চা নিয়েই হিসেব চাওয়া-পাওয়ার
লোকসভা ভোটের মরসুমে তা নিয়েই ‘চায় পে চর্চা’ শুরু হয়েছে উত্তরবঙ্গের সীমান্তবর্তী এই লোকসভা কেন্দ্রে। তৃণমূল, বিজেপি, আরএসপি এবং কংগ্রেস— ভোটের মাঠে প্রধান চারটি দলকেই পড়তে হচ্ছে চা বাগানের অভাব-অভিযোগ, ক্ষোভ ও প্রশ্নের মুখে।
vote

চার মূর্তি, কৃষ্ণনগর।

মফস্সলের রাস্তা হেলান দিয়ে আছে ভুটান পাহাড়ের গায়ে। শহর ঘিরে ডুয়ার্সের জঙ্গল আর চা বাগান। এই মনোরম সৌন্দর্য আর তার আড়ালে থাকা মনখারাপ নিয়ে সম্বৎসর পর্যটকদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে আলিপুরদুয়ার। 

মনখারাপ কেন? 

লোকসভা ভোটের মরসুমে তা নিয়েই ‘চায় পে চর্চা’ শুরু হয়েছে উত্তরবঙ্গের সীমান্তবর্তী এই লোকসভা কেন্দ্রে। তৃণমূল, বিজেপি, আরএসপি এবং কংগ্রেস— ভোটের মাঠে প্রধান চারটি দলকেই পড়তে হচ্ছে চা বাগানের অভাব-অভিযোগ, ক্ষোভ ও প্রশ্নের মুখে। প্রত্যেকটি দলের প্রার্থীও আশ্বাস দিচ্ছেন, তিনি জিতলে চা-শ্রমিকদের দুর্দশা ঘুচবে। 

আলিপুরদুয়ার লোকসভা কেন্দ্রে ৬২টি চা বাগান। তার মধ্যে ১১টা বন্ধ। যেগুলি খোলা, সেগুলিতেও শ্রমিকরা ন্যূনতম মজুরি, রেশন, চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। শ্রমিক-সন্তানরা স্থানীয় সরকারি স্কুলগুলিতে ভর্তি হয়। কিন্তু সে সব স্কুলে পরিকাঠামো ভাল না থাকায় পড়াশোনা বেশি দূর এগোয় না। অনেকে শ্রমিক মা-বাবা কষ্ট করে বেসরকারি স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করেন। কিন্তু তার খরচ বেশি দিন টানতে পারেন না। তাই স্কুলছুট বাড়ে। অথচ, দেশের চা বাগান সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী রেশন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা— এ সবই চা-শ্রমিকদের প্রাপ্য। 

যে লোকসভার একটা বড় অংশ বিপন্ন চা-শ্রমিক, তার মন বিষণ্ণ হওয়াই স্বাভাবিক।

চা-শ্রমিকরা অভিজ্ঞতার নিরিখে প্রশ্ন তুলছেন, রাজ্যের তৃণমূল সরকার তাঁদের রেশন বন্ধের ব্যবস্থা করল কেন? মজুরি আইনমাফিক আগে তাঁরা ৪০ পয়সা কেজি দরে মাসে ৪৫ কেজি চাল, গম বাগান মালিকদের থেকে রেশন হিসাবে পেতেন। রাজ্য সরকার ২ টাকা কেজি চাল দেওয়া শুরু করার পরে নির্দেশিকা জারি করে, ওই রেশনের আর প্রয়োজন নেই। এর ফলে গত তিন বছরে ১৩৮, ১৫০ বা ১৭৬ টাকা রোজের চা-শ্রমিকদের সংসারে অনটন আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ। ১৯৭৮ সালে বামফ্রন্ট সরকার ওয়েস্ট বেঙ্গল টি ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন তৈরি করে, যার কাজ ছিল বন্ধ চা বাগান অধিগ্রহণ করা। ২০১৫ সালে সেই কর্পোরেশন বিক্রি করে দেওয়া হল কেন, ভোটের মরসুমে সে প্রশ্নও তুলছেন চা-শ্রমিকরা।

দিল্লি দখলের লড়াইলোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

আলিপুরদুয়ার কেন্দ্রের বিদায়ী তৃণমূল সাংসদ এবং এ বারও এখানে ওই দলের প্রার্থী দশরথ তিরকের অবশ্য দাবি, ‘‘তৃণমূল সরকারের আমলে কয়েকটি বন্ধ চা বাগান খুলেছে, চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৬৭ টাকা থেকে বেড়ে ১৭৬ টাকা হয়েছে। চা-শ্রমিকরা জানেন আমাদের দলই তাঁদের বন্ধু। সেই কারণেই আমি লক্ষাধিক ভোটে জিতব।’’ ২০১৪ সালের লোকভা ভোটে দশরথবাবু জিতেছিলেন ২১ হাজার ৩৯৭ ভোটে।

আলিপুরদুয়ারের বিজেপি প্রার্থী জন বার্লার প্রতি চা-শ্রমিকদের প্রশ্ন, ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উত্তরবঙ্গে জনসভায় ডানকানের ৭টি চা বাগান অধিগ্রহণ করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা এখনও পূরণ হল না কেন? চা বাগানে ন্যূনতম মজুরি দৈনিক ৩৫০ টাকা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রায় তিন বছর আগে পড়শি রাজ্য অসমে সরকারে এসেছে বিজেপি। তা-ও এখনও বাস্তবায়িত হয়নি কেন? যার জবাবে বার্লা বলছেন, ‘‘রাজ্য সরকার আদালতে গিয়ে অসহযোগিতার পথ নিয়েছে। তাই এখনও ডানকানের বাগানগুলি কেন্দ্র অধিগ্রহণ করতে পারেনি। আর অসমে বিজেপির নতুন সরকার। তাকে তো একটু সময় দিতে হবে! নিশ্চয়ই তারা আশ্বাস পূরণ করবে।’’

তবে বার্লা সম্পর্কে বিরোধী শিবিরের আরও একটি প্রচার আছে। জন আদিবাসী বিকাশ পরিষদের নেতা ছিলেন। তখন তিনি ছিলেন গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার বিরোধী। পরে মোর্চা নেতা বিমল গুরুঙ্গ যখন সমতলের ১২৬টি মৌজা সমেত গোর্খাল্যান্ডের দাবি তোলেন, তখন তা সমর্থন করেন জন। তার পরে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। বার্লা অবশ্য বলছেন, ‘‘বিরোধীরা নিজেদের পরাজয় নিশ্চিত বুঝে এ সব বলছে। গুরুঙ্গের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী করমর্দন করতে পারলে আমি তাঁর সঙ্গে থাকতে পারব না কেন?’’

বামফ্রন্টের তরফে আরএসপি প্রার্থী মিলি ওরাওঁয়েরও দাবি, ‘‘আমি জিতলে বন্ধ বাগান খোলা, চা-শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি, ৬ হাজার টাকা পেনশন, রেশন, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার দাবি লোকসভায় তুলব।’’ কিন্তু তাঁকেও তাড়া করছে প্রশ্ন, বাম জমানার ৩৪ বছরেও চা-শ্রমিকদের দুর্দশা ঘোচেনি কেন? বামফ্রন্টের নেতারা বলছেন, বাম জমানায় সব চা বাগানে বিদ্যুৎ গিয়েছে। তখন ৬ মাস অন্তর রাজ্য সরকার বাগানের মালিক এবং শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠক করত। ফলে রেশন চালু রাখা, হাসপাতাল এবং স্কুলের পরিকাঠামোর উন্নতি প্রভৃতি দায়িত্ব এড়াতে পারতেন না মালিকরা। তা ছাড়া, তখন তিন বছর অন্তর প্রায় ৪০ শতাংশ মজুরি বাড়ত শ্রমিকদের। বাম জমানার শেষে ৯৫ টাকা দৈনিক মজুরি পেতেন শ্রমিকরা।

আলিপুরদুয়ারের কংগ্রেস প্রার্থী স্কুলশিক্ষক মোহনলাল বসুমাতার প্রচারেও থাকছে চা শ্রমিকদের সঙ্কট। তবে কংগ্রেসের আলিপুরদুয়ার জেলা সভাপতি বিশ্বরঞ্জন সরকার মারা যাওয়ায় এখানে দলের সংগঠন এখন কিঞ্চিৎ নড়বড়ে। নতুন জেলা সভাপতি গজেন্দ্রনাথ বর্মনের নেতৃত্বে শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গীদের নিয়ে লড়ে 

যাচ্ছেন তিনি। 

আলিপুরদুয়ারের আরও একটি সমস্যা আছে। এর সীমান্তে ভুটানের অরণ্য ধ্বংস করে ডলোমাইট এবং অন্যান্য পাথর তুলে বাংলাদেশে চোরাচালান করা হয়। ফলে ভুটান পাহাড়ের লাগোয়া চা বাগান এলাকায় আবহাওয়ার পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই এখন সেখানে বন্যা হয়। পোকামাকড়ের উৎপাত বাড়ায় চা চাষ ক্ষতিগ্রস্ত। শ্রমিকদের ইদানীং খুব চর্মরোগ হয়। 

অল ইন্ডিয়া প্ল্যান্টেশন ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল আলম বলেন, ‘‘এই পরিস্থিতিতে দক্ষ শ্রমিকরা এখানকার চা বাগান ছেড়ে কেরল, কর্নাটক এবং তামিলাড়ুর চা ও কফি বাগানে চলে যাচ্ছেন। কারণ, কেরলে দৈনিক ন্যূনতম মজুরি ৫২৭ টাকা, কর্নাটক এবং তামিলনাড়ুতে ৩৫০ টাকার আশপাশে।’’ 

লাগোয়া রাজ্য অসমে বিজেপির তুরুপের তাস জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি)-র ফলে সেখানকার অনেক মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে চলে আসছেন আলিপুরদুয়ারে। এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের জন্য দরজা খোলা রাখার বার্তাও দিয়েছেন। এ বার লোকসভা ভোটে এই বিষয়েও মাথা ঘামাচ্ছেন আলিপুরদুয়ারের ভোটাররা। পাশাপাশি, গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভোট দিতে না পারার স্মৃতিও ভাবাচ্ছে কিছু মানুষকে। সব ভাবনারই প্রতিফলন ঘটবে আগামী ১১ এপ্রিল। 

নির্বাচনী নির্ঘণ্ট

২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের ফল

  • সকলকে বলব ইভিএম পাহারা দিন। যাতে একটিও ইভিএম বদল না হয়।

  • author
    মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূলনেত্রী

আপনার মত