• নিজস্ব সংবাদদাতা
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

মত পাল্টে মোদীর সঙ্গে দেখা করতে চান মমতা

1
সে-দিন মুখোমুখি। ১৯ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি ভবনে নরেন্দ্র মোদী ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।—ফাইল চিত্র।

নয় মাসের শৈত্য কাটিয়ে অবশেষে আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মুখোমুখি হতে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাক্ষাতের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সময় চেয়ে তাঁর সচিবালয়ে বার্তা পাঠিয়েছেন তিনি। ঘোষিত উপলক্ষ, রাজ্যের ঘাড়ে চেপে থাকা ঋণের বোঝা কমানোর ব্যাপারে সওয়াল করা। আজ নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এ কথা জানান মমতা। প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের সূত্র জানাচ্ছে, আগামী ১০ বা ১১ মার্চ এই বৈঠক হতে পারে। সে দিন মোদীর সঙ্গে মমতার একান্ত বৈঠকও হওয়ার কথা।

লোকসভা ভোটের ময়দানে মোদীর বিরুদ্ধে যে তোপ দাগা শুরু করেছিলেন মমতা, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরেও তা থামেনি। মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে দেশের প্রায় সব মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে শুভেচ্ছা জানালেও, তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করলেও সে পথে হাঁটেননি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী নিজে সুশাসনের স্বার্থে সব রকম রাজনীতি দূরে সরিয়ে রাখার কথা বলা সত্ত্বেও। অথচ ঘটনা হল, রাজনীতির প্রশ্নে বিজেপির বিপরীত মেরুতে থাকা ত্রিপুরার বাম মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার কিন্তু রাজ্যের প্রয়োজনে তাঁর গোটা মন্ত্রিসভাকেই বসিয়ে দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি। মোদীর অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নীতীশ কুমারও গত রবিবার বিহারের মুখ্যমন্ত্রী পদে ফের শপথ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে রাজ্যের আর্থিক বিষয় নিয়ে আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

মমতার অনড় অবস্থান বদলাতে শুরু করে সারদা কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসা এবং তাকে ঘিরে সিবিআইয়ের তদন্তের জাল ক্রমশ তৃণমূলের উপরে চেপে বসার পরে। এই অবস্থায় গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি রাষ্ট্রপতি ভবনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সম্মানে দেওয়া ভোজসভায় প্রথম বার প্রধানমন্ত্রী মোদীর মুখোমুখি হন মমতা।অনেকের মতে, বিজেপি-কে বার্তা দিতেই সে বার দিল্লিবাসের মেয়াদ বাড়িয়ে ভোজসভায় হাজির হন মমতা।

তার পরেও অবশ্য প্রশাসনের প্রশ্নে কেন্দ্রের সঙ্গে অসহযোগিতার রাস্তা থেকে সরেননি মমতা। এ মাসের গোড়াতেই নীতি আয়োগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ডাকা বৈঠকে যাননি তিনি। এমনকী, পাঠাননি রাজ্যের কোনও প্রতিনিধিও। যা নিয়ে সমালোচনা হয় বিস্তর।

তা হলে এখন কেন মোদীর দেখা চাইছেন মমতা? ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, “পশ্চিমবঙ্গের আগের সরকার আমাদের ঘাড়ে যে বিপুল ঋণের বোঝা চাপিয়ে গিয়েছে, তা লাঘব করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আমরা কেন্দ্রকে বলছি। সাড়ে তিন বছর অপেক্ষা করেও কোনও লাভ হয়নি।... তাই আমি প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে অবিলম্বে এই ঋণ মকুবের বিষয়টি বিবেচনা করার আর্জি জানিয়েছি। আমার সাংসদদের একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য সময়ও চেয়েছি আমি।”

আমার দল সভায় আমায় কিছুই বলতে দেবে না। তাই এখানে বসেই আমার বক্তব্য জানাচ্ছি, যাতে আমার দল তো বটেই, বিরোধীরাও জানতে পারেন আমি ঠিক না ভুল। ... আমাকে দল সাসপেন্ড করলে কষ্ট পাব। বহিষ্কার করলে খুশি হব।

স্বপনকান্তি ঘোষ, তৃণমূল বিধায়ক

মুখ্যমন্ত্রীর সাধ হয়েছে, ভাইপোকে রাজা বানাবেন। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তাঁর সেই সাধ পূর্ণ করবেন না।... দেখুন না, মার্চ-এপ্রিলে কী হয়! ১৯১ জনের মধ্যে ৫০ বিধায়ক তৃণমূল ছেড়ে গেলে মমতা-সরকার তো সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে।

হুমায়ুন কবীর, তৃণমূলের প্রাক্তন মুর্শিদাবাদ জেলা কার্যকরী সভাপতি

গত কালই চতুর্দশ অর্থ কমিশনের সুপারিশ মেনে রাজ্যগুলিকে দেয় কেন্দ্রীয় করের অংশের পরিমাণ ১০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে কেন্দ্র। এর পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গের রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে আগামী দু’বছরে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি অনুদান দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু রাজ্যের দাবি মেনে তার ঋণ পরিশোধের উপরে তিন বছরের স্থগিতাদেশ দেওয়া যে সম্ভব নয়, তাও স্পষ্ট ভাষাতেই জানিয়ে দিয়েছে তারা। কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পথ খুলেছেন মমতা। ফেসবুকে নিজের পোস্টে তিনি কোথাও মোদীর নাম উল্লেখ করেননি। বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চান। তৃণমূল সূত্রের ব্যাখ্যা, এর মধ্যে দিয়ে মমতা বোঝাতে চেয়েছেন, কোনও ব্যক্তিগত কারণে নয়, রাজ্যের প্রয়োজনেই দেশের প্রশাসনিক প্রধানের সঙ্গে দেখা করতে চলেছেন তিনি। যা শুনে বিরোধী শিবিরের প্রশ্ন, তা হলে এত দিন সেই সাক্ষাতে বাধা হচ্ছিল কোথায়? রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের যতগুলি বৈঠক ডেকেছেন মোদী, তার কোনওটিতেই তো মমতা হাজির হননি। সে সব বৈঠক তো রাজ্যের স্বার্থেই ছিল!

নবান্নের শীর্ষকর্তাদের একাংশ বলছেন, সারদা কেলেঙ্কারি নিয়ে রাজ্যের শাসক দলের উপরে চাপ আরও বেড়েছে। ইতিমধ্যে বিদ্রোহী হয়েছেন একদা দলের দু’নম্বর মুকুল রায়। তৃণমূল তাঁকে কার্যত খরচের খাতায় ফেলে দেওয়ার পরে তিনি বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন বলে গুঞ্জন। এর মধ্যে আবার মুখ্যমন্ত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বাংলাদেশে তাঁর সফরসঙ্গী শিবাজি পাঁজা জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেফতার হয়ে মমতার বিড়ম্বনা বাড়িয়েছেন। এই সব চাপের মুখে তৃণমূল নেত্রী তলে তলে মোদী সরকারের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়তে চাইছেন। মোদীর সঙ্গে সাক্ষাৎ সেই চেষ্টারই প্রথম ধাপ বলে ওই শীর্ষকর্তাদের মত। বিজেপির কেন্দ্রীয় সূত্রও এমন অভিমতে সায় দিচ্ছে।

তৃণমূলের অন্দরে অবশ্য এ নিয়ে দু’রকমের মতামতই উঠে আসছে। এক পক্ষের মতে, রাজ্যের ঋণ মকুবের দাবিতে মুখ্যমন্ত্রীর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করায় কোনও অন্যায় নেই। তা ছাড়া, মমতা মনে করছেন, কেন্দ্রীয় কর বাবদ বরাদ্দ বাড়লেও বেশ কিছু কেন্দ্রীয় প্রকল্পের ক্ষেত্রে অনুদান বন্ধ করে রাজ্যের ঘাড়েই সব আর্থিক দায় চাপানো হয়েছে। ফলে হরেদরে রাজ্যের কোনও লাভই হবে না। এ নিয়ে কেন্দ্র বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে জমি তৈরি করতে চাইছেন মমতা। ওই নেতাদের বক্তব্য, তার পরেও যদি কেন্দ্র কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপ না করে, তা হলে তাদের বিরুদ্ধে বঞ্চনার অভিযোগ তোলা সহজ হবে। আর কেন্দ্র সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে তা মুখ্যমন্ত্রীর লড়াইয়ের ফসল বলে কৃতিত্ব দাবি করা যাবে।

দলের অন্য পক্ষ অবশ্য এই তত্ত্ব মানতে নারাজ। তাঁদের মতে, রাজ্যের দাবি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার থাকলে গত মে মাসে নতুন সরকার গঠনের পরেই যেতে পারতেন মমতা। কিন্তু রাজ্যের সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কের দিকে তাকিয়ে তিনি মোদীকে উপেক্ষা করার বার্তাই বরাবর দিতে চেয়েছেন। আসলে সারদা কেলেঙ্কারির খাঁড়া দলের ঘাড়ে যত চেপে বসছে, ততই কেন্দ্রের সঙ্গে একটা বোঝাপড়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

দলের ওই অংশ আরও বলছে, মুকুল সিবিআইয়ের জেরার মুখে মুখ্যমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের বিপুল সম্পত্তি ও সারদা-যোগের তথ্যপ্রমাণ তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন বলে খবর। সেই ক্ষতি সামাল দেওয়ার পাশাপাশি মুকুলের সঙ্গে বিজেপির সম্পর্কের সুতো কাটার চেষ্টাতেই এ বার মোদী-অমিত শাহদের সঙ্গে সখ্য বাড়ানোর চেষ্টা করছেন মমতা।

তৃণমূল নেত্রীর এই উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে কী করবে বিজেপি?

বিজেপি সূত্র দাবি করছে, যা-ই হোক না কেন, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল-বিরোধী রাজনীতি জারি থাকবে। মমতার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমে দলের জনভিত্তি যে ক্রমশ বাড়ছে, বিজেপি যে রাজ্যে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে; বনগাঁ লোকসভা ও কৃষ্ণগঞ্জ বিধানসভা উপনির্বাচনের ফলেই তা প্রমাণিত। ফলে পশ্চিমবঙ্গে সুর নরম করার কোনও প্রশ্ন নেই। তবে একই সঙ্গে মমতা বন্ধুত্বের হাত বাড়ালে তাকে পুরোপুরি ঠেলে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না বলেই মনে করছেন বিজেপি নেতাদের একাংশ। কারণ, রাজ্যসভায় সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। আর সব বিল দুই সভার যৌথ অধিবেশন ডেকে পাশ করানোও সম্ভব নয়। ফলে মোদী-অরুণ জেটলি আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরির যে চেষ্টায় নেমেছেন, তার তালিকা থেকে তৃণমূলকে বাদ দেওয়া উচিত নয় বলেই ওই নেতাদের অভিমত।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন