Advertisement
E-Paper

মাধ্যমিকের শেষ পরীক্ষায় বসা হল না দেবজিতের

মাধ্যমিকের একটা মাত্র পরীক্ষা বাকি, কর্মশিক্ষা। কিন্তু সেটা আর দিতে পারবে না দেবজিত্‌। বুধবার বিকেলে মাঠে খেলার সময়ে বাজ পড়ে মারা গিয়েছে দেবজিত্‌ ঘোষ (১৬) নামে কুলপির হরিণখোলা গ্রামের এই কিশোর। মারা গিয়েছে সঞ্জয় নস্কর (১৪) নামে গ্রামের আর এক অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়া। জখম হয়েছে আরও এক মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী সুশান্ত ঘোষ। বাপন ঘোষ নামে এক কিশোরও বজ্রাঘাতে জখম হয়েছে। তাদের দু’জনকে স্থানীয় ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হলে প্রাথমিক চিকিত্‌সার পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।

দিলীপ নস্কর

শেষ আপডেট: ২০ মার্চ ২০১৫ ০২:০৭
এই স্কুলবাড়িতেই আশ্রয় নিয়েছিল ছেলেরা। ইনসেটে, বাঁ দিকে, দেবজিত্‌। ডান দিকে, সঞ্জয়। —নিজস্ব চিত্র।

এই স্কুলবাড়িতেই আশ্রয় নিয়েছিল ছেলেরা। ইনসেটে, বাঁ দিকে, দেবজিত্‌। ডান দিকে, সঞ্জয়। —নিজস্ব চিত্র।

মাধ্যমিকের একটা মাত্র পরীক্ষা বাকি, কর্মশিক্ষা। কিন্তু সেটা আর দিতে পারবে না দেবজিত্‌।

বুধবার বিকেলে মাঠে খেলার সময়ে বাজ পড়ে মারা গিয়েছে দেবজিত্‌ ঘোষ (১৬) নামে কুলপির হরিণখোলা গ্রামের এই কিশোর। মারা গিয়েছে সঞ্জয় নস্কর (১৪) নামে গ্রামের আর এক অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়া। জখম হয়েছে আরও এক মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী সুশান্ত ঘোষ। বাপন ঘোষ নামে এক কিশোরও বজ্রাঘাতে জখম হয়েছে। তাদের দু’জনকে স্থানীয় ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হলে প্রাথমিক চিকিত্‌সার পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, হরিণখোলা হাইস্কুল থেকে এ বার মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছে দেবজিত্‌ ও সুশান্ত। সঞ্জয় ওই স্কুলেরই ছাত্র। বাপন প্রাক্তনী। প্রতিদিনের মতো স্কুল ছুটির পরে ওই হাইস্কুল ও প্রাথমিক বিদ্যালয়-লাগোয়া গ্রামের ছেলেরা খেলাধূলা করে। বুধবার বিকেলেও খেলা চলছিল।

ঘড়িতে তখন প্রায় ৪টে। জনা চল্লিশ ছেলে কেউ ফুটবল নিয়ে মাঠে দাপাদাপি করছিল। কেউ মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে গল্পগুজবে ব্যস্ত। এমন সময়ে হঠাত্‌ই আকাশ মেঘে ঢেকে যায়। সামান্য বৃষ্টিও শুরু হয়। পরীক্ষা এখনও শেষ না হওয়ায় অকাল বৃষ্টিতে মাথা ভেজাতে চায়নি অনেক ছেলে। তারা সকলে প্রাথমিক স্কুলের ভিতরে ঢুকে পড়ে। দোতলা স্কুলের নীচের ঘরে সকলের দাঁড়ানোর জায়গা হচ্ছিল না। দেবজিত্‌, সঞ্জয়, সুশান্ত, বাপনরা দোতলায় উঠে আশ্রয় নেয়।

কিছু ক্ষণের মধ্যেই প্রাথমিক স্কুলের পিছনে একটি তালগাছের উপরে সশব্দে বাজ পড়ে। খোলা জানলা দিয়ে আগুনের হল্কা এসে লাগে ওই চার জনের গায়ে। কিছু ক্ষণের মধ্যেই গোঙানির শব্ধ পেয়ে নীচে তলায় থাকা ছেলেরা দুড়দাড় করে উপরে উঠে আসে। তারা দেখে, ওই চার জন মেঝেতে পড়ে কাতরাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে সকলকে নিয়ে যাওয়া হয় ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেখানে দু’জনকে চিকিত্‌সকেরা মৃত বলে জানিয়ে দেন। পুলিশ জানায়, দেহ ময়না-তদন্তের পরে বৃহস্পতিবারই গ্রামে সত্‌কারের কাজ হয়েছে। ঘটনাচক্রে এ দিনই মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার কথা ছিল দেবজিতের।

ঘটনাস্থলে ছিল ওই গ্রামের নবম শ্রেণির পড়ুয়া প্রতুল ঘোষ, রূপম, দীপু ঘোষেরা। তারা জানায়, আচমকা বিদ্যুতের ঝলকানি আর বিকট শব্দ করে বাজ পড়ে। কেউ কেউ ভয়ে কানে হাত চাপা দিয়ে বসে পড়ে। তারপরেই উপর থেকে আর্তচিত্‌কার, গোঙানি শুনে সকলে ছুটে যায়।

এ দিকে দুর্ঘটনার জেরে সারা শোকের ছায়া নেমে এসেছে হরিণখোলা গ্রামে। বৃহস্পতিবার সারা দিন কোন বাড়িতে হাঁড়ি চড়েনি। প্রায় অভুক্ত অবস্থায় শত শত মানুষ। বহু মানুষের চোখে জল। আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারাও শোকস্তব্ধ। এ দিন বিকেলে এলাকায় গিয়ে দেখা গেল, দেবজিতের বাড়িতে আত্মীয়-প্রতিবেশীদের ভিড়। দিনমজুর বাবা শ্যামকুমার ঘোষ কোনও মতে বললেন, “কোনও দিন ভাবিনি, এ ভাবে ছেলেকে হারাতে হবে। ও স্কুলের কৃতী ছাত্র ছিল। মাধ্যমিকেও ভাল ফল করত বলেই ওর বিশ্বাস ছিল।” পাশেই সঞ্জয়ের মামার বাড়ি। নিজের বাড়ি ডায়মন্ড হারবারের বোলসিদ্ধি গ্রামে হলেও মামার বাড়িতে থেকেই পড়াশোনা করছিল ছেলেটি। নাতির অকাল মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন দাদু প্রভাত ঘোষ। ওই স্কুলের পরিচালন সমিতির সম্পাদক যুধিষ্ঠির ঘোষের বাড়ি হরিণখোলাতেই। তিনি ঘটনা ঘটার পর থেকে দুই পরিবারে পাশে দাঁড়িয়েছেন।

জানালেন, দু’জনেরই দুঃস্থ পরিবার। আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারগুলি যাতে সরকারি আর্থিক সাহায্য পায়, সে জন্য পুলিশ ও ব্লক প্রশাসনকে জানিয়েছেন। স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা সৈরিন্ধ্রী দলুই বললেন, “খুবই দুঃখজনক ঘটনা। ওরা দু’জনেই পড়াশোনা, খেলাধূলায় ভাল ছিল।” দুই ছাত্রের মৃত্যুতে এ দিন স্কুলে ছুটি ঘোষণা করা করা হয়েছিল বলেও জানালেন তিনি। বৃহস্পতিবার যে পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল, তা পিছিয়ে ২১ তারিখ করা হয়েছে বলে স্কুল সূত্রের খবর।

কুলপির বিডিও সেবানন্দ পণ্ডা বলেন, “ওই পরিবারে সদস্যেরা এলে নিশ্চয়ই আর্থিক সাহায্যে করা হবে।”

স্কুলের পাশেই মাঠ। একটা দিনের ব্যবধানে সবুজের উচ্ছ্বাসটাই সেখান থেকে উধাও। বিষণ্ণ মাঠে ছেলেদের হইহল্লা, দাপাদাপি নেই। কেউ আজ খেলতেই নামেনি সেখানে।

southbengal dilip naskar kulpi madhyamik debjit sanjay Debojit ghosh Sanjay Nasker
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy