ব্যস্ততা আর প্রযুক্তির ভিড়ে আজকাল যেন হারিয়ে যেতে বসেছে সেই চেনা আড্ডার সংস্কৃতি। কিন্তু উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ মহকুমায় এক দল অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ এখনও ধরে রেখেছেন সেই ঐতিহ্য। তাঁদের কাছে আড্ডা শুধু গল্পগুজব নয়, বরং সুস্থ ও সক্রিয় জীবনের চাবিকাঠি। তাই প্রতিদিন নিয়ম মেনে বিকেল ৫টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত বসে তাঁদের আড্ডা।
২০২০ সালে এই আড্ডার সূচনা হয় গোপালনগরের বারাকপুর এলাকার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বিকাশপ্রসাদ বিশ্বাসের বাড়িতে। প্রথমে সঙ্গী ছিলেন কয়েক জন বন্ধু। উদ্দেশ্য ছিল, অবসর জীবনের একঘেয়েমি কাটানো, মনকে প্রফুল্ল রাখা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আসর হয়ে ওঠে এক আত্মিক বন্ধনের কেন্দ্র। বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ১৫। প্রতিদিন আড্ডায় থাকে নানা বৈচিত্র্য। গান, কবিতা আবৃত্তি, সাহিত্য পাঠ, সংস্কৃত শ্লোক উচ্চারণ থেকে শুরু করে ধর্ম ও সমাজচর্চা— সবই চলে আড্ডায়। প্রত্যেক সদস্য নিজের মতো করে কিছু না কিছু পরিবেশন করেন। কেউ গেয়ে শোনান রবীন্দ্রসঙ্গীত, কেউ শোনান স্বরচিত কবিতা, কেউ আলোচনা করেন দর্শন বা ইতিহাস নিয়ে। আড্ডার ফাঁকে চা-জলখাবারেরও ব্যবস্থা থাকে।
আড্ডার অন্যতম সদস্য, বনগাঁর বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক জগন্নাথ বিশ্বাস প্রতিদিন প্রায় ছ’কিলোমিটার পথ উজিয়ে পৌঁছে যান। তাঁর কথায়, “অবসর জীবন মানেই যেন খানিকটা একঘেয়ে দিনযাপন। কিন্তু এই আড্ডা আমাদের জীবনে নতুন উদ্যম এনেছে। আনন্দে কাটছে সময়।” দূরদূরান্ত থেকেও আসেন অনেকে। প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে দত্তপুলিয়া থেকে নিয়মিত বাসে করে আসেন অজিতকুমার তরফদার। সঙ্গে থাকে তাঁর হারমোনিয়াম। সুরের মূর্ছনায় তিনি মাতিয়ে তোলেন আসর। অজিতের দাবি, ‘‘এই আড্ডা আমাকে বাঁচার বাড়তি অক্সিজেন দেয়।”
২০২০ সালে করোনা-কালে কিছু দিন বসেনি আসর। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে আবার শুরু হয় আড্ডা। সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন আড্ডার অন্যতম আয়োজক বিকাশপ্রসাদ বিশ্বাস। তাঁর স্মৃতি ও স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়েই চলেছেন বাকিরা। বিকাশের স্ত্রী মনা যুক্ত আড্ডাখানায়। তিনি বলেন, ‘‘স্বামীর জীবদ্দশায় বাড়িতে এই আড্ডার সূচনা হয়েছিল। আজও তা একই আন্তরিকতায় চলছে— এটাই আমাদের বড় প্রাপ্তি।”
প্রবীণদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে নতুন প্রজন্ম ক্রমশ মোবাইল ফোন ও ভার্চুয়াল জগতের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। মানুষের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে মানুষের। তাঁরা তরুণদের পরামর্শ দেন— মোবাইলের গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব জীবনের মেলবন্ধনে ফিরতে। কারণ, মুখোমুখি কথোপকথন ও সংস্কৃতি চর্চা মানসিক ভাবে ভাল থাকার চাবিকাঠি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)