সবং কলেজে খুনের ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ফের ছাত্র পরিষদের (সিপি) ১২ জন নেতা-কর্মীকে তলব করল পুলিশ। তালিকায় রয়েছেন খুনের ঘটনায় প্রথম অভিযোগকারী, সবং সজনীকান্ত কলেজের সিপি পরিচালিত ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক সৌমেন গঙ্গোপাধ্যায় এবং ছাত্র পরিষদের কলেজ শাখার সভাপতি শ্যামল ওঝা। শ্যামলের খুড়তুতো ভাই পল্টু ওঝাকে ইতিমধ্যে এই খুনের মামলায় গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলা পুলিশ সুপার ভারতী ঘোষ বলেন, “সবং কলেজের খুনের ঘটনায় তদন্তের স্বার্থে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক সৌমেন গঙ্গোপাধ্যায়-সহ কয়েকজনকে ডাকা হয়েছে।” রবিবার রাতে নোটিস পাঠিয়ে আজ, সোমবার মেদিনীপুর কোতোয়ালি থানায় ডাকা হয়েছিল সিপি-র ওই ১২ জনকে। নোটিস পাঠিয়েছিলেন খুনের ঘটনার তদন্তকারী অফিসার বিশ্বজিৎ মণ্ডল। কিন্তু কেউই আসেননি। উল্টে সিপি-র তরফে তদন্তকারী অফিসারকে চিঠি পাঠিয়ে জানানো হয়েছে, সবং থানায় বা সংশ্লিষ্টদের বাড়িতে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক। সৌমেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। তবে সিপি-র কলেজ শাখার সভাপতি শ্যামল বলেন, “কৃষ্ণপ্রসাদের খুনের ঘটনা নতুন করে সাজাতেই আমাদের ডাকা হয়েছে। প্রকৃত জিজ্ঞাসাবাদের ইচ্ছে থাকলে তো সবংয়েই তা করা যেতে পারে। তাই আমরা থানার তদন্তকারী অফিসারকে ডাকযোগে চিঠি পাঠিয়েছি।”
এই খুনের ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গত ১৯ অগস্ট সিপি-র আট সদস্যকে মেদিনীপুর কোতোয়ালি থানায় তলব করেছিল পুলিশ। কলেজের ছাত্র সংসদের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক সৌগম সেন, বর্তমান সহ-সাধারণ সম্পাদক সুমন বেরা-সহ চার জন মেদিনীপুরে গিয়েওছিলেন। তারপরই গ্রেফতার করা হয় পল্টুকে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুনের ঘটনাটিকে সিপি-র অন্তর্দ্বন্দ্বের জের বলে ইঙ্গিত করায়, তাকে মান্যতা দিতে এ সবই পুলিশ পরিকল্পনামাফিক করছে বলে কংগ্রেস এবং সিপি-নেতৃত্বের অভিযোগ। সোমবার মেদিনীপুরে সবংয়ের কংগ্রেস বিধায়ক মানস ভুঁইয়া বলেন, “জেলার পুলিশ সুপার মুখ্যমন্ত্রীকে জঙ্গলমহলের মা বলেছেন। কন্যা কী করে মায়ের নির্দেশ অমান্য করবেন? পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে মুখ্যমন্ত্রী সবংকে টার্গেট করে অত্যাচারের রোলার চালাতে শুরু করেছেন।” মানসবাবুর কথায়, “ছাত্র পরিষদের ছেলে খুন হল। আর গ্রেফতার হল ছাত্র পরিষদের ছেলেই। আমি পুলিশ সুপারকে, মুখ্যমন্ত্রীর স্নেহধন্য কন্যাকে অনুরোধ করব, কৃষ্ণপ্রসাদ জানাকে যখন মারা হচ্ছে, সেই ফুটেজ প্রকাশ্যে আনুন। যারা যারা মারছে তাদের গ্রেফতার করুন।’’ মানসবাবুর মতে, ‘‘আমার বাড়ির ছেলেকে আমি মারব, আমার বাড়ির ছেলেরা মারবে, এটা হয় কখনও? আসলে মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া ছাত্র পরিষদের অন্তর্দ্বন্দ্বের তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে পুলিশ সুপার কাজ করছেন।”
প্রথমে সোমবারই কৃষ্ণপ্রসাদের স্মরণসভা হওয়ার কথা ছিল। পরে স্থির হয় ২৮ অগস্ট স্মরণসভা হবে। ওই দিন আবার কলকাতায় সিপি-র প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে কর্মসূচি রয়েছে। একই দিনে দুই কর্মসূচি নিয়ে কংগ্রেসের অন্দরে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। এ দিন মানসবাবু বলেন, “ছাত্র পরিষদের ছেলেরাই বলল, ২৮ অগস্ট প্রতিষ্ঠা দিবসেই কৃষ্ণপ্রসাদের স্মরণসভা করতে। আমি সইফুল (মহম্মদ সইফুল, ছাত্র পরিষদের রাজ্য সহ-সভাপতি), অমিতদের (অমিত পাণ্ডে, ছাত্র পরিষদের জেলা সভাপতি) বলেছি, তোমরা কলকাতায় যাবে। আমি ছাত্র পরিষদের প্রাক্তন কর্মী হিসেবে জেলা কংগ্রেস নেতৃত্বকে নিয়ে, প্রদেশ নেতৃত্বের যাঁরা আসবেন, তাঁদের নিয়ে সবংয়ে সভা করব। এর মধ্যে কেউ বিতর্ক খোঁজার চেষ্টা করবেন না।” সিপি-র রাজ্য সহ-সভাপতি মহম্মদ সইফুলের কথায়, “কৃষ্ণপ্রসাদের খুন ছাত্র পরিষদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বলে প্রতিষ্ঠা করতে আমাদের ছেলেদের দিয়ে মিথ্যে বয়ান নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে ২৮অগস্ট থেকে জোরালো আন্দোলন শুরু হবে।”
এ দিন বিকেলে সবংয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে মিছিল করে তৃণমূল। বুড়াল বাদে বাকি ১২টি অঞ্চলে মিছিল হয়। কৃষ্ণপ্রসাদ খুনের ঘটনায় কংগ্রেস নোংরা রাজনীতি করছে বলে অভিযোগ করা হয় মিছিল থেকে। প্রকৃত দোষীদের গ্রেফতারের দাবিও জানানো হয়। তৃণমূলের স্থানীয় নেতা তথা জেলা কর্মাধ্যক্ষ অমূল্য মাইতি বলেন, “সিসিটিভি ফুটেজে সিপি-র ছেলেদের হাতেই লাঠি দেখা গিয়েছে। সেখানে যাদের দেখা গিয়েছে, তাদের জেরা করে পুলিশ প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু মানস ভুঁইয়ারা রাজনীতির খেলা খেলছেন।’’