মোহালি টেস্ট শুরু হতে বাকি আর দিন দশেক। কিন্তু তার আগে জোড়া বিতর্কে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গেল ভারতীয় ক্রিকেটে।
এক দিকে, এক তরুণীকে মারধরের অভিযোগে বেঙ্গালুরু পুলিশ গ্রেফতার করল ভারতের জাতীয় দলের লেগস্পিনার অমিত মিশ্রকে। পরে মিশ্রকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হল ঠিকই, কিন্তু আসন্ন মোহালি টেস্ট তিনি খেলছেনই নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। অন্য দিকে, ভারতীয় টিম ডিরেক্টর রবি শাস্ত্রী বনাম ওয়াংখেড়ে পিচ প্রস্তুকারক সুধীর নায়েক যুদ্ধের আগুনেও নতুন করে ঘৃতাহুতি হল। যে বিতর্কে সুনীল গাওস্কর থেকে সঞ্জয় মঞ্জরেকর— সবাই ঢুকে পড়লেন। গাওস্কর ভারতীয় টিম ডিরেক্টরের নাম না করে শুনিয়ে রাখলেন যে, ভারত মোটেও ওয়াংখেড়ে পিচের কারণে সিরিজের শেষ ওয়ান ডে-তে জঘন্য ভাবে হারেনি। মঞ্জরেকর আবার শাস্ত্রীর নাম করলেন। বলে রাখলেন যে, ওয়াংখেড়ে পিচ প্রস্তুতকারকের সঙ্গে যে ব্যবহার করেছিলেন শাস্ত্রী, তা মাত্রা ছাড়িয়েছে।
দু’টো ঘটনা বিশদে কী কী?
গত সেপ্টেম্বর মাসে ভারতীয় লেগস্পিনার অমিত মিশ্রর বিরুদ্ধে বেঙ্গালুরু পুলিশের কাছে শারীরিক নিগ্রহের অভিযোগ দায়ের করেন এক তরুণী। অভিযোগনামার নির্যাস—মিশ্রর অনুপস্থিতিতে, ভারতীয় ক্যাম্প চলাকালীন তাঁর হোটেল রুমে গিয়েছিলেন ওই তরুণী। একটু পরে মিশ্রও সেখানে আসেন এবং দু’জনের মধ্যে তুমুল বাগবিতণ্ডার পর মিশ্র নাকি তাঁকে শারীরিক ভাবে নিগ্রহ করেন। যার পরই মিশ্রর নামে এফআইআর দায়ের করা হয়।
দিন কয়েক আগে বেঙ্গালুরু পুলিশ ভারতীয় স্পিনারকে শমন পাঠিয়ে জানায় যে, সাত দিনের মধ্যে অশোকনগর থানায় হাজিরা দিতে। যার পর মঙ্গলবার সেখানে উপস্থিত হন অমিত। এবং তিন ঘণ্টা জেরার পর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। পরে জামিনে অমিত মুক্তি পেয়ে যান ঠিকই, কিন্তু তাঁর টেস্ট ভবিষ্যৎ কী হতে যাচ্ছে, এখনও নিশ্চিত নয়।
ভারতীয় বোর্ডের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত সরকারি কোনও বিবৃতি পেশ করা না হলেও আইপিএল চেয়ারম্যান রাজীব শুক্ল বলেছেন যে, মিশ্রর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তাঁর খেলা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। বলেছেন, ‘‘আমি এটুকু বলতে পারি যে, বোর্ড ব্যাপারটা দেখছে। যখনই হাতে সব কাগজপত্র এসে পৌঁছবে, আমরা সেটা নিয়ে বসব। আমরা দেখব, মিশ্র সত্যিই অপরাধটা করেছে কি না। বোর্ড যতক্ষণ না কোনও সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, ততক্ষণ নির্বাচকরা অমিতকে নিতেই পারেন।’’ ঘটনা হল, ইতিমধ্যেই মোহালি ও বেঙ্গালুরু দু’টো টেস্টের টিমে অমিতকে রাখা হয়েছে। প্রশ্নটা এখন, এর পরেও অমিতকে সেখানে রাখা হবে, নাকি কোনও বিকল্প বাজিয়ে দেখা হবে?
শোনা গেল, বোর্ড নাকি চার্জশিটের সব কাগজপত্র চেয়ে পাঠিয়েছে। আইনজীবীদের দিয়ে যা খতিয়ে দেখা হতে পারে। বোর্ডমহলে কারও কারও ধারণা হল, আইন যে পথেই চলুক, বোর্ডের শাস্তি থেকে নাকি বাঁচা মুশকিল আছে অমিতের। বলা হচ্ছে, ভারতীয় লেগস্পিনার বোর্ডের ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ ভেঙেছেন। বোর্ডের অনুমতি না নিয়ে কোনও মহিলাকে হোটেল রুমে আনার অধিকার তাঁর নেই। অতএব, এটা নাকি আগে যাবে বোর্ডের দুর্নীতিদমন শাখার কাছে। তার পর বোর্ডের আইনজীবীদের হাত ঘুরে শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির কাছে। যে কমিটি শাস্তি ঠিক করবে অমিতের। কিন্তু ৫ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া মোহালি টেস্টে তাঁর নামা? কারও কারও অভিমত হল, বিকল্পের কথা ভাবা উচিত। কারণ, অমিতের বিরুদ্ধে পুলিশি ব্যাপারস্যাপার যে আজই শেষ হয়ে গেল, এমন নয়। কোর্ট-কাছারি তো বটেই, পুলিশের কাছেও হাজিরা দিতে হতে পারে। আর মোহালি টেস্ট চলাকালীন যদি অমিতকে ডেকে পাঠানো হয়, তখন কী হবে? টেস্ট ছেড়ে তো তাঁর পক্ষে যাওয়া সম্ভব হবে না। তার চেয়ে হরভজন সিংহের মতো কাউকে নেওয়া যায় কি না, ভেবে দেখা উচিত। যদিও আগামী বৃহস্পতিবার বিয়ে হরভজনের।
ভরত-শাস্ত্রী জুটি। —ফাইল চিত্র
দাক্ষিণাত্যে অমিত মিশ্রকে নিয়ে যখন দিনভর এমন টালবাহানা চলল, পশ্চিমাঞ্চলে তখন আবার অন্য বিতর্কের আগুন গোটা দিন জ্বলল। ওয়াংখেড়ে পিচ নিয়ে গত কালই রবি শাস্ত্রী বনাম সুধীর নায়েক লেগেছিল। অভিযোগ উঠে গিয়েছিল যে, শাস্ত্রী পিচ নিয়ে কিউরেটর নায়েককে গালিগালাজ করেছেন। যে বিতর্ক এ দিনও থামল না। একের পর এক প্রাক্তন ঢুকে পড়লেন ঘটনাপ্রবাহে। এবং মুম্বই ক্রিকেট সংস্থা জানিয়ে দিল যে, আগামী ৩০ অক্টোবর সংস্থার ম্যানেজিং কমিটির বৈঠকে ব্যাপারটা উঠবে।
যা খবর, তাতে এমসিএ ভাইস প্রেসিডেন্ট দিলীপ বেঙ্গসরকর এখন দু’পক্ষকে নিয়ে বসে একটা মিটমাটের রাস্তা খুঁজবেন। এবং শাস্ত্রী যতই কোনও কোনও মিডিয়ায় দাবি করুন যে, তিনি নায়েককে গালিগালাজ করেননি, মুম্বই ক্রিকেটমহলে অনেকেই নিশ্চিত তিনি সেটা করেছেন। বেঙ্গসরকরের প্রচেষ্টায় দু’পক্ষে মিটমাট হবে কি না, সময় বলবে। কিন্তু বর্তমানে প্রাক্তন ক্রিকেটারদের কেউ কেউ শাস্ত্রীর আচরণে বেশ ক্ষুব্ধ। যেমন সঞ্জয় মঞ্জরেকর। প্রাক্তন জাতীয় ক্রিকেটার টুইট করে লিখেছেন, ‘সুধীর নায়েকের সঙ্গে রবি শাস্ত্রীর আচরণ সীমা ছাড়িয়েছে। একজন টেস্ট ক্রিকেটারকে ও অপমান করেছে।’ বিনোদ কাম্বলীও টুইট করে একহাত নিয়েছেন শাস্ত্রীকে। গাওস্কর শুধু নাম করেননি। তাঁর বক্তব্য, ভারত হেরেছে ওয়াংখেড়ে উইকেটের কারণে নয়। হেরেছে, নিজেদের জঘন্য বোলিং এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিংয়ের কারণে।
দুইয়ে মিলে কী দাঁড়াল?
টি-টোয়েন্টি, ওয়ান ডে সিরিজে হারের পর আসন্ন টেস্ট সিরিজে বিরাট কোহলিদের ভাগ্যে কী আছে, জানা নেই। কিন্তু আপাতত জোড়া বিতর্কের মেঘে ভারতীয় ক্রিকেটের আকাশ ভাল রকম ঘোলাটে।
জোড়া বিতর্কে টিম ইন্ডিয়া
কাঠগড়ায় অমিত মিশ্র
অভিযোগ হোটেলে নিজের ঘরে মহিলাকে শারীরিক নিগ্রহ করেন।
ধারা আইপিসি ৩২৫, ৩৫৪। দু’টোই জামিনযোগ্য।
যা হল মঙ্গলবার তিন ঘণ্টা জেরার পর গ্রেফতার। কিছুক্ষণ বাদেই জামিনে মুক্তি।
যা হতে পারে বোর্ডের রিপোর্ট যেতে পারে নীরজ কুমারের দুর্নীতিদমন শাখার কাছে। শৃঙ্খলাভঙ্গের অপরাধে শাস্তি দিতে পারে বিসিসিআই।
প্রশ্ন উঠছে যে ক্রিকেটার ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ ভেঙেছেন বলে অভিযোগ, তাকে কি অভিযোগমুক্ত হওয়ার আগে জাতীয় দলে রাখা উচিত?
কাঠগড়ায় রবি শাস্ত্রী
অভিযোগ পিচ প্রস্তুতকারক সুধীরকে গালাগালি। অভিযুক্ত বোলিং কোচ ভরত অরুণও।
বোর্ড কী বলছে আইপিএল চেয়ারম্যান রাজীব শুক্ল বলেছেন, অর্ডারি পিচ তৈরিতে বোর্ড সমর্থন দেয় না। মুম্বই ক্রিকেট সংস্থা বৈঠক ডেকেছে ৩০ অক্টোবর।
প্রাক্তনরা যা বলছেন সুনীল গাওস্কর শাস্ত্রীর নাম না করে বলেছেন, ওয়াংখেড়ের পিচ হারের কারণ নয়। সঞ্জয় মঞ্জরেকর শাস্ত্রীর নাম করে বলেছেন, সুধীর নায়েকের সঙ্গে তাঁর আচরণ সীমা ছাড়িয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে এমসিএ-র কর্মীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহারের জন্য যদি শাহরুখ খান সাসপেন্ড হন, তা হলে পিচ প্রস্তুতকারককে গালাগালি করার জন্য শাস্ত্রীর শাস্তি হবে না কেন?