Advertisement
E-Paper

সোনালি এখন এই পাড়ার রিকশা দিদিমণি...

সূর্য ডুবলে অদ্ভুত আঁধার নামে সোনালির ঘরে। সোনালি জেগে ওঠেন নাগরিক সড়কে।সূর্য ডুবলে অদ্ভুত আঁধার নামে সোনালির ঘরে। সোনালি জেগে ওঠেন নাগরিক সড়কে।

স্রবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৭ মার্চ ২০১৯ ১১:৫৮
 রিকশাদিদি সোনালি।

রিকশাদিদি সোনালি।

বেশ কিছু দিন হল, তাঁর ঘরে আলো নেই।

গত সাত দিন গায়ে জ্বর। কাজে বেরননি সোনালি। তাঁর কাজ রিকশা চালানো।

‘‘বাবা বেশি পড়াতে পারেনি আমায়। হঠাৎ করে বাবা চলে গেল। আমি, মা আর বোন। দেখলাম খেতে পাচ্ছি না। তাই বাবার রিকশাটা চালাতে আরম্ভ করলাম।’’

জিনস্-এর কেপ্রি আর গেঞ্জি পড়া সোনালি কসবা থানা পেরিয়ে অলিগলির পথ ধরে নিজের বাড়িতে হাজির করল আনন্দবাজার ডিজিটাল টিমকে।

এই রিকশা চালানোর জন্য অনেক বন্ধু ছেড়ে চলে গেছেন তাঁকে। ‘‘বাবাও চাইতো না আমি রিকশা চালাই। প্রথমে তো সবাই বলতো মেয়ে হয়ে রিকশা চালাচ্ছিস? কেউ ঠাট্টা করত। টিটকিরি দিতো! আমি কানে তুলতাম না। ছোটবেলা থেকেই আমি যেটা ভেবেছি করব সেটাই করেছি।’’ সোনালির অন্তরের শক্তি বলে উঠলো! চলাই তাঁর আসল লড়াই।

ঘর অন্ধকার। ঘরে হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত রুগ্ণ মা। চোখেমুখে অপুষ্টির ছায়া। অনেক মানুষ এসেছেন সোনালির এই একচিলতে ঘরে। ‘‘এনজিও-র দিদি। বড় কেউ। কাগজের লোক। সব্বাই বলেছে আমি নাকি হিরোইন, রিকশাদিদি। অথচ, সেই হিরোইনের যে দিনের পর দিন পেটে ভাত অবধি জোটেনি! কেউ দেখেনি। জানতে চায়নি।’’ ব্যাঙ্গের হাসি সোনালির কঠিন মুখে! ভনিতা নেই কোনও। নেই কোনও চাওয়া পাওয়ার হিসেব। তাই আঙুল তুলতে পারে সোনালি যে কারও দিকে।

আরও পড়ুন: আমি কে? চেনো কি আমায়?

বোনের বিয়ে দিয়েছেন সোনালি। এক গাল হাসি নিয়ে সেই বিয়ের অ্যালবামের পাতা ওল্টাতে লাগলেন, ‘‘বাবা তো দেখে যেতে পারল না। মা থাকতে থাকতে অন্তত ছোট বোনের বিয়েটা দেখে গেল। আমার শান্তি,’’ হাসেন সোনালি। পরক্ষণেই বলেন, অত যে গয়না দেখছ সব কিন্তু সিটি গোল্ড।’’ যাঁর মধ্যে সোনার আলো তাঁকে বোধহয় সোনার জৌলুস গায়ে মেখে লোক জানানোর দায় থাকে না!
এত যাঁর বোনের বিয়ে নিয়ে ভাললাগা তিনি নিজে বিয়ে করতে চান না?

আরও পড়ুন: নারীবাদের বিবর্তন, চতুর্থ তরঙ্গ আসছে কি?

‘‘বিয়ে? এখন? আমি বিয়ে করতে চাইলে তো সেই হয়তো রিকশাওয়ালাই জুটবে। রাতে মদ খেয়ে বউ পেটাবে। বাচ্চা হবে। সেটাও আমাকেই টানতে হবে। রোজের অশান্তি। ঝামেলা। কে এ সব ঘাড়ে নেবে।’’ বাস্তবের ছবি নিয়ে মা আঁকড়ে, ভিটে আঁকড়ে জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন সোনালি। তাঁর চাকা ঘুরছেই।

এখন তিনি পাড়ার রিকশাদিদি। পাশের বৌদি গম ভাঙাতে যাবে, অতটা হাঁটবে, নাহ্, তার জন্য রিকশা নিয়ে সোনালি হাজির। পাড়ার কারওর কষ্ট হাঁটতে, সোনালি চলে আসেন রিকশা নিয়ে। সে দিন হয়তো আলুসেদ্ধ ভাত (সোনালির রোজের খাবার) জোটেনি। তবু সোনালি অন্যের সাহায্যে নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন বরাবর। সোনালির এলাকায় গিয়ে শোনা গেল, শুধু রিকশা নয়, ‘সোনালি দারুণ মারপিট করতে পারে। লোকজনের আপদে বিপদে ও ছুটে যায়।’

এমন ইমেজে পাড়ার এক জন মানুষ হয়ে থেকে গেছেন সোনালি। ‘‘ধুর, মেয়েদের জামাকাপড় আর পরি না। রিকশা চালাতে গেলে ও সব চলে না। এই ভাল!’’ সোনালির ‘মস্তানি’ স্বর বলে ওঠে। সোনালির ঘরে অনেক ঈশ্বরের ছবি।

আরও পড়ুন: নারীপ্রগতি নিয়ে কবেই ভেবেছিলেন রবীন্দ্রনাথ

সোনালি, আপনি কি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন? ‘‘আগে করতাম। এখন করি না। বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে আর নয়। এটা বললে লোকে কি খারাপ বলবে আমায়?’’ পাল্টা প্রশ্ন করেন তিনি। যে মেয়ের ভাল ভাবার দায়দায়িত্ব সমাজ নেয়নি সে মেয়ে অন্যের ভাবনার মর্যাদা আজও দেন?

ঠিকমতো খাবার জোটে না সোনালির। মায়ের ওষুধে সব টাকা শেষ। তবুও বোনের বাড়ি গিয়ে থাকতে চান না তিনি। ‘‘কারও বোঝা হব, ঋণ করে বাঁচব। না, সে হবে না। তার চেয়ে এই কষ্ট ভাল,’’ সাফ জবাব সোনালির।

কষ্টটা যেন সোনালির বাইরের। রিকশা ইউনিয়নে চার হাজার টাকা দিয়ে নাম লেখালে তবে স্ট্যান্ডে রিকশা নিয়ে যাত্রীর অপেক্ষা করা যায়। আমি চার হাজার টাকা কোথায় পাব? আমি এ দিক সে দিক থেকেই যাত্রী তুলি। জানি, তাতে রোজগার কম হয়, কী করব?’’
এ শহর কি এতটাই নির্মম? স্ট্যান্ডে দাঁড়ানোর হাজার চারেক টাকা কেউ সোনালির জন্য মকুব করতে পারে না!

সকাল ৮টায় বেরিয়ে পড়েন পথে। যাত্রীর খোঁজে। দুপুরে বাড়ি। ‘‘অত ভারী রিকশা টানতে পারি না একটানা। রাতে তো পায়ের যন্ত্রণায় ঘুম আসে না।’’

তাই বিকেলে কসবার রাস্তায় সকলের প্রিয় ‘রিকশাদিদি’ ভুট্টা নিয়ে বসেন। ‘‘আগে তো লোকের বাড়িও কাজ করতাম। কয়েক জন দিদি বলল, নিউটাউনে কাজ কর। আরে, নিউটাউনে যাতায়াতেই সব টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছিল। ওদের কথা শুনে কাজের বাড়ির কাজও চলে গেল। এখন খুব সমস্যায় পড়েছি।’’ চোখ যেন মেঘে ঢাকল সোনালির।

অজস্র মানুষকে তিনি গন্তব্যে পৌঁছে দেন, তিনি আজ যেন গন্তব্যহীন! সোনালি বলে যান তাঁর অবিরাম রাত জাগা গাঢ় বেদনার কথা। ‘‘কেউ নেই। আসে না। আমরা মা-মেয়ে একলা পড়ে থাকি। ভগবান আমার একটা চাওয়াও শুনলো না...একটাও না!’’

সূর্য ডুবতে থাকে। সূর্য ডুবলে অদ্ভুত আঁধার নামে সোনালির ঘরে। সোনালি জেগে ওঠেন এই শহরের পথে। রক্ত-ঘাম-শরীর-শ্রম-হাড়হাভাতের গ্লানি মুছে নিরুদ্দেশের মোড়ের অপেক্ষায় সোনালি...ঠিক ওঁর মোবাইলের রিংটোনের মতো, ‘‘ম্যায় নিকলা গাড্ডি লেকে রাস্তে পে, সড়ক পে, এক মোড় আয়া...।’

International Women's Day rickshwa Kasba
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy