ইস্টবেঙ্গলের স্প্যানিশ কোচ আলেসান্দ্রো মেনেন্দেস সোমবারও জোর গলায় বলেছেন, ‘‘আই লিগ অনেক লম্বা। অনেক ম্যাচ বাকি। প্রচুর ওঠা-নামা হবে। খেতাবের লড়াই থেকে আমরা এখনও পিছিয়ে যাইনি।’’ আইজল এবং চেন্নাই সিটি এফ সি-র কাছে হারের পর লিগ টেবলে জনি আকোস্তারা এখন রয়েছেন আট নম্বরে।
চার্চিল ব্রাদার্সের কাছে হার এবং চেন্নাইয়ের সঙ্গে ড্র করার পর মোহনবাগানের বঙ্গসন্তান কোচ শঙ্করলাল চক্রবর্তীরও কোনও হা-হুতাশ নেই। বরং তার গলা থেকে বেরিয়েছে, ‘‘লিগ শীর্ষে থাকা চেন্নাইয়ের সঙ্গে আমাদের পয়েন্টের ফারাক মাত্র আট। এটা কিছুই নয়।’’
এগারো দলের আই লিগে প্রত্যেকটি দলকে খেলতে হবে কুড়িটি করে ম্যাচ। তার অর্ধেকও খেলেনি কোনও দল। কলকাতার দুই প্রধানের দুই কোচ আশাবাদী হতেই পারেন। কিন্তু যে ভাবে গত তিন বারের চোখে না-পড়া একটি দল চেন্নাই এফ সি, বা অবনমনে পড়েও খেলার সুযোগ পেয়ে যাওয়া চার্চিল ব্রাদার্সের মতো দল কলকাতার দুই প্রধানকে তাদের মাঠেই নাস্তানাবুদ করে হারিয়ে গিয়েছে, তাতে এ বারও কলকাতায় খেতাব আসবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়ে গিয়েছে। পনেরো বছর খেতাব জেতেনি লাল-হলুদ জার্সি, চার বছর জেতেনি সবুজ-মেরুন। এ বারও কি পারবে? না কি আইজল, মিনার্ভার মতো এ বারও চেন্নাইয়ের কাছে মাথা নোয়াতে হবে শতাব্দীপ্রাচীন বা ছুঁতে যাওয়া দুই ক্লাবকে? সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে।
লিগ টেবল এবং সূচির দিকে চোখ রাখলে মনে হচ্ছে, এখনই ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে এ বারও কলকাতায় ট্রফি আসা কিন্তু কঠিন। কেন? সাত ম্যাচ খেলে লিগ টেবলে অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছে চেন্নাই। সাত ম্যাচে ১৭ পয়েন্ট নিয়ে তারা অপরাজেয়। বহু দিন পর শুরুতেই আই লিগের কোনও দল এ রকম উল্কার গতিতে এগোচ্ছে। তাদের তিন স্প্যানিশ ফুটবলার সর্বোচ্চ গোল করার তালিকায় চার্চিলের উইলিস প্লাজার পরেই। স্প্যানিশ আর্মাডা যদি হয় চেন্নাই কোচ আকবর নওয়াসের প্রধান অস্ত্র, তা হলে চার্চিলের হয়ে ফুল ফোটাচ্ছেন কলকাতার দুই বাতিল ফুটবলার উইলিস প্লাজা এবং খালিদ আউচো। গত বছর চার্চিলের অবনমন হয়েছিল। গোয়া থেকে কোনও দল নেই বলে তাদের সুযোগ দিয়েছে ফেডারেশন। সেই চার্চিলই এখন লিগ টেবলে ছয় ম্যাচে ১০ পয়েন্ট নিয়ে দু’নম্বরে। যেটা দেখার তা হল, এক) চেন্নাই এবং চার্চিল—একটা ম্যাচও হারেনি এখনও। দুই) দুটো দলই কলকাতার দুই প্রধানের কাছ থেকে নিয়ে গিয়েছে পয়েন্ট। দু’ম্যাচে চেন্নাই কেড়ে নিয়েছে চার পয়েন্ট। আর চার্চিল এক ম্যাচেই পেয়েছে তিন পয়েন্ট।
লিগ বরাবরই সাপ-লুডোর মতো। কেউ ওঠে, কেউ নামে। লিগের অঙ্ক হল, চ্যাম্পিয়নের লড়াইতে থাকতে হলে শীর্ষে থাকা দলকে যেমন হারাতে হবে বা হারতে হবে, আবার নিজেদেরও জিততে হবে। দু’বার মোহনবাগানকে জাতীয় লিগ (পরে যা আই লিগ হয়) দেওয়া কোচ সুব্রত ভট্টাচার্য বলছিলেন, ‘‘লিগ টেবলের যা অবস্থা দেখছি, তাতে আমাদের এখানকার দুটো দলকেই পরপর দু’তিনটে ম্যাচ জিততেই হবে।
দশটা ম্যাচের পর যদি চেন্নাই এ রকম এগিয়ে থাকে, তা হলে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাবে ওদের। তখন ধরা মুশকিল।’’ আর ইস্টবেঙ্গলকে প্রথম জাতীয় লিগ দেওয়া কোচ মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের যুক্তি, ‘‘চেন্নাই দলটা খুব ধারাবাহিক। আইজল, মিনার্ভা গত দু’বার চ্যাম্পিয়ন হলেও এই ধারাবাহিকতা কিন্তু ছিল না ওদের। যে বার আমি ইস্টবেঙ্গলকে চ্যাম্পিয়ন করেছিলাম, সে বার ২০টা ম্যাচ খেলে মাত্র একটায় হেরেছিলাম। আমি বলছি না যে, খেতাব পাওয়া সম্ভব নয়। বরং বলব, কাজটা খুব কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। জেতার ধারাবাহিকতা দেখাতে হবে।’’ দুই প্রাক্তন সফল কোচেরই মন্তব্য, ‘‘কলকাতার মাঠ থেকে যেভাবে ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগানকে হারিয়ে বা ড্র করে চেন্নাই বা চার্চিল পয়েন্ট পয়েন্ট নিয়ে গেল, সেটা পরের দিকে ওদের সুবিধা দেবেই।’’ তবে দুজনেরই অঙ্কে চার্চিল নেই। তাঁদের মতে, চেন্নাই এ বার ফেভারিট। লিগ টেবলের হিসাবে চেন্নাইয়ের ১৩টি ম্যাচ বাকি আছে। ইস্টবেঙ্গলের ১৬টি আর মোহনবাগানের ১৪টি ম্যাচ বাকি।
চেন্নাইয়ের বিরাট সুবিধা পরের ছ’টি ম্যাচের মধ্যে পাঁচটি ম্যাচই খেলবে ঘরের মাঠে। তার মধ্যে একটা আবার ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে। আসা-যাওয়ার ধকল পোহাতেও হবে না সান্দ্রো রদ্রিগেজদের। যে সুবিধা কলকাতার দুই প্রধান পাচ্ছে না। চেন্নাই কোচের মাথা ব্যথার কারণ অবশ্য হতে পারে কোয়ম্বত্তূরের গরম। কারণ দলের স্তম্ভ চার স্প্যানিশ ফুটবলার এই গরম কতটা মানিয়ে নিতে পারবেন তার উপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। চেন্নাইয়ের প্রথম একাদশের প্রায় সব ভারতীয় ফুটবলার অবশ্য ভূমিপুত্র। চেন্নাইয়ে গিয়ে চেন্নাই বা গোয়ায় গিয়ে চার্চিলকে না হারাতে পারলে আলেসান্দ্রো বা শঙ্করলালের খেতাব যুদ্ধে ফেরা কঠিন!