বন্দর-নগরী সফর শেষ করে চলুন ইডুক্কি জেলায় কেরলের জনপ্রিয় শৈলশহর মুন্নার। ৫,২০০ ফুট উচ্চতায় সাহেব আমলের এই হিলস্টেশনটিতে সারা বছর হাল্কা শীত অনুভূত হয়। ঢেউখেলানো সবুজ চা বাগান, মশলা বাগান, ঘন জঙ্গল, উচ্ছ্বল ঝর্না, হ্রদ, পাহাড়ি নদী— এ সব নিয়েই মুন্নার অপরূপা।

কোচি থেকে দূরত্ব ১৩০ কিলোমিটার হলেও যাত্রাপথের মনোরম শোভা দীর্ঘ জার্নির ক্লান্তিকে ভুলিয়ে দেয়। মুন্নার পৌঁছনোর ৪৬ কিলোমিটার আগেই পথের ধারে ভালারা জলপ্রপাত। জলরাশির লাস্য দেখে আবার এগিয়ে চলা। মুন্নারের অন্দরে প্রবেশের আগেই গাইড নিয়ে দেখে নিন স্পাইস গার্ডেন। গাইড আপনাকে নানান প্রকার মশলা, বনৌষধি গাছের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন।

মুন্নার ভাল ভাবে দেখতে হলে দুটো দিন তো লাগবেই। চা বাগান দিয়েই শুরু করা যাক। চা পাতা উত্তোলন ও প্রসেসিং দেখে চলুন ১৩ কিলোমিটার দূরে মাট্টুপেট্টি ড্যাম ও লেকের ধারে। টলটলে পান্না-সবুজ জলে বোট নিয়ে ভেসে পড়ুন। চা গাছে ঢাকা পাহাড়গুলো লেকটিকে চারপাশ থেকে জড়িয়ে আছে। এর পর ইকো পয়েন্ট দেখে চলে আসুন কুন্ডলা লেক। শিকারায় বসে নৌবিহারের আনন্দ নিতে পারেন। শহর থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে ১৭০০ মিটার উচ্চতায় মুন্নারের সর্বোচ্চ স্থান টপ স্টেশনে পৌঁছে দিগন্তবিস্তৃত পশ্চিমঘাট পাহাড়ের মেলা আর মেঘ-কুয়াশার খেলা দেখুন। এ ছাড়া ৯ কিলোমিটার দূরে দেখে নিতে পারেন আট্টুকাল জলপ্রপাত। প্রথম দিনের সফর শেষ হবে পোথোমেডু ভিউ পয়েন্টে। সূর্য ডোবার পালা শেষ করে ফিরে চলুন রাতের ঠিকানায়।

চলছে চা পাতা উত্তোলন।

আরও পড়ুন: ‘ঈশ্বরের আপন দেশ’ কেরল আপনাকে স্বাগত জানায়​

দ্বিতীয় দিন অরণ্যের হাতছানিতে চলুন এরাভিকুলাম জাতীয় উদ্যান। অনেকেই একে রাজামালাই নামে চেনেন। বিরল প্রজাতির প্রাণী নীলগিরি থর দেশের মধ্যে একমাত্র এই পাহাড়ি অভয়ারণ্যেই দেখা যায়। আবার পশ্চিমঘাট পর্বতমালার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আনাইমুদি (২৬৯০ মিটার) এখানেই অবস্থিত। ফেব্রুয়ারি-মার্চ ছাড়া সারা বছরই অরণ্য খোলা থাকে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। পারমিট নিয়ে বনবিভাগের মিনিবাসে রোমাঞ্চকর বনভ্রমণ উপভোগ করুন।

মারায়ুর

মুন্নার ভ্রমণ শেষ করে এগিয়ে চলুন ৪২ কিলোমিটার দূরে মারায়ুরের পথে। ৩০ কিলোমিটার চলার পর দেখা হবে সবুজ বনানীর মাঝে পাথরের গা বেয়ে নেমে আসা লাক্কোম জলপ্রপাতের সঙ্গে। স্থানীয়দের জনপ্রিয় পিকনিক স্পট। এটি এরাভিকুলাম ন্যাশনাল পার্কের অংশ বিশেষ। বনানীকে সঙ্গে নিয়ে পথ চলতে চলতে জঙ্গলের ঠাসবুনোটের ফাঁকে হঠাৎ দেখা মিলতে পারে হরিণ, গাউর, ময়ূর  প্রভৃতির। অরণ্যের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে ভেসে আসে অচেনা পাখির ডাক।

এ ভাবেই হঠাৎ গাছের ডালে দেখা মিলতে পারে ময়ূরের।

আরও পড়ুন: কেরলের অচেনা অভয়ারণ্য মরমিয়া শেনদুরনি​

মারায়ুরের প্রধান গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য মুনিয়ারা। পাহাড়ের উপর পাথরের সমাধিস্থলগুলি দেখলে মনে হবে খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ বছরের প্রাচীন মানবসভ্যতার ইতিহাসের সামনে আপনি দাঁড়িয়ে আছেন। একে একে দেখে নিন চন্দন গাছের বাগান, রাজীব গাঁধী চিলড্রেন্স পার্ক এবং ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কারিমুট্টি জলপ্রপাত। এ ছাড়া নীল পাহাড়ের সারি ও সবুজ উপত্যকার অনবদ্য কোলাজ খুবই দৃষ্টিনন্দন। প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকায় মারায়ুর আজও কোলাহল বর্জিত। মুন্নার থেকে সকালে বেরিয়ে মারায়ুর সফর সেরে ফিরে আসুন মুন্নার। তবে নিরিবিলিতে শান্ত মারায়ুরে রাত্রিবাস ভালই লাগবে।

পেরিয়ার

চা বাগানের আস্তরণে ঢাকা পাহাড়ি মুন্নারকে বিদায় জানিয়ে এ বার চলুন ৯৭ কিলোমিটার দূরে পেরিয়ার। সবুজ অরণ্য ও নীল হ্রদের অনুপম যুগলবন্দি পেরিয়ার। ১৮৯৫ সালে পেরিয়ার নদীতে বাঁধ দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে সুবিশাল জলাধার পেরিয়ার। একে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে ৭৭৭ বর্গ কিলোমিটার ব্যাপী অভয়ারণ্য। কুমিলি শহরে পৌঁছে আরও চার কিলোমিটার চলার পর পেরিয়ারের গেটওয়ে থেক্কাডি। কুমিলি বা থেক্কাডিতে রাত্রিবাস করে পর দিন দেখে নিন পেরিয়ার। তবে জঙ্গলের অন্দরমহলে রোমাঞ্চকর নিশিযাপনের অভিজ্ঞতা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। থেক্কাডি থেকে টিকিট কেটে গাড়ি নিয়েই প্রবেশ করুন অরণ্যের অন্দরে। তবে, বিকেল ৫ টায় প্রবেশদ্বার বন্ধ হয়ে যায়। জঙ্গলের বুক চিরে ২ কিলোমিটার পথ গেছে বোট জেটির কাছে। কেটিডিসি (কেরালা ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন) ও বন দফতরের বোট কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে লঞ্চে ভেসে পড়ুন পেরিয়ারের নীল জলে। লেকের বুকে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শুকনো গাছের মরা ডালগুলোকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলতে চলতে দেখতে পাবেন, ওঁত পেতে বসে থাকা মাছরাঙার শিকারি ভঙ্গিমা। পক্ষীপ্রেমীদের এই স্বর্গরাজ্যে ৩২৩ প্রজাতির পাখি আছে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখুন জঙ্গলমহলে। ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকলে বন্যপ্রাণীর দেখা মিলবে। এ ব্যাপারে লঞ্চে গাইডের সহযোগিতা পাওয়া যায়।

সবুজ অরণ্য ও নীল হ্রদের অনুপম যুগলবন্দি পেরিয়ার।

এ ছাড়া জিপ সাফারির ব্যবস্থাও আছে। ১৮৭৮ সালে ৩৫০ বর্গকিলোমিটার বনাঞ্চল ব্যাঘ্র প্রকল্পের আওতায় আনা হয়। বাঘ, হাতি, গাউর, বন্য কুকুর, সম্বর, স্পটেড ডিয়ার, জায়েন্ট স্কুইরেল প্রভৃতি বন্যজন্তুর পাশাপাশি ১৬০ প্রজাতির প্রজাপতি, ২৭ রকমের উভচর, ৪৫ প্রজাতির সরীসৃপ আছে। এ ছাড়া আছে ঘাস জাতীয় গাছ ও অর্কিডের সমারোহ।

কেনাকাটা: মুন্নার থেকে চা, কফি, কোকো পাউডার, হরেক রকম মশলা, হোমমেড চকোলেট, চন্দন সাবান, ভেষজ তেল, ক্রিম, ভেষজ প্রসাধনী, বিভিন্ন প্রকার হার্বাল ওষুধ কিনতে পারেন। মশলায় সমৃদ্ধ কুমিলি থেকেও কিনতে পারেন উচ্চমানের মশলাপাতি।

যাত্রাপথ: এর্নাকুলাম থেকে সরকারি ও বেসরকারি বাস যাচ্ছে মুন্নার। মুন্নারের দর্শনীয় স্থানগুলি গাড়ি বা অটো ভাড়া করে দেখে নিতে পারেন। ডিস্ট্রিক্ট ট্যুরিজম্‌ প্রোমোশন কাউন্সিলের কন্ডাকটেড ট্যুরেও সাইট সিয়িংয়ের ব্যবস্থা আছে। মুন্নার থেকে বাসে বা গাড়িতে যেতে পারেন মারায়ুর। অটো ভাড়া করে দেখে নিন আশপাশের দ্রষ্টব্য। এর্নাকুলাম থেকে ভাড়া গাড়িতে এসে মুন্নার ও মারায়ুর বেড়ানোই সুবিধাজনক। তবে এরাভিকুলাম ন্যাশনাল পার্কে প্রাইভেট গাড়ির প্রবেশ নিষেধ। সে ক্ষেত্রে বনবিভাগের মিনিবাসই একমাত্র ভরসা।

মুন্নার ভাল ভাবে দেখতে হলে হাতে সময় নিয়ে আসুন।

আরও পড়ুন: গল্পের বাঘ করবেটে টানে​

মুন্নার থেকে সরকারি ও বেসরকারি বাস যায় কুমিলি। ঘণ্টা পাঁচেক সময় লাগে। কুমিলি থেকে অটো বা ট্যাক্সিতে চলে আসুন চার কিলোমিটার দূরে পেরিয়ারের প্রবেশদ্বার থেক্কাডি। এর্নাকুলাম থেকে গাড়ি ভাড়া করে একসঙ্গে বেড়িয়ে নিতে পারেন মুন্নার, মারায়ুর, পেরিয়ার।

মারুতি, ইন্ডিকা প্রভৃতি ছোট গাড়ির ভাড়া ১৬০০-১৭০০, ট্যাভেরা, জাইলো গাড়ির ভাড়া ১৬০০ টাকা, ইনোভা, কোয়ালিস গাড়ির ভাড়া ১৯০০-২০০০ টাকা।

গাড়ির জন্য যোগাযোগ করতে পারেন: আর বিশ্বনাথন ৯৪৪৬১৭৬৫৮৬, ৮৯২১৩৯৩৬৫৭। এ ছাড়া আরও বেশ কিছু সংস্থা আছে যারা গাড়ির ব্যবস্থা করে দেয়।

রাত্রিবাস

মুন্নার: কেরল ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের হোটেল টি কাউন্টি, যোগাযোগ: ০৪৮৬৫-২৩০৪৬০, ০৪৮৬৫-২৩০৯৬৯, ০৪৮৬৫-২৩০৯৭১/৭২/৭৩

ই-মেল: teacounty@ktdc.com

ভাড়া: প্রাতরাশ সমেত ৭৩০০-১১৩০০ টাকা, ট্যাক্স আলাদা। সিজনভেদে ভাড়া ওঠানামা করে। 

Website : www.ktdc.com

মারায়ুরের সবুজ উপত্যকার অনবদ্য কোলাজ খুবই দৃষ্টিনন্দন।

এ ছাড়া শহর জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য বেসরকারি হোটেল, লজ এবং হোমস্টে। বেশ ব্যয়বহুল। ভাড়া ১০০০-৪০০০ টাকা।

মারায়ুর: মারায়ুর ট্যুরিস্ট হোম (০৪৮৬৫-২৫২২৩১, ০৯৪৯৭২৭৭১৯২), ক্যালউইন ট্যুরিস্ট হোম (০৯৪৪৭৫৭৫০২৩), জে এন এন ট্যুরিস্ট হোম (০৮৩০৪৯৪৯৩৪২)

ভাড়া মোটামুটি ৭০০-১০০০ টাকা।

পেরিয়ার: কেরল ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের তিনটি হোটেল আছে জঙ্গলের মধ্যে।

পেরিয়ার হাউস (০৪৮৬৯-২২২৫৪৬, ০৪৮৬৯-২২২৪৪৭, ০৪৮৬৯-২২২০২৬, ০৯৪০০০০৮৫৯৭) ই-মেল: periyarhouse@ktdc.com

ভাড়া: প্রাতরাশ সমেত ১৬০০-৪৯০০ টাকা, ট্যাক্স আলাদা।

লেক প্যালেস (০৪৮৬৯-২২৩৮৮৭/৮৮) ই-মেল: lakepalace@ktdc.com

ভাড়া: প্রাতরাশ, লাঞ্চ, ডিনার সমেত ১৩০০০-২৫০০০ টাকা, ট্যাক্স ও নৌবিহারের খরচ ধরা আছে।

অরণ্য নিবাস (০৪৮৬৯-২২২০২৩, ০৪৮৬৯-৩২১৯৩০, ০৪৮৬৯-২২২৭৭৯) ই-মেল: aranyanivas@ktdc.com

ভাড়া: প্রাতরাশ সমেত ৪৯৫০-৭৪৫০ টাকা, ট্যাক্স আলাদা।

সিজনভেদে ভাড়া ওঠানামা করে।

Website : www.ktdc.com

এ ছাড়া কুমিলি ও থেক্কাডিতে আছে অসংখ্য বেসরকারি হোটেল ও লজ। ভাড়া ১০০০-৪৫০০ টাকা।

কলকাতায় কেরল ট্যুরিজমের ঠিকানা: সিআইটি শপিং কমপ্লেক্স, জি-১১, গড়িয়াহাট রোড (সাউথ), দক্ষিণাপণ, ঢাকুরিয়া, কলকাতা- ৭০০০৬৮

ছবি: লেখক।