আত্মবিশ্বাসটাই তাঁর মূল অস্ত্র। কিন্তু, কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জিতবেন, আশা করলেও বিশ্বাসটা তেমন গভীর ছিল না। কারণ, উল্টোদিকে যে সিঙ্গাপুরের মেয়েরা। যাঁরা এর আগে কখনও টেবল টেনিসে ফাইনাল হারেনি। তাই সোনা জিতে আবেগ চেপে রাখতে পারেননি বছর তেইশের মেয়েটি।

তিনি সুতীর্থা মুখোপাধ্যায়। কাঁকিনাড়ার মাদ্রালের বাসিন্দা। টেবল টেনিসে এই মুহূর্তে মেয়েদের জাতীয় চ্যাম্পিয়ন। কমনওয়েলথ গেমসে টেবল টেনিসে সোনা জয়ী জাতীয় দলের সদস্য।

 মা নীতা মুখোপাধ্যায়কে ফোন করে একটা কথাই বারবার বলছিলেন তিনি, ‘‘আমরা পেরেছি মা। ওদের হারাতে পেরেছি।’’ সোনা জয়ী দলে রয়েছেন বাংলার আর এক খেলোয়াড় মৌমা দাস। মৌমা এর আগেও কমনওয়েলথ গেমসে অংশ নিয়েছেন। একবার ফাইনালও খেলেছেন। সুতীর্থার এটাই প্রথম কমনওয়েলথ গেমস। আর শুরুতেই সোনা পাওয়ার আনন্দে আত্মহারা মাদ্রালের মুখোপাধ্যায় পরিবার। সুতীর্থার মা নীতা মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘নামী কোনও অ্যাকাডেমি নয়, আমাদের নৈহাটিরই একটি সংস্থা থেকেই উত্থান মেয়ের। তবে এখন প্রাক্তন জাতীয় চ্যাম্পিয়ন সৌম্যজিৎ রায়ের যাদবপুরের অ্যাকাডেমিতে প্র্যাকটিস করে ও।’’ তিনি জানালেন, বাড়িতে থাকলে সকালের নৈহাটি-শিয়ালদহ লোকাল ধরে প্র্যাকটিসে যাওয়াতে কোনও ছেদ পড়ে না তাঁর।

সুতীর্থার বাবা অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় সামরিক বিভাগের কর্মী। মাদ্রালের বাড়িতে একমাত্র মেয়েকে নিয়ে থাকেন নীতা। তিনি জানান, মেয়েকে ইনডোর গেমে যে দেবেন, তা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন তাঁরা। ব্যাডমিন্টনে দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও এলাকায় কোনও অ্যাকাডেমি নেই। নীতা বলেন, ‘‘দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় সুতীর্থাকে নৈহাটির টেবল টেনিস অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করে দিই। দু’বছরের মধ্যে সাবজুনিয়র বিভাগে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয় ও।’’

এর পরে একের পর এক সাফল্য এসেছে। জুনিয়র বিভাগেও জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন তিনি। মাস দুয়েক আগে সিনিয়র বিভাগে মেয়েদের জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হন তিনি। এই মুহূর্তে দেশের এক নম্বর মহিলা টেবল টেনিস খেলোয়াড় তিনিই। কমনওয়েলথ গেমসের জন্য মূলত সৌম্যদীপের অ্যাকাডেমিতেই প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। তবে নৈহাটির পুরনো অ্যাকাডেমি কিন্তু ছাড়েননি তিনি। বাড়িতে থাকলে এখনও নিয়মিত পুরনো অ্যাকাডেমিতেই অনুশীলন করেন  সুতীর্থা।

‘‘বাড়িতে আর থাকা হয় কোথায়? আজ এখানে, তো কাল সেখানে।’’ আফশোষ ঝড়ে প়ড়ে সুতীর্থার মায়ের কথায়। তিনি বলেন, ‘‘এই তো বাড়িতে ফিরে দু’দিন থেকেই চলে যাবে সুইৎজারল্যান্ড।’’ তার জন্য সব দৌড়-ঝাঁপ আমাকেই করতে হচ্ছে।

মেয়ের পরের লক্ষ্য কী? নীতা জানালেন, এশিয়ান গেমসে সোনা পাওয়াই ওর এই মুহূর্তের লক্ষ্য। তবে মেয়ের আসল লক্ষ্য যে ২০২০ সালের অলিম্পিক, তা জানাতে ভুললেন না তিনি।

খেলার জন্য প্রচুর ঘোরাঘুরি করতে হয়। ফলে লেখাপড়ার প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। নীতা জানালেন, তবে খেলার ফাঁকে সময় পেলেই মেয়ে পড়াশোনা করতে বসে যান। বর্তমানে সুতীর্থা মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকের প্রথম বর্ষের পড়ুয়া। মেয়ে যে আরও সাফল্য পাবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত নীতা। তিনি বলেন, ‘‘সাফল্যটাকে ও স্বাভাবিক একটা ঘটনা হিসেবেই নিয়েছে। মেয়ের পা মাটিতেই রয়েছে।’’ নীতা জানান, বাড়ি ফিরলে সেই রোজকার রুটিন। আবার সেই ভোরের নৈহাটি-শিয়ালদহ লোকাল।