Advertisement
E-Paper

দুই দৈত্যের যুদ্ধে দর্শক বাকি বিশ্ব

কোরকোবাদো পাহাড়ের কোল ঘেঁষে একত্রিশ টাওয়ারের গেমস ভিলেজ। চারপাশের বস্তি আর টিলা ভেদ করে আকাশের দিকে মাথা তোলা দৈত্যকায় বাড়িগুলো ছোটবেলার সেই কবিতাটা মনে পড়ায়— ‘তালগাছ এক পায় দাঁড়িয়ে...।’

রতন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ১৮ অগস্ট ২০১৬ ০৩:৫৭
দুই কিংবদন্তি। যুক্তরাষ্ট্রের মাইকেল ফেল্পস। (ডান দিকে) চিনের লং কিংকোয়ান।

দুই কিংবদন্তি। যুক্তরাষ্ট্রের মাইকেল ফেল্পস। (ডান দিকে) চিনের লং কিংকোয়ান।

কোরকোবাদো পাহাড়ের কোল ঘেঁষে একত্রিশ টাওয়ারের গেমস ভিলেজ। চারপাশের বস্তি আর টিলা ভেদ করে আকাশের দিকে মাথা তোলা দৈত্যকায় বাড়িগুলো ছোটবেলার সেই কবিতাটা মনে পড়ায়— ‘তালগাছ এক পায় দাঁড়িয়ে...।’

সাওপাওলো থেকে রিও আসার পথে ব্রাজিল এয়ারলাইন্সের বিমানসেবিকা ঘোষণা করেছিলেন, ‘‘জানলা দিয়ে বাঁ দিকে তাকান, ওটাই অলিম্পিয়ানদের থাকার জায়গা।’’ গেমস ভিলেজ দর্শন সেই প্রথম। বিশাল জায়গা। তবে কোন দেশ কোথায় আছে, জানতে বেশি খাটতে হবে না। কঠোর পরিশ্রম করে আসার পর উচ্ছ্বাস, আবেগের বিস্ফোরণ আর স্বপ্ন দেখার ধাত্রীগৃহ যে জায়গাটা, সেখানে ঢুকলেই দেখা যাবে বিভিন্ন জানলা থেকে উড়ছে নানান দেশের পতাকা। পদক পেলে দেশের পতাকা গায়ে জড়িয়ে ভিকট্রি ল্যাপ দেন ওঁরা, বা পাগলের মতো ওড়ান আকাশে।

এত দেশের মধ্যে ভিলেজের রাস্তায় ইতি-উতি সেলফি তুলতে থাকা অ্যাথলিটদের আগ্রহ অবশ্য শুধু দু’টো টাওয়ার নিয়ে। যে দু’টোয় ডেরা গেঁড়েছে অলিম্পিক্সের দুই সুপার পাওয়ার— যুক্তরাষ্ট্র আর চিন। গত কয়েকটা অলিম্পিক্সে এই দুই দেশ ছিল এক এবং দু’নম্বর। এ বার কী হবে? ইতিমধ্যেই সামান্য হলেও পিছিয়ে পড়েছে চিন। যুক্তরাষ্ট্র (৮৪) সবার আগে দৌড়চ্ছে, অশ্বমেধের ঘোড়ার মতো। আপাতত গ্রেট ব্রিটেন দু’নম্বরে। তিনে চিন। এই পিছিয়ে পড়া নিয়ে তাদের সংবাদমাধ্যম এতটুকু চিন্তিত নয়। চিনের অন্তত চারশো সাংবাদিক এসেছেন এখানে। তাঁদের অন্যতম, চিনা ডেইলির জং তেং বলছিলেন, ‘‘আমরা যা সমীক্ষা করেছি তাতে আমেরিকাকে টপকাতে না পারলেও কাছে চলে যাব। অপেক্ষা করুন, এখনও তো কয়েক দিন বাকি।’’

যুক্তরাষ্ট্র বনাম চিন অলিম্পিক্স সম্মান-যুদ্ধ ঠিক কোন পর্যায়ের তা দু’দেশের সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যায়। রিওয় কে ক’টা পদক পেতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দু’টো দেশ যা করেছে শুনলে চমকে যেতে হবে। মনে পড়বে পশ্চিমবাংলায় ক’মাস আগের বিধানসভা নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর গণনার আগের কয়েকটা দিন। নিয়েলসনের চেয়ে অনেক গুণ বড় এক অস্ট্রেলিয়ান ও এক ব্রিটিশ সমীক্ষা-সংস্থাকে দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অ্যাথলিটদের অবস্থা, কে পেতে পারেন পদক, তার সমীক্ষা করে চিন। দুই সমীক্ষাতেই ২০১৫-র পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে চিন ৩৯-৪০টি সোনা পাবে বলা হয়েছিল (এ পর্যন্ত চিন পেয়েছে ১৯টি)।

সোনাই যেহেতু টেবল টপারের মাপকাঠি সে জন্য সোনার সংখ্যাই বলা হয়েছে শুধু। যা শুনে জোটের সূর্যকান্ত বা আব্দুল মান্নানরা ভোট পরবর্তী পর্বে যে রকম বলেছিলেন সেই ভঙ্গিতে চিনের শ্যেফ দ্য মিশন চুং ওয়াং হে বললেন, ‘‘সমীক্ষায় জল আছে। আমরা আরও বেশি পেয়ে এ বার সুপার পাওয়ার হব।’’

আর যুক্তরাষ্ট্র? তাদের অলিম্পিক্স কমিটির সিইও স্কট ব্ল্যাকমানকে দেখতে অনেকটা তৃণমূলের পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মতো। কথার ভঙ্গিও। মোটাসোটা ভদ্রলোক বলছিলেন, ‘‘আমাদেরও সমীক্ষা করা আছে। অলিম্পিক্সের শেষ দিন দেখবেন ওদের মুখগুলো।’’ জানা গিয়েছে, সিমন গ্লেভসের সংস্থাকে দিয়ে গত চার মাসে চার বার বিশ্বব্যাপী সমীক্ষা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রতি দেশের হাল হকিকত জানতে। গ্লেভস জানিয়েছেন, ৪১ সোনা-সহ ১০২টি পদক আসছে। ৩১ সোনা-সহ ৭৮টি পদক পাবে চিন। এক আর দু’নম্বর ঠিক হয়ে আছে।

কিংবদন্তি মাইকেল ফেল্পস অ্যান্ড কোম্পানির সঙ্গে লন্ডন অলিম্পিক্সের বিস্ময় সাঁতারু য়ি শিওয়েনদের লড়াই ঘিরে শেষ চার-পাঁচ দিন কোপাকাবানার পাশে সমুদ্রের জল উথাল পাতাল হবেই। গেমস ভিলেজের ঘরে ঘরে পাওয়া যাবে আনন্দাশ্রু বা স্বপ্নভঙ্গের কান্না। উচ্ছ্বাস আর হতাশা। আলো অথবা অন্ধকার। আর খেলার জগতের গ্লোবাল সুপার পাওয়ার কে— চিন না যুক্তরাষ্ট্র, তা ঠিক হয়ে যাবে অগস্টের ২১-এ।

যুদ্ধটা কোন পর্যায়ে মালুম হয় মিডিয়া সেন্টারে চিনা বা পশ্চিমী সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললেই। যাঁরা বলছেন যুক্তরাষ্ট্র যে খেলাগুলো শাসন করে, সেই অ্যাথলেটিক্স, সাঁতার, সেলিং বা ক্যানোয়িংয়ে আধিপত্য বাড়াতে চিন চেষ্টার কসুর করেনি। আবার চিন যে খেলাগুলোয় পদক পেতে পারে সেই ইভেন্টগুলোয় নজর রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।

চিন যেমন ‘রিও মিশন ১০৪’ (লন্ডনে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পদক ছিল ১০৩) সামনে রেখে গত চার বছর প্রস্তুতি সেরেছে, তেমনই যুক্তরাষ্ট্র সোনার সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যে ক্রীড়াবিদদের ঘরের দেওয়ালে লিখে রেখেছে, ‘‘গোল্ড, গোল্ড, গোল্ড।’’ রূপো আর ব্রোঞ্জ যেন অপাঙক্তেয়। যুক্তরাষ্ট্র মহিলা ফুটবল দলের এক সদস্য যখন বলছেন, ‘‘শুধু সোনাই আমাদের দেশে মর্যাদা পায়,’’ শুনে কেমন যেন অস্বস্তি হয়। সোনা নয়, আমাদের একশো কুড়ি কোটির দেশ যে কোনও পদক পেলেই তো বর্তে যায়!

রিওয় যুক্তরাষ্ট্রই এ বার সবথেকে বড়, ৫৫৫ জনের দল পাঠিয়েছে। ৩০৬টা ইভেন্টের মধ্যে ২৪৪টিতেই লড়ছে তারা। আর চিন? যুক্তরাষ্ট্রকে পিষে মারতে যারা মরিয়া, তারা এখনও পিছিয়ে অনেকটা। ৪১৬ জনের দল নিয়ে তারা লড়ছে ২১০ ইভেন্টে। তবে চিনের আসল ইভেন্ট বেশ কিছু বাকি।

কাউন্ট়ডাউন চলছে। আগুনে যুদ্ধও। এই যুদ্ধে আমরা দর্শক মাত্র। ভারতের ১১৯ জনের দল এই যুদ্ধে লিলিপুট। এখনও কোনও পদক নেই। তার উপর নরসিংহ যাদবের ডোপ- কলঙ্ক। এখানে এসেও তিনি রিংয়ে না নামতে পারলে এমন লজ্জার নজির অলিম্পিক্সে প্রথম হবে।

কলঙ্ক গলাধঃকরণ আর দৈত্যদের পদক-যুদ্ধের দাপাদাপি দেখা ছাড়া আমাদের আর যে কিছু করারও নেই!

China USA Rio Olympics
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy