ভোট আসে-যায়, কিন্তু তাঁদের হাল ফেরে না!
পেটের তাগিদে বাঘ-কুমির-জলদস্যুর ভয়কে উপেক্ষা করেই মাছ-কাঁকড়া ধরা বা মধু সংগ্রহ করতে হয় তাঁদের। তাই ভোট নিয়ে বাড়তি কোনও উৎসাহ নেই সুন্দরবনের এই প্রান্তিক মানুষদের। রাজ্য জুড়ে যখন নানা রাজনৈতিক তরজা চলছে, তখন দু’টো বাড়তি রোজগারের আশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সুন্দরবনের মউলেরা মধু সংগ্রহ করতে শুক্রবার পাড়ি দিয়েছেন সুন্দরবনের গহন অরণ্যে।
এবার সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্প এলাকায় ৪২৮ জন মউলে ৪৯টি দলে ভাগ হয়ে কাজে গিয়েছেন। সজনেখালি রেঞ্জ থেকে ১৬টি ও বসিরহাট রেঞ্জ থেকে ৩৩টি দল মধু সংগ্রহ অভিযানে রওনা দিয়েছে। বন দফতর এবার তাঁদের লক্ষ্যমাত্রা বেধে দিয়েছে ১৫ মেট্রিক টন। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলে এবারের মতো মধু সংগ্রহ শেষ হবে বলে জানিয়েছেন বনাধিকারিকেরা। প্রাথমিক ভাবে মউলেদের ১৫ দিনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে মধু সংগ্রহের। এই সময়ের মধ্যে লক্ষমাত্রা পূরণ না হলে দ্বিতীয় দফায় ফের অনুমতি দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের এএফডি পার্থ দেবনাথ বলেন, ‘‘প্রতি বছরের মতো এবারও জঙ্গল থেকে মধু সংগ্রহের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার থেকে তাঁরা জঙ্গলে গিয়েছেন। দ্রুত যাতে তাঁরা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে সুস্থ ভাবে ফিরে আসতে পারেন, সেই কামনা করি।’’
মধু সংগ্রহে গিয়ে কোনও বিপদ-আপদ হলে মউলেদের উদ্ধারের জন্য ‘অপারেশন গোল্ডেন হানি’ নামে বিশেষ নিরাপত্তা কবচ তৈরি করা হয়েছে বন দফতরের তরফে। পাশাপাশি, মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়লে বিশেষ বিমার ব্যবস্থাও মউলেদের জন্য করেছে বন দফতর।
সুন্দরবনের গ্রামীণ অর্থনীতিতে মধু সংগ্রহ অভিযান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মউলেদের সংগৃহীত মধু সবটাই কিনে নেবে বন দফতর। এবার কেজি প্রতি ‘গ্রেড এ’ মধুর জন্য ২৭৫ টাকা ও ‘গ্রেড বি’ মধুর জন্য ২৫০ টাকা পাবেন মউলেরা। মধুর মরসুম এলে তাই বাড়তি রোজগারের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়েও সুন্দরবনের গভীরে যান মউলেরা। ভোটের দামামা যতই বাজুক, মউলেরা এ সময়ে কাজ ফেলে বাড়ি বসে থাকার কারণ দেখেন না। ঝড়খালি বাসিন্দা সুনীল দাস, পশুপতি বিশ্বাসেরা বলেন, ‘‘ভোট নিয়ে মাতামাতি করে কি করব! মধু সংগ্রহে না গেলে রোজগার হবে না। সংসারে হাঁড়ি চড়বে না। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করতে পারব না। ভোটের দিন যদি সুযোগ পাই, ভোটটা অবশ্য দেব, কিন্তু ওইটুকুই।’’ সাতজেলিয়ার বাসিন্দা নিরাপদ সর্দার, হিঙ্গলগঞ্জের বাসিন্দা অখিল মণ্ডলেরা বলেন, ‘‘ভোট দিয়ে কী হচ্ছে? নেতারাই তো শুধু ফুলেফেঁপে উঠছেন। আমাদের দুর্দশা কি কিছু কমছে? আমাদের হয় ভিন্ রাজ্যে কাজে যেতে হবে, নয় তো প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে মাছ-কাঁকড়া ধরতে, মধু সংগ্রহ করে জীবনধারণ করতে হবে। ভোট নিয়ে ভাবার কোনও কারণ দেখি না।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)