নিউ জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, সেবক রোড ছাড়িয়ে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস যখন ঢুকে পড়ল ডুয়ার্সের অপরূপ নিসর্গে, তখন বাতানুকূল কামরার ঘেরাটোপ থেকে ইচ্ছে করেই এসে দাঁড়ালাম খোলা দরজার সামনে, প্রকৃতিকে নিবিড়ভাবে উপভোগ করার জন্যই। কখনও ঝমঝম শব্দে নদীর উপরের রেলসেতু পেরিয়ে, কখনও সোঁদা গন্ধমাখা ঘন জঙ্গলের বুক চিরে চলে যাওয়া অসম্ভব সুন্দর এক যাত্রাপথের সৌন্দর্যসুধা পান করছি প্রাণভরে। কিছুটা দূরে পাহাড়ের বিস্তৃত বিন্যাস সামগ্রিক ছবিটাকে যেন এক আলাদা মাত্রা দিয়েছে। সব ভালরই যেমন এক অমোঘ অন্ত আছে, তেমনই এই সুন্দর রেলযাত্রাও একসময় শেষ হল যখন ট্রেন নিউমাল জংশন স্টেশনে ঢুকল।

গাড়ি বুকিং ছিল আগে থেকেই। ডুয়ার্সের দৃষ্টিনন্দন আবহ প্রতি মুহূর্তে যেন নিজের জাত চেনাতে শুরু করল।

মালবাজার হয়েই পথচলা। একের পর এক সুন্দর সব নদী পেরিয়ে যাচ্ছি। নেওড়া নদী, কুর্তিনদীর নীল ধারা, যার নেপথ্যে পাহাড়ি প্রেক্ষাপট, বাস্তবিকই যেন ছবির মতো। ডুয়ার্সের এ-ও এক বড় বৈশিষ্ট্য। নদী, পাহাড়ের ঘনিষ্ঠ মধুর এই আত্মীয়তা চোখে পড়ে মাঝেমধ্যেই। চালসা মোড় থেকে ডানহাতি রাস্তা ধরল গাড়ি। এ রাস্তাটা চলে গেছে ময়নাগুড়ি হয়ে জলপাইগুড়ির দিকে। পথে পড়ল মঙ্গলবাড়ি। আজ রবিবার। এখানে হাটবার। মূলত চা-বাগান অঞ্চলের হাট। ক্রেতা, বিক্রেতার উপস্থিতিতে বেশ জমজমাট দেখলাম হাটের পরিবেশ। শালগাছের ঘন জঙ্গল পড়ল পথের ধারেই। এরপরই শুরু হয়ে গেল বাতাবাড়ি চা-বাগানের অনুপম বিস্তার। চোখজুড়নো সবুজ সেই চা-বাগানের মধ্যে অবস্থিত ‘গ্রিন টি রিসর্ট’-এ পৌঁছলাম অবশেষে। এটাই আমার রাত্রিবাসের ঠিকানা।

অনেকটা জমি নিয়েই গড়ে উঠেছে এই রিসর্ট। চারপাশের চা-বাগানের অপরূপ নিসর্গ তো আছেই, আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে চোখে পড়ে কাঞ্চনজঙ্ঘাও, এমনটাই জানালেন সুমন্তবাবু। রিসর্টমালিক সুমন্ত চৌধুরী স্থানীয় মানুষ, তবে বর্তমানে ব্যবসাসূত্রে থাকেন কলকাতায়। দেখলাম লাগোয়া জমিতে চাষ হচ্ছে অনেক কিছুর। বরবটি, শসা, টম্যাটো, ফুলকপি, তরমুজ, বেগুন, শিম, আম, লিচু, আঙুর ও আরও অনেককিছু। ছোট্ট একটা বাঁধানো জলাশয়ে খেলে বেড়াচ্ছে মাছও। মধ্যাহ্নভোজটা ব্যাপক জমে গেল স্থানীয় মাছের স্বাদে। উত্তরবঙ্গ হল নানান নদীতে সমৃদ্ধ। আর সেইসব নদীতেমেলে বিভিন্ন প্রজাতির সুস্বাদু সব মাছ। আজ পেলাম জয়া ও কুশমা, এই দু’রকম স্থানীয় মাছের দারুণ পদ। সুমন্তবাবু আশ্বাস দিলেন, ‘‘কাল খাওয়াবো বোরোলি মাছ।’’

জম্পেশ সে মধ্যাহ্নভোজনের পর গাড়িতে সওয়ার হয়ে বেরিয়ে পড়লাম কাছেপিঠের দর্শনীয় স্থানগুলো দেখার জন্য। ফার্মবাজার পেরিয়ে যে রাস্তাটায় পড়লাম তার চারপাশে চা-বাগানের অপরূপ সবুজ বিস্তার। হঠাৎই চোখে পড়ল ময়ূর। চা-বাগানের সবুজে যেন রঙের বৈচিত্র এনেছে। গাড়িচালকের কাছে শুনলাম এই চা-বাগানে নাকি অনেক ময়ূর আছে। চা-বাগানের কিছুটা দূর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে অপরূপা কুর্তি নদী। একজায়গায় তো দেখলাম নদী প্রায় পুরো একটা ‘S’আকৃতি নিয়ে বয়ে যাচ্ছে। তার পিছনে নীল পাহাড়ের অবস্থান পুরো দৃশ্যপটকেই যেন অন্য মাত্রা দিয়েছে। জায়গাটা যতটা সুন্দর, তার নামটিও কম সুন্দর নয়। এ জায়গার নাম হল ছাওয়াফেলি!গাছের ছায়া পড়ে চা-বাগানে, আর মেঘের ছায়া নদীতে। আবার ছাওয়াফেলির এই অপরূপ সৌন্দর্য গভীর ছায়া ফেলল শহুরে পর্যটকের মনে। ছাওয়াফেলির ছায়া তাই বোধহয় এক পরম সত্য।

ছাওয়াফেলির ছায়ার মায়াকে ছিন্ন করা কঠিন। কিন্তু, দেখা যে অনেক বাকি। সেখানেও তো অপেক্ষমান নতুন মায়া? ঠিক তাই। নাওঘাটে কুর্তি নদীর জলের সান্নিধ্যে যখন পৌঁছলাম, দেখলাম আর এক মায়াময় দৃশ্য। দিনান্তের রক্তিম মায়াবী আলোয় নদী, চা-বাগান সবকিছুরই যেন এক মোহিনী রূপ। নদী বেশ চওড়া এখানে। নাওঘাটে নাও আছে অবশ্যই। লোক পারাপারও হয়।এ-পারটা বড়ডিঘি চা-বাগান, ও-পারটা বড়ডিঘি জনপদ। এদিককার গ্রামগুলিতে মূলত খেড়িয়া ও ওরাওঁ সম্প্রদায়ের বাস। চা-বাগানেই কাজ করেন গ্রামের মানুষ। সম্প্রদায় আছে অনেক, কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা নেই। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে মিলেমিশে শান্তিতে বসবাস করে। দারিদ্র আছে, দারিদ্র ভোলার জন্য হাঁড়িয়াও আছে, কিন্তু জাতের নামে বজ্জাতি করার প্রবণতা নেই। অস্তমিত দিনমণির রঙে যখন মাতোয়ারা হল নদী, আকাশ, সমস্ত চরাচর, তখন অসীম নির্জনতায় সেই অলস মায়ার সাক্ষী থাকলাম আমি। অকস্মাৎ ডেকে উঠল ময়ূর। কর্কশকণ্ঠেই বোধহয় মনে করিয়ে দিল ঘরে ফেরার কথা। তার বাক্যি মেনে যখন ফিরে এলাম রিসর্টে তখন সন্ধ্যা নেমেছে।

পরদিন প্রাতরাশ সেরে বেরিয়ে পড়লাম। এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে খানিক আগে। তার প্রভাবে গাছপালা, চা-বাগান সব যেন আরও বেশি সবুজ হয়ে উঠেছে। মঙ্গলবাড়ি, চালসা মোড় পেরিয়ে গাড়ি থামল মূর্তি নদীর সেতুতে। প্রশস্ত মূর্তি নদী নিজের ছন্দে আঁকাবাঁকা পথে চলে গেছে দূরপানে। এই সেতু পেরোতেই চাপড়ামারি জঙ্গল শুরু হয়ে গেল। কিছুপরে আবার পেলাম নদীসান্নিধ্য। এবারে জলঢাকা নদী। ডুয়ার্সের এই এক মজা। প্রচুর নদীর দেখা পাওয়া যায় যাত্রাপথে, কিছু সময় পরপরই। বড় জনপদ নাগরাকাটাছাড়িয়ে গাড়ি ঢুকে পড়ল ভগতপুর চা-বাগানে। রাস্তার পাশেই কুর্তি মন্দির। মন্দির ছাড়িয়ে চা-বাগানের মধ্য দিয়ে চলে গেলাম রোম্যান্টিক চড়াই-উতরাই পথ ধরে উদ্দেশ্যহীন এক উদ্দেশের দিকে। চোখজুড়নো চা-বাগানের শ্যামলিমা আর কুর্তি নদীর মনভোলানো ছন্দ যেন পরমপ্রাপ্তি হয়ে রইল এই খামখেয়ালি যাত্রায়।

কুর্তি মন্দিরে অনেক দেবদেবীর অধিষ্ঠান। রাম-লক্ষ্মণ-সীতা, দুর্গা, বিশ্বকর্মা, লক্ষ্মীনারায়ণ। এই অঞ্চলের চা-বাগানগুলি গড়ে উঠেছে পাহাড়ের ঢালে। ভিউপয়েন্ট থেকে বহুদূর অবধি ঢেউ খেলানো চা-বাগান আর সবুজ উপত্যকার ছবিটা বেশ লাগল। এখানেই হয়তো ধ্যানস্থ হয়ে কাটিয়ে দেওয়া যেত বাকি দিন, প্রকৃতির এই অপূর্ব শোভা দেখে। হঠাৎ মনে পড়ে গেল বোরোলি মাছের কথা। সুমন্তবাবু মধ্যাহ্নভোজে তার আয়োজন রাখবেন বলেছিলেন। বোরোলির দুর্নিবার আকর্ষণে ফিরে এলাম রিসর্টে।উত্তরবঙ্গের এই বিখ্যাত মাছের অপূর্ব স্বাদে মধ্যাহ্নভোজটা যে যারপরনাই মধুর হল সেটা মনে হয় না বললেও চলবে।

‘গ্রিনটি রিসর্ট’ থেকে মূর্তি বনবাংলো, মূর্তি নদীর সেতুর দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার। মধ্যাহ্নভোজন পর্বের পর যাওয়া হল সেখানে। সেতুতে দাঁড়িয়ে দেখছি কুলুকুলু ধ্বনিতে ছোট ছোট ঢেউ তুলে বয়ে যাচ্ছে সুন্দরী নদী। কতিপয় বাচ্চা ছেলে সেতু থেকে সোজা নদীতে ঝাঁপ দিচ্ছে। নদীও সস্নেহে ধারণ করছে তাদের। ভারী সুন্দর সেই দৃশ্য দেখে গাড়ি চলে এল চালসা মোড় পেরিয়ে চালসা টপে। এখানকার ভিউপয়েন্ট থেকে সবুজে মোড়া ডুয়ার্সের অনেকটা অংশের একটা নয়নাভিরামদৃশ্য চোখে পড়ে। গরুমারা, চাপড়ামারি দু’টি জঙ্গলই একসঙ্গে দেখা যায় এখান থেকে। সবুজে সবুজ চারধার। সবুজ ছাড়া এইমুহূর্তে আর একটাই রং উপস্থিত, আকাশের নীল। এবার সামসিং যাওয়ার রাস্তা ধরে যত এগোচ্ছি, ততই যেন কাছে আসছে দূরের নীল পাহাড়ের সারি। পথের পাশে তখন চা-বাগানের অনুপম সৌন্দর্য। এই অসামান্য কোলাজের বোধকরি তুলনা নেই। মেটেলি, সামসিং মোড় ছাড়িয়ে পৌঁছলাম যে জায়গাটায়, তার নামটাও দারুণ। লালিগুরাস। মরসুমে নিশ্চয়ই এখানে গুরাস, অর্থাৎ রডোডেনড্রন ফোটে। সেই থেকেই হয়তো এই নাম। এটি এখন এ অঞ্চলের এক জনপ্রিয় পিকনিক স্পট হয়ে দাঁড়িয়েছে, তেমনটাই শুনলাম গাড়িচালকের থেকে। হবে না-ই বা কেন? অবারিত, উন্মুক্ত চরাচর পুরোটাই সবুজ পাহাড় দিয়ে ঘেরা, আর নীচে সবুজ উপত্যকায় বিভিন্ন রঙের খেতকে পাশ কাটিয়ে এঁকেবেঁকে বহুদূর চলে যাওয়া মূর্তি নদী, গোটা দৃশ্যপটকেই করে তুলেছে নজরকাড়া, অসামান্য।

লালিগুরাস দেখে এবার গন্তব্য গরুমারা জঙ্গলের মেদলা ওয়াচটাওয়ার। বুধুরাম বিট্‌-এ বন দফতরের কাউন্টারে টিকিট কেটে মোষে টানা গাড়িতে চড়ে পৌঁছলাম নজরমিনারে। মোষ-সাফারির অভিজ্ঞতাটা ভালই হল। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে মূর্তি নদী। তিনতলা নজরমিনারের সর্বোচ্চ তলে দাঁড়িয়ে হাতি, গন্ডার, বাইসন সবই চোখে পড়ল। গন্ডার নদী পেরোচ্ছে, নদী পেরিয়ে যাচ্ছে হাতির দল, বাইসনের আকস্মিক দৌড়— এইসব খণ্ডচিত্র একসঙ্গে জুড়ে জঙ্গলের যে রোমাঞ্চকর পূর্ণচিত্রটা তৈরি করল সেটা এককথায় অনবদ্য। মেদলা নজরমিনার দেখে ফিরছি যখন, তখন মূর্তি নদীর জলকে লাল করে অস্তাচলে গেল বিভাবসু। কাছেই চটুয়া বস্তিতে (জঙ্গলের প্রবেশ তোরণের বাইরে) তখন আদিবাসী ছেলেমেয়েরা তাদের নৃত্যগীত প্রদর্শনের জন্য অপেক্ষা করছিল। মেদলা নজরমিনার দর্শনের সঙ্গেএই আদিবাসী নাচগানের অনুষ্ঠান দেখাটা এক টিকিটেই সম্পন্ন হয়। মাদলের ধ্বনিতে আদিবাসী ছেলেমেয়েদের নাচগানে আপ্লুত হলেন উপস্থিত দর্শকদের সবাই। সুরের সেই মধুর ধ্বনি কানে নিয়েই ফিরে এলাম রিসর্টে।

পরদিন যখন এই সুন্দর সফর শেষ করে নিউমাল জংশন স্টেশনের দিকে যাচ্ছি কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস ধরে কলকাতায় ফিরব বলে, তখনও যেন সফরের রেশ কাটেনি। ডুয়ার্সের বাতাবাড়ি ও সন্নিহিত দর্শনীয় জায়গাগুলির যে অপরূপ সৌন্দর্য দেখলাম এই দু’দিনে, তা বোধহয় চিরস্মরণীয় হয়েই থেকে যাবে মনের মণিকোঠায়।

যাত্রাপথ:নিউ মালজংশন থেকে বাতাবাড়ির দূরত্ব ১৪ কিলোমিটার। পুরো গাড়ি রিজার্ভ করলে খরচ পড়বে ৫০০ টাকার মতো। শিয়ালদহ থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস ধরে নিউমাল জংশন স্টেশনে নামাটা তাই সবচাইতে সুবিধাজনক।অন্য ট্রেনে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে এসেও চলে আসতে পারেন বাতাবাড়ি। দূরত্ব পড়বে ৬৫ কিলোমিটার। পুরো গাড়ি রিজার্ভ করলে খরচ হবে ২০০০ টাকার মতো। বাতাবাড়ি থেকে সারাদিনের সাইটসিয়িং-এর জন্য পুরো গাড়ি রিজার্ভের খরচ ২৫০০-৩০০০ টাকা। ডুয়ার্সে বাতাবাড়ির অবস্থানটা এমনই যে এখান থেকে গরুমারা, চাপড়ামারি, সামসিং, টোটোপাড়া, ভুটান সীমান্ত ফুন্টশোলিং, বিন্দু, ময়নাগুড়ির জল্পেশ মন্দির— সবই ঘুরে আসা যায় অনায়াসে।

রাত্রিবাস: চা-বাগান সংলগ্ন সুন্দর অবস্থানে রয়েছে ‘গ্রিন টি রিসর্ট’।

নন এসি দ্বিশয্যাঘরের ভাড়া ১৬০০ টাকা, এসি দ্বিশয্যাঘরের ভাড়া ২০০০-২৯০০ টাকা,এসি স্যুইটরুমের ভাড়া ৪৯০০ টাকা।

অতিরিক্ত আকর্ষণ হল সুস্বাদু স্থানীয় মাছ ও রিসর্টের চমৎকার বাঙালি রান্না।

যোগাযোগ:  সুমন্ত চৌধুরী, ফোন: ৯৮৩০০-৯৯৫৩৬, ৯৬৭৯৭-১২৪৩৫

ছবি সৌজন্য: লেখক।