• সৌরাংশু দেবনাথ
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

‘শাহরুখ নিয়ে আমার ভাল স্মৃতি নেই’, প্রথম আইপিএলের বিস্ফোরক স্মৃতিচারণে প্রাক্তন সিএবি প্রেসিডেন্ট

Prasun Mukherjee
শাহরুখ, বুকানন, সৌরভের সঙ্গে সেই সময়ের সিএবি প্রেসিডেন্ট প্রসূন মুখোপাধ্যায়। —ফাইল চিত্র।

২০০৮ সালে শুরু হয়েছিল আইপিএল। তখন সিএবির প্রেসিডেন্ট ছিলেন প্রসূন মুখোপাধ্যায়। ইডেনে প্রথমবার আইপিএল আয়োজনে কোন কোন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল, আনন্দবাজার ডিজিটালকে সেটাই অকপটে জানালেন প্রাক্তন নগরপাল।

প্রশ্ন: সেটাই ছিল প্রথম আইপিএল। আয়োজনের অতীত কোনও অভিজ্ঞতা ছিল না।

প্রসূন— সেটাই ছিল চ্যালেঞ্জ। তার আগে আইপিএল কখনও হয়নি। ইডেনে আন্তর্জাতিক ম্যাচ হতো, কিন্তু সেটা ছিল আমাদের নিজেদের ব্যাপার। কোনও প্রাইভেট পার্টি এসে ভাড়া নিয়ে ম্যাচ আয়োজন করত না। আইপিএল হল অনেকটা বিয়েবাড়ি ভাড়া দেওয়ার মতো। আমার বাড়ি, কিন্তু অনুষ্ঠান করছে অন্যরা। যারা ভাড়া নেয়, তারাই ব্যবহার করে। ফলে, সমস্যা তো ছিলই।

প্রশ্ন: কী ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছিল?

প্রসূন— প্রথমে মুম্বইয়ে হওয়া বৈঠকে ললিত মোদী একটা আইডিয়া দিয়েছিলেন যে আইপিএল কী ভাবে হবে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, অন্য লিগ ভাল করে স্টাডি করে এই ধাঁচটা গড়েছিলেন তিনি। বললেন, ক্রিকেটের সঙ্গে বিনোদন থাকবে। ব্যাবসার ব্যাপারটা খেয়াল করতে হবে। খাতির করতে হবে পার্টিদের। ওরা যা চাইবে, সেটা মেটাতে হবে। সমস্যা তখনই শুরু হল যখন,যা বলা হয়েছিল, সেটার অনেক কিছুই পাল্টাতে থাকল মুখে মুখে। সবকিছু লিখিত-পড়িত হওয়ার সময় তখন ছিল না। টেলিফোনে ললিত মোদী বলতেন, আর সেই মতো আমাদের পাল্টাতে হত ব্যবস্থাপনা। ওঁর কথা শুনতে হত, কারণ তিনিই ছিলেন আইপিএলের প্রথম কমিশনার। বোর্ডের অংশ হওয়া সত্ত্বেও একজন কমিশনারকে রেখে স্বাধীন ভাবে কাজ করত আইপিএল। তখন থেকেই নানা প্রশ্ন উঠছিল মনের মধ্যে। ভাবতাম, সবকিছু ঠিক চলছে তো। না হলে সেই সময় বোর্ডের কোষাধ্যক্ষ শ্রীনিবাসন কী করে চেন্নাইয়ের দল কিনতে পারে! এটা হতে পারে কি না, সেই সময় প্রশ্ন উঠেওছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই ভাবেই চলল। এর পর লটারি হল। কলকাতার দল পেল শাহরুখ খান। আর ওদের সঙ্গে শুরু থেকেই সমস্যা হতে থাকল।

আরও পড়ুন: টেস্টে গাওস্করের চেয়ে কোহালি এগিয়ে: দিলীপ বেঙ্গসরকর

প্রশ্ন: রেড চিলিজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সিএবির ঝামেলা লাগল বলছেন?

প্রসূন— জুহি চাওলার স্বামী জয় মেটা-ই কথা বলতেন প্রধানত। ওঁদের প্রথমে বোঝাতে হল যে কী কী করতে হবে। ওঁরা এতে অভ্যস্ত নন। আমাদের লোকজনকেও জানাতে হল কার কী দায়িত্ব। কার্যকরী কমিটির সভা হয়েছিল এখানে। আইএমজি সংস্থার তরফেও প্রধানত দু’জন মহিলা এসেছিলেন। ওরা খুব দক্ষ, খুব পরিশ্রম করতেন। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল টিকিট নিয়ে। আমরা কত টিকিট পাবো, সেটা নিয়ে সমস্যা বাধল। প্রথম দিকে তো ওরা মাত্র পাঁচ বা ছয় শতাংশ টিকিট দেবে বলছিল। আমরা প্রচণ্ড রেগে গেলাম। আমি তখন মুম্বই গেলাম। শেষ পর্যন্ত আমরা ১৬ শতাংশ টিকিট আদায় করলাম। এটা মোটেই নয় যে আইপিএল আয়োজন খুব মসৃণ ভাবে হয়েছে। বরং উল্টোটাই। প্রচণ্ড ঝগড়া হয়েছিল ওদের সঙ্গে।

প্রশ্ন: তার মানে সম্পর্ক মোটেই বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না।

প্রসূন— না, না। ছোটখাটো নানা সমস্যা চলতই। আসলে শাহরুখ খানের ইগো সমস্যা তৈরি করত। ওরা সবসময় সেরাটাই চাইছিল। আমাদের কোনও দিক থেকেই খামতি হলে চলবে না। যদিও আমরাই সব করে দিচ্ছি। কিন্তু ওরা কাজ হয়ে গেলে পাত্তা দেবে না। আর পান থেকে চুন খসলেই মুশকিল। যেমন ক্লাবহাউসের টিকিট নিয়ে হল।

প্রশ্ন: ক্লাবহাউসের টিকিট নিয়ে কী হয়েছিল?

প্রসূন— ক্লাবহাউসে ছয় হাজার সিট রয়েছে। তার মধ্যে ১৬ শতাংশ সিএবি পাবে। ওরা কী করল, সংখ্যা ঠিক রেখে আমাদের সব টিকিট দিল আপার টিয়ারের পিছন দিকে। টিকিটের বিতরণ ওরা নিজেদের খেয়ালখুশি মতো করতে থাকল। আমি বললাম, এটা হবে না। লোয়ার টিয়ারের প্রথম সিট থেকে টিকিট কাটতে কাটতে উপরে উঠবে। এ ভাবেই ১৬ শতাংশ টিকিট দিতে হবে। কারণ, আমাকেও তো বেশ কিছু লোককে আমন্ত্রণ জানাতে হবে। তাঁরাও তো আসবেন মাঠে। এবং তাঁদের সম্মানের কথাও ভাবতে হবে। আরও আছে।

প্রশ্ন: আবার কী হল?

প্রসূন— ওরা লোয়ার টিয়ারের ডানদিকে পুরোটা ব্লক করে জায়গা নিয়ে নিল। কিন্তু, বাঁশ দিয়ে জায়গা বন্ধ করে দিলে দর্শকরা বাঁ দিকের সিটে যাবে কী করে। বাঁশ দিয়ে বন্ধ করে দিলে তখন অন্যদিক দিয়ে নেমে রো-র পুরোটা অন্যদের ঘাড়ের উপর দিয়ে আসতে হবে এ পাশে। আমি দেখেই বাঁশ খুলে দিলাম। এসব নিয়ে ইগোর সংঘাত হতে থাকল নিয়মিত। যখনই এমন কিছু ঘটত, আমি বলতাম, এ ভাবে চলবে না। আমরা বুঝতে পারলাম যে ঠোকাঠুকি চলতেই থাকছে।

প্রশ্ন: ঝড়-বৃষ্টিও তো সমস্যা বাড়িয়েছিল।

প্রসূন— আসল সমস্যা কিন্তু ঝড়-বৃষ্টি ছিল না। সমস্যা ছিল ইগো। আর বৃষ্টির জন্য আমরা ব্যবস্থা নিয়েওছিলাম। সারা মাঠ ঢাকা দেওয়ার প্রস্তুতি ছিল। প্লাস্টিক দেওয়া আট টুকরো ক্যানভাসের ব্যবস্থা করছিলাম। মাঠটাকে আট টুকরো করলে যেমন হয়, হিসাব করে তেমন আকারের ক্যানভাস ধারে ধারে রাখা হয়েছিল। আমরা ১০০ মালি রেখেছিলাম। ওরা চার ভাগে ভাগ হয়ে ছিল। যে মুহূর্তে বৃষ্টি হবে, ওরা ক্যানভাসের রোলটাকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে আসবে পিচের দিকে। ততক্ষণে পিচ ঢাকা পড়েও যাবে। আট দিক থেকে গড়াতে গড়াতে পিচের উপর এসে আটকে যাবে ক্যানভাসটা। চাপা দেওয়ার জন্য লোহার আংটা দেওয়া সিমেন্টের স্ল্যাব রাখা ছিল। চৌকো চৌকো সিমেন্টের জাঙ্কও ছিল। কিন্তু ওগুলো তা মাঠের বাইরে থেকে দৌড়ে গিয়ে আনতে হবে। এ বার ঝড়ের দমকা হওয়া এমন ছিল যে সেগুলো আনার সুযোগ মিলছিল না। ক্যানভাসের ভিতর হাওয়া ঢুকে পড়েছিল। সেগুলোকে চেপে রাখা যাচ্ছিল না!

আরও পড়ুন: ‘আইপিএলে সব বোলারকে মার খেতে দেখেছি, আমিও মার খেতেই পারি’​

প্রশ্ন: ঝড়ের দাপটে ক্যানভাসের উপর দাঁড়ানো অবস্থায় আপনি পড়েও গিয়েছিলেন।

প্রসূন—পুলিশ অফিসার হওয়ার সুবাদে সবসময় অ্যাকশনের পয়েন্ট যাওয়া অভ্যাস আমার। আমাদের মানসিকতাই অন্য রকম। যাই হোক, এর আগে কোনও সিএবি প্রেসিডেন্ট এমন আবহাওয়ায় মাঠের মধ্যে গিয়ে তদারকি করেননি। আমিই প্রথম। সেই সময়ই এত জোরে হাওয়া দিচ্ছিল যে পড়ে গিয়েছিলাম। দুর্ভাগ্যের হল, এটা নিয়ে অনেক হাসাহাসি হয়েছিল। কিন্তু, এটা বুঝতে হবে যে ঝড়ের সময় আমি হাত লাগিয়েছিলাম মাঠ ঢাকা দেওয়ার কাজে। আমাকে দেখে যাতে অন্যরাও এগিয়ে আসে, এটাই ছিল উদ্দেশ্য। লিডারকে তো সামনেই দাঁড়াতে হয়। আর আমি এ ভাবে কাজ করেই অভ্যস্ত।

প্রশ্ন: আইপিএল আয়োজনে আপনার ভাল স্মৃতি কী?

প্রসূন— (একটু থেমে) ভাল স্মৃতি, ভাল স্মৃতি...। শাহরুখ খান সম্পর্কে একেবারেই কোনও ভাল স্মৃতি নেই। এসআরকে এমন ভাব করতেন যেন তাঁকে ভগবান পাঠিয়েছে। যা চাইছেন তা-ই যেন হবে, এমন হাবভাব ছিল। আমরা যা-ই ব্যবস্থা করি না কেন, খুশি করা যেত না। মাথায় রাখতে হবে যে আইপিএল এর আগে কখনও হয়নি। আমরাই প্রথম বার করছিলাম। এক বার হলে একটা সিস্টেম চালু থেকে যায়। পরের বার সেই অনুসারে এগোয় সব কিছু।

প্রশ্ন: একটা টেমপ্লেট তৈরি হওয়া আর কী!

প্রসূন— হ্যাঁ, তখন সেটাকে আরও ভাল নিশ্চয়ই করা যায়। কিন্তু আইডিয়াটা তো আগের বারের থেকেই মেলে। পরের বারে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হয় না। প্রথম বার কোনও কাঠামো খাড়া করাই চাপের। আর সিএবির ভিতরেও তো পূর্ণ সহযোগিতা পাইনি। অনেক বিরুদ্ধতা হয়েছে ভিতরে। গোলমাল হত। অন্তর্ঘাতের চেষ্টা হয়েছে নানা ভাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা করতে পারেনি। ম্যাচগুলো ঠিকই হয়েছিল।

প্রশ্ন: তার মানে মনে রাখার মতো মুহূর্ত বলতে একেবারেই কিছু নেই?

প্রসূন— অনেক আম্পায়ারের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। নিউজিল্যান্ডের বিলি বাউডেন, যিনি আঙুল বাঁকিয়ে চার-ছয় দেখাতেন, সেই তিনি খুব প্রশংসা করেছিলেন আমাদের আয়োজনের। ওঁর সঙ্গে তো বন্ধুত্বই হয়ে গিয়েছিল। জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, “ব্রিলিয়ান্ট ব্যবস্থাপনা। তুমি নিজে প্রেসিডেন্ট হয়েও আন্তরিক ভাবে, খাটাখাটনি করে সব ঠিক করছ। এমন আমি কোথাও দেখিনি।”পাকিস্তানের প্রাক্তন ক্যাপ্টেন রামিজ রাজাও ধারাভাষ্যে দিতে এসে প্রশংসা করেছিলেন। দুঃখের বিষয় হল, বাইরের লোক প্রশংসা করলেও এখানে কেউ কিছু বলেনি। বরং জোর করে খোঁজা হত কোথায় কী ভুল! তখন এমন অবস্থা যে যাই করা হোক না কেন, খারাপ বলা হতো। সব দিকে এত ঝামেলার মুখে পড়তে হতো যে কী বলব! সমস্যা কাটিয়ে কাটিয়ে কাজ করতে হয়েছে। সাপোর্ট পাইনি। পেলে হয়তো আরও ভাল করা যেত। আর নাইট রাইডার্সের সঙ্গে দর কষাকষি লেগেই থাকত। আইপিএল শেষ হওয়ার পর ওরা তো হাত মিলিয়েও যায়নি!

আরও পড়ুন: ‘কলকাতা আমার, ইডেন আমার, কিন্তু কেকেআর কখনওই আমার নয়’​

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন