Advertisement
E-Paper

সোনার পদক নিরুদ্দেশ সোনার হদিসটাকে সামনে এনে দিয়ে

ভারতীয় ক্রীড়ামোদীর বিরুদ্ধে ভারতীয় তারকা ক্রীড়াবিদদের এটা বহু বছরের অভিমান! যা জমতে-জমতে প্রাচীন অরণ্যপ্রবাদের চেহারা নিয়েছে; এরা জিতলে সঙ্গে থাকে। হেরেছ কী পাথর ছুড়বে।

গৌতম ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২০ অগস্ট ২০১৬ ০৩:৫৪

ভারতীয় ক্রীড়ামোদীর বিরুদ্ধে ভারতীয় তারকা ক্রীড়াবিদদের এটা বহু বছরের অভিমান! যা জমতে-জমতে প্রাচীন অরণ্যপ্রবাদের চেহারা নিয়েছে; এরা জিতলে সঙ্গে থাকে। হেরেছ কী পাথর ছুড়বে।

ধারণা ছড়ানোর উৎসমুখ অবশ্যই তারকা ভারতীয় ক্রিকেটারগোষ্ঠী। সেই যে ১৯৭৪-এ ইংল্যান্ড সিরিজ গো-হারান হারার পর অজিত ওয়াড়েকর ও তাঁর টিমের সম্মানে তৈরি ব্যাট ইনদওরে একদল উত্তেজিত ক্রিকেট-সমর্থক ভেঙে ফেলে, তার পর থেকে এ হেন নেগেটিভ বিশ্বাসের উৎপত্তি।

যা বিভিন্ন সময় বিশ্বকাপ ক্রিকেটে খারাপ পারফরম্যান্স ও শোচনীয় টেস্ট হারে নতুন জ্বালানি জুগিয়েছে। দু’হাজার তিন বিশ্বকাপের শুরুতে যখন সৌরভরা পরপর ম্যাচ হারছেন, মোবাইলে একটা শপথ গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ে; এরা যে সব পণ্যের বিজ্ঞাপন করে, চলুন আমরা সেগুলো বর্জন করি। সেই টিম যে টুর্নামেন্ট থেকে তখনও বিদায় নেয়নি। এদের নিয়ে আশার বারুদ আজই উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়, অতশত কেউ মনে রাখার কারণ দেখেইনি। সমর্থনের সেই শেয়ার বাজার অব্যাহত থেকে গিয়েছে পরেও। প্লেয়ারদের অভিমানকে অক্ষত রেখে যে, হারা মানেই যদি অনিবার্য বর্জন হয় তা হলে জিতলে তোমাদেরই বা ভালবাসা দেখাব কেন?

পিভি সিন্ধুর নিচু রিটার্নটা নেটে লাগামাত্র ক্যারোলিনা মারিন যখন অলিম্পিক্স সোনার মাদকতায় উদ্বাহু, গোটা আনন্দবাজারের নিউজরুমকে দেখা গেল তুমুল হাততালিতে ফেটে পড়তে। টুইটার, ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামে উপচে পড়া সমবেত প্রতিক্রিয়ায় মনে হচ্ছে এই হাততালি একই সময় গোটা ভারত জুড়ে চলেছে যে, হে কন্যা কী যুদ্ধটাই না লড়লে! হেরেছ তো কী, এ তো বীরের মৃত্যু। গোটা দেশ তোমার জন্য গর্বিত।

গত রোববার দীপা কর্মকারও তো তাই। মধ্যিখানে সাক্ষী মালিক। একজন রুপো। একজন পদকহীন চতুর্থ। একজন ব্রোঞ্জ। গোটা দেশ অভূতপূর্ব ভালবাসার আস্তরণে ঢেকে দিয়েছে এঁদের কাঙ্খিত স্বপ্নে না পৌঁছনোর আক্ষেপকে।

সঞ্জয় মঞ্জরেকরের টুইটে জানা গেল, ত্রিনিদাদে গোটা ভারতীয় ক্রিকেট টিম আজ টিভির সামনে সিন্ধুর জন্য বসেছিল। দস্তুর এই যে, চিরকাল ক্রিকেটাররাই বড় ম্যাচে দেশকে একতাবদ্ধ করবে। জুলজুল করে তাকিয়ে থাকবে বাকি সব খেলা। অথচ রিও অলিম্পিক্স এমন বিচিত্র অভিজ্ঞতা যে হাইপ্রোফাইল ক্রিকেটসমাজ হাঁ করে দেখল, সাধারণ নাগরিক জীবন থেকে আবির্ভূত একটা দীপা বা একটা সিন্ধুকে।

কোহালিদের কথা ছেড়ে দিলাম। ভাবা যায় না বিষেণ বেদীর মতো দুর্মুখ যিনি এক কালে জঘন্য হারার পর নিজের টিমকে প্রশান্ত মহাসাগরে ফেলে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন, তিনি ব্যাডমিন্টন কন্যার ফাইনাল হারেও কেমন গদগদ। আগের দিন সিন্ধুর মনোভাবকে গাওস্করের সঙ্গে তুলনা করেছেন তো আজ গভীর সান্ত্বনা দিয়েছেন এই হারে।

ক্রিকেট ঝাঁকুনি সহ নড়ে বসেছে, বলিউড কি পিছিয়ে থাকে? শাহরুখ আর অমিতাভ একই সেন্টিমেন্ট সহ টুইট করেছেন, ‘দীপা আমরা তোমার ফ্যান।’ অলিম্পিক্স ক্রীড়াবিদদের প্রতি সেই যে তাঁদের উত্তাপ শুরু হয়েছে, আজও চলছে। সলমন খান যেমন রাতে গরমাগরম টুইট করেছেন, ‘মা-কে বললাম সিন্ধুর সঙ্গে যে আমার ছবি আছে, ভেবে গর্বিত।’

স্বাধীনতার উনসত্তর বছরে ক্রিকেট বাদ দিয়েও তো ক্রীড়াকীর্তি কিছু কিছু হয়েছে। আশির মস্কো অলিম্পিক্স সহ ভারত একাধিক বার হকিতে সোনা জিতেছে। অভিনব বিন্দ্রা একক অলিম্পিক্স সোনা দিয়েছেন। এশিয়ান গেমসে ফুটবল টিম সোনা জিতেছে। প্রকাশ পাড়ুকোন অল ইংল্যান্ড আর বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছেন। বিশ্বনাথন আনন্দ দাবায় বিশ্বজয়ী হয়েছেন। কিন্তু চলতি সপ্তাহে এই একটা রুপো, একটা ব্রোঞ্জ আর একটা চতুর্থ হওয়া গণ-আবেগকে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা যে মাত্রায় উদ্বেল করে দিয়েছে, তা নজিরহীন।

চরিত্ররা কেউ সম্পন্ন ঘরের প্রতিনিধি নন। তথাকথিত সম্পন্ন শহরেরও না। হায়দরাবাদ। রোহতক। আগরতলা। এই হল আঁতুড়ঘরের নমুনা। স্বচ্ছল শহর, উন্নত পরিকাঠামো, নিখুঁত বিজ্ঞানসম্মত প্রশিক্ষণ এঁদের কোথায় নিয়ে ফেলতে পারত অনুমান করা যায়? বরিস বেকার হতে চেয়েছিলেন ফুটবলার। স্টেফি গ্রাফ অ্যাথলিট। জার্মান ক্রী়ড়াবিজ্ঞান ব্যবস্থা এগারো বছর বয়সে দু’জনের কব্জি আর গোড়ালি এক্স-রে করে রায় দেয়, ওই দু’টো খেলার কোনওটাতেই এঁদের ভবিষ্যৎ লুকিয়ে নেই। ওঁদের ঢুকতে হবে টেনিসে। বাকিটা ইতিহাস।

ভারতীয় ক্রীড়ামহল গত কাল রাত থেকে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় সময় গুনছে যে, সিন্ধু যদি সোনা পান, তা হবে ক্রস ওভার জয়। গোটা দেশে ক্রীড়া-মানচিত্র নতুন চেহারায় দেখা দেবে। আট বছর আগে বিন্দ্রার শ্যুটিংয়ে সোনা যা দিতে পারেনি। পিজিএ-তে ভারতীয় গল্ফারের অগ্রগমন যে চেতনা জাগাতে ব্যর্থ।

আসলে উন্নতিশীল দেশে গল্ফ-শ্যুটিং এগুলোকে একটাই প্রিজমে মাপা হয়। বড়লোকের ফাটবাজি খেলা। কিন্তু ব্যাডমিন্টন তো রোজকার সভ্যতায় ফিট করে। দ্রুত তার সঙ্গে আইডেন্টিফাই করা যায়। এ তো খেলতে পারে আমার-আপনার ঘরের মেয়েরা। আমাদেরই এক প্রতিনিধি একুশ বছরের দীর্ঘাঙ্গিনী যদি নড়িয়ে দিতে থাকে ব্যাডমিন্টনের বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডকে, ডেসিবল তো বাড়বেই।

ব্যাডমিন্টনে বিশ্ব পর্যায়ের পারফরম্যান্সে পাঁচ বছরের বড় সাইনা নেহওয়াল সিন্ধুর অনেক আগে। কিন্তু সাইনার যেমন বড় টুর্নামেন্টের ফাইনাল টেম্পারামেন্ট আকর্ষণীয় নয়। চরিত্র হিসেবেও তিনি অনুপ্রেরণামূলক নন। মেজাজে বড় বেশি ধ্রুপদী। আলাপ, ঝালা এই সব সূক্ষ্ম কাজ যারা বোঝে তাদের ভাল লাগবে। বাকিদের উৎসাহিত করবে না। এ দিনই যেমন টুইটারে এক ফ্যান বলেছে, ‘সাইনা প্যাক আপ ইওর ব্যাগস অ্যান্ড গো। আমরা নিজেদের লোক পেয়ে গিয়েছি।’ সাইনা আবার ভদ্রতা করে সেই ক্রীড়ামোদীকে উত্তর দিয়েছেন, ‘ঠিকই। সিন্ধু খুব ভাল খেলছে।’

সিন্ধু আসলে মূর্তিমান ব্যান্ডের গান। অন ইওর ফেস। উদ্ধত, বেগবান, নির্ভয়ী যৌবন। এ দিন নয়াদিল্লি থেকে এক ভক্ত বলছিলেন, ‘‘সিন্ধু হল ব্রায়ান লারা। যে দিন খেলবে কেউ দাঁড়াবে না।’’ এ হেন কন্যা যে গোটা দেশকে রাত সাড়ে সাতটায় টিভির সামনে এনে রাস্তাঘাট ফাঁকা করে দেবেন তাতে অবাক কী!

অস্ট্রেলিয়ানরা বলে থাকে গ্যালান্ট লুজার বলে কোনও অভিব্যক্তি তাদের স্পোর্টিং অভিধানে নেই। এ জন্য নেই যে, ভাল খেলে পরাজিত হয় সেই লোকটা যে বেশির ভাগ দিন হারে। আর বড় ম্যাচ অবধারিত হারে। আজ রাত্তিরের সিন্ধু, রোববার রাতের দীপা একেবারেই তা নন। অনুন্নত ক্রীড়াব্যবস্থাকে বাহন করেও কী বাঘিনীর লড়াই দিয়েছেন এঁরা। আর তাই তো হারেও একটা আবেশ ছড়িয়ে গিয়েছে গোটা দেশে। হে কন্যা, তোমরা যথার্থ বীর, তোমাদের জন্য গর্ব করাই যায়।

কোথাও যেন একটা সন্তুষ্টিও আছে এঁরা কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছয়নি তো পরের বার আবার লড়বে। উঠবে, পড়বে। কিন্তু জিতে শেষ করে আসবে।

ক্রিকেটের বাইরে অন্য খেলার ক্রীড়াবিদদের চিরকাল অভিযোগ থেকেছে যে, মিডিয়া আমাদের দেখে না। আমাদের কেউ পোছে না। ব্লেম ইট অন রিও যে, তিন কন্যার মিলিত দাপটে সযত্নে লালিত সেই আফসোস মেকওভারের মুখে।

একেবারে নতুন আঙ্গিক ভারতীয় খেলাধুলো জগতে। নতুন সময়! নতুন যুগ! হয়তো বা নতুন সমর্থনের ধরনও!

এই সিন্ধু, এই সাক্ষী, এই দীপারাও এখন ভারতীয় খেলাধুলোর নতুন মুখ। একমাত্র কোহালি ও দলবলেরা নন। রিও বোধহয় ভারতীয় খেলাধুলোর ইতিহাসে মোড় ঘোরানো অলিম্পিক্স হয়ে থাকল। যেখানে বিজিতর সঙ্গে বিজয়ীর আবেগে কোনও পার্থক্য করা হয়নি! চূড়ান্ত লড়াই। পিছিয়ে গিয়ে ফিরে আসা। আবার পিছিয়ে পড়া। শেষমেশ হেরে যাওয়া রেকর্ড বিচারে নিষ্ঠুর হতে পারে। একশো কুড়ি কোটির চেতনায় বোধহয় এক রোম্যান্টিক স্বপ্নের ইন্টারভ্যাল হিসেবে গেঁড়ে থাকল।

সিন্ধুর সোনা নিরুদ্দেশ ঠিকই কিন্তু আরও ভরি-ভরি সোনার হদিশ কি সামনে দেখা যাচ্ছে না?

Rio Olympics PV Sindhu Badminton
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy