×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৯ জুন ২০২১ ই-পেপার

ধিক্কারের মধ্যে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড

রাজর্ষি গঙ্গোপাধ্যায়
প্যারিস ০৬ জুলাই ২০১৬ ০৩:৫৭

পক্ককেশ, চোয়ালচাপা প্রতিজ্ঞার ভদ্রলোক আজকাল খুব রবার্ট লুই স্টিভেনসনের উপন্যাস মনে করিয়ে দেন।

ইংলিশ চ্যানেলের এ পারে ভদ্রলোককে নিয়ে চলিত প্রবাদের একটা হল, এঁর জন্মকুণ্ডলী নিয়ে বসা উচিত। খুঁজেপেতে বার করা উচিত যে, এ জন্মেছিল কোন লগ্নে যে এত সাফল্য পায়? থিয়েরি অঁরির মতো তাঁর এক সময়ের সতীর্থরা বলাবলি করেন, প্লেয়ারের জীবন মানে সব সময় সাফল্য-ব্যর্থতার সহবাস হবে, এত দিন জেনে এসেছি। কিন্তু এই লোকটা জীবনের অন্ধকার দিকটা দেখলই না! চিরকাল সাফল্যের তাজ পরে ঘুরে বেড়াল।

দিদিয়ের দেশঁর ফুটবল-জীবনটা হিংসে করারই মতো। ফ্রান্সের সর্বাত্মক ধারণা হল, আটানব্বইয়ে জিনেদিন জিদানদের টিম থেকে ফরাসি ফুটবলের স্বর্ণযুগ শুরু। টিমটা রোনাল্ডো-বেবেতোর ব্রাজিলকে তিন গোল দিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিল। দু’বছর পর শক্তির তীব্রতা আরও বাড়িয়ে ইউরো কাপ তুলতেও ভোলেনি। দেশঁ দু’টো টিমেরই অধিনায়ক ছিলেন, ছিলেন স্বর্ণযুগের প্রথম সাক্ষর। কালের নিয়মে ফুটবল ছাড়লেন, ঢুকলেন কোচিংয়ে। কিন্তু ফুটবল-দেবতার অশেষ কৃপা-বর্ষণ এখানেও তাঁর উপর অবিরাম ঘটতে লাগল। লিগ ওয়ানে মার্সেইকে কেউ পরাক্রমী ধরত না। কিন্তু দেশঁ এসে কোথা থেকে সেই মার্সেইকে লিগ চ্যাম্পিয়ন করে দিলেন! পরের চমক আরও বড়। মোনাকোকে নিয়ে সোজা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে পৌঁছে যাওয়া!

Advertisement

ফ্রান্স এই দিদিয়ের দেশঁকে ভালবাসে। মনে করে, লোকটা ফুটবল বোঝে। টিমে অনুশাসন আর মুক্ত হাওয়ার সন্ধি ঘটিয়ে সাফল্য আনতে জানে। বিশ্বাস করে, ষোলো বছর পর যদি ইউরো জিততে পারে অলিভিয়ার জিরুঁ-পল পোগবাদের ফ্রান্স, ফুটবলারদের দক্ষতার সঙ্গে দেশঁর ভাগ্যও অলিখিত ভাবে মিশে থাকবে।

ফ্রান্স এই দিদিয়ের দেশঁকে তীব্র ঘৃণাও করে। বলে, লোকটা ‘বর্ণবিদ্বেষ’-কে প্রশ্রয় দেয়। করিম বেঞ্জিমাকে নেয় না। সামির নাসরিকে উপেক্ষা করে। বেন আর্ফার মতো প্লেয়ারকে টিমে ডাকে না নিজের সুবিধের কথা ভেবে!

ফ্রান্সে দিদিয়ের দেশঁ এখন ডক্টর জেকিল। ফ্রান্সে দিদিয়ের দেশঁ-ই এখন মিস্টার হাইড। একই সঙ্গে সমাদৃত এবং ধিক্কৃত।

ইউরোতে ফ্রান্সের ম্যাচের সময় রাস্তায়-ঘাটে ব্যাপারটা দেখা গিয়েছে। লোকজনকে বলতেও শোনা গিয়েছে। ইউরোতে ফ্রান্সের ম্যাচ পড়লে প্রচুর যুবক-যুবতী আসেন বেঞ্জিমা লেখা জার্সি পরে। কোচের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার তাঁদের উপায় নেই। কিন্তু নীরব বিবৃতি তো দেওয়া যায়। দেশঁ-র আর এক গরিমার সময়ে তাঁকে বোঝানো যায়, আপনি বেঞ্জিমাকে ভুললেও আমরা ভুলিনি। আইসল্যান্ড ম্যাচের দিন টিভি সাংবাদিকের বুমে একজনকে বলতে শোনা গিয়েছে, “ফ্রান্স ভাল খেলছে। কিন্তু ফ্রান্সকে দুর্দান্ত দেখাত যদি একটা করিম বেঞ্জিমা থাকত টিমে। যে যেমন খেলুক, বেঞ্জিমাকে বাদ দিয়ে ইউরো খেলতে নামা ডাহা মূর্খামি।” মঙ্গলবারও এ দেশের রহস্য-ঔপন্যাসিক রাচিদ সান্তাকি বলেছেন, “এই টিমটা সমগ্র ফ্রান্সের ছবি নয়। কাদের কেন নেওয়া হয়েছে, তার বিভাজন দেশঁর টিমে স্পষ্ট।” সাঁ দেনির এক স্কুল টিচারও দুঃখ করেছেন যে, “টিমটা ফ্রান্সের প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাতে কোনও বেঞ্জিমা বা আর্ফাকে দেখা যায় না।”



সমর্থক-পণ্ডিতরা তবু ‘মূর্খামি’ বলে ছেড়ে দেবেন। কিন্তু এরিক কঁতোনারা অত নরমপন্থী নন। অস্থিতে জ্বালা ধরিয়ে শুনিয়ে দেবেন, “দেশঁ? ওরে বাবা, ওর চেয়ে বড় ফরাসি আর কেউ আছে নাকি? ওর পুরো পরিবারটাই মারাত্মক ভাবে ফরাসি। কারও সঙ্গে মেশেটেশে না!” করিম বেঞ্জিমা বলবেন, ফ্রান্সের যে অংশ বর্ণবিদ্বেষে বিশ্বাস করে, দেশঁ তাতে প্রভাবিত হয়েছেন! বেঞ্জিমা ক’দিন আগেও গরগরে আক্ষেপ নিয়ে বলেছেন, তিনি জানতেই পারলেন না তাঁর কী দোষ। ‘সেক্স-স্ক্যান্ডাল’ তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়নি। কোর্ট ট্রায়ালে ডাক পড়েনি। অথচ টিম থেকে হঠাৎ বাদ পড়ে গেলেন। একমাত্র অঁরি এবং লেবফ পাশে দাঁড়িয়েছেন দেশঁর। পাল্টা শুনিয়েছেন, দেশঁর বিরুদ্ধে এ সব নোংরা অভিযোগ আনা অর্থহীন। লোকটা সত্যি বর্ণবিদ্বেষী হলে তাঁর পরম বন্ধুর নাম অঁরি হত না। জিদানের সঙ্গে তাঁর এত ভাল সম্পর্কও থাকত না। অঁরি কৃষ্ণাঙ্গ। জিদান আলজিরিয়ান বংশোদ্ভূত।

অথচ দেশঁকে ছাড়া ফ্রান্সের এখন চলবেও না। মার্সেই সেমিফাইনালের আগে দেশঁর টিম নিয়ে এক জার্মান কাগজ লিখেছে, ‘ফ্রেঞ্চ গ্যালাকটিকোস’। চতুর্দিকে দেশঁর উচ্চকিত প্রশংসাও চলছে যে, লোকটা যা বলে তাই করে। ব্যক্তিত্বের আগে টিম, এটা তাঁর বরাবরের দর্শন ছিল। প্লেয়ার ছিল যখন, মেনে চলত। কোচ হিসেবেও মনোভাব বদলায়নি। রোজ কোনও না কোনও প্লেয়ারের প্রশংসা করে যাচ্ছে। নিজেকে কোথাও না রেখে। ফরাসিদের বক্তব্য হল রেমন্দ দমেনেকের সময়কার অন্তর্কলহের আগ্নেয়গিরি, লঁরা ব্লাঁ-র পুরনোপন্থী কোচিং পদ্ধতি থেকে লে ব্লু-কে টেনে বার করতে একজনই পারতেন। দেশঁ। যিনি জানেন, প্লেয়ারদের বিরক্ত না করেও কঠোর অনুশাসন কী করে সিস্টেমে ঢোকাতে হয়। দেশঁ জমানায় মাঠে থাকাকালীন মোবাইল বন্ধ রাখতে হয় ফুটবলারদের। ফরাসি কোচ টিমের প্লেয়ারদের মাথায় এটাও ঢুকিয়ে দিয়েছেন যে, “যদি আমার পদ্ধতিতে কারও চলতে অসুবিধে হয়, তা হলে শেষে সে যেন নিজেকে দোষারোপ করে। আমাকে নয়। টিমে কে থাকবে আর কে থাকবে না, তা শুধু পারফরম্যান্সের উপর নির্ভর করবে না। সিস্টেমের সঙ্গেও মানিয়ে নিতে হয়।” জনান্তিকে দেশঁ বলে থাকেন, আমি ফ্রান্সের যে কোনও পদেই থাকি না কেন, নিজের আত্মা, এনার্জি, সময়, হৃদয় সর্বস্ব টিমের প্রতি নিবেদন করে দিই। আমি শুধু জিততে জানি। ওটা আমার রক্তে আছে। কোচের যে বিশ্বাসের মন্ত্রশক্তিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়নকেও ভয় পায় না ফ্রান্স। আগ্রাসন দেখিয়ে অলিভিয়ার জিরুঁ বলে দেন, “ব্রাজিল বিশ্বকাপে ওদের কাছে হেরে গিয়েছিলাম মনে আছে। চেষ্টা করব সেই যন্ত্রণা ভোলাতে। কিন্তু আপনারাও মনে রাখবেন, শেষ ফ্রেন্ডলিতে কিন্তু ওরা আমাদের কাছে হেরেছিল।”

দেশঁ নিয়ে অঁরিদের ঈর্ষার কিছু নেই। জন্মকুণ্ডলী না মিললেও অন্তত সাফল্য পেয়ে তাঁদের ‘বর্ণবিদ্বেষী’ শুনতে হয়নি।

Advertisement