Advertisement
E-Paper

আইনে আছে অধিকার, বাস্তব ভরা বৈষম্যেই

রাস্তায় ফেলে যে দিন চলে গিয়েছিলেন স্বামী, লক্ষ্মীদি তখন বছর বাইশ। কোলে আড়াই বছরের সন্তান। ঘর-বাড়ি নেই, রোজনামচার সব জিনিসও চলে গিয়েছে স্বামীর দ্বিতীয় সংসার সাজাতে।

সুচন্দ্রা ঘটক

শেষ আপডেট: ০৮ মার্চ ২০১৯ ০১:৩০

রাস্তায় ফেলে যে দিন চলে গিয়েছিলেন স্বামী, লক্ষ্মীদি তখন বছর বাইশ। কোলে আড়াই বছরের সন্তান। ঘর-বাড়ি নেই, রোজনামচার সব জিনিসও চলে গিয়েছে স্বামীর দ্বিতীয় সংসার সাজাতে। বর্ডার পেরিয়ে বারাসতের ঠিকাদারের কাছে প্রথম কাজ নেওয়া। কুড়ি টাকা ঘর ভাড়া মাসে। সঙ্গে মা-ছেলের খাওয়া। নির্মাণস্থলে রঙের মিস্ত্রিদের জোগাড়ের কাজে মাস চলাই ছিল ভার।

শুধু জোগাড়ের মাইনে বললে হবে না, মনে করান লক্ষ্মী দাস। মেয়ে জোগাড়ের বেতন কিন্তু আলাদা। এখনও কম, তখন আরও কম ছিল। তা ছাড়া, মেয়েদের কাজও বেশি। এমনকি ছেলেদের মতো বিড়ি-সিগারেটের বিরতি নেওয়ার সুযোগও থাকে না বেশির ভাগ কাজের জায়গায়।

লক্ষ্মীদির সঙ্গে মিলে যায় সলোনি সাহার অভিজ্ঞতা। কিছু দিন আগেই রাগ করে ছেড়েছেন বেকবাগানের একটি বেসরকারি সংস্থার চাকরি। অভিযোগ, তাঁর থেকে পুরুষ সহকর্মীদের মাইনে বেড়েছিল অনেক বেশি। কারণ হিসেবে জানানো হয়েছিল, ছেলেদের সংসার চালাতে হয়। তাই একই কাজ করে তাঁরা পাবেন বেশি বেতন। নাগেরবাজার এলাকার একটি স্কুলেও এমনই অভিযোগ শিক্ষিকাদের। কর্তৃপক্ষ মাইনে বাড়ানোর দাবি শুনতে চান না মেয়েদের কাছে। কারণ তাঁরা তো চাকরি করেন, ‘শাড়ি আর টিপ কেনার জন্য।’ যদিও সন্তানের পরীক্ষার জন্য ছুটি নিতে হলে মিথ্যা বলে মেডিক্যাল লিভই দস্তুর সেখানে। কারণ, পুরুষ সহকর্মীরা এমন ছুটি বেশি নেন না যে। তবে এ শহরেরই বেশ কিছু স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির কর্মীরা জানান, স্বামীদের রোজগারে সংসার চললেও তাঁরা কাজ করেন সন্তানদের পড়ার খরচ জোগাতে। অফিসেরই শৌচাগারে দেখা হয়ে যাওয়া সাফাইকর্মী জানান, মাইনে পেলেই ছোট্ট ছেলের জন্য গল্পের বই কেনেন। কাজ না করলে দমদম ক্যান্টনমেন্টের এক কামরার টানাটানির সংসারে তা সম্ভব হত না।

লক্ষ্মীদির ছেলেকে স্কুলে পাঠানো সম্ভব হয়নি। বাড়িতে দেখার কেউ ছিল না। তাই সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন নির্মাণস্থলে। সেখানেই বসিয়ে রাখতে হত ছেলেকে। পরে দফায় দফায় ফিরে এসেছেন স্বামী। তাঁর দেখাশোনাও করেছেন লক্ষ্মীদিই। বলছিলেন, ‘‘যে ঠিকাদারের কাছে কাজ করতাম, তিনি ভাল ছিলেন। ওই দাদা জানতেন, কাজটা আমার দরকার। জানতেন বলে অন্যদের থেকে আমার কাজের চাপও বেশি থাকত। টাকা একই।’’ ধুলো-বালির মধ্যে কখনও বিরাটি, কখনও মধ্যমগ্রাম বা দমদমের নির্মাণস্থলে লক্ষ্মীদির ছেলেও বসে থাকত মায়ের কাজ শেষ হওয়ার অপেক্ষায়। সন্ধ্যার স্বামীও মিস্ত্রির কাজ করেন নির্মাণস্থলে। তাই সন্ধ্যা বাড়ি বাড়ি কাজে যান বছর তিনেকের কন্যা রিয়াঙ্কাকে সঙ্গে নিয়ে। রোজ। রিয়াঙ্কার বাবার কাজ ভারী মুশকিলের, মেয়েকে দেখাশোনা করা সম্ভব নয়। কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের কাছে এমন সব দাবি করা হয় যেন তাঁদের পরিবারের দায়িত্ব নেই। আর পরিবার থেকে এমন দাবি আসে যেন এর বাইরে তাঁদের আর কোনও কাজের দায়িত্ব। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে ঠিকই, তবে সেটুকুই সার!

মেয়েদের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলা নতুন নয়। হয়তো কখনও কখনও বেশিই বলা হয়। তবে যাঁরা বরাবার বলেন, তাঁদের ‘নারীবাদী’ বলে নিন্দাও করা হয়। এখন দেশের বহু আইন মেয়েদের পক্ষে। বেতনের ক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্য এ দেশে অপরাধ। যে কোনও সংস্থায় জিজ্ঞেস করলে শোনা যায় একই উত্তর, ভেদাভেদে বিশ্বাস করেন না কর্তৃপক্ষ। তবে একটি বেসরকারি সংস্থার সমীক্ষা বলে, ২০১৫-১৬ সালেও পুরুষ এবং মহিলা কর্মীদের বিভিন্ন ধর‌নের কাজে বেতনের ব্যবধান ছিল গড়ে ২০ শতাংশের কাছাকাছি। ছোট সংস্থা বা অসংগঠিত পরিসরে তা আরও বেশি। এমনকি, বেশ কিছু কাজের ক্ষেত্রে এখনও বিশেষ জায়গা পান না মহিলারা। আবার কিছু ক্ষেত্রে শুধু মহিলাদেরই চাওয়া হয় কম বেতন দিতে হবে ভেবে। আইন যা-ই থাক না কেন, এ শহরে বহু মহিলা কর্মী আছেন যাঁরা সন্তানের জন্মের সময়ে চাকরি ছেড়েছেন। শুধু পরিবারের চাপে নয়, কর্মক্ষেত্রে তাঁকে ছুটি দেওয়া হয়নি বলেও। কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ম করেছে, মাস ছয়েকের ছুটি সদ্য মায়েদের প্রাপ্য। সে তো সমান বেতন ও সমান সম্মানও পাওয়ার কথা। তবে তা শুধুই খাতায়-কলমে। সেই কবে বম্বে হাইকোর্টে কথা উঠেছিল, ছেলেদের মতো মেয়েদেরও সমান অধিকার আছে বিয়ের পরেও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখভাল করার। আইনে বাধা না থাকলেই কি বাধা আসে না? ক’জন বিবাহিতা মহিলা জোর গলায় বলতে পারেন তাঁর আয়ের একটি বড় অংশ ধরা থাকবে বাবা-মায়ের জন্য?

তবে পারতে হবে নিজেদেরই। সে কথা মনে করিয়ে দেন লক্ষ্মীদি। আন্তর্জাতিক নারী দিবস সম্পর্কে বিশেষ জানা নেই ওঁর। সুযোগ হয়নি জেনে নেওয়ার। কিন্তু ভেদবিচারের কাজ ছেড়ে বহু আগেই বেরিয়ে এসেছেন। কয়েক জন মহিলার সঙ্গে গড়েছেন দল। বিভিন্ন বাড়ি, অফিসে গিয়ে কাজ করেন। শুধু জোগাড়ে নন, ঘর-বাড়ি রং করেন মহিলারাই। কোনও পুরুষ রং-মিস্ত্রি নেই দলে। দিন পিছু সমান রোজগার ওঁদের। তা দিয়ে রাজারহাটের কাছে গড়েছেন বাড়ি। ছেড়ে যাওয়া স্বামী অসুস্থ অবস্থায় ফিরে এলে সব দায়িত্ব নিয়েছেন। নাতনিকে স্কুলে ভর্তি করেছেন। বয়স পেরিয়েছে পঞ্চাশ। শরীর ভেঙেছে। তবে এখনও কাজ করেন। কারণ, স্বামীর দেখভাল তিনিই করবেন। ছেলে-বৌমার উপরে চাপ বাড়ানো ঠিক নয় বলেই মন্তব্য তাঁর। এ দিকে বছর দুই আগে হওয়া সমীক্ষা বলে, দিন দিন শিক্ষিত মহিলাদের মধ্যে রোজগেরের সংখ্যা কমছে। শিক্ষার সঙ্গে মানানসই কাজ হয় তাঁদের দেওয়া হচ্ছে না, নয় তো বাড়িতে যথেষ্ট সহযোগিতা পাচ্ছেন না কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য। তবু যেন আশা জোগান স্বনির্ভর হয়ে ওঠা লক্ষ্মী দাসেরা। ইচ্ছে থাকলে উপায় হবেই, অভিজ্ঞতা বোঝায় ওঁদের!

International Women's Day Women's Right
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy