Advertisement
E-Paper

হ্যামিল্টনগঞ্জের কাছেই কুটুমবাড়ি ইষ্টিকুটুম

হ্যামিল্টনগঞ্জ স্টেশন থেকে ইষ্টিকুটুমের দূরত্ব ১৪ কিমি। গন্তব্যে পৌঁছে রাতযাত্রার হ্যাংওভার কাটিয়ে সুব্রতবাবুর খামার দর্শনে নেমে পড়েছি।

জগন্নাথ ঘোষ

শেষ আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০১৮ ১২:৪০
মেন্দাবাড়ির জঙ্গল ছেড়ে প্রায়শই বেরিয়ে আসে বুনো জানোয়ারের দল।

মেন্দাবাড়ির জঙ্গল ছেড়ে প্রায়শই বেরিয়ে আসে বুনো জানোয়ারের দল।

পর্যটন ব্যবসায় হোম-স্টেগুলি সামিল হওয়ায় বেড়ানোর ঠিকানা যেমন বেড়েছে, সীমিত সাধ্যে পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার পরিসর বেড়েছে এবং গ্রামীণ মানুষের স্বনির্ভরতার উপায়ও হচ্ছে। এ রাজ্যে ফার্ম ট্যুরিজম সম্পর্কে তেমন জানা ছিল না। উত্তরবঙ্গের সুব্রত কুণ্ডুর মুখে উত্তর পটকাপাড়ায় তাঁর ফার্ম হাউস ইষ্টিকুটুমের কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, এবারের ডেস্টিনেশন পটকাপাড়া।

হ্যামিল্টনগঞ্জ স্টেশন থেকে ইষ্টিকুটুমের দূরত্ব ১৪ কিমি। গন্তব্যে পৌঁছে রাতযাত্রার হ্যাংওভার কাটিয়ে সুব্রতবাবুর খামার দর্শনে নেমে পড়েছি। সঙ্গী বন্ধন বরাইক বুঝিয়ে দেন, এই পানিয়াল গাছ, আষাঢ়-শ্রাবণে পাকা ফল হাতে ডলে খেলে বেশ সুস্বাদু। ওই ডেউয়া।জানি, লবণ-লেবু-মরিচে হাল্কা জারিয়ে খেলে জিভের তৃপ্তি। সারণে এগোলে কাজল নীল অপরাজিতা, টাটকা লাল ঝুমকো জবা, মোরগঝুঁটি, মালতি।

ব্রেকফাস্টের শেষ পর্যায়ে বক ফুলের পকোড়া, চা, তারমধ্যে এসে পড়লেন ফার্মের কর্ণধার সুব্রত। হেড কুক ভাইরাস বলেন, এসবই বাবুর বাগানের। চা-টা শুধু নিমাতি বাগিচার। অর্থাৎ, আক্ষরিক অর্থেই গার্ডেন ফ্রেশ। কুণ্ডুবাবু বলেন, বাবার বরাবরই চাষবাসে ঝোঁক ছিল।আবার খাদ্যরসিকও ছিলেন। তিনি বলতেন, খাদ্যে পুষ্টি তো মনেও তুষ্টি। তাই আপন চাষের ডাল, তেল-আনাজ থেকে ঘরোয়া গাভীর দুধ। এই বাসনা থেকে এখানে ১০০ বিঘে জমি ধরে নিলেন। তারপর এই খামার কাহিনি।

আরও পড়ুন: সহসা সবুজের সভায়

আরও পড়ুন: নৈনিতাল-কৌশানি-বিনসর-চৌকরি​

২০১৩ সালের জন্মাষ্টমীতে পিতার ইচ্ছের সঙ্গে জুড়লেন ফার্ম ট্যুরিজম। কিন্তু কেন? সুব্রত বলেন, ‘‘ভোজন আর ভ্রমণ জুড়ে একটা পূর্ণ সার্কিট করতে চাইলাম। আহারে যেমন হরেক ট্রেজারি খুলে দিয়েছি, বিহারেও প্রকৃতি তার ওপেন ট্রেজারি মেলে দিয়েছে।’’

কথার মাঝেই লিটারখানেক করে বেলের পানা রেখে গেল একটি মেয়ে, রূপন্তি।কুণ্ডুবাবুর সাম্রাজ্য সামলে রাখেন পাঁচ প্রহরী— ভাইরাস, বন্ধন, দীপাঞ্জন, দুই মেয়ে চিমো এবং এই রূপন্তি। সুব্রত বলেন, এই যে পানীয়, ফার্মের পাকা বেলের সঙ্গে ঘরোয়া দুধ মিশিয়ে তৈরি।বিশুদ্ধ গো দুগ্ধের সঙ্গে গাছপাকা বেলের সমন্বয়ে নির্মিত সরবত লোভের উদ্রেক করে।

বলেই ফেলি, ভোজনটা সেরে নিয়ে ভ্রমণে যাই, কি বলেন? দুটোই চলুক বলে সুব্রত এগোন।ফার্মে কাঁঠাল, লিচু, মুসাম্বি, কালোজাম, গোলাপজাম, পেঁপে, কমলা, করমচা, কামরাঙা, পেয়ারা, বাতাবি, নাশপাতি, তাল, বেল, খেজুর, পাতিলেবু, গন্ধরাজ, সুপুরি পাবেন।টিম্বার বলতে পাচ্ছেন সেগুন, গামার, জারুল, রসুনি, চিলৌনি। আনাজও তো আছে? ফার্মের আনাজই ব্যবহার করি আমরা। বেগুন, শশা, মুলো, গাজর, কড়াই, পালং। ১৫ একর জমিতে এর চাষ। কালোমুনিয়া, স্বর্ণমাসুরি আর গোবিন্দভোগ, এই তিন ধরনের চালের চাষ হয় এখানে। আমাদের সমগ্র চাষে জৈব সার ব্যবহৃত হয়। সেই সার উৎপাদন প্রক্রিয়াও চলছে এখানে। আপনার সাম্রাজ্যে চা বাগানও দেখছি? হ্যাঁ, ওটা শো-পিস। সাদরি মেয়েরা চা পাতা তোলে। কাঁচা পাতা বিক্রি হয়ে যায় চা ফ্যাক্টরিতে।

একটু থেমে দ্বিতীয় কিস্তি শুরু করেন কুণ্ডুবাবু। খামার পর্যটন মানেই কিন্তু মরসুমি মেনু। চৈত্রে পাকা বেল, বকফুল ফ্রাই। মাঘে চা ফুলের পকোড়া স্বাদে উত্তম। ফাল্গুনের লাঞ্চ টেবিলে ডুয়ার্সের বিখ্যাত ঢেঁকি সর্ষে। হলংয়ের বাংলোয় বসে প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু মদন বর্মনের হাতের এই পদটি বারংবার চেয়ে খেয়েছেন। চৈত্রে পাবেন ভুরু চেউ।

উই ঢিবিতে জন্মানো মাশরুম (রাভা ভাষায় চেউ)। পদটি একেবারে চিকেনের বিকল্প। ভাদ্র মাসে তাল বড়া, তাল ক্ষীর। আশ্বিনে বাতাবি পাকছে। শীতে সর্ষে খেত জুয়েলারি ফিল্ড। মেনুতে ঢুকছে রাই ফুলের ফ্রাই, রাই শাক। ফার্মের খেজুর গাছ শীতে রসস্থ হয়েছে। সাঁঝে-ভোরে সেই অম্লান রস। মাঠের গোবিন্দভোগ আর নলেন রসের মেলবন্ধনে সুস্বাদু পরমান্ন, উইন্টার স্পেশাল। মাঠের আনাজে পঞ্চরত্ন নবরত্ন। ফার্মের খাঁটি সর্ষের তেলে রান্না যাবতীয় পদ।

সুব্রত বলেন, কালোমুনিয়া চালের ফ্রায়েড রাইস মেনুতে থাকছে। খামারের গরুর খাঁটি দুধ, বিশুদ্ধ ঘি। আমি ট্যুরিস্টকে ডুয়ার্সের নদীয়াল মাছ খাওয়াতেই পছন্দ করি। খামারবাড়ির শেষ প্রান্তে কালজানি নদী ছাড়াও পোরে, বানিয়া, তোর্সার পেটের সুস্বাদু মাছ, বোরেলি, চেলি, পাথরচাটা, কুসমা। জেলেদের বরাত দেওয়া আছে। সারাদিন ঘুরে দেখেও ফার্মস্টোরি শেষ হওয়ার নয়। পরদিন থেকে আমাদের প্রকৃতিবীক্ষণ।

গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসে কুণ্ডুবাবু বলেন, চলুন ডুয়ার্সের সবথেকে রোমাঞ্চকর স্পট থেকে শুরু করা যাক। মানে মেন্দাবাড়ি? ঠিক তাই। মনে পড়ে ১৩ বছর আগের সেই বর্ষণমুখর দুপুরটা। বাংলোর জানলার ফ্রেমে ধোয়াধার বৃষ্টিতে ভিজছে কালচে বন। বুড়ি নদী উপচে জলের টান। পাশে রাইনো ক্যুপ ভিজছে। মেঘের চাতালে বোমাবাজি চলে, সেই সঙ্গে ভেকের ডাক, কেকানাদ। সমবেত অর্কেস্ট্রার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ‘কি সুর বাজে প্রাণে আমিই জানি।’

হাইওয়ে ধরে বেশ খানিকটা গিয়ে গাড়ি ডানদিকের মেটে পথে নেমেছে। এদিকে কিছু কাঁচা ঘরগেরস্ত শুরু হল। সুপুরি ছায়ার নীচে বেড়ার দেওয়াল, টিনের চালা। ইষ্টিকুটুম থেকে ৬ কিমি পেরিয়ে এসেছি। গাড়ি ঢুকল মেন্দাবাড়ির জঙ্গলের হাতায়। বুনো চেহারাটি তার একই আছে দেখছি। শুধু লিচু গাছটা তাগড়া হয়ে গোড়ায় সিমেন্ট বাঁধাই বেদি তৈরি হয়েছে। লিচুর ছায়ায় বসে কুণ্ডুবাবুর জাদুবাক্স থেকে বেরিয়ে এল দীপ নারায়ণের বোঁদের বোমা, খয়েরি ল্যাংচা। স্বাপদের বিপদে বসে বনভোজটা তৃপ্তিকরই হল। এবারে তোর্সা চরে যাওয়ার অনুমতি চাইতেই বিটবাবু বললেন, বিধি মেনে স্থানীয় জিপসি এবং গাইড নিতে হবে।

সিসি লাইন চিরকালীন অন্ধকারাচ্ছন্ন হুইসপারিং ট্রেইল। সারা আকাশে মেঘের সংক্রমণে পথ আরও আঁধারে ঢেকেছে। বাতাসের ছোট ছোট খুনসুটিতে পাতার ফিসফিসানি শুনি। সেই আলাপ ক্রমশ বেড়ে ঝড়ের মুখড়া রচনা। তারপর উদ্দাম ঝঞ্ঝা। জঙ্গলে ছেড়া পাতা উড়ছে। লাটোর ফল ছড়িয়েআছে পথে। প্রবল আন্দোলিত গাছপালা। এবারে ভীম বিক্রমে বন ঝাপসা করা বৃষ্টি। গাড়ির মধ্যে বসা ২০ মিনিটের একটা শর্টফিল্ম দেখছি। অবশেষে সমারোহে রোদ উঠেছে। টাওয়ারের মাথায় বসে দেখি নীচে চেপ্টি ঘাসে ঢাকা তোর্সা। এই ঘাস খেতে খেতে জলদাপাড়ায় রাইনো ঢোকে।

বিটবাবুটির সঙ্গে আলাপ হল। নিউ পোস্টিং। বেহালা ছেড়ে এসে কেমন বেহাল লাগছে? সুপার ফাইন, যুবকটি বলেন। বন, বন্য, বনচোর সব মিলিয়ে একটি রহস্য সিরিজ। কাজের মন আর স্থান একজোট হলে কাজের কাজ হয়। এখানে সেটি আছে দাদা। বেস্ট অফ লাক। বিকেল ঝুঁকে পড়তেই নিপাট আঁধারে ঢাকল জঙ্গল। কালো চাদরে হলুদ বুটিদার জোনাকির নকশা ছিঁড়ে এগোলাম সঞ্জয় হাজারির গ্রিন কটেজের দিকে। পথে পড়ল কেটা টাওয়ার। এখানে রাতে ঘাঁটি করলে বুনো জানোয়ার দেখা যাবে। একবার সদ্য বিকেলেই এই পথের মাঝে পেয়েছিলাম গজকুমার অ্যান্ড কোম্পানিকে। মিনিট চল্লিশ দমবন্ধ সময় কেটেছিল। কোম্পানি একবার ছুটে আসে, আবার পিছু হটে।

সুপুরি, তূণ, সেগুন, জারুল, পিঠালি বনের হৃদয়পুরে বসে আছি। বনের নিভৃতে ফেলে যাওয়া প্রেমপত্রের মতো কাঠের বাংলোটা। এ বনে সারা দুপুর ঘুঘুর ডাক, বিকেলে ওড়ে মদনটাক, সাঁঝে কেকানাদ। রসুই বারান্দায় সান্ধ্য চা বৈঠকে বসে বসে দেখি চাঁদের ভৃঙ্গার খুলে আলোর উৎসবের মাঝে চাতকের তৃষিত ডাকে আমাদের হৃষিত মন, খুশিতে বন। হঠাৎ পাশের গ্রাম থেকে বিশ-পঁচিশ মশাল ম্যান ঝোপ ভেঙে এগিয়ে আসছে। সঞ্জয় বলে, তাড়াতাড়ি দোতলায় উঠুন। প্রায় সামনেই ডজনখানেক ডবল ডেকার আকৃতির ছায়া। মশালের আলোয় দিগভ্রান্ত মহাকাল বুড়ি নদীর তীর ধরে বনের ব্ল্যাকহোলে অদৃশ্য হলে সব নিশ্চুপ। এই ডুয়ার্স বনের দস্তুর। সুব্রত বলেন, বিপদ কেটে গিয়েছে, চলুন তল্পি গোটাই।

লেখক পরিচিতি:তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সংবাদপত্র, সাময়িকপত্র এবং লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত লেখালেখি চলছে। লেখার বিষয় বাংলায় পর্যটনের নতুন দিশা দেখানো, সেখানকার প্রকৃতি-পরিবেশের সঙ্গে পরিচয় করা, স্থানীয় জনজাতির সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হওয়া, ওঁদের নিত্যকার যাপন, জীবিকা, খাদ্যাভ্যাস থেকে মেলা-পার্বণ-বিনোদন প্রভৃতি বিষয় জানা এবং লেখা।

ছবি সৌজন্য: লেখক।

Durga Puja Celebration 2018 Durga Puja Special Durga Puja Nostalgia Kolkata Durga Puja Durga Puja Preparations Travel and Tourism Short Trip North Bengal
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy