Advertisement
E-Paper

প্রতিষ্ঠিত হব, প্রত্যয়ী সেই নির্যাতিতা

পরিবারের অভিযোগ,  গরু চড়াতে এসেছিল পাশের গ্রামের এক যুবকও। জঙ্গলের মধ্যে একা ওই তরুণীকে পেয়ে তাঁকে ওই যুবক ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ।

দয়াল সেনগুপ্ত

শেষ আপডেট: ০৮ মার্চ ২০১৯ ০৫:৫৭

অভিযুক্তের চরম শাস্তির দাবিতে এখনও তিনি অনড়। কিন্তু অতীত আঁকড়ে পড়ে থাকলে চলবে কী করে! তাই জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লক্ষ্যে নিজের মতো করে এগোচ্ছেন সিউড়ি ১ ব্লকের নির্যাতিতা আদিবাসী তরুণী।

মাস পাঁচেক আগের এক বিকেলে তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ। ওই ঘটনার পরে এক লহমায় ভেঙে গিয়েছিল তাঁর সব স্বপ্ন। পড়াশোনা বন্ধ করে স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু বেশ কিছুদিন এ ভাবে থাকার পর নিজেকে বুঝিয়েছেন, দোষ তো তাঁর নয়। তাহলে কিসের সঙ্কোচ? ঘুরে দাঁড়াতে হলে পড়াশোনো করে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে তাঁকে। তাই সম্প্রতি আবার কলেজ যাওয়া শুরু করেছেন। শান্ত কিন্তু দৃঢ় ভাবে বলছেন, ‘‘অভিযুক্তের কঠোরতম সাজা চাই। কিন্তু ওর পাপে কেন আমার জীবন নষ্ট হতে দেব? প্রতিষ্ঠিত আমাকে হতেই হবে।’’ মেয়ের জেদ দেখে ভরসা পাচ্ছে প্রান্তিক আদিবাসী পরিবারটি।

গত বছর সেপ্টেম্বরের এক বিকেল। নির্যাতিতা তরুণীর গ্রামে সেদিন ফুটবল ম্যাচ ছিল। ওই কলেজ ছাত্রীর বাবা, দাদা সকলেই মাঠে গিয়েছিলেন খেলা দেখতে। কলেজে না গিয়ে সে দিন বাড়িতেই ছিলেন ওই ছাত্রী। তাঁর মা বলেছিলেন, ঘাস কাটতে না পারলেও গরুগুলো চরিয়ে আনতে। পিসির সঙ্গেই গ্রামের অদূরে জঙ্গলের ধারে গিয়েছিলেন ওই ছাত্রী। বিপদ অপেক্ষা করছিল সেখানেই। নির্যাতিতা ওই ছাত্রীর মায়ের এখনও স্পষ্ট মনে আছে সেই বিকেলের কথা। বলছিলেন, ‘‘গরু চরানোর সঙ্গে আমার মেয়ে কিছু জ্বালানি সংগ্রহ করেছিল। হঠাৎ আকাশ কালো করে এল। তাড়াতাড়ি জ্বালানি নিতে জঙ্গলে ঢুকতেই বৃষ্টি নামে। ওর পিসি তখন অনেক দূরে ছিল।’’ পরিবারের অভিযোগ, গরু চড়াতে এসেছিল পাশের গ্রামের এক যুবকও। জঙ্গলের মধ্যে একা ওই তরুণীকে পেয়ে তাঁকে ওই যুবক ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ। ছাত্রীর মায়ের কথায়, ‘‘বৃষ্টির মধ্যে মেয়ের চিৎকার কেউ শুনতে পায়নি। পরে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে সব জানায়।’’ তার পর থেকেই লজ্জা, ঘৃণা ও ক্ষোভে একেবারে কুঁকড়ে গিয়েছিলেন ওই তরুণী।

অথচ ওই ঘটনার আগে আদিবাসী পরিবারটি স্বপ্ন দেখেছিল প্রাণোচ্ছ্বল ওই মেয়েকে ঘিরেই। তাই বড় মেয়ে এবং বাকি দুই যমজ মেয়ের এক জনের বিয়ে দিলেও অন্য জনের (নির্যাতিতা) বিয়ে দেননি। বাবা-মা জানতেন, সেই মেয়ের পড়াশোনার প্রতি কতটা আগ্রহ। তাই তাঁরাও চেয়েছিলেন, পড়াশোনা শিখে প্রতিষ্ঠিত হোক সে। দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করেও মা-বাবার ইচ্ছে পূরণ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন সিউড়ির একটি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের পড়ুয়া ওই তরুণী।

কিন্তু শনিবারের সেই বিকেলে তাঁর জীবনেও আঁধার নেমেছিল।

গ্রামের মেয়ের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটায় খেপে গিয়েছিলেন প্রতিবেশীরাও। পুলিশ আভিযোগ দায়ের হওয়ার পরেই অভিযুক্ত যুবককে গ্রেফতার করে পুলিশ। কিন্তু মামলা তোলার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। শেষে নির্যাতিতা জেলাশাসক মৌমিতা গোদারা বসুকে সব জানান। হস্তক্ষেপ করেন জেলাশাসক। মামলাও ওঠেনি। অভিযুক্ত জেলে থাকতে থাকতেই মামলার চার্জশিট জমা দেয় পুলিশ। মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই রায় হবে বলে পুলিশ সূত্রের খবর। এরই মধ্যে সরকারের সমাজ কল্যাণ দফতর থেকে অর্থ সাহায্য পেয়েছেন নির্যাতিতা। আরও নানা দিক থেকে সাহায্যের হাত এগিয়ে আসায় দমবন্ধ ব্যাপারটা কিছুটা কেটেছে। নিজেকে ক্রমশ সাহস জুগিয়েছেন ওই ছাত্রী। কিছু দিন আগে থেকে কলেজ যাওয়াও শুরু করেছেন।

মেয়ের এই সিদ্ধান্তে স্বস্তি পরিবারেও। তরুণীর মা বলছেন, ‘‘আমার মেয়ের তো কোনও দোষ ছিল না। কিন্তু ওই ঘটনার পর থেকে খুব কষ্টে ছিল ও। সেই কষ্ট ভুলে ও যে আবার লেখাপড়া শুরু করেছে, এটা ভেবেই আমাদের ভাল লাগছে।’’ কলেজের অধ্যক্ষ তাঁর ছাত্রীর মনের জোরকে কুর্ণিশ করে বলছেন, ‘‘ওর যে কোনও সমস্যায় আমরা পাশে আছি।’’

Rape International Women's Day Rape victim
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy