আলেপ্পি

এ বার চলুন কেরলের ভিন্ন রূপ দর্শনে। কুমিলি থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে ‘প্রাচ্যের ভেনিস’ আলেপ্পি। বর্তমান নাম আলাপ্পুঝা। ভেম্বানাদ হ্রদ, পুন্নামাডা হ্রদ ও আরব সাগরে ঘেরা এই শহরের বুক চিরে অসংখ্য খাঁড়িপথের জাল তৈরি হয়েছে। শহরে ঢোকার আগেই কুট্টানাদ। এখানে সমুদ্রতল থেকে প্রায় ২ মিটার নীচে কৃষিজমিতে প্রচুর ধান চাষ হয়। তাই কুট্টানাদকে ‘রাইস বোল অব কেরল’ বলা হয়। বর্ষাকালে জলে ডুবে যাওয়া এই আবাদ যখন জলাভূমির চেহারা নেয়, তখন হয় মৎস্যচাষ। কুট্টানাদ বোট জেটি থেকে বোট যাচ্ছে আলেপ্পি।

অটো ভাড়া করে চলে আসুন তিন কিলোমিটার দূরে আরব সাগরের পারে। মনোরম বেলাভূমিতে কিছু ক্ষণ সময় কাটিয়ে অনতিদূরে দেখে নিন লাইট হাউস। এর পর বোট জেটি থেকে নৌকা বা বেসরকারি মোটরবোটে উঠে ভেসে পড়ুন জলজীবনের ছবি দেখতে। ব্যাকওয়াটারে ভাসতে ভাসতে চোখের সামনে দৃশ্যমান হবে কেরলের গ্রামজীবন। গ্রাম্য ঘরবাড়ির উঁকিঝুঁকি, খাঁড়ির দু’পাশে ধানখেত, কাজু আর গোলমরিচের বাগান, শিকারি মাছরাঙা, পানকৌরির আনাগোনা, জলের আয়নায় নারকেল গাছের ছবি— এক স্বপ্নময় যাত্রা। টুকরো টুকরো জলছবি দেখতে দেখতে এক সময় পৌঁছে যাবেন প্রসারিত অষ্টমুড়ি লেকে। এখানে চাইনিজ ফিশিং নেট নিয়ে জেলেদের ব্যস্ততা চলছে আর ভেসে আছে হাউসবোট।

আলেপ্পির প্রধান উৎসব ‘স্নেক বোট রেস’। পুন্নামাডা লেকে প্রতি বছর অগস্টের দ্বিতীয় শনিবার নেহরু ট্রফি বোট রেস অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় আলেপ্পিতে তিলধারণের জায়গা থাকে না।

কুইলন যাওয়ার পথে।

আরও পড়ুন: ‘ঈশ্বরের আপন দেশ’ কেরল আপনাকে স্বাগত জানায়​

‘কেট্টুভাল্লাম’ অর্থাৎ হাউজবোট। বিলাসবহুল হাউজবোট আলেপ্পির অন্যতম আকর্ষণ। কেরলের নিজস্ব শৈলিতে তৈরি এই হাউজবোটের কারুকার্য দেখলে বিস্ময় জাগে। রাতের মায়ায় হাউজবোটে ভেসে থাকার মুহূর্তগুলো চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

কুইলন

আলেপ্পিতে একরাত কাটিয়ে বেরিয়ে পড়ুন কেরলের আর এক বাণিজ্যবন্দর কুইলনের পথে। বর্তমান নাম কোল্লাম। আলেপ্পি থেকে সড়কপথে দূরত্ব প্রায় ৮৫ কিলোমিটার। সময় লাগে কমবেশি ২ ঘণ্টা। তবে সবচেয়ে আনন্দের হয়, যদি সারাটা দিন জলপথে ভাসতে ভাসতে যেতে পারেন কুইলন। এ ক্ষেত্রে, সরকারি লঞ্চ আপনাকে পৌঁছে দেবে। আলেপ্পি থেকে সকাল সাড়ে দশটার মধ্যে উঠে পড়ুন লঞ্চে। সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হাউজবোট, পরিত্যক্ত স্নেক বোট, জলজীবনের নানান ছবি দেখতে দেখতে এগিয়ে চলা ব্যাকওয়াটারের ছায়াশীতল পথ ধরে। কখনও দেখা যায় খাঁড়ির ওপর ছোট্ট সেতুতে এ পাড়া-ও পাড়া যাতায়াত চলছে। কৌতূহলী শিশুরা পরদেশিদের দেখে হাত নাড়ছে। কখনও আবার ছোট্ট মেয়েটা ডিঙি বেয়ে চলেছে স্কুলের পথে। বেলা গড়ালে লঞ্চ এসে ভিড়বে এক স্থানীয় গ্রামে। এখানেই লাঞ্চ বিরতি। তার পর সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে, তখন আর একপ্রস্থ বিরতি চা পানের জন্য। দিনান্তে আপনার জন্য আপেক্ষা করে থাকবে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। লেগুনের বুকে সূর্যের লুটোপুটি দেখে পৌঁছে যাবেন কুইলন। ৮ ঘণ্টার এই লম্বা সফর শেষ হবে সন্ধ্যা সাড়ে ছটায়।

কুইলন পৌঁছে অটোভাড়া করে দেখে নিন অমৃতানন্দময়ী মাতার আশ্রম, মহাত্মা গাঁধী বিচ, থঙ্গসেরি সৈকত, তিরুমুল্লাভরম সৈকত, ৫০০ বছরের পুরনো পর্তুগিজদের দুর্গ, লাইটহাউস। হাতে সময় বেশি থাকলে নৌকায় চেপে বেড়িয়ে আসতে পারেন মুনরো দ্বীপ। কাজুবাদামের কারখানা দেখতে ভুলবেন না। এ ছাড়া, খাঁড়িপথে নৌবিহারের মজা তো আছেই।

লঞ্চে কুইলন এলে দুটো রাত থাকতে পারলে ভাল হয়। সড়কপথের পর্যটকেরা সকাল সকাল আলেপ্পি থেকে বেরিয়ে কুইলন পৌঁছে দেখে নিতে পারেন আশপাশের দ্রষ্টব্য। সে ক্ষেত্রে, একটি রাত্রিবাসই যথেষ্ট।

ভারকালায় সূর্যাস্ত।

ভারকালা

কুইলন পর্ব শেষ করে এবার চলুন ৩৪ কিলোমিটার দূরে মনোরম সৈকত ভারকালার পথে। ভারতীয়দের কাছে এ সৈকত স্বল্পপরিচিত হলেও এর প্রাকৃতিক শোভা আর ছিমছাম, নিরিবিলি পরিবেশ বিদেশি পর্যটকদের মনে জায়গা করে নিয়েছে। তাই বোধহয় হোটেল, রেস্তরাঁ, দোকানপাট, পানশালা— সবেতেই পশ্চিমি দুনিয়ার ছাপ।

মালয়ালম ভাষায় বল্কল শব্দের অর্থ ভাল্লাকালাম। কথিত আছে, দেবর্ষি নারদ এখানে বল্কল ত্যাগ করেছিলেন। ভাল্লাকালাম থেকেই এ স্থানের নামকরণ হয়েছে ভারকালা। সোনালি বালুকাতট, নীলচে সবুজ সাগর, সবুজ নারকেল গাছের প্যারেড আর পাহাড়ের লাল দেওয়াল— প্রকৃতির এই হরেক রঙের শেড মন কেড়ে নেয়। ক্লিফ, অর্থাৎ পাহাড়ের এই লাল খাড়াই খোয়াইয়ের মতো অংশটা সমুদ্রতটের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ের উপর থেকে দেখা বেলাভূমি যেন ক্যালেন্ডারের ছবি। বালির বুকে রংবেরঙের ছাতা যেন খেলনার মতো সাজানো আছে।

পাহাড় থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসুন বেলাভূমিতে। একটি অংশ পাপনাশম সৈকত। ব্রহ্মার অনুচরদের পাপনাশ হয়েছিল এই স্থানে, তাই এরূপ নামকরণ। পাপনাশম সৈকতে স্নান করলে সব পাপ ধুয়ে যায়, এমনই বিশ্বাস। পাপমুক্তি হবে কি না সে গ্যারান্টি না থাকলেও ভারকালায় সমুদ্রস্নান যে বড়ই উপভোগ্য হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অন্য অংশ, অর্থাৎ ক্লিফটপ সৈকতেই পর্যটকেরা ভিড় জমায়। রঙিন ছাতার নীচে ডেকচেয়ারে গা এলিয়ে রৌদ্রস্নানের আলসেমিতে মেতে থাকে বিদেশি পর্যটকের দল। অ্যাডভেঞ্চারের আনন্দ নিতে প্যারাগ্লাইডিং করতে পারেন।  

আরও পড়ুন: ঘন অরণ্য, পাহাড়, উচ্ছ্বল ঝর্না, চা বাগান বুকে অপেক্ষায় কেরল​

হাতে সময় কম থাকলে কুইলন থেকে ভারকালা বিচ দেখে সে দিনই চলে যান ৬৪ কিলোমিটার দূরে তিরুঅনন্তপুরম। ভারকালায় রাত্রিবাস করলে বেড়িয়ে নিতে পারেন আশপাশের কিছু দ্রষ্টব্য। টিলার মাথায় সিঁড়ি বেয়ে উঠে দেখে নিন ১১৫২ সালে তৈরি প্রাচীন জনার্দন স্বামী মন্দির। ১০ কিলোমিটার দূরে আছে লেক-সংলগ্ন কাপ্পিল সৈকত। এ ছাড়াও বেড়িয়ে নিতে পারেন ভারকালা প্রস্রবণ, ব্রিটিশ দুর্গ।

দিনের শেষে সাগরের সঙ্গে সূর্যের হোলি খেলা দেখে মুগ্ধতায় মন ভরে যাবে। দিনের আলো নিভলে আলো-আঁধারির রহস্যময়তায় রাতের ভারকালা আরও রোম্যান্টিক হয়ে ওঠে। ক্লিফটপের মাথায় রাস্তার ধারে দেদার বিকোচ্ছে ঝিনুকের খেলনা, ঘর সাজানোর উপকরণ, পোশাক, কস্টিউম জুয়েলারি, সামুদ্রিক মাছ প্রভৃতি। কিউরিও শপে বিদেশিদের ভিড়। ইচ্ছে হলে কোনও ম্যাসাজ পার্লারে ঢুকে আয়ুর্বেদিক স্পা করিয়ে নিতে পারেন। আবার কোনও শামিয়ানা খাটানো রেস্তরাঁয় বসে গিটারের সুর শুনতে শুনতে নারকেল তেলে ভাজা চিকেন পাকোড়ার স্বাদ নিন আর উপভোগ করুন মায়াবী ভারকালা।

বিদেশি পর্যটকদের মনে জায়গা করে নিয়েছে ভারকালা সৈকত।

বিশেষ তথ্য:

  • স্নেক বোট রেসের টিকিট অনলাইনে বুকিং হয়। ওয়েবসাইটঃ www.alleppeysnakeboatrace.com
  • আলেপ্পি থেকে কুইলন যাওয়ার সরকারি লঞ্চের বিষয়ে জানতে দেখুন: www.dtpcalappuzha.com

কেনাকাটা

কুইলনের খ্যাতি তার মশলার জন্য। এ ছাড়া কাজুবাদামও কিনতে পারেন। ভারকালায় ঝিনুকের তৈরি অন্দরসজ্জার টুকিটাকি, রকমারি জুয়েলারির পাশাপাশি কিউরিয়ো ও হস্তশিল্পের সম্ভার তো আছেই।

যাত্রাপথ

কুমিলি থেকে বাস যাচ্ছে আলেপ্পি। সময় লাগে মোটামুটি ৫ ঘণ্টা। কুমিলি থেকে বাসে কোট্টায়াম এসে সড়কপথে বা জলপথে পৌঁছতে পারেন আলেপ্পি। কোচি থেকে বাসে বা গাড়িভাড়া করে সরাসরি যেতে পারেন আলেপ্পি। পথের দূরত্ব ৫৩ কিলোমিটার। এ ছাড়া ট্রেনও আসছে কোচি থেকে। আলেপ্পির দর্শনীয় স্থানগুলি অটো ভাড়া করে দেখে নিতে পারেন।

আলেপ্পি থেকে বাসে বা গাড়িতে যেতে পারেন কুইলন। ট্রেনও আসছে কুইলন। ডিস্ট্রিক্ট ট্যুরিজম্‌ প্রোমোশন কাউন্সিলের লঞ্চে খাঁড়িপথে আলেপ্পি থেকে কুইলন যাত্রা এক অনন্য অভিজ্ঞতা। অটো ভাড়া করে দেখে নিন আশপাশের দ্রষ্টব্য।

কুইলন থেকে ভারকালা যেতে ঘণ্টাখানেক সময় লাগে। তিরুঅনন্তপুরমগামী বাসে চেপে কাল্লামবালাম নামুন। সেখান থেকে অটো বা লোকাল বাসে চেপে পৌঁছে যাবেন ভারকালা। কুইলন থেকে সরাসরি ভাড়া গাড়িতে যাওয়াই সুবিধাজনক।

মারুতি, ইন্ডিকা প্রভৃতি ছোট গাড়ির ভাড়া ১৬০০-১৭০০, ট্যাভেরা, জাইলো গাড়ির ভাড়া ১৬০০ টাকা, ইনোভা, কোয়ালিস গাড়ির ভাড়া ১৯০০-২০০০ টাকা।

গাড়ির জন্য যোগাযোগ করতে পারেন: আর বিশ্বনাথন ৯৪৪৬১৭৬৫৮৬, ৮৯২১৩৯৩৬৫৭। এ ছাড়া আরও বেশ কিছু সংস্থা আছে যারা গাড়ির ব্যবস্থা করে দেয়।

আরও পড়ুন: কেরলের অচেনা অভয়ারণ্য মরমিয়া শেনদুরনি​

রাত্রিবাস

আলেপ্পি: কেরল ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের হোটেল ট্যামারিন্ড, যোগাযোগ: ০৪৭৭-২২৪৪৪৬০, ৯৪০০০-০৮৬৭৬, ৯৪০০০-০৮৬৭৫

ই-মেল: tamarindalappuzha@ktdc.com

ভাড়া: ১১০০-১৯০০ টাকা, ট্যাক্স আলাদা। সিজনভেদে ভাড়া ওঠানামা করে। ওয়েবসাইট www.ktdc.com

এ ছাড়া শহর জুড়ে ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন মানের অসংখ্য বেসরকারি হোটেল, লজ। ভাড়া ১০০০-৬০০০ টাকা। হাউজবোটে রাত্রিবাসের জন্য যোগাযোগ: ০৪৭৭-২২৬৪৪৬২

ওয়েবসাইট: www.atdcalleppey.com

                www.alleppeyhouseboats.net

কুইলন: কেরল ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের হোটেল ট্যামারিন্ড, যোগাযোগ: ০৪৭৪-২৭৪৫৫৩৮,০৪৭৪-২৭৬২৫৬৮, ৯৪০০০-০৮৬৬০

ই-মেল: tamarindkollam@ktdc.com

ভাড়া: ১১০০ টাকা, ট্যাক্স আলাদা। সিজনভেদে ভাড়া ওঠানামা করে। 

ওয়েবসাইট: www.ktdc.com

বিভিন্ন মানের অসংখ্য বেসরকারি হোটেল আছে। ভাড়া ১০০০-৮০০০ টাকা।

ভারকালা

বেদান্ত ওয়েক আপ (০৪৭০-২৬০৮৮২২), রাজাপার্ক বিচ রিসর্ট (০৪৭০-২৬০৭০৬০)

বেশ কিছু বেসরকারি হোটেল, লজ, হোমস্টে আছে। ভাড়া ১০০০-৬০০০ টাকা।

কলকাতায় কেরল ট্যুরিজমের ঠিকানা: সিআইটি শপিং কমপ্লেক্স, জি-১১, গড়িয়াহাট রোড (সাউথ), দক্ষিণাপণ, ঢাকুরিয়া, কলকাতা- ৭০০০৬৮, ফোন: ৮২৭৪০-০৭১৯০

ছবি: লেখক।