রাত তিনটে। কৃষ্ণপক্ষের রাত্রি। জনহীন কলকাতার রাস্তা যেন ঘুমন্ত অজগর সাপের মতো গা এলিয়ে আছে।

কিরীটী একাই সেই অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। পকেটে কালো ভ্রমরের ড্রাগন।

কিরীটীর মনে হচ্ছে কেউ বুঝি আসছে তার পিছু পিছু। তার পায়ের শব্দ পাওয়া যায় না। কিন্তু সে আসছে...

কালো ভ্রমর!

কৌশিক সেন। এই ছবিতে আসল খেলাটা তাঁরই। সাইকোপ্যাথ। দুর্ধর্ষ কিলার। রক্তের গন্ধে পাগল হওয়া এক শিক্ষিত ডাক্তার। অন্য দিকে পরিবার হারানো একলা মানুষ — এই কনট্রাস্টটা দারুণ ফুটিয়ে তুলেছেন কৌশিক। ক্যামেলিয়া প্রোডাকশনের ‘কিরীটী ও কালো ভ্রমর’ আর কারও নয়। কৌশিক সেনের।  নিশুতি রাতের রহস্যময়তাকে ছাপিয়ে গেছে তাঁর শোম্যানশিপ। শুধু সংলাপে নয়। এই ছবিতে তাঁর বডি ল্যাঙ্গোয়েজও একটা চরিত্র হয়ে গেছে। এ রকম একজন ‘গুণী’ দুর্বৃত্তকে ঘিরেই ছবিতে টেনশনের শুরু।

ইয়ং ফেলুদা, অ্যাডাল্ট ব্যোমকেশ, আর শবর-এর রোমাঞ্চকর কাহিনির বাইরে এ বার টালিগঞ্জ পেল এক নতুন গোয়েন্দা। কিরীটী রায়। নীহাররঞ্জন গুপ্ত-র সত্যান্বেষী — এক ইররেজিসটেবল পুরুষ। মাঝসপ্তাহের প্রায় পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহই বলে দিল ষাটের দশকের গোয়েন্দার আকর্ষণ আজও আছে। 

এই ছবিতে পরিচালক অনিন্দ্য বিকাশ দত্ত গোয়েন্দা গল্পের সোজা ফর্মুলা থেকে সরে এসেছেন। ‘কিরীটী ও কালো ভ্রমর’-এ গোয়েন্দার চেয়ে অপরাধী অনেক বেশি জায়গা জুড়ে আছে। চার খণ্ডের গোয়েন্দা উপন্যাস ‘কালো ভ্রমর’-ই বলা যেতে পারে কিরীটী রহস্যের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অংশ। নীহাররঞ্জন লিখে গেছেন ‘‘ভাগ্যিস কালো ভ্রমরের জন্ম হয়েছিল নয়তো কিরীটী হত না।’’ দুর্ধর্ষ এই সিরিয়াল কিলারের মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজন ছিল এক অধিনায়কের। ক্যাপ্টেনের।

পোশাকে, চলনে-বলনে পরিচালক যতই কিরীটীকে আজকের সময়ের জন্য তৈরি করুন, চরিত্র নির্মাণে নীহাররঞ্জনের টেক্সট থেকে তিনি খুব একটা সরে আসেননি। এই ছবিতে কালো ভ্রমরের তালেই তাল মিলিয়েছে কিরীটী।

সে কারণেই হয়তো কালো ভ্রমর কৌশিক সেনের সঙ্গে কিরীটী ইন্দ্রনীল সেনগুপ্তর মুখোমুখি লড়াইয়ে ইন্দ্রনীল আন্ডার অ্যাক্টিং করতে বাধ্য হয়েছেন।

ব্যাকব্রাশ করা চুল, মোটা ফ্রেমের চশমা বা জিনসে কিরীটী হিসেবে মানিয়ে গেলেও বাংলা উচ্চারণে তাঁর আরেকটু সড়গড় হওয়া উচিত ছিল। আর যাই হোক, কিরীটী হিন্দি টোনে বাংলা বলতে পারে না। তবে কিরীটীর শাগরেদ সুব্রতর ভূমিকায় সমদর্শী দত্তকে বেশ মানিয়েছে।

অন্ধকার কুঠুরি, পচা মৃতদেহ, একের পর এক ধারালো অস্ত্রের খুন। চাপা রক্তের গন্ধে জমাট এই ছবি। সিনেমাটোগ্রাফার অরিজিৎ বিশ্বাস যেমন ভাল কাজ করেছেন, তেমনি ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে দেবজ্যোতি মিশ্র রহস্যটা ধরে রেখেছেন।

কিন্তু এ রকম একটা রহস্য ঘেরা ছবির শেষটা কেন এমন?

কিরীটী আর কালো ভ্রমর কি না শেষে মাওবাদীদের সঙ্গে লড়াই করছে! সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে পরিচালক প্লটে এমন কনট্রাস্ট কেন আনলেন তা বোঝা গেল না।

কিরীটীর গুলি খেয়ে কালো ভ্রমর যেখানে জলে পড়ে যাচ্ছে, সেখানেই ছবিটা শেষ হতে পারত। তা না করে ছবিটাকে জোর করে টেনে বড় করা হল। আর তাতেই কিছুটা হলেও হারিয়ে গেল রহস্য।

সব কিছুকে সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে ভাবতে হবে কেন? বিশেষ করে কিরীটী যখন একটা পিরিয়ড পিস। এই গল্পেই কিরীটীর সঙ্গে কৃষ্ণার দেখা এবং প্রেম। কৃষ্ণার চরিত্রে অরুণিমা ঘোষ যথাযথ।

তবে গোয়েন্দা কাহিনিতে প্রথম প্রয়াসে অনেকটাই উতরে গেলেন পরিচালক অনিন্দ্য বিকাশ দত্ত।