• নিজস্ব সংবাদদাতা
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

বেলাগাম বিল, শয্যার অভাবে সঙ্কটে রোগী

Corona
বেসরকারি হাসপাতালে লাগামছাড়া খরচের অভিযোগ করোনা আক্রান্তদের পরিবারের। ছবি: রয়টার্স।

গুরুতর কোভিড আক্রান্তের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় শয্যার অভাব এবং বেসরকারি হাসপাতালে লাগামছাড়া খরচ। এই দুইয়ের মধ্যে পড়ে নাভিশ্বাস উঠছে অনেক পরিবারেরই। চিকিৎসকদের একাংশের বক্তব্য, রাজ্যে সংক্রমণের গোড়াপত্তনের সাড়ে চার মাস পরেও দু’টি মূল সমস্যার সমাধান এখনও সে ভাবে করা যায়নি।

কোভিড আক্রান্ত রোগীর পরিজনের প্রতিদিন কী ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে, তা জানলেই চিকিৎসকেরা কেন এ কথা বলছেন তা বোঝা সম্ভব। বেহালার বাসিন্দা এক মাঝবয়সির পরিজনের অভিজ্ঞতা যেমন। পেশায় শিক্ষক ওই ব্যক্তির গত ২১ জুলাই জ্বর আসে। দেহের তাপমাত্রা একশোর কাছাকাছি ছাড়া শারীরিক কষ্ট বলতে সে ভাবে কিছু ছিল না। শনিবার সন্ধ্যায় আক্রান্তের স্ত্রী পালস অক্সিমিটারে দেখেন, বছর সাতচল্লিশের শিক্ষকের দেহে অক্সিজেনের মাত্রা কমে ৭৯ হয়ে গিয়েছে! তৎক্ষণাৎ কোথাও শয্যা না-পেয়ে ঠাকুরপুকুরের একটি নার্সিংহোমে রোগীকে ভর্তি করানো হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় পর দিন সেখান থেকে মিন্টো পার্কের একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর হন আক্রান্ত। উন্নত চিকিৎসার জন্য আপাতত এক্সট্রাকর্পোরিয়াল মেমব্রেন অক্সিজিনেশন (ইকমো) পদ্ধতিতে ইএম বাইপাসের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনি। শুক্রবার পর্যন্ত তিনটি হাসপাতাল মিলিয়ে কোভিড আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় খরচ হয়েছে সাড়ে ১৪ লক্ষ টাকা!

দমদমের বাসিন্দা ৭৮ বছরের এক বৃদ্ধার বুধবার কোভিড ধরা পড়ে। স্বাস্থ্য দফতরের পরামর্শমতো বাড়িতেই ছিলেন রোগী। বৃহস্পতিবার রাত থেকে তাঁর শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমতে শুরু করে। সারা রাত শহরের একাধিক হাসপাতালে শয্যার খোঁজ করেও আইসিইউ বেড পাননি পরিজন। সকালে বৃদ্ধার দেহে অক্সিজেনের মাত্রা কমে ৮৮ হয়ে যায়। পরিজনের প্রাণ বাঁচাতে বিপুল খরচের কথা না-ভেবে ইএম বাইপাসের বেসরকারি হাসপাতালে আক্রান্তকে ভর্তি করানো হয়।

আরও পড়ুন: করোনার সঙ্গে লড়াইয়ে টিকে থাকতে কী কী প্রয়োজন? কী বললেন চিকিৎসকেরা?

বস্তুত, বেসরকারি হাসপাতালে কোভিড চিকিৎসায় অনিয়ন্ত্রিত বিল বৃদ্ধির একের পর এক অভিযোগের নিরিখে প্রতি সপ্তাহে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এ ধরনের মামলা শুনানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য কমিশন। এ দিনও পাঁচটি মামলার শুনানি হয়েছে। তার মধ্যে একটিতে কোভিড নেগেটিভ রোগীর কাছ থেকে আনন্দপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে পিপিই বাবদ অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই অভিযোগ রয়েছে বেলঘরিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে। দু’ক্ষেত্রেই টাকা ফেরতের জন্য নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। কোভিড চিকিৎসায় অতিরিক্ত বিল সংক্রান্ত দু’টি মামলাও ছিল এ দিনের শুনানির তালিকায়। রোগীর আত্মীয়দের একাংশের বক্তব্য, পিপিই’র জন্য প্রতিদিনের খরচ রাজ্য সরকার বেঁধে দিয়েছে। এর পরেও সেই প্রবণতায় যে রাশ টানা যায়নি, তা তো কমিশনে নথিভুক্ত অভিযোগের তালিকা থেকেই স্পষ্ট। তা হলে কোভিড চিকিৎসার খরচ নিয়ে বহু প্রতীক্ষিত নির্দেশিকার অনুপস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে কী অসম্ভব আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে তা সহজে অনুমেয় বলে বক্তব্য ভুক্তভোগীদের।

আরও পড়ুন:২৪ ঘণ্টায় রাজ্যে সর্বোচ্চ সংক্রমণ, ফের মৃত্যু ডাক্তারের

রাজ্য প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট বলা হচ্ছে, যে সব বেসরকারি হাসপাতালকে কোভিড হাসপাতাল বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, তার যাবতীয় খরচ বহন করছে রাজ্যে সরকার। সেখানে রোগীদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা কোনওমতেই নিতে পারেন না কর্তৃপক্ষ। আর যে সব বেসরকারি হাসপাতাল  কোভিড হাসপাতাল নয়, সেখানে এমন লাগামছাড়া খরচের অভিযোগ সরকারের অজানা নয়, রোগীর আত্মীয়েরা স্বাস্থ্য কমিশনেও যাচ্ছেন। কিন্তু মুশকিল হল, সেই সব হাসপাতালের তরফে আবার পাল্টা আদালতে আর্জি জানানো হয়েছে। ফলে সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে না।

রোগীদের জন্য আর একটি গুরুতর সমস্যা, সময়মতো বেড না পাওয়া। চিকিৎসকদের একাংশের পর্যবেক্ষণ, মোট সংক্রমণের নিরিখে হাসপাতালে কত জন ভর্তি রয়েছেন, সেই পরিসংখ্যান থেকে পরিস্থিতি সম্পর্কে আভাস পাওয়া সম্ভব। স্বাস্থ্য দফতরের ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সরকার এবং সরকার অধিগৃহীত হাসপাতাল মিলিয়ে  এ রাজ্যে মোট কোভিড শয্যার সংখ্যা ১১২৯৯টি। তাতে রোগী ভর্তি রয়েছেন ৪৪৪০ জন (৩৯.২৯)। বেসরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট সেন্টারের শয্যা সংখ্যা বাদ দিলে মোট শয্যার সংখ্যা ২০৫৪টি। তাতে রোগী ভর্তি রয়েছেন ১৮২২ জন (৮৯ শতাংশ)।

এ রাজ্যে সংক্রমিত জেলাগুলির মধ্যে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর নিরিখে শীর্ষে রয়েছে কলকাতা এবং উত্তর ২৪ পরগনা। রাজ্যের মোট সরকারি শয্যার মধ্যে কলকাতায় রয়েছে ২২২২টি শয্যা। স্বাস্থ্য দফতরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এ দিনের তথ্য অনুযায়ী, তাতে ১৭৩৯ জন (৭৮.২৬ শতাংশ) রোগী ভর্তি রয়েছেন। উত্তর ২৪ পরগনায় ৮৬৮টি শয্যার মধ্যে রোগী ভর্তির সংখ্যা ৩৪০ জন (৩৯.১৭ শতাংশ)। সেখানে বেসরকারি হাসপাতালে কলকাতার জন্য বরাদ্দ ১৮১৯টি শয্যার মধ্যে ১৫৯৯টি (৮৮ শতাংশ) শয্যাই ভর্তি। উত্তর ২৪ পরগনায় ২৩৫টি শয্যার মধ্যে মাত্র ১২টি (৯৫ শতাংশ) বেড খালি রয়েছে! এদিন স্বাস্থ্য দফতরের করোনা বুলেটিনের তথ্য বলছে, বঙ্গে মোট অ্যাক্টিভ কেসের সংখ্যা এখন ২০২৩৩ জন। তার মধ্যে ৬২৬৯ জন হাসপাতালে ভর্তি থাকার অর্থ, প্রায় ৬৯ শতাংশ আক্রান্ত বাড়িতে বা সেফ হোমে রয়েছেন। বেহালার বাসিন্দা মাস্টারমশাই বা দমদমের বৃদ্ধা সেই ৬৯ শতাংশের তালিকাভুক্ত। তাঁদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সময়ের মধ্যে হাসপাতালে উপসর্গের নিরিখে শয্যার ব্যবস্থা করাই এখন চ্যালেঞ্জ রাজ্য সরকারের কাছে।

আরও পড়ুন: স্থানীয়দের ‘আপত্তি’তে কোভিড পজিটিভ বৃদ্ধের দেহ পড়ে রইল ১১ ঘণ্টা

কার্ডিওথোরাসিক সার্জন কুণাল সরকার বলেন, ‘‘দিনে দু’বার শরীরের তাপমাত্রা মাপার জন্য হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন নেই। কিন্তু মৃদু উপসর্গ থেকে যাঁরা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত এইচডিইউ, অক্সিজেন বেডের ব্যবস্থা করতে হবে। রাজ্যে ৬৯ শতাংশ করোনা আক্রান্ত বাড়ি বা সেফ হোমে রয়েছেন। এই সংখ্যাটা অনেক বেশি।’’ তাঁর বক্তব্য, স্বাস্থ্য দফতরের বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী রাজ্যে আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ৯৪৮টি। এইচডিইউ বা অক্সিজেন বেডের সংখ্যা যদি এর দ্বিগুণও ধরা হয় তা হলেও সংখ্যাটা পর্যাপ্ত নয়। চিকিৎসার খরচ বেঁধে দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘এটা হলে অনেক সুবিধা হত। সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গ একমাত্র রাজ্য যেখানে এখনও চিকিৎসার খরচ বেঁধে দেওয়া হয়নি।’’

হাসপাতালে ভর্তি-ছুটির প্রক্রিয়ায় গতি আনতে সরকারি-বেসরকারি ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসকদের নিয়ে দল গড়েছে স্বাস্থ্য ভবন। সেই পরিদর্শক দলের অন্যতম সদস্য তথা ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরামের সম্পাদক কৌশিক চাকী বলেন, ‘‘সরকারি বুলেটিন অনুযায়ী গড় বেড অকুপেন্সির হার হল ৪০ শতাংশ। এর পরও মানুষ কেন বেড পাচ্ছেন না, সেটা বুঝতেই সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিদর্শনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। প্রথম দিন রাজারহাট সিএনসিআই ঘুরে সেখানে এইচডিইউ বেড চালুর প্রস্তাব দিয়েছিলাম। ইতিমধ্যে সেখানে ৫০টি এইচডিইউ শয্যা চালুর সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছে বলে জেনেছি।’’ কোভিড চিকিৎসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘বেসরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রে কেন খরচ বেশি হচ্ছে তা ভাল ভাবে বিচারবিবেচনা করে রেট বেঁধে দেওয়া উচিত।’’

স্বাস্থ্য সচিব নারায়ণ স্বরূপ নিগম জানান, সরকারি হাসপাতালে শয্যার সমস্যা নেই। স্বাস্থ্য দফতরের কন্ট্রোল রুমে যাঁরা ফোন করছেন, তাঁদের শয্যার ব্যবস্থা করে দেওয়া হচ্ছে। তাঁর কথায়, ‘‘গুরুতর অসুস্থ হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন রয়েছে সারা রাজ্যে এমন রোগীর সংখ্যা দু’হাজারের বেশি নয়। তবুও যাঁদের থাকার প্রয়োজন নেই তাঁরা হাসপাতালে থেকে সমস্যা তৈরি করছেন।’’ তিনি জানান, আজ, শনিবার সাগর দত্তে ২৪টি আইসিইউ শয্যা চালু হচ্ছে। এম আর বাঙুরে ৬২ শয্যার নতুন আইটিইউ তৈরি হয়ে গিয়েছে। ১৫-৩১ অগস্টের মধ্যে প্রায় আড়াইশো এইচডিইউ শয্যা বৃদ্ধির কথা জানান তিনি।

(জরুরি ঘোষণা: কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের জন্য কয়েকটি বিশেষ হেল্পলাইন চালু করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এই হেল্পলাইন নম্বরগুলিতে ফোন করলে অ্যাম্বুল্যান্স বা টেলিমেডিসিন সংক্রান্ত পরিষেবা নিয়ে সহায়তা মিলবে। পাশাপাশি থাকছে একটি সার্বিক হেল্পলাইন নম্বরও।

• সার্বিক হেল্পলাইন নম্বর: ১৮০০ ৩১৩ ৪৪৪ ২২২
• টেলিমেডিসিন সংক্রান্ত হেল্পলাইন নম্বর: ০৩৩-২৩৫৭৬০০১
• কোভিড-১৯ আক্রান্তদের অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা সংক্রান্ত হেল্পলাইন নম্বর: ০৩৩-৪০৯০২৯২৯)

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন