Advertisement
E-Paper

শামির স্বপ্নের স্পেলেও হার এড়ানো কঠিন ব্যাটিং বিপর্যয়ে

পাঁচ ওভারের একটি স্বপ্নের স্পেল। আর তাতেই পার্‌থে ডেনিস লিলি, জেফ থমসনদের মনে করালেন মহম্মদ শামি। লাঞ্চের পরে এই একটি স্পেলেই তিনি তুলে নেন চার উইকেট।

সুমিত ঘোষ

শেষ আপডেট: ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮ ০৩:২১
বিধ্বংসী: আগুনে বোলিং করে শামির ছয় উইকেট। গেটি ইমেজেস

বিধ্বংসী: আগুনে বোলিং করে শামির ছয় উইকেট। গেটি ইমেজেস

পাঁচ ওভারের একটি স্বপ্নের স্পেল। আর তাতেই পার্‌থে ডেনিস লিলি, জেফ থমসনদের মনে করালেন মহম্মদ শামি। লাঞ্চের পরে এই একটি স্পেলেই তিনি তুলে নেন চার উইকেট। এমন সব ভয়ঙ্কর ডেলিভারি করতে থাকেন যে, অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানেরা উইকেট বাঁচাবেন না মাথা, সেটাই ঠিক করে উঠতে পারছিলেন না।

অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক টিম পেন আউট হলেন বিপজ্জনক বাউন্সার থেকে মুখ বাঁচাতে গিয়ে। একই ভাবে বিদায় নিলেন দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ স্কোরার উসমান খাওয়াজা (৭২)। রবিবার শামির লাফিয়ে ওঠা বলেই আঙুলে আঘাত পেয়ে হাসপাতাল যেতে হয়েছিল অ্যারন ফিঞ্চকে। আঙুলের হাড়ে চিড় ধরেনি জানার পরে এ দিন ব্যাট করতে নামলেন। শরীর লক্ষ্য করে ছুটে আসা বলে লেগসাইডে খোঁচা দিয়ে তিনিও আউট হলেন শামির বলে। আর একটি বাউন্সার গিয়ে লাগল নেথান লায়নের হেলমেটে। তার পরের বলেই ডিপ পয়েন্টে ক্যাচ দিয়ে আউট লায়ন।

তত ক্ষণে বলাবলি শুরু হয়ে গিয়েছে, পার্‌থে পেসারদের করা সর্বকালের সেরা স্পেলগুলোর মধ্যে শামির এই বোলিং ঢুকে পড়বে কি না। ডেনিস লিলির পার্‌থ বরাবরই ক্রিকেট বিশ্বের দ্রুততম পিচের জন্য বিখ্যাত। যদিও সেটা ছিল ওয়াকা অর্থাৎ ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের পুরনো মাঠে। নতুন স্টেডিয়ামে এটাই প্রথম ম্যাচ হচ্ছে। তবে প্রতিশ্রুতি মতো পুরনো ওয়াকার মতোই প্রাণবন্ত, আগুনে পিচ তৈরি হয়েছে এখানে।

পুরনো ওয়াকায় পেসারদের সব চেয়ে ভয়ঙ্কর স্পেলগুলোর মধ্যে স্থানীয় কিংবদন্তি ডেনিস লিলির কথা সবার আগে মনে পড়বে। ১৯৭২-এ অবশিষ্ট বিশ্ব একাদশের বিরুদ্ধে পার্‌থে লিলির সেই বিধ্বংসী ২৯ রানে আট উইকেটের স্পেল। প্রতিপক্ষ দলের ব্যাটসম্যানদের নাম? সুনীল গাওস্কর, রোহন কানহাই, গ্যারি সোবার্স, জাহির আব্বাস, টোনি গ্রেগ। কিন্তু লিলির গতি ও বাউন্সের সামনে সে দিন বিশ্ব একাদশ শেষ হয়ে যায় মাত্র ৫৯ রানে। ১৯৮৪-তে মাইকেল হোল্ডিংয়ের ২১ রানে ছয় উইকেট। অস্ট্রেলিয়া অলআউট হয়ে যায় মাত্র ৭৬ রানে। ১৯৯৩-তে কার্টলে অ্যামব্রোজের ২৫ রানে সাত উইকেট। ৩২ বলে মাত্র এক রান খরচ করে সাত উইকেট নেন তিনি। অস্ট্রেলিয়া ৮৫-২ থেকে ১১৯ রানে শেষ হয়ে যায়। ২০০৪-এ পার্‌থে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গ্লেন ম্যাকগ্রার ২৪ রানে আট উইকেট এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে মিচেল জনসনের ৬১ রানে আট উইকেটের কথাও অনেকের মনে পড়ে যাবে। শামি নিলেন ৫৬ রানে ছয় উইকেট। লাঞ্চের পরের স্পেলটা ধরলে পাঁচ ওভারে চার রান দিয়ে চার উইকেট। সর্বকালের সেরা স্পেলগুলোয় জায়গা করে নেওয়ার মতোই বোলিং। একটা সময়ে হ্যাটট্রিকের মুখেও ছিলেন।

কিন্তু ভয়ঙ্কর সুন্দর হয়ে উঠেও হোল্ডিং, অ্যামব্রোজদের মতো প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার সুখস্মৃতি নিয়ে হয়তো পার্‌থ থেকে মেলবোর্ন যাওয়া হচ্ছে না শামির। কারণ, দলের প্রধান কয়েক জন ব্যাটসম্যানের দায়বদ্ধতা এবং শৃঙ্খলার অভাব। তালিকার উপরে থাকবেন দুই ওপেনার। এম বিজয় এবং কে এল রাহুল। শেষ কবে তাঁরা ওপেনিংয়ে সেঞ্চুরি পার্টনারশিপ উপহার দিয়েছেন, মনে করা যাচ্ছে না। বিজয়ের উপমহাদেশের বাইরে শেষ সেঞ্চুরি চার বছর আগে ব্রিসবেনে। ইংল্যান্ডে মাঝ পথে বাদ দিয়ে আবার এখানে ফিরিয়ে আনা হল। আর রাহুলকে নিয়ে সব সময়ই শোনা যায়, তিনি দারুণ প্রতিভাবান। ইংল্যান্ডে পাঁচ টেস্ট খেলে একেবারে শেষেরটায় ওভালে গিয়ে সেঞ্চুরি। বাকি সিরিজে রান নেই। দু’জনেরই আউট হওয়ার ভঙ্গি দেখে মনে হল, অবিলম্বে দেশে ফেরত পাঠিয়ে রঞ্জি ট্রফি খেলতে দেওয়া উচিত। রাহুল তো ওপেনার হয়েও বুঝে উঠতে পারেন না, অফস্টাম্প কোথায়। বল ছাড়তে গিয়ে আউট হলেন। বিজয়কে ফেরালেন নেথান লায়ন। চতুর্থ দিনের পিচে অসমান বাউন্স রয়েছে। বল মারাত্মক টার্ন নিচ্ছে। তাতেও পাকাপোক্ত রক্ষণাত্মক শট না খেলে বিজয় ব্যাট-প্যাডের মধ্যে গেট খুলে দিয়ে ড্রাইভ মারতে গেলেন। এই সিরিজে লায়ন সব চেয়ে বেশি উইকেট তুলেছেন এখনও পর্যন্ত। এ দিন বিরাট কোহালিকেও অসম্ভব বুদ্ধি করে তুললেন তিনি। অফস্টাম্পের উপর স্ট্রেট ডেলিভারি ছাড়লেন একদম মাপা লেংথে। কোহালি সামনের পায়ে এসে খেললেন টার্ন করবে ভেবে। বল সোজা হয়ে ব্যাটের কাণা নিয়ে স্লিপে। এমন বুদ্ধিদীপ্ত শিল্পীকে খেলতে গেলে ধৈর্য দরকার। বিজয়দের মতো স্টাইলভাই ওপেনার দিয়ে হবে না। তাঁর অসীম ভাগ্য ভাল যে, পৃথ্বী শ চোটের জন্য সিরিজ থেকেই ছিটকে গেলেন। না হলে মেলবোর্নে অবধারিত বাইরে যেতেন। এখন পৃথ্বীর জায়গায় দেশ থেকে উড়িয়ে আনা হচ্ছে মায়াঙ্ক আগরওয়ালকে। ঘরোয়া ক্রিকেটে ঝুরি ঝুরি রান করেছেন মায়াঙ্ক। তবু মেলবোর্নেই তাঁকে নামানোর ঝুঁকি নেওয়া হবে কি না, সেটাই দেখার।

এমনিতে ভারতীয় ব্যাটিংয়ের যা অবস্থা, চেতেশ্বর পূজারা এবং কোহালি এক সঙ্গে রান না পাওয়া মানে মোটামুটি বিসর্জনের বন্দোবস্ত পাকা হয়ে গেল। সচিন-দ্রাবিড়-সৌরভ-লক্ষ্মণদের পরবর্তী প্রজন্মে ত্রয়ীকে ধরা হত বিশ্বমানের। কোহালি, পূজারা এবং অজিঙ্ক রাহানে। হালফিলে সেই রাহানেকে ম্লান দেখাচ্ছে। এ দিন ক্রিজে থিতু হয়ে গিয়েও যে ভাবে আত্মঘাতী শট মেরে উইকেট উপহার দিয়ে গেলেন, তা দলের সহ-অধিনায়কের কাছ থেকে মোটেই আশা করা যায় না। চার উইকেট পড়ে যাওয়ার পরেও রাহানে এবং হনুমা বিহারী ধৈর্য ধরে ভালই এগোচ্ছিলেন। রাহানের অ্যাডভেঞ্চার করার ইচ্ছা হঠাৎই বিপদ ডেকে আনল। দিনের শেষে ক্রিজে রয়েছেন দুই তরুণ— বিহারী এবং ঋষভ পন্থ। ক্রিকেট মহান অনিশ্চয়তার কথা মাথায় রেখেও বলতে হবে, শেষ দিনে এঁরা দু’জনে জিতিয়ে দিলে বছরের অন্যতম সেরা অঘটন ঘটবে।

পার্‌থে তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে স্লেজিং। এ দিন শেষ ওভারের শেষ বল খেলার আগে পন্থের উদ্দেশে উইকেটের পিছন থেকে কেউ একটা বললেন, ‘‘সোমবারের রাত। আবার বাড়াবাড়ি করছ কেন? তাড়াতাড়ি আউট হয়ে যাও, তার পরে আমরা ডিনারে যাব।’’ উইকেটের পিছনে দাঁড়িয়ে পন্থ সারাক্ষণ চটরপটর করে গিয়েছেন অস্ট্রেলিয়া ব্যাট করার সময়। এখন ফেরত পাওয়ার পালা।

ভারতীয় শিবিরে একটা ক্ষীণ আশা এখনও রয়েছে কারণ, সকালের দিকে পার্‌থের উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য খুব ভাল থাকছে। অস্ট্রেলিয়া এ দিনও সকালের সেশনে দারুণ ব্যাট করেছে। এমনকি, শামির দুর্ধর্ষ স্পেলের পরেও মিচেল স্টার্ক এবং জশ হেজ্‌লউড শেষ উইকেটে ৩৯ বলে ৩৬ রান যোগ করে দেখিয়ে দিয়ে গেলেন, পার্‌থের পিচে সাহস আর প্রত্যয় থাকলে ব্যাট করাই যায়। বিহারী-পন্থদের কাজটা আরও কঠিন, সন্দেহ নেই। শেষ ইনিংসে অনেক বেশি চাপের মধ্যে, অনেক খারাপ হয়ে আসা পিচে ব্যাট করতে হচ্ছে। পাঁচ উইকেট হাতে নিয়ে এখনও তুলতে হবে ১৭৫ রান। ইদানীংকালের ক্রিকেটে এত রান শেষ ইনিংসে কাউকে করতেই দেখা যায় না। ভারতের সামনে অস্ট্রেলিয়া টার্গেট দিয়েছিল ২৮৭ রানের। তাদের ক্রিকেট ইতিহাসে মাত্র দু’বারই এ রকম বড় স্কোর তাড়া করে জিতেছে কোনও ভারতীয় দল।

ক্রিকেট, মহান অনিশ্চয়তার ক্রিকেট! যদি ফের বোকা বানায়, এই আশাতেই থাকবেন ভারতীয় ভক্তরা।

Cricket Test Border-Gavaskar Trophy 2018 India Australia Mohammad Shami
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy