×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০৭ মার্চ ২০২১ ই-পেপার

খেলা

ক্রিকেটের জন্য গুরুদ্বারে রাত কাটাতে হত পন্থকে

নিজস্ব প্রতিবেদন
২০ জানুয়ারি ২০২১ ১০:৫১
প্রত্যেক সপ্তাহের শেষে মায়ের সঙ্গে উত্তরাখণ্ডের রুরকি থেকে দিল্লি যেতেন তিনি। প্রশিক্ষক তারক সিনহার কাচে ক্রিকেট শিখতে। থাকার জায়গা ছিল না রাজধানীতে। আর্থিক সঙ্গতি ছিল না হোটেল ভাড়া করার। তাই মা-ছেলে থাকতেন গুরুদ্বারে। ঋষভ পন্থের শিক্ষণপর্ব সাক্ষী থেকেছে দীর্ঘ পরিশ্রমের।

পন্থের জন্ম ১৯৯৭ সালের ৪ অক্টোবর, হরিদ্বারে। তাঁর বাবার নাম রাজেন্দ্র পন্থ। মা, সরোজ পন্থ। দিদি সাক্ষীর সঙ্গে পন্থের বেড়ে ওঠা রুরকিতে। দেহরাদূনের ইন্ডিয়ান পাবলিক স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রটির জীবনের প্রথম কোচ তারক সিনহা। ছাত্রের ব্যাটিং অনুশীলনের দিকে নজর দিতেন তারক। ভাল ব্যাটসম্যান হওয়ার জন্য বলতেন চোখ এবং হাতের সমন্বয় সাধনের কথা।
Advertisement
উইকেট কিপিংয়ের পাশাপাশি ব্যাটিং উন্নত করার ক্ষেত্রে কোচ তারকের কাছে কৃতজ্ঞ পন্থ। আবার তারকেরই আর একটি সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি তাঁর ক্ষেত্রে। অনূর্ধ্ব ১৩ এবং অনূর্ধ্ব ১৫ স্তরে খেলার জন্য পন্থকে রাজস্থানে পাঠিয়েছিলেন তারক।

কিন্তু অভিযোগ, সেখানে সঙ্কীর্ণ রাজনীতির কোপে বন্ধ হতে বসেছিল পন্থের কেরিয়ার। তিনি চলে আসেন দিল্লিতে। এর পরই তাঁর কেরিয়ারের পালে হাওয়া লাগে। ২০১৫-’১৬ মরসুমে তাঁর আত্মপ্রকাশ রঞ্জি ট্রফিতে। ২০১৬ সালে রঞ্জি ট্রফির ইতিহাসে তিনি দ্রুততম শতরানের মালিক হন। ঝাড়খণ্ডের বিরুদ্ধে দিল্লির হয়ে শতরান করেন মাত্র ৪৮ বলে।
Advertisement
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে গৌতম গম্ভীরের কাছ থেকে দিল্লির রঞ্জি দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পান পন্থ। তার আগের বছরই অবশ্য সুযোগ পেয়েছেন আইপিএল-এ। ১ কোটি ৯০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে তাঁকে নেয় দিল্লি ডেয়ারডেভিলস। যে দিন নিলাম হয়েছিল, সে দিন পন্থ ব্যস্ত ছিলেন অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে শতরান করে ভারতকে সেমিফাইনালে নিয়ে যেতে।

জাতীয় দলের দরজা তাঁর জন্য খুলে যায় টি-২০ ম্যাচ দিয়ে। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে টিম ইন্ডিয়ার হয়ে টি-২০ ম্যাচে খেলেন তিনি। প্রতিপক্ষ ছিল ইংল্যান্ড। তখনও অবধি তিনি ছিলেন ভারতের হয়ে সবথেকে কম বয়সে (১৯ বছর ১২০ দিন) আন্তর্জাতিক টি-২০ তে আত্মপ্রকাশ করা ব্যাটসম্যান। পরে এই রেকর্ড ভেঙে দেন ওয়াশিংটন সুন্দর। তিনি প্রথম টি-২০ খেলেছেন ১৮ বছর ৮০ দিন বয়সে।

প্রথম টেস্ট ম্যাচও পন্থ খেলেন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে। ২০১৮ সালের অগস্টে। সে বছরই ওয়ান ডে ম্যাচে শুরু হয় তাঁর অভিযান। প্রথম ম্যাচে তিনি মুখোমুখি হন ওয়েস্ট ইন্ডিজের।

 এখনও অবধি ১৬ টেস্টে তিনি মোট ১০৮৮ রান করেছেন। গড় ৪৩.৫২। সর্বোচ্চ ১৫৯। কট বিহাইন্ড করেছেন ৬৭ জনকে। স্টাম্পিংয়ের শিকার ২ জন। ১৬টি ওয়ান ডে-তে রান করেছেন ৩৭৪। গড় ২৬.৭১। সর্বোচ্চ রান ৭১। উইকেটের পিছনে ক্যাচ নিয়েছেন ৮টি। স্টাম্প করেছেন ১ জন ব্যাটসম্যানকে। ২৮ টি টি-২০ ম্যাচে রান করেছেন ৪১০। গড় ২০.৫০। সর্বোচ্চ ৬৫। ক্যাচ নিয়েছেন ৭ টি। স্টাম্পিংয়ে আউট করেছেন ৪ জনকে।

বাঁ হাতি ব্যাটসম্যান ঋষভের প্রিয় শট পুল। তবে ছেলের এই খ্যাতি দেখে যেতে পারেননি ঋষবের বাবা রাজেন্দ্র পন্থ। ২০১৭ সালে তিনি হৃদরোগে মারা যান। তাঁর শেষকৃত্যের দু’দিন পরেই আইপিএল ম্যাচে দুরন্ত ব্যাটিং করেন পন্থ।

অনেকেই জানেন না পন্থ একজন দক্ষ জিমন্যাস্টও। সতীর্থরা জানেন পন্থ দুষ্টুমি করতে ভালবাসেন। তবে একইসঙ্গে তিনি খুব আবেগপ্রবণও। মাঠে অবশ্য যথেষ্ট লড়াকু পন্থ। ব্যাট-বলের পাশাপাশি কম যান না অস্ট্রেলীয়দের সঙ্গে বাক্ যুদ্ধেও। বার বার স্লেজিংয়ে জড়িয়ে পড়েছেন তিনি।

সদ্য শেষ হওয়া সিরিজে মেলবোর্ন টেস্টে পন্থের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয় ম্যাথু ওয়েডের। ভারতীয় উইকেটকিপারকে দেখা যায়, সারা ক্ষণ স্টাম্পের পিছন থেকে কথা বলে যাচ্ছেন। তাতেই সম্ভবত বিরক্ত বোধ করেন ওয়েড। একটা সময়ে তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে পন্থকে লক্ষ্য করে বলতে থাকেন, ‘‘তোমার এত ওজন বেশি কেন? কত কিলো বেশি তোমার? ২৫ কিলো হবে নিশ্চয়ই। না ৩০ কিলো?’’

উইকেটের পিছন থেকে পন্থও সমানে কথা বলে যেতে থাকেন। স্টাম্প মাইক্রোফোনে অনেক সময়ে শোনা যাচ্ছিল সে সব কথা। এক বার উত্যক্ত হয়ে ওয়েড বলে ওঠেন, ‘‘বিগ স্ক্রিনে দেখছ তুমি কী করছ? দেখো, দেখো।’’ পন্থ সেই সময়ে বেশি কিছু বলেননি, শুধু ওয়েডের দিকে তাকিয়ে থেকে হাসছিলেন। তাতে আরও মেজাজ হারান ওয়েড।

গত অস্ট্রেলিয়া সফরে পন্থকে রাগিয়ে দিতে টিম পেন বলেছিলেন, ‘‘ধোনি এসে গেলে তো তুমি বাইরে বসবে। আমাদের বিগ ব্যাশ টিমে চলে এসো। আমাদের সঙ্গেই থেকো। বাচ্চার দেখভাল করতে পারো তো? আমরা স্বামী-স্ত্রী তা হলে একটু সিনেমা দেখে আসব।’’ বল-বিকৃতি কেলেঙ্কারির জেরে সেই সিরিজে স্টিভ স্মিথ অধিনায়কত্ব হারিয়ে নির্বাসিত হয়েছিলেন। তখনই অধিনায়ক হন টিম পেন।

ব্যক্তিগত জীবনের সম্পর্ক নিয়েও লুকোচুরি নেই পন্থের। প্রেমিকা ঈশা নেগির সঙ্গে ছুটি কাটানোর ছবি মাঝে মাঝেই পোস্ট করেন তিনি। গত বছর জানুয়ারিতে ঈশার সঙ্গে পাহাড়ে বরফের মধ্যে ছুটি কাটানোর ছবি পোস্ট করেছিলেন তিনি।

সঙ্গে লিখেছিলেন, ‘তুমি পাশে থাকলেই নিজেকে বেশি ভাল লাগে।’ একই ধরনের ছবি ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেছেন ঈশাও। ছবির সঙ্গে লিখেছেন, ৫ বছর ধরে তাঁরা সম্পর্কে রয়েছেন। এবং আগামী দিনেও থাকবেন। ২০১৮-১৯ মরসুমের অস্ট্রেলিয়া সফর থেকে ফেরার পরও ঈশার সঙ্গে ছবি ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেছিলেন তিনি।

তবে তার আগে ঋষভের সঙ্গে অভিনেত্রী ঊর্বশী রৌতেলার সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন ছড়িয়েছিল। দু’জনকে একসঙ্গে নৈশভোজেও দেখা গিয়েছিল। কিন্তু ঈশাকে নিয়ে ঋষভের পোস্ট যাবতীয় জল্পনায় জল ঢালে।

কেরিয়ারে সাফল্যের পাশাপাশি এসেছে ব্যর্থতাও। কিপিংয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঋদ্ধিমান সাহা এবং লোকেশ রাহুলের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই তাঁকে জায়গা করে নিতে হয় দলে।

ক্রিকেটমহলের মতে, কিপিংয়ে ঋদ্ধিমান এগিয়ে থাকলেও ব্যাটিংয়ে তাঁকে পিছনে ফেলে দিচ্ছেন পন্থ। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে গাব্বা টেস্টের শেষ দিনে তাঁর অপরাজিত ৮৯ জয়ের অন্যতম অনুঘটক। ফলে ঋদ্ধিমানের সামনে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে পড়ল। মত, ক্রিকেট মহলের।

তবে বহু বার ব্যর্থতার মুখোমুখি হওয়া ঋষভও জানেন, জাতীয় দলের জায়গা সবসময়েই কণ্টকাকীর্ণ। চাপের পাশাপাশি জীবনে হাল্কা ভাবেই থাকতে ভালবাসেন তিনি। সতীর্থদের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক বাঁধা সেই তারেই।

রোহিত শর্মার সঙ্গে খুবই অন্তরঙ্গ পন্থ। এক বার হোটেলে পন্থের ঘরে চূড়ান্ত অগোছালো ছবি শেয়ার করেছিলেন রোহিত। মজা করে ক্যাপশন দেন, ‘কিংবদন্তিসম পন্থের ঘর!’

তবে সব কিছু ছাপিয়ে অস্ট্রেলীয়দের যোগ্য জবাব দিয়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের নয়নের মণি এখন ধোনি-গিলক্রিস্টের এই তরুণ ভক্ত।