবাহ তৈরি করেছে। যখন আমরা দূরের ছায়াপথের দিকে তাকাই, ভয়ঙ্কর ঘটনাগুলিকে দেখা সহজ হয়ে যায়। আমরা দেখতে পাই শক্তিশালী প্রবাহ সব ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। আমাদের ছায়াপথে এত দিনে মৃদু প্রবাহ দেখা গেল।’’
গবেষণাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। এর মাধ্যমে আকাশগঙ্গার কৃষ্ণগহ্বর সংক্রান্ত বড় রহস্যের সমাধান ঘটল। তবে একইসঙ্গে অন্য রহস্য জন্মও নিল। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও অনুসন্ধান, আরও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। তবেই কৃষ্ণগহ্বরের প্রকৃতি সম্বন্ধে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে।