মাথা নিচু করা অবস্থায় নাচের পর হঠাৎ দাঁড়িয়ে যাওয়া। তার পরে দু’হাত সমান্তরাল ভাবে আকাশের দিকে মেলে ধরা। ডান হাত ভাঁজ করা অবস্থায়। আর বাঁ হাত পুরোটাই প্রসারিত। নতুন সহস্রাব্দে মার্কিন মুলুকে খেলার মাঠে উচ্ছ্বাস প্রকাশের নয়া ভঙ্গিমা।

পোশাকি নাম—ড্যাব ড্যান্স। আশির দশকের শেষ দিকে মাইকেল জ্যাকসনের ‘ব্যাড’ অ্যালবামের সৌজন্যে যার আত্মপ্রকাশ।

সোমবার মহমেডানকে হারিয়ে ওঠার পর সেই ‘ড্যাব ড্যান্স’ দিয়েই কল্যাণী মাতালেন মোহনবাগানের চার তারকা। কামো স্টিফেন বায়ি, জোড়া গোলদাতা আজহারউদ্দিন মল্লিক, চেস্টারপল লিংডো এবং আনসুমানা ক্রোমা।

কলকাতা লিগে এখনও পর্যন্ত কামোর গোল ছয়। ক্রোমার পাঁচ। সবুজ-মেরুন জার্সি গায়ে গোল করতে দু’জনের মধ্যে যেমন সুস্থ প্রতিযোগিতা রয়েছে। ম্যাচের পর তা জারি উচ্ছ্বাস প্রকাশেও।

পিছিয়ে গিয়ে মহমেডানকে ২-১ হারানোর আনন্দে কামো সতীর্থদের গ্যালারির কাছে ডেকে নিয়ে ‘ড্যাব ড্যান্স’ করাচ্ছেন দেখে ক্রোমাও আসরে নামলেন। মোহনবাগানের পাঁচ নম্বর তাঁর জার্সি খুলে দাঁড়িয়ে পড়লেন আদুল গায়ে। ইতালিয়ান স্ট্রাইকার বালোতেল্লির মতো দু’হাত মুঠো করে ফুলিয়ে তুললেন ঘামে সপসপে তাঁর পেশিবহুল শরীর। যা অনুকরণ করলেন আজহারউদ্দিনরাও। 

ম্যাচ জিতে আনন্দ প্রকাশের কেন এই অদ্ভুত ভঙ্গী? কামো বলে গেলেন, ‘‘এটা ডার্বি জেতার জন্য। যাঁরা সমালোচনা করছিলেন তাঁদের জন্য। যে দর্শকরা আমাদের জন্য গলা ফাটালেন তাঁদের মজা দেওয়ার জন্য।’’

আর ক্রোমা? তাঁর মন্তব্য, ‘‘শয়নে, স্বপনে আমার আদর্শ বালোতেল্লি। জীবনের সব অপমান, কষ্ট, সমালোচনা দেখলেই ওঁর কথা মনে পড়ে। এ রকম একটা দুরন্ত ম্যাচ জিতে ওঁর একজন ক্ষুদ্র ভক্ত হিসেবে বালোতেল্লিকে স্মরণ করলাম।’’

নব্বই মিনিট পর্যন্ত যে ম্যাচে জয়ের দিশা দেখতে পাচ্ছিলেন না এ দিন কল্যাণীতে হাজির হাজার পাঁচেক মোহনবাগান সমর্থক। সেই ম্যাচই অতিরিক্ত সময়ে আজহারউদ্দিনের গোলে জিতে তাঁরা বাড়ি ফিরলেন।

উল্টোদিকে, ফৈয়জের গোলে এগিয়েও হেরে গিয়ে ম্যাচ শেষে রেফারিকে বিষোদগার করছিলেন মহমেডান কোচ বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য। সাত বছর আগে মোহনবাগানের শেষ লিগ জয় তাঁর কোচিংয়েই। সেই বিশ্বজিৎ বলছিলেন, ‘‘অসৎ রেফারিরাই কলকাতা লিগের বারোটা বাজাল। আমাদের আশা প্রায় শেষ।’’

এক বছর আগে এই ম্যাচটাই হেরে গিয়েছিলেন মোহনবাগান কোচ শঙ্করলাল চক্রবর্তী। জানতেন ২০১৩-র ২ মার্চের পর মহমেডানের বিরুদ্ধে টানা সাত ম্যাচে জয় নেই তাঁর মোহনবাগানের। দুনিয়া কাঁপানো ৯/১১-র দিনেই সিঁথির এই বঙ্গসন্তান কোচ সেই ‘সাত’-এর গেরো কাটিয়ে দিলেন। বলছিলেন, ‘‘রেনবো ম্যাচ ড্র করে চাপ বেড়েছিল। আমরা সেই চাপ কাটিয়ে ফের বেরিয়ে এলাম।’’

শঙ্করলালের এই চাপ এ দিন কাটিয়েছে আজহারউদ্দিনের জোড়া গোল। তবে নেপথ্যে কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন মহমেডানের কোচ বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য ও আর তাঁর রক্ষণ। বিরতিতে ফল ১-১। না জিতলে লিগের আশা শেষ। এই পরিস্থিতিতে  মোহনবাগান রক্ষণকে চাপে রাখার বদলে তিনি হঠাৎই রক্ষণাত্মক হয়ে গেলেন। যার সুযোগে নিখিল কদমের জায়গায় চেস্টারপলকে নামিয়ে উইং দিয়ে আক্রমণে ঝড় তুললেন শঙ্কর। যা সামলাতে মনবীর সিংহ আর দিপান্দা ডিকা বাদে মহমেডানের আটজন চলে গেলেন রক্ষণে। ম্যাচে ফিরল মোহনবাগান।

এ ছাড়াও, রানা ঘরামিদের রক্ষণ এতটাই নড়বড়ে যে তাঁর দু’টো গোলের সময়েই আজহারউদ্দিন ছ’গজ বক্সের মধ্যে ফাঁকায় গোল করে  গেলেন। ম্যাচ শেষে রানাদের আড়াল করলেন দুই কোচই। কিন্তু তাতেও রানা, কালু, রিচার্ডদের ক্ষমা করা যাচ্ছে না।

এ দিন জিতে সাত ম্যাচে ১৯ পয়েন্ট হল মোহনবাগানের। ফলে আপাতত শীর্ষে কামো-ক্রোমাদের দল। এক ম্যাচ কম খেলে ১৮ পয়েন্টে  দ্বিতীয় ইস্টবেঙ্গল।

এ দিন স্টেডিয়ামের বিশেষ কক্ষে বসে মোহনবাগানকে জরিপ করে গেলেন ইস্টবেঙ্গল কোচ খালিদ জামিল। যা জেনে মোহনবাগান কোচের রসিকতা, ‘‘এখনও দেখতে আসছে! নতুন ফুটবলার তো আর আনতে পারব না।’’

শঙ্করলাল রসিকতা করলেও এ দিন ফৈয়জও যে ছ’গজ বক্সেই মোহনবাগানের দুই স্টপারের দূরত্ব কাজে লাগিয়েই গোল করে গেলেন। দু প্রান্ত দিয়ে উড়ে এল অনেক ক্রস।

ডার্বির আগে যা না শুধরালে সবুজ-মেরুন সমর্থকদের সাত বছর লিগ না পাওয়ার যন্ত্রণা কিন্তু আট বছরে পা দিতে পারে।