Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৫ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

আঁতুড়ঘরে সমর্থন প্রিয় নায়ককে

স্মিথ ফিরতে চান মানুষের হৃদয়ে, বলছেন ক্লাব কোচ

সুমিত ঘোষ 
সিডনি ০২ জানুয়ারি ২০১৯ ০৩:৪৬
উন্মাদনা: শৈশবের ক্লাবে এলে এখনও এ ভাবেই স্মিথকে নিয়ে উত্তাল হয়ে ওঠে নতুন প্রজন্ম। ফাইল চিত্র

উন্মাদনা: শৈশবের ক্লাবে এলে এখনও এ ভাবেই স্মিথকে নিয়ে উত্তাল হয়ে ওঠে নতুন প্রজন্ম। ফাইল চিত্র

গ্লেন ম্যাকগ্রা ওভাল— অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শহরের অভ্যন্তরে গেলে এমন দর্শনীয় মাঠ অনেকই দেখা যাবে। চারদিকে গাছপালায় ঘেরা মনোরম পরিবেশ, পাখি ডাকছে, পুরনো আমলের ক্রিকেট মাঠের মতো বাউন্ডারি লাইনে যত্ন করে কাঠের ফেন্স তৈরি করা। যেখানে কোনও টিভি ক্যামেরা পৌঁছয় না। লাইভ কভারেজ নেই। স্টাম্প মাইক্রোফোন লাগানোর প্রশ্ন নেই যে, কে কী স্লেজিং করল শোনা যাবে।

মুম্বইয়ের আজাদ ময়দান বা শিবাজি পার্কের মতো অস্ট্রেলিয়াতে এই মাঠগুলোই হচ্ছে স্বপ্নকে লালন করার জায়গা। যেখানে কিশোর প্রতিভারা তৈরি হচ্ছে ক্রিকেট নিবেদিত কোচেদের হাতে। সম্প্রতি যদিও অস্ট্রেলিয়ার গ্রেড ক্রিকেটের আর পাঁচটা মাঠকে ছাপিয়ে শিরোনামে উঠে এসেছে ম্যাকগ্রা ওভাল। কারণ, কোনও এক স্টিভ স্মিথ। এখানকার সাদারল্যান্ড ক্লাবেই কিশোর স্মিথের ক্রিকেটে হাতেখড়ি। এখানেই প্রথম তাঁর প্রতিভা ধরা পড়ে। আর বল-বিকৃতি কেলেঙ্কারির জেরে সাসপেন্ড হওয়ার পরে এখানেই প্রথম তাঁর দেশের স্বীকৃত ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় খেলেন তিনি।

নতুন বছরের প্রথম দিনে স্মিথের পাড়ায় ক্রিকেট দরজা খুলে কেউ বসে নেই। সবাই ছুটিতে চলে গিয়েছে। সাদারল্যান্ড ক্লাবের এক কর্তা জানালেন, আগামী বারো-তেরো দিন এখানে ক্রিকেটের নামগন্ধও নেই। সকলের আলোচনায় অবশ্যই সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডের ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়া সিরিজের শেষ টেস্ট।

Advertisement

ফোনে পাওয়া গেল সাদারল্যান্ড ক্লাবের নামী কর্তা টম আইসটনকে। এই ক্লাবের কমিটিতে বিভিন্ন পদে টম আছেন প্রায় সাঁইত্রিশ বছর ধরে। কোষাধ্যক্ষ, সচিব, নির্বাচক-প্রধান নানা ভূমিকায় দেখা গিয়েছে তাঁকে। অনেক নামী ক্রিকেটারই তাঁর চোখের সামনে বেড়ে উঠেছে। স্মিথকে একদম ছোটবেলা থেকে দেখছেন। প্রথম থেকে দেখার অভিজ্ঞতা শোনাতে গিয়ে বললেন, ‘‘শুরুতে খুব আহামরি কিছু মনে হয়নি। তবে পনেরো বছর বয়সে আমাদের ক্লাবের হয়ে খেলে ও সেরা অনূর্ধ্ব-১৬, সেরা অনূর্ধ্ব-২১ ক্রিকেটার এবং বর্ষসেরা ক্রিকেটারের পুরস্কার পায়। এখানে আরও একটা পুরস্কার দেওয়া হয়। প্লেয়ার্স প্লেয়ার। মানে সব প্লেয়ারের সেরা প্লেয়ার। সেটাও প্রায় জিতে যাচ্ছিল। তখনই আমরা বুঝে যাই, আমাদের ক্লাবে বিশেষ এক প্রতিভা জন্ম নিয়েছে।’’

ছোটবেলার মতোই টম খুব কাছ থেকে স্মিথকে দেখেছেন সম্প্রতি ক্লাবের হয়ে খেলতে আসার সময়ে। বল-বিকৃতির জেরে সারা দেশে খলনায়ক হয়ে যাওয়া অস্ট্রেলীয় অধিনায়ককে তাঁর আঁতুড়ঘরে ট্রেনিং করতে দেখে মুগ্ধ হয়ে যান টম। বলছিলেন, ‘‘ওর চোখের মধ্যে সেই পুরনো জেদ আর স্বপ্ন দেখেছি আমি। ক্লাবের ছেলেদের সঙ্গে নিয়মিত ভাবে ট্রেনিং করেছে। এত বড় ক্রিকেটার হয়ে যাওয়ার পরেও ক্লাব টিমের রুটিন মেনে চলেছে। আমাদের ক্লাবের উঠতিদের জন্য সেটাই তো সব চেয়ে বড় শিক্ষা। যত বড়ই হও না কেন, পরিশ্রেমর রুটিন যেন একই থাকে।’’

টমের চেয়েও ছেলেবেলার মাঠে ফেরার সেই কয়েকটা দিন স্মিথের সঙ্গে বেশি সময় কাটিয়েছেন ড্যানিয়েল রিক্সন। প্রাক্তন অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার এবং কোচ স্টিভ রিক্সনের ছেলে। এখন তিনিই সিডনির গ্রেড ক্রিকেটের ক্লাব সাদারল্যান্ড ক্লাবের কোচ। প্রত্যাবর্তনের জন্য কতটা তৈরি স্মিথ? তাঁর সঙ্গে সাদারল্যান্ডের ড্রেসিংরুমে কাটানো ড্যানিয়েল বললেন, ‘‘মানসিক ভাবে চ্যালেঞ্জটা নেওয়ার জন্য পুরোপুরি তৈরি স্মিথ। বিশেষ করে এক বছর বাইরে থাকায় বাড়তি প্রতিজ্ঞা রয়েছে যে, আমাকে আবার মানুষের মন জয় করে নিতে হবে ভাল পারফরম্যান্স দিয়ে। আমার মনে হয়, ভাগ্যকে মেনে নিয়েছে স্মিথ। যা ঘটে গিয়েছে, সেটাকে অতীত মনে করে এগিয়ে যেতে চায়। ফিরতে চায় মানুষের হৃদয়ে।’’

স্মিথের মানসিক দৃঢ়তার গল্পের অভাব নেই ম্যাকগ্রা ওভালে। এক বার যেমন সাদারল্যান্ডের হয়ে ম্যাচ খেলছিলেন স্মিথ। তখন বয়স ষোলো। উল্টো দিকে অভিজ্ঞ এক জন বোলার সমানে তাঁকে স্লেজিং করে যাচ্ছিলেন। অনেক্ষণ ধরে সহ্য করার পরে শেষ পর্যন্ত স্মিথ গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করল, আপনার বয়স কত? বোলার জানালেন, তিরিশ বছর। কেন? সঙ্গে সঙ্গে স্মিথের পাল্টা স্লেজিং, ‘‘তিরিশ বছর হয়ে গেল, এখনও গ্রেড ক্রিকেটে পড়ে আছেন!’’

বল-বিকৃতি অধ্যায়ের দুই চরিত্র অধিনায়ক স্মিথ এবং সহ-অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নার দু’জনেই সিডনির। তাই ভূকম্পনের মাত্রা এখানেই সব চেয়ে বেশি ছিল। টম আইসটন এখনও সেই রাতের কথা মনে করে বলে ফেলেন, ‘‘বিশ্বাস হয় না!’’ তবে স্মিথ ছোটবেলার মাঠে ফেরার সময় দর্শক উপস্থিতি এবং তাঁদের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হয়েছে, তাঁর ক্রিকেটীয় আঁতুড়ঘর প্রাক্তন অধিনায়ককে ক্ষমা করে দিয়েছে। ‘‘মাঠে অনেক লোকই এসেছিলেন খেলা দেখতে। তাঁরা স্মিথকে ভবিষ্যতের জন্য শুভেচ্ছা জানিয়ে গিয়েছেন। অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য লম্বা লাইন পড়ে গিয়েছিল। স্মিথকে দেখে মনে হচ্ছিল, সমর্থকদের উষ্ণতা ওকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল,’’ বলছেন টম।

কোচ ড্যানিয়েল আবার মুগ্ধ স্মিথের ব্যবহারে। ‘‘আমি আর স্টিভ স্মিথকে কী কোচিং করাব? বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যানকে পেয়ে আমি বরং ওকে বলেছিলাম, যদি ছেলেদের সঙ্গে একটু কথা বলে যেতে পারে,’’ বলছিলেন তিনি, ‘‘সঙ্গে সঙ্গে শুধু রাজিই হয়নি, ম্যাচের পরে আলাদা করে প্রায় ঘণ্টাখানেক ক্লাবের ছেলেদের সময় দিয়েছে স্মিথ।’’ সাদারল্যান্ড ক্লাবের স্পনসরের তরফে অনুরোধ এসেছিল, স্মিথকে রেখে যদি ডিনারের আয়োজন করা যায়। আইসটন-রা সেটা স্মিথকে জানাতে তিনি এক কথায় থাকতে রাজি হয়ে যান। ডিনারে ফের ক্লাবের কিশোর ক্রিকেটারদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সেই উৎসাহী কিশোরদের মধ্যে ছিল কোনও এক অস্টিন ওয়-ও। স্টিভ ওয়ের পুত্র। সতেরো বছরের অস্টিনও খেলছে সাদারল্যান্ডের হয়ে। আর তাঁর খেলা দেখতে প্রায়ই হাজির হয়ে যান তাঁর বাবা। ড্যানিয়েল কয়েক বার স্টিভকেও নিয়ে এসেছেন ছেলেদের সঙ্গে কথা বলার জন্য। বরাত জোরে দুই স্টিভেরই পরামর্শ পেয়ে গিয়েছে সাদারল্যান্ড ক্লাবের উঠতিরা।

প্রত্যাবর্তনের রাস্তায় স্মিথের সব চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের উন্নত মান, বলছেন সাদারল্যান্ডের কোচ ড্যানিয়েল। এক বছর ধরে তিনি যেটা থেকে দূরে রয়েছেন। দারুণ উদাহরণ দিলেন তিনি, ‘‘ক্যামেরন ব্যানক্রফ্‌ট বিগ ব্যাশে ফিরে তিন বল টিঁকেছে। যে বলটায় ও আউট হয়, তার গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৪৯ কিলোমিটার। ওই গতিতে গ্রেড ক্রিকেটে কেউ বল করে না। স্মিথ আমাদের ক্লাবের হয়ে খেলেছে ঠিকই। সেঞ্চুরি করেছে। তবে গ্রেড আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট— দু’টোর মধ্যে গুণগত মানে প্রচুর তফাত।’’

আইসটন জানালেন, সাদারল্যান্ডের জার্সি-টুপি পরে আপাতত আর দেখা যাবে না স্মিথকে। ‘‘যত দূর জানি, দু’দিনের মধ্যে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে খেলতে চলে যাবে ও। এই মুহূর্তে আর আমাদের ক্লাবের হয়ে খেলার সম্ভাবনা নেই,’’ বললেন তিনি। বিরাট কোহালি বনাম স্টিভ স্মিথ লড়াইটাই যে দেখা গেল না সিরিজে, তার জন্য আফসোস হচ্ছে না? আপনি কি সিডনিতে টেস্ট দেখতে যাবেন? জিজ্ঞেস করা মাত্র কেমন চুপ করে গেলেন সাদারল্যান্ড ক্লাবের উচ্চ কর্তা। বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস। কোথাও যেন ভারতীয় সাংবাদিক পেয়ে বলার চেষ্টা তোমাদের সেরার সঙ্গে আমাদের সেরার দ্বৈরথই হল না, কী আর মাঠে যাব! কিন্তু প্রিয় সন্তানের গায়ে কলঙ্কের দাগ লাগার গ্লানি চেপে শুধু বললেন, ‘‘দেখি।’’

আরও পড়ুন

Advertisement