নদীর অপর প্রান্তে বাংলাদেশ। সে দিকে হাত দেখিয়ে জালালপুরের জয়ন্ত মণ্ডল ও সোমনাথ ঘোষ বলেন, ‘‘ওপারে শ্রীপুর ও ভাতসালা গ্রামে কংক্রিটের বাঁধ হয়েছে। সেই বাঁধ ভাঙে না। ঝড় এলে ও দিকের মানুষের কোনও ক্ষতি হয় না। আর এখানে ফি বছর বাঁধ ভেঙে সর্বস্ব হারাতে হয় আমাদের।’’ তার পরে একটা দীর্ঘঃশ্বাস ছেড়ে তাঁরা যোগ করলেন, ‘‘ত্রাণ দিতে হবে না। গায়েগতরে খেটে নুন ভাতের ব্যবস্থা করতে পারব। আমাদের কংক্রিটের বাঁধ চাই।’’
বসিরহাটের টাকি পুরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের জালালপুর। ইয়াসের দিন অখ্যাত এই এলাকাকে গিলে খেয়েছিল ইছামতী। তার পরে কেটে গিয়েছে ১০ দিন। তবু অনেক এলাকার মতো এখানেও শুরু হয়নি বাঁধ মেরামতির কাজ। আগামী সপ্তাহে ভরা কটালে নদীতে জলস্ফীতি হলে ফের এলাকা প্লাবিত হওয়ায় শঙ্কা রয়েছে। ভীত জালালপুর।
বসিরহাট মহকুমা প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে, শুক্রবার বসিরহাটে ক্ষতিগ্রস্ত নদী-বাঁধের সংস্কার নিয়ে বৈঠক করেছেন সেচমন্ত্রী সৌমেন মহাপাত্র, জেলাশাসক সুমিত গুপ্তা, মহকুমাশাসক (বসিরহাট) মৌসম মুখোপাধ্যায়, জেলা পরিষদের সভাধিপতি বীনা মণ্ডল এবং সেচ দফতরের কর্তারা। সেখানে ছিলেন কয়েকজন বিধায়কও। ইয়াসের প্রভাবে জলোচ্ছ্বাসে এই মহকুমায় প্রায় দেড় কিলোমিটার নদী-বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। প্রায় ৪৫ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামনেই অমাবস্যার কটাল। মহকুমা প্রশাসনের এক আধিকারিক জানান, কটালের আগে সব বাঁধ সারানোর জন্য তৎপর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন সেচমন্ত্রী। জালালপুরে এক দিনের মধ্যে বাঁধের কাজ শুরু হবে বলে প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে।
শনিবার জালালপুর গিয়ে দেখা গেল, শতাধিক বিঘা আনাজের জমি জলমগ্ন। পচে গিয়েছে পাট, ঝিঙে, পটলের মতো আনাজ। ওই ওয়ার্ডের পশ্চিম ব্যাওকাটি ও পূর্ব ব্যাওকাটি-ও প্লাবিত হয়েছিল। বেশ কিছু মানুষ ত্রাণ শিবিরে উঠে গিয়েছেন। ঘর পড়েছে। ভেঙেছে কংক্রিটের রাস্তা। উপড়ে পড়েছে গাছ ও কলের পাইপ।
জালালপুরের নারায়ণ দাস, বনমালী বিশ্বাস বলেন, ‘‘ইয়াসের দিনের কথা মনে পড়লে আজও ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে। দুপুরে সবে খেতে বসেছি, এমন সময় প্রতিবেশীদের চিৎকার কানে আসে। বাঁধ ভেঙে জল ঢুকছে গ্রামে। সবাই নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটেছিলাম।’’ ওই পরিস্থিতিতে ঘরের জিনিসপত্র নেওয়ার মতো সময় ছিল না সোমনাথদের। প্রাণ বাঁচাতে কোনওরকমে বাচ্চাদের কোলে বা পিঠে চাপিয়ে ত্রাণ শিবিরে উঠেছিলেন সকলে। দেখতে দেখতে ইছামতীর জলে ভেসে গিয়েছিল ঘরবাড়ি-চাষের খেত।
গত ১০ বছর ধরে ইছামতীর চর দখল করে পলি কাটা চলছে বেআইনি ভাবে। মেছোভেড়ি-ও তৈরি হয়েছে। এর ফলে প্লাবনের সমস্যা আরও ভয়ঙ্কর হয়েছে বলে জানাচ্ছেন এলাকার বাসিন্দাদের একাংশ। বাসুদেব দাস দফাদার নামে তাঁদের এক জনের কথায়, ‘‘এক সময় ইছামতীতে জেগে ওঠা চর দখল করে শুরু হয়েছিল ইটভাটার জন্য পলিমাটি কাটা এবং মেছোভেড়ি করার অবৈধ কাজ। সেই কাজ এখনও চলছে। এলাকাবাসীর একাংশ ওই দুই ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন।’’
পুরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বিদায়ী সিপিএম কাউন্সিলর সাধন নাথ বলেন, ‘‘১০ বছর আগে জালালপুরে নদীর পলি কেটে ইটভাটায় সরবরাহের কাজ শুরু হয়েছিল। একই সঙ্গে চালু হয় নদীর পাড় কেটে মাছের ভেড়ির ব্যবসাও। সেই কাজের বিরোধিতা করেছিলাম। কিন্তু এলাকাবাসীর একাংশের জন্য বিরোধিতা ধোপে টেকেনি। এখন নদী আগ্রাসী হয়ে বাঁধ ভেঙে
গ্রাম ভাসাচ্ছে।’’
এ প্রসঙ্গে টাকির পুর-প্রশাসক, তৃণমূলের সোমনাথ মুখোপাধ্যায়ের দাবি, ‘‘জালালপুরে মেছোভেড়ি তৈরি এবং নদীর পাড়ে মাটি কাটার বিরুদ্ধে থানায় এফআইআর করেছি। কিন্তু এলাকার এক শ্রেণির মানুষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। ঠিক করেছি, পুলিশ-প্রশাসন এবং ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠক করে এ নিয়ে চরম একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’’ বাঁধ মেরামতির কাজ এখনও শুরু না-হওয়া প্রসঙ্গে তাঁর প্রতিক্রিয়া, ‘‘বাঁধ মেরামতি শুরু হওয়ার কথা।আধিকারিকেরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন বলে শুনেছি। আমরা ভাঙা বাঁধ মেরামতির চেষ্টা করেছিলাম। জলের স্রোত বেশি হওয়ায় তা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। দুর্গত মানুষকে ত্রাণ
দেওয়া হচ্ছে।’’