দু’দিন আগেই মজুত করা ছিল হাজার হাজার নিষিদ্ধ বাজি। বাঁশের মাচায় শুকোতে দেওয়া ছিল বাজিগুলি। কিন্তু দু’দিনেই উধাও সে সব। হারালে বিস্ফোরণস্থল ঘিরে ‘নো এন্ট্রি’ বোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছিল পুলিশ। পুলিশি নজরদারিও থাকার কথা। তার পরেও বিপুল নিষিদ্ধ বাজি কোথায় গেল, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
গত শনিবার চম্পাহাটির হারালের বাজি মহল্লায় একটি কারখানায় তীব্র বিস্ফোরণ ঘটে। কয়েক জন গুরুতর আহত হন। সেই রাতেই গৌরহরি গঙ্গোপাধ্যায় নামে এক আহতের মৃত্যু হয়। সোমবার বাইপাসের একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান বিশ্বজিৎ মণ্ডল (২৬) নামে আরও এক জন। এখনও দু’জন চিকিৎসাধীন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ঘটনার দিনই এলাকায় গিয়ে দেখা গিয়েছিল, বিস্ফোরণস্থলের আশপাশে একাধিক কারখানায় নিষিদ্ধ শব্দবাজি মজুত রয়েছে। একটি জায়গায় দেখা যায়, বাঁশের মাচা তৈরি করে প্রকাশ্যেই প্রচুর বাজি রোদে শোকানো হচ্ছে। অথচ, দু’দিন পরে, সোমবার সেখানে গিয়ে দেখা গেল, সব ফাঁকা। বিস্ফোরণস্থল ঘেরা রয়েছে আগের মতোই। কিন্তু আশপাশে মজুত সেই সব নিষিদ্ধ বাজির আর চিহ্ন নেই। ফাঁকা পড়ে রয়েছে বাজি শোকানোর সেই বাঁশের মাচা।
বাজি বাজেয়াপ্ত করার কথা পুলিশ কিছু জানায়নি। তা হলে কোথায় গেল সেই বাজি? স্থানীয় সূত্রের খবর, রাতের অন্ধকারেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে সব বাজি। আপাতত তা মজুত করা হয়েছে এলাকারই কোনও বাড়িতে। এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকায় প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বাসিন্দাদের একাংশ। অভিযোগ, ওই কারখানার মালিক কারা, তা জানেন এলাকার সকলেই। তার পরেও তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি। এমনকি, সোমবার পর্যন্ত ফরেন্সিক দলও এলাকায় আসেনি। পুলিশ জানিয়েছে, ছুটি থাকায় ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞেরা আসেননি। তদন্ত চলছে।
ওই কারখানার মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সামনে আসছে। অভিযোগ, বেআইনি কারখানা নিয়ে বৈধ ব্যবসায়ীদের একাংশ বার বার প্রতিবাদ করেছেন। তার পরেও কাজ বন্ধ হয়নি। প্রশাসনের তরফেও কারখানায় অভিযান চালানো হয়েছিল। কিছু দিন বন্ধ রাখার পরে আবারও কারখানা চালু করা হয়। প্রশাসন এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির উপরে ‘প্রভাব’ খাটিয়েই তাঁরা অবৈধ কারবার চালু রেখেছেন বলে দাবি। এমনকি, বেআইনি ওই কারখানা চালাতে পাশের একটি বেসরকারি প্রাথমিক স্কুল বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলেও অভিযোগ। অবৈধ ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বাজি ক্লাস্টার করতেও তাঁরাই বাধা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ।
আরও অভিযোগ, ব্যবসায়ী সমিতির সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিস্ফোরণের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এমনকি, হতাহতের সংখ্যা নিয়েও লুকোচুরি চলছে বলে অভিযোগ। বিস্ফোরণস্থলের পিছনে ফাঁকা মাঠে সে দিন প্রায় ১৫টি সাইকেল পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল। কয়েকটি আধপোড়া অবস্থায় ছিল। সোমবারও সেই সাইকেলগুলি পড়ে থাকতে দেখা যায়। অভিযোগ, সব ক’টি সাইকেলই কারখানার কর্মীদের। সকলেই সেই সময়ে কাজ করছিলেন। বিস্ফোরণের পরে সাইকেলগুলি সরিয়ে পিছনের মাঠে ফেলা হয়। বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, অত জন কর্মীই কাজ করছিলেন। এত বড় বিস্ফোরণের পরে তাঁরা কোথায় গেলেন, সেই প্রশ্ন তুলছেন তাঁরা।
অন্য দিকে, পর পর বিস্ফোরণের পরে বাজি ক্লাস্টার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন এলাকার মানুষ। এত দিনেও কেন ক্লাস্টারের কাজ এগোল না, সেই প্রশ্ন উঠছে। ক্লাস্টারের জন্য ইতিমধ্যেই এক দফায় স্থানীয় মানুষজনের জমি অধিগ্রহণ করেছিল সরকার। আরও এক দফায় জমি অধিগ্রহণ করার কথা। কিন্তু পর পর বিস্ফোরণের পরে বাসিন্দাদের একাংশ জানাচ্ছেন, সরকার নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে ক্লাস্টার তৈরির প্রতিশ্রুতি না দিলে জমি দেওয়া হবে না। এই পরিস্থিতিতে আগামী দিনে ক্লাস্টারের কাজে জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। প্রশাসন অবশ্য জানিয়েছে, ক্লাস্টার দ্রুতই তৈরি হবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)