আনন্দplus-এ অনেক দিন পর আপনার ইন্টারভিউ। কেমন আছেন?

(হেসে) ভাল। লাইফ ইজ গুড। গত বছর একটু আপসেট ছিলাম। ‘লড়াই’ চলেনি। এমনিতে খুব একটা আপসেট হই না কিন্তু ‘লড়াই’ থেকে অনেক আশা ছিল। ভেবেছিলাম বাঙালি দর্শক পছন্দ করবে।

আর তা ছাড়া গৌতমদা (ঘোষ)-র সঙ্গে শ্যুটটা শেষ করলাম। এখন কমলেশ্বরের (মুখোপাধ্যায়) সঙ্গে কাজ করছি। এর পর সৃজিত (মুখোপাধ্যায়)-এর ছবি। ভালই আছি, বুঝলেন। (হাসি)

 

তা তো বুঝতেই পারছি। শোনা যাচ্ছে ১৭-১৮ বছরের মেয়েরা নাকি নিয়মিত আপনার প্রেমে পড়ছেন?

এটা অদ্ভুত। ব্যাপারটা নিয়ে আমি ইয়ার্কি মারছি না। জীবনের যে স্টেজে আমি আছি এটা নিয়ে দারুণ মজা হচ্ছে না তবে ভাল লাগছে... (হেসে)

 

মেয়েরা প্রোপোজ করছে কি ফোনে?

হ্যাঁ, ফোনে, বেশির ভাগই হোয়াটস্অ্যাপে। কিছু ফেসবুকেও করছে। আজকের কমিউনিকেশন সিস্টেমটাই এমন যে আপনি সর্বদা সবার সঙ্গে কানেক্টেড। এবং খুব চট করে আমি কাউকে ফোনে ব্লক করি না যদি না সে মারাত্মক বাড়াবাড়ি কিছু না করে। সবাইকেই ছোটছোট মেসেজ পাঠাই, ‘গড ব্লেস’, ‘ভাল থেকো’ এ অবধি। আর কাউকে মনে কষ্ট দিতে ইচ্ছে করে না। ভাবি একটা মেসেজ পেলে একজন মানুষ খুশি তো হবে।

এবং তাদের অনেককেই বলতে শুনি, ‘নাউ ইউ আর লুকিং মোর হট’। আর যারা বলছে, তারা মিশুকের (তৃষাণজিৎ)  থেকে একটু বড় হবে। ভাবতে পারছেন?

 

তাই?

আরে হ্যাঁ। এই বয়সে আমি নিজেকে বদলেছি, ফিজিকটা চেঞ্জ করেছি, এটা যে মনে ধরেছে মানুষের তা ভেবে ভাল লাগছে। তবে প্রোপোজ করার পর যখন দেখছি বাড়াবাড়ি করছে তখন বোঝাচ্ছিও তাদের...

 

ওহ! কাউন্সেলিংও করছেন?

হ্যাঁ, করতে হচ্ছে। তবে এটুকু বুঝেছি, রোম্যান্টিক ছবি তো অনেক দিন করা ছেড়ে দিয়েছি, কিন্তু কোথাও আমার রোম্যান্টিক ইমেজটা থেকে গিয়েছে, রোম্যান্টিসিজমটা রয়ে গিয়েছে।

আর আমি বরাবরই স্ট্রেট ফরোয়ার্ড। প্রেম করলাম, এক জায়গায় বললাম হ্যাঁ, এক জায়গায় না—এ সবের মধ্যে নেই। প্রেম করছি তো প্রেম করছি। ওই লোক দেখানো, ‘উই আর ফ্রেন্ডস’ কোনও দিন আমি বলিনি। (প্রচণ্ড হাসি)।

 

 ছবি: কৌশিক সরকার।

 

আপনার ব্যক্তিগত জীবন তো রোম্যান্টিক, কিন্তু ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা তো রোজ খারাপ থেকে খারাপতর হচ্ছে।

সত্যি খুব খারাপ অবস্থা ইন্ডাস্ট্রির...

 

ইন্ডাস্ট্রির ব্যাপারে আনন্দplus-কে দেওয়া ভবিষ্যদ্বাণী তো প্রায় মিলে যাওয়ার পথে...

মন থেকে তো চাইনি ভবিষ্যদ্বাণীটা মিলুক। আর সত্যি বলতে আমি একজন মানুষ যে ১৬ লাখ টাকার বাজেট থেকে নিজের কাঁধে ইন্ডাস্ট্রিকে বয়ে নিয়ে ৬ কোটি টাকার ছবি করেছি।  ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে আমার বন্ডিংটা বুঝতে পারছেন। নানা প্রযোজক, ডিস্ট্রিবিউটরের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছে। সবাইকে একটাই জিনিস বলছি, কমার্শিয়াল বাংলা ছবিকে বাঁচাতে হবে। কমার্শিয়াল বাংলা ছবি না চললে ইন্ডাস্ট্রি চলবে না।

 

মাল্টিপ্লেক্সের ছবি দিয়ে ইন্ডাস্ট্রি বাঁচবে না?

না, বাঁচতে পারে না ইন্ডাস্ট্রি শুধু মাল্টিপ্লেক্সের ছবি দিয়ে। এবং ব্যাপারটা তো আজকের নয়। আগেও তাই হয়েছে। আগে কমার্শিয়াল ছবি বানাতেন অঞ্জন চৌধুরী, হরনাথ, স্বপন সাহা, অনুপ সেনগুপ্ত, প্রভাতদারা। আর অন্য ধারার ছবি বানাতেন অপর্ণা সেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ আর গৌতম ঘোষরা।

সেই ফর্মুলাটা, এই বিভাজনটা গেল কোথায়,  সেটাই তো বুঝছি না! গত দেড়-দু’মাসে আমি গ্রামগঞ্জে  শো করেছি। কোনও নতুন বাংলা ছবির পোস্টার দেখিনি। ভাবা যায়?

যা দেখেছি সব পুরনো ছবির রিপিট রান। ওই একটা ‘মিশর রহস্য’, ‘চাঁদের পাহাড়’, ‘ব্যোমকেশ...’ কী ‘ফেলুদা’ তো বাঁচাতে পারবে না ইন্ডাস্ট্রিকে। রেগুলার কমার্শিয়াল বাংলা ছবি চাই...

 

সেটা হচ্ছে না কেন? পরিচালকের অভাব?

না, পরিচালক আছে। আমি আগেও যেটা বলেছিলাম, বাজেট কমাতে হবে। ভারতের সর্বত্র কমার্শিয়াল ছবি নায়করা ডমিনেট করে। আমি খুব শিগগিরি দেব আর জিতের সঙ্গে বসছি। ওদের বোঝাতে চাই, বছরে দু’টো থেকে তিনটে ছবি ওদের করা উচিত। দেড় বছরে ওরা যদি একটা ছবি করে, আমরা কেউ বাঁচব না।

এটা বলতে পারছি কারণ আমার মাইন্ডটা কমার্শিয়াল। আরে ৩৪ বছরে গোল্ডেন জুবিলি তো কম দেখলাম না। আমি নিজে কাজ করব না, কিন্তু চ্যালেঞ্জটা নিতে চাই। ওরা যাতে আরও বেশি কমার্শিয়াল ছবি করে সেই তাগিদটা দিতে চাই। কাউকে তো লিডারশিপ দিতে হবে।

 

এটা তো বিরাট খবর, আপনি দেব আর জিতের সঙ্গে বসতে চান। ওঁদের মোটিভেট করতে চান যাতে ইন্ডাস্ট্রি বাঁচে, বাংলা নতুন বছরে এটাই তো টলিউডের সবচেয়ে বড় স্কুপ!

হ্যাঁ, আমি চাই ওরা বসুক আমার সঙ্গে। দেবের সঙ্গে আটচল্লিশ ঘণ্টা আগেও কথা হয়েছে।

নতুন বছরে আমি হাত জোড় করছি ইন্ডাস্ট্রির কাছে। আর নিজেদের মধ্যে প্লিজ ঝগড়া করবেন না। এটা তো একটা সংগঠন। আমাদের সবাইকে নিয়ে চলতে হবে।

আগেও যখন এ রকম প্রবলেম হয়েছিল ইন্ডাস্ট্রিতে আমি, দীপকদা (চির়ঞ্জিত চক্রবর্তী) কী তাপস (পাল) রেগুলারলি প্রোডিউসরদের সঙ্গে বসতাম। সব প্রোডিউসরেরই আলাদা আলাদা ক্ষমতা থাকে। সেই ক্ষমতাগুলোকে পজিটিভ দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতাম। দেব-জিৎকেও বসতে হবে প্রোডিউসরদের সঙ্গে। কথা বলতেই হবে ওদের ফ্যানদের সঙ্গে। সহজ নয় ব্যাপারটা। কিন্তু না করলে যে আমরা বাঁচব না।

 

এটাই কি বাংলা নতুন বছরে আপনার রেজলিউশন?

হ্যাঁ। এটাই রেজলিউশন। সবাইকে বলছি, নিজেদের জিজ্ঞেস করুন কোথায় ভুল হচ্ছে। আগে শুনতাম গ্রামের দিকে হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আজকে তো কলকাতা শহরের বড় বড় হল বন্ধ হওয়ার মুখে। ব্যাপারটা আমার আপনার বাড়ির পাশে ঘটছে। তাও কি আমাদের ঘুম ভাঙবে না?

মিনার-বিজলি-ছবিঘরের কথা ভাবুন। আগে জানতাম মিনার-বিজলি-ছবিঘরে একটু স্ট্যান্ডার্ড ছবি হলে ২৫ সপ্তাহ, ভাল ছবি হলে ৫০ সপ্তাহ — আজ বাংলা ছবির সেই পীঠস্থানগুলো বন্ধ হওয়ার মুখে! এর থেকে দুঃখের আর কী হতে পারে?

 

স্বপন সাহা, প্রভাত রায়ের মতো বাণিজ্যিক পরিচালকদের কথা আপনি আগে বললেন, এটা বলুন ওঁরা কী কী ঠিক করতেন যা আজকে রাজ চক্রবর্তীরা পারছেন না?

দু’টো ব্যাপার বলি। আমি ইন্টেলিজেন্স, স্মার্টনেস বলছি না। আরও গোদা জিনিস বলছি যা হয়তো অনেকের পছন্দ হবে না।

ওই পরিচালকদের একজন মানুষের প্রতি সাঙ্ঘাতিক দায়বদ্ধতা থাকত। সেটা প্রোডিউসর। ওঁদের ধ্যানজ্ঞান ছিল কী করে প্রোডিউসরের ঘরে টাকা ফেরত পাঠাব। 

আগে ছবি না চললে পরিচালকরা এসে বলতেন, ‘‘বুম্বাদা, ওই প্রযোজকের আগের ছবিতে টাকা ফেরত দিতে পারেনি। আপনি আর একটা ছবি প্লিজ করে দেবেন। হিট হয়ে গেলে ওই মানুষটা আবার লগ্নি করবে।’’

আমি এ রকম প্রচুর ছবি করেছি যেখানে এক পয়সাও নিইনি। কিন্তু এই ব্যাপারটা ইনিশিয়েট করতেন পরিচালকরা নিজে। সেই দায়টা বোধহয় আজকে কমে গিয়েছে।

আমরা স্মার্ট কনটেন্ট, স্মার্ট কনটেন্ট বলতে বলতে এমন একটা জায়গায় পৌঁছে গিয়েছি যে, মানুষ আর রিলেট করতে পারছে না।

আরে, আজ থেকে দশ বছর আগের সময়টা ভাবুন। তখন কমার্শিয়াল ছবিতে ‘...ফাটাকেষ্ট’ হচ্ছে, ‘সাথী’ হচ্ছে, ‘মায়ের আঁচল’ হচ্ছে... এই ছবিগুলো তো দেখত মানুষ। সুপারহিট ছবি। আর একটা কথা বলতে পারি?

 

সিওর...

আমরা জানতাম কলকাতায় ম্যাটিনি শো আর গ্রামের দিকে দুপুর দেড়টার শোটা হাউজ ফুল করে মা-বোনেরা। এবং রোববারের পরে যদি সোমবারও ওই দু’টো শো ফুল হয়, তা হলে চোখ বন্ধ করে বারো সপ্তাহ।

 

মানে পিওর অঙ্ক?

একদমই। আর এখানেই প্রশ্ন, স্মার্ট মেকিংয়ের চক্করে কি আমরা এত স্মার্ট হয়ে গেলাম, যে ওই দর্শকদের হারিয়ে ফেললাম?

হঠাৎ করে বড্ড বেশি বেলুনের মতো ফুলে গেলাম আমরা। আমার তো কষ্ট হয় সেই দর্শকদের হারিয়ে, আপনাদের হয় না? যে জায়গাটা রুল করতাম আমরা সেখানে ঢুকে গেল টেলিভিশন। টেলিভিশনের কনটেন্ট কী? সেই ফ্যামিলি ড্রামা, ইমোশনস। আগে তারা সিনেমায় সেগুলো পেত, আজ টিভি থেকে পাচ্ছে। পাচ্ছে বলেই সিনেমা থেকে সরে গিয়ে ওটা বেশি করে দেখতে শুরু করল আমাদের মা-বোনেরা।

এতটাই দেখতে থাকল যে আমি গ্রামেগঞ্জে গিয়ে বুঝতে পারি কী অসম্ভব জনপ্রিয় এই টিভির নতুন ছেলেমেয়েরা!  সবার নাম হয়তো মানুষ জানে না, কিন্তু ওদের চরিত্রগুলোকে চেনে।

 

মানে, বাহা, মৌরি ফিল্মস্টারদের জনপ্রিয়তায় ভাগ বসাতে পেরেছে?

সাঙ্ঘাতিক ভাগ বসাতে পেরেছে। একবার গ্রামে গিয়ে দেখে আসুন না।

আমাদের, মানে সিনেমার স্টারদের শোগুলোতে তো লোক কম হচ্ছে না। হাজার হাজার লোক দেখতে আসছে। তার মানে কী দাঁড়াচ্ছে? মানে দাঁড়াচ্ছে, ফিল্মস্টারদের দেখতে তাদের প্রচুর ইন্টারেস্ট, কিন্তু যে সিনেমাটা আমরা বানাচ্ছি সেটার সঙ্গে তারা রিলেট করতে পারছে না। কিন্তু এত কথার পর তাও বলছি একমাত্র রাজ (চক্রবর্তী)-ই পারে হার্ডকোর কমার্শিয়াল ঘরানার ছবি বানাতে। ওকে দেখে বুঝি ও ভীষণ রুটেড। এ ছাড়াও আর একটা প্রবলেম আছে।

 

কী সেটা?

রাজকে বুঝতে হবে সব রকম দর্শক ওর ছবি দেখবে না। আরে, স্বপন সাহা তো কোনও দিন ভাবেননি নন্দনে ওঁর ছবি চলবে।  ঠিক যেমন ঋতুপর্ণ ঘোষ ভাবেনি ওর ছবি পানাগড়ে চলবে।

 

যে সময়ে স্বপন সাহারা একচেটিয়া কাজ করেছেন, সেই সময় থেকে আজকের গ্রামবাংলাও তো অনেকটাই বদলে গিয়েছে। আজ স্বপন সাহা কি এই স্মার্টফোনের যুগে প্রাসঙ্গিক হতেন?

হ্যাঁ, গ্রাম বদলে যাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু স্বপন সাহা সেই সময়ের গ্রামের দর্শকদের ফাটিয়ে এন্টারটেইন করতেন। সেই মানুষগুলো, সেই দর্শককুল তো আজও আছে। মানছি সেই মানুষগুলোর হাতে আজকে স্মার্টফোন, কিন্তু তাঁরা তো আজও এন্টারটেন্ড হতে চান। সেই মানুষগুলোকে ভেবে কি আমরা কেউ বানাচ্ছি? কেউ বানাচ্ছি না।

 

স্বপন সাহা আর ঋতুপর্ণ ঘোষের মধ্যে যে বিভাজনটা ছিল, সেটা উঠে যাওয়ার জন্য কি মিডিয়া দায়ী?

কেন বলছেন বলুন?

 

এই জন্যেই বলছি মিডিয়া আজকে সৃজিত, কৌশিক, কমলেশ্বরের ইন্টারভিউ নিয়মিত ছাপে। কাগজ খুললেই তাঁদের ছবি দেখা যায়। আজকে রাজ, রাজীবের মনে হতেই পারে, আরে অন্য রকম ছবি বানালেই তো কাগজে ছবি বেরোবে, না হলে নয়!

খুব ভাল প্রশ্ন। এটা হতে পারে। কিন্তু আগে তো স্বপন সাহা, অ়ঞ্জন চৌধুরীদের কখনও মনে হয়নি কাগজে ছবি ছাপার কথা? আজকে...

 

...সময়টাও তো পাল্টে গিয়েছে। হয়তো স্বপন সাহাদের থেকে রাজদের লোভ বেশি ছবি ছাপানোর ক্ষেত্রে?

হ্যাঁ, কাগজে ছবি বেরোলে সবার ভাল লাগে। কিন্তু রোজ রোজ ছবি ছাপিয়ে কী হবে বলুন তো? দেখি তো সব ছবি। দইয়ের দোকান, মিষ্টির দোকান, কেকের দোকানে দাঁড়িয়ে সব ছবি তুলছে। কী লাভ তাতে?

এত দেখা গেলে অভিনেতার স্টারডমটা তো চলে যাবেই। পরিচালককেও মানুষ সিরিয়াসলি নেবে না। মাঝেমধ্যে মনে হয় আজকালকার জেনারেশন কি শুভেন্দুজেঠুকে বলা উত্তমকুমারের সেই পেট্রোল পাম্পের গল্পটা ভুলে গেল নাকি? এরা কি উত্তমকুমারের থিওরি ভুল প্রমাণিত করবে? এটা একটু ভেবে দেখুক সবাই। মাঝেমধ্যে মনে হয় অভিনেতা, পরিচালক আর মডেলদের মধ্যে একটা বেসিক তফাত থাকবে রে বাবা।

 

এটা স্ট্রং স্টেটমেন্ট কিন্তু...

জানি অপ্রিয় হব, কিন্তু কাউকে তো বলতে হবে। আর একটা জিনিস, আজকাল শুধু দেখি সাকসেস পার্টি হচ্ছে। আরে কীসের সাকসেস পার্টি! সাংবাদিক হিসেবে তো যান ওই সব পার্টিতে। গিয়ে জিজ্ঞেস করেন তো প্রোডিউসারকে, আপনার পরের ছবি কী? দেখবেন প্রোডিউসার তাঁর ছবিরই সাকসেস পার্টিতে বলছেন, না আমি কোনও ছবি শুরু করছি না। তা হলে কীসের পার্টি হচ্ছে এ সব?

আর একটা কথা, স্বপনদা, হরদা, অঞ্জন চৌধুরীর সময় কি পার্টি হত না? অবশ্যই হত। সেটা স্টুডিয়োর ঘেরা চত্বরে। সেখানে টেকনিশিয়ানরা থাকত। আজকাল তো পার্টিতে দেখি কেউ আর টেকনিশিয়ানদের ডাকে না।

শুধু কিছু স্যুট পরা কর্পোরেট লোকজন ঘুরছে। সেটা খারাপ বলছি না, সেটাও ভাল, কিন্তু টেকনিশিয়ানরা কেন বাদ যাবে বলুন? একটা ছবির মেরুদণ্ড হচ্ছে টেকনিশিয়ানরা।
তারাও তো তোমার লোক, তারা তো একটা ছবির জন্য পাগলের মতো খাটে। আনন্দের সময় তাদের তোমরা ডাকবে না?

আর আপনি মিডিয়ার দোষের কথা বলছিলেন না, আমি দোষ দেখি না মিডিয়ার। মিডিয়া আমাদের প্রচুর পাবলিসিটি দেয়। কিন্তু আমরা কি তার সদ্ব্যবহার করতে পারছি? মনে হয় না।

 

একটা কথা জিজ্ঞেস করছি। সৃজিত, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়রা ঘরোয়া আড্ডায় সে দিন বলছিলেন, জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পর আপনি কনগ্র্যাচুলেট না করায় ওঁরা একটু হলেও দুঃখ পেয়েছেন।

আরে কী বলব ওদের দু’টোকে? ওদের দুঃখ হয়েছে বুম্বাদার ওপর, জোর আছে আমার উপর বলেই দুঃখ হয়েছে। কিন্তু ওদের বুঝতে তো হবে, আমি বাংলাদেশের এমন জায়গায় ছিলাম যেখানে নেটওয়ার্ক ছিল না। আমি খবরটা জেনেছিলাম তিন দিন পরে। আমি তো এমনিই সবার আগে সবাইকে মেসেজ করি। কিন্তু এ বার পরিস্থিতি অন্য রকম ছিল। যে মুহূর্তে নেটওয়ার্ক পেয়েছি, কেজি-কে জানিয়েছি, সৃজিতকে জানিয়েছি। তবে সৃজিতকে এটাও বলেছি, ‘জাতিস্মর’-এর জন্য ও জাতীয় পুরস্কার পেলে আমি বেশি খুশি হতাম।

 

আর একটা কথা জিজ্ঞেস করছি । আপনি বলছেন বাজেট কমানোর কথা। কিন্তু প্রযোজকদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, ওঁরা বলেন প্রসেনজিৎ সবচেয়ে এক্সপেনসিভ অভিনেতা।  আপনার সঙ্গে একদিন শ্যুটিং করার খরচই নাকি ২৪ হাজার টাকা।

২৪ হাজার হবে না, ১৮ কী ২০ হাজার হবে। আরে আমি তো আর ওই টাকাটা নিজে নিচ্ছি না। আমার তো একটা মেক আপ আর্টিস্ট লাগবে, একটা ড্রেসের ছেলে লাগবে। এত বছর কাজ করার পর এটা তো ন্যাচারাল। পৃথিবীর সর্বত্র স্টারদের জন্য প্রযোজকেরা এই খরচাটা করে।

আর আমি ভাগ্যবান, এই মুহূর্তে তিনটে ছবি করছি যেখানে প্রোডিউসররা এই খরচটা দিচ্ছে। আর প্রসঙ্গটা যখন তুললেন, তখন এটাও বলি আমি কিন্তু নিজের ভ্যানের ভাড়া মার্কেট রেটের থেকে কম নিই। শুধু মেনটেনেন্স আর ড্রাইভারের টাকাটা নিই। তা-ও আমার ছেলেদের বলছি, ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা ভাল না,
তোরা প্যাকেজ করে নে। ওরা তাই করছে। ইন্ডাস্ট্রির খারাপ সময়ে উনিশ-কুড়ি করতেই হবে। গ্যাঁট হয়ে নিজের রেট কমাব না— ভুল স্ট্র্যাটেজি।

 

আচ্ছা, দেব, জিৎ, অঙ্কুশ – এই তিন কমার্শিয়াল হিরোকে প্রসেনজিৎ কী উপদেশ দেবেন?

বাবা, আমি উপদেশ দেবার কে? 

 

বলুন না? দেবকে তো বলতে পারেন পলিটিক্স অনেক হল, এ বার সিনেমায় মন দে। জিৎকে বলতে পারেন নিজের রেমুনারেশন কমা...

 

আমি ও সব বলার জায়গায় নেই। ওই যে আগে বললাম, বাংলা বাজারের টপ বক্স অফিস বলতে ওরা দু’জনেই। কে আগে, কে পরে, সেই তর্কে যাচ্ছি না। কিন্তু টপ স্টার ওরাই। ওদের আরও বেশি ছবি করা উচিত। এখানে আমি আবীর, পরম, যিশুদের গ্রুপটার কথা বলছি না। ওটা আলাদা।

আমি বলছি, দেব আর জিৎ যদি দু’জন মিলে বছরে ছ’টা ছবি করে, অঙ্কুশ ধরুন দু’টো করল, তা হলে তো দশটা কমার্শিয়াল ছবি হল। এই দশটার মধ্যে দু’টো ছবি তো সুপারহিট হবেই। এই দু’টো ছবি সুপারহিট হলেই দেখবেন আরও দশটা ছবি শুরু হচ্ছে ইন্ডাস্ট্রিতে। এই ফর্মুলাটা মানলেই ইন্ডাস্ট্রিটা বাঁচবে।

 

আচ্ছা, কৌশিক, সৃজিত, কমলেশ্বর কমার্শিয়াল ছবি বানাতে পারে না?

হান্ড্রেড পার্সেন্ট পারে। আমি চ্যালেঞ্জ নিয়ে বলছি পারে। সৃজিত তো পারেই। ‘মহাভারত’ হলে কমলেশ্বরও দেখিয়ে দিত। কৌশিকও পারে তবে ওকে একটু ভেবে এগোতে হবে।

ওরা তিন জন যে দিন ঠিক করবে কমার্শিয়াল ছবি বানাবে, ইন্ডাস্ট্রি সে দিন বদলে যাবে। ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে বড় ব্লেসিং হবে সেটা। যে রকম মণিরত্নম ‘রোজা’ করে কমার্শিয়াল ছবির চেহারাটা বদলে দিয়েছিল, এই তিন জনও কমার্শিয়াল বাংলা ছবির ধারাটা সারা জীবনের জন্য বদলে দিতে পারে বলেই আমার বিশ্বাস।

 

কিন্তু  কৌশিক-সৃজিতরা দেড়শো হলের ছবি বানাবেন কেন বলুন তো? ওঁদের নাম, যশ, সবই তো অন্য ধারার ছবি থেকে...

একজন আর্টিস্ট সব সময়ই চায় তার কাজটা ম্যাক্সিমাম লোকের কাছে পৌঁছক। সৃজিত, কৌশিকের ইচ্ছে হয় না ১৫০টা হলে ওদের সিনেমা চলুক— এটা মানতে আমি রাজি নই। তপন সিংহ, তরুণ মজুমদাররা তো পারতেন। আর মণিরত্নম কি কম পুরস্কার পেয়েছেন! পুরস্কারও পেয়েছেন আবার বাণিজ্যিক ছবিও বানিয়েছেন।

আমার মনে হয় কমার্শিয়াল ছবিকে অশ্রদ্ধা করার সময়টা চলে গিয়েছে। ওটাই লাইফলাইন, ওটাই অক্সিজেন। এটা ইন্ডাস্ট্রির সবাইকে অন্তত সব সময় মনে রাখতে হবে। আজকে আরও বেশি করে...