বনগাঁ পুরসভার পুরপ্রধান তৃণমূলের শঙ্কর আঢ্যের ‘অনৈতিক’ কাজের প্রতিবাদে দলের ১১ জন কাউন্সিলর অনাস্থা প্রস্তাব আনলেন। 

শুক্রবার সকালে বনগাঁর মহকুমাশাসকের কাছে দলীয় কাউন্সিলররা এ সংক্রান্ত চিঠি জমা দিয়েছেন। মহকুমাশাসক কাকলি মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘কাউন্সিলরদের চিঠি পেয়েছি। পরবর্তী পদক্ষেপ করা হচ্ছে।’’

এই ঘটনায় বনগাঁ ও জেলা তৃণমূলের অন্দরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। লোকসভা ভোটের ফল বের হওয়ার পর থেকেই অবশ্য বনগাঁয় এই নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। দিন কয়েক ধরে বনগাঁ শহরের মানুষের আলোচনার বিষয় ছিল, পুরসভার কয়েক জন কাউন্সিলর বিজেপিতে যোগ দেবেন না তো? পুরপ্রধানের বিরুদ্ধে তাঁদের ক্ষোভের কথা কম বেশি দীর্ঘদিন ধরেই জানতেন এলাকার অনেকেই। ঘনিষ্ঠ মহলে ওই সব কাউন্সিলররা জানাতেন, দলের জেলা নেতৃত্ব নাকি তাঁদের সব ক্ষোভের কথা কানেই তোলেন না।      

প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, পুরসভার মোট ২২ আসনের মধ্যে তৃণমূলের দখলে এখন রয়েছে ২০টি আসন। একটি করে আসন পেয়েছে কংগ্রেস ও সিপিএম। ২০১৫ সালের পুরসভা ভোটে প্রথমবারের জন্য তৃণমূল একক ভাবে এই পুরবোর্ড দখল করেছিল। 

কেন কাউন্সিলরেরা অনাস্থা আনলেন? লোকসভা ভোটে এ বার পুরসভার ২২টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২১টি ওয়ার্ডে তৃণমূল প্রার্থী মমতা ঠাকুর পিছিয়ে ছিলেন। কাউন্সিলর অভিজিৎ কাপুরিয়া বলেন, ‘‘লোকসভা ভোটে আমরা বনগাঁ পুর এলাকা থেকে প্রায় ২০ হাজার ভোটে পিছিয়ে রয়েছি। ভোটের ফল বের হওয়ার পরে আমরা কাউন্সিলররা এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পেরেছি, তাঁরা পুরপ্রধানের বিরুদ্ধে ক্ষোভের জন্য তৃণমূলকে ভোট দেননি। পুরপ্রধানের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ  মানুষ মানতে পারছেন না। মানুষ আমাদের জানিয়েছেন, তাঁরা তৃণমূলের বিরুদ্ধে নন। তাঁরা ব্যক্তির বিরুদ্ধে। আমরা তাই পুরপ্রধানকে চাই না।’’ 

মনোতোষ নাথ নামে এক কাউন্সিলরের কথায়, ‘‘কাউন্সিলর হিসাবে আমাদের কোনও গুরুত্বই নেই। সব ওয়ার্ডের কাজ উনি নিজেই করেন।’’ এক মহিলা কাউন্সিলর বলেন, ‘‘আমার ওয়ার্ডে উন্নয়নমূলক কী কাজ হচ্ছে তা আমিও জানতে পারি না। একবার পুরপ্রধান আমাকে এমন অপমান করেছিলেন, আমি কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম।’’ 

মহকুমাশাসকের কাছে অনাস্থা প্রস্তাবের চিঠি দিয়ে কাউন্সিলররা বনগাঁ উত্তর কেন্দ্রের তৃণমূল বিধায়ক বিশ্বজিৎ দাসের সঙ্গে দেখা করে ক্ষোভের কথা জানান। দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বিধায়ক তাঁদের দল না ছাড়বার পরামর্শ দিয়েছেন। পরে পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গেও বিদ্রোহী কাউন্সিলররা ফোনে কথা বলেন। জেলা তৃণমূল সভাপতি জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বলেন, ‘‘পুরপ্রধানের বিরুদ্ধে কাউন্সিলরদের অনাস্থার বিষয়টি জানতে পেরেছি। পুরমন্ত্রী ওদের সঙ্গে বসবেন। কাউন্সিলরদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।’’

লোকসভা ভোটের প্রচারে বিজেপির বারাসত সাংগঠনিক জেলার সহ সভাপতি দেবদাস মণ্ডল বনগাঁ শহরে পথসভা করে দাবি করেছিলেন, ‘‘ভোটের ফল প্রকাশের পরে পুরবোর্ড ভেঙে যাবে।’’ কয়েকজন কাউন্সিলর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলেও তিনি দাবি করেন। 

তৃণমূল থেকে পাল্টা সভা করে কাউন্সিলররা ওই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এ দিন দেবদাস বলেন, ‘‘অনেক আগেই পুরপ্রধানের বিরুদ্ধে কাউন্সিলরদের প্রতিবাদ করা উচিত ছিল। শেষ পর্যন্ত তাঁরা যে সাহস ও সততার পরিচয় দিলেন, সে জন্য বিজেপির তরফে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’’      

অনাস্থা চেয়ে চিঠি দেওয়া কাউন্সিলরদের কি বিজেপিতে যোগ দেওয়ার কোনও সম্ভাবনা রয়েছে?

বিদ্রোহী কাউন্সিলররা অবশ্য  তেমন সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁদের কথায়, ‘‘আমাদের দল ছেড়ে যাওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই। মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি আমাদের আস্থা রয়েছে।  তবে পুরপ্রধানকে সরাতেই হবে।’’ অভিজিৎ বলেন, ‘‘এ দিন আমাদের সঙ্গে পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের কথা হয়েছে। উনি জানিয়েছেন, আমরা যা চাইছি তাই হবে। ১২ জুনের পরে তিনি আমাদের সঙ্গে বসবেন।’’ বনগাঁর প্রাক্তন বিধায়ক তৃণমূলের গোপাল শেঠ বলেন, ‘‘কাউন্সিলরদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। তবে সকলে দলের সঙ্গেই রয়েছেন। দলের নেতারা সকলের সঙ্গে বসে তাঁদের ক্ষোভের সমাধান করবেন।’’               

পুরসভার একমাত্র সিপিএম কাউন্সিলর মানবেন্দ্র কর্মকার গোটা ঘটনা নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি। ঘোলা জলে রাজনৈতিক লাভের আশা দেখছে কংগ্রেসও। বনগাঁ শহর কংগ্রেস সভাপতি কৃষ্ণপদ চন্দ বলেন, ‘‘কংগ্রেস কাউন্সিলরকে যদি অনাস্থা আনা তৃণমূল কাউন্সিলররা পুরপ্রধান পদে সমর্থন করেন তাহলে আমরা তৃণমূলকে সমর্থন করব। না হলে আমরা ভোটদানে বিরত থাকব।’’  

দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, পুরপ্রধান শঙ্কর আঢ্য এলাকার বাইরে রয়েছেন। এক কাউন্সিলর সেই সূত্রে বলেই ফেললেন, ‘‘পুরপ্রধান এলাকার বাইরে না থাকলে, হয় তো অনাস্থা আনার সাহস পেতাম না।’’