Advertisement
E-Paper

Higher secondary exam: হাঁড়ি-হেঁশেল ঠেলছে মেয়েরা, উচ্চ মাধ্যমিকে অনুপস্থিত অনেকে

মাধ্যমিকের পর উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হতেই দেখা গেল উত্তর ২৪ পরগনা জেলার অনেক ছাত্রীই পরীক্ষায় বসেনি।

সীমান্ত মৈত্র  

শেষ আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২২ ০৭:৩৩
প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

আশঙ্কা ছিলই। এবার হাতে-কলমে প্রমাণও মিলল।

মাধ্যমিকের পর উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হতেই দেখা গেল উত্তর ২৪ পরগনা জেলার অনেক ছাত্রীই পরীক্ষায় বসেনি। শিক্ষক শিক্ষিকাদের সঙ্গে কথা জানা গিয়েছে, অনুপস্থিত ছাত্রীদের বেশিরভাগেরই বিয়ে হয়ে গিয়েছে নাবালিকা অবস্থায়। ছাত্রী বা তার বাবা-মায়ের ইচ্ছে থাকলেও শ্বশুরবাড়ির আপত্তিতে পরীক্ষা দেওয়া হল না তাদের। কোনও কোনও ছাত্রী আবার শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জানিয়েছে, পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারেনি বলে পরীক্ষায় বসেনি তারা।

বনগাঁর গাঁড়াপোতা গার্লস হাইস্কুলের ৬ জন ছাত্রী উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেনি। স্কুল সূত্রে জানানো হয়েছে, কিছুদিন আগে শিক্ষিকারা ওই ছাত্রীদের বা তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পেরেছেন, এদের সকলেরই বিয়ে হয়ে গিয়েছে। তারা এলাকাতেই নেই। বিষয়টি জানার পরও ছাত্রীদের বাড়িতে গিয়ে শিক্ষিকারা তাদের বুঝিয়ে ফর্ম ফিলআপ করিয়েছিলেন। ছাত্রীরা জানিয়েছিল, পরীক্ষা দেবে। কিন্তু এদের মধ্যে ৩ জন অ্যাডমিট কার্ডই নিতে আসেনি। দু’জনের অ্যাডমিট কার্ড তাদের মায়েরা এসে নিয়ে গিয়েছিলেন। মাত্র একজন ছাত্রী নিজে এসেছিল অ্যাডমিট কার্ড নিতে। কিন্তু পরীক্ষায় বসল না কেউই।

প্রধান শিক্ষিকা ববি মিত্র বলেন, ‘‘চেষ্টা করেও ৬ জনকে পরীক্ষায় বসাতে না পারাটা দুর্ভাগ্যজনক। জানতে পেরেছি মেয়েদের শ্বশুরবাড়ির লোকজনের আপত্তি ছিল। সে কারণে তারা পরীক্ষা দিতে আসতে পারেনি।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘করোনা ও লকডাউন পরিস্থিতিতে স্কুল বন্ধ থাকায় অনেক মেয়েদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। এখন স্কুল খুলে গিয়েছে। আশা করছি, আগামী বছর থেকে এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠা যাবে। স্কুল খোলা থাকলে ছাত্রীদের বিয়ে আটকানো সম্ভব।’’

গোপালনগরের নহাটা সারদা সুন্দরী বালিকা বিদ্যামন্দির স্কুলের ৬ জন ছাত্রী এ বার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেনি। স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা শম্পা পাল বলেন, ‘‘ওই ৬ জন ছাত্রীর মধ্যে কয়েকজনের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। নাবালিকারা একবার সংসারে ঢুকে পড়লে তাদের ফের স্কুলে আনা খুবই সমস্যার।’’

গাইঘাটার ইছাপুর হাইস্কুলের ৩ পড়ুয়া পরীক্ষায় অনুপস্থিত। এদের মধ্যে ২ জন ছাত্রী। প্রধান শিক্ষক অশোক পাল বলেন, ‘‘ওই ২ জন ছাত্রীর মধ্যে একজনের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ১ জন ছাত্রী জানিয়েছে, পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারেনি বলে পরীক্ষায় বসেনি।’’

বাগদার কোনিয়াড়া যাদবচন্দ্র হাইস্কুলের ৪ জন পড়ুয়া উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছে না। প্রধান শিক্ষক অনুপম সর্দার বলেন, ‘‘অনুপস্থিত ৪ জনের মধ্যে ৩ জনই ছাত্রী। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। সম্ভবত তাদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে।’’

গাইঘাটার রামচন্দ্রপুর পল্লিমঙ্গল বিদ্যাপীঠ স্কুলের ২ জন পড়ুয়া এ বার পরীক্ষা দিচ্ছে না। প্রধান শিক্ষক রবীন দাস বলেন, ‘‘ ২ জন অনুপস্থিত পড়ুয়ার মধ্যে ১ জন ছাত্রী। আমরা তার খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছি।’’

হাবড়ার কামিনীকুমার গার্লস হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা জয়িতা দে বলেন, ‘‘আমাদের স্কুলের দু’জন ছাত্রী পরীক্ষা দিচ্ছে না। একজন পলিটেকনিক নিয়ে অন্যত্র পড়াশোনা করছে। অন্য জনকে স্কুলে ডেকে এনে টাকা দিয়ে ফর্ম ফিলআপ করিয়েছিলাম। সে-ও পরীক্ষা দিচ্ছে না। তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি।’’

এবার ফর্ম ফিলআপ করেও পরীক্ষায় বসেনি বনগাঁ মহকুমার রিতা মণ্ডল (নাম পরিবর্তিত)। তার মা জানালেন, করোনায় পরিবারের রোজগার কলানিতে ঠেকে। বাধ্য হয়ে মেয়ের বিয়ে দেন। আশা ছিল, মেয়ে অন্তত না খেয়ে থাকবে না। তবে ও যাতে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে, সেই অনুরোধ করেছিলেন শ্বশুরবাড়িতে। তিনি বলেন, ‘‘মেয়ের শাশুড়িকে বলেছিলাম, রিতাকে পরীক্ষায় বসতে দিন। উনি রাজি হননি। উল্টে বলেছেন, রিতা না থাকলে সংসার কে সামলাবে?’’

ইচ্ছে থাকলেও এ বার পরীক্ষায় বসতে পারল না বনগাঁ মহকুমার দেবারতি দাস (নাম পরিবর্তিত)। সে বলল, ‘‘গত বছরই বিয়ে হয়ে গিয়েছে। সংসার সামলিয়েও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। শ্বশুরবাড়িতে বলেছিলাম, পরীক্ষা দিতে চাই। কিন্তু ওঁরা রাজি হলেন না। বন্ধুদের পরীক্ষা দিতে দেখে খুব মন খারাপ লাগছে।’’

বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষকেরা জানান, করোনা ও লকডাউন পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় অনেক ছাত্রছাত্রীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ছাত্রেরা কেউ কেউ কাজে যুক্ত হয়ে পড়েছে। অনেকে ভিন্ রাজ্যে কাজে চলে গিয়েছে। বহু নাবালিকার বিয়ে হয়ে গিয়েছে এই সময়ে। স্কুল খোলার পর স্কুল ছুটদের বিষয়টি প্রকট হতে শুরু করে। অনুপস্থিত পড়ুয়াদের স্কুলমুখী করতে পদক্ষেপও করেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা। অনুপস্থিতির কারণ জানতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেওয়া শুরু হয়। দেখা যায়, অনেকেরই বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন অভিভাবকেরা। অন্য এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে চলে গিয়েছে তাদের অনেকে। কারও হয় তো একই এলাকায় বিয়ে হয়েছে, কিন্তু শ্বশুরবাড়ির মত না থাকায় আর পড়াশোনায় ফেরেনি মেয়েটি। হাঁড়ি-হেঁসেল নিয়েই ব্যস্ত নাবালিকারা। কোনও কোনও ছাত্রী তো ইতিমধ্যে মা হয়ে গিয়েছে বলেও জানতে পারেন শিক্ষিকারা। কেউ কেউ আবার অন্তঃসত্ত্বা। শিক্ষক শিক্ষিকারা বিবাহিত ছাত্রীদের শ্বশুরবাড়িও গিয়েছিলেন। স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়িকে বুঝিয়ে কিছু ছাত্রীদের স্কুলে এনে উচ্চ মাধ্যমিকের ফর্ম ফিলআপ করিয়েছিলেন। কিছু ক্ষেত্রে ফর্ম ফিলআপের টাকা শিক্ষক-শিক্ষিকারাই দিয়েছিলেন। তাঁদের আশা ছিল, সকলেই পরীক্ষা দেবে। কিন্তু বাস্তবে তার বিপরীত চিত্রই চোখে পড়ল। শনিবার থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হতেই দেখা গেল অনেকেই পরীক্ষায় বসেনি। এদের বেশিরভাগই ছাত্রী। অনুপস্থিত ছাত্রেরা কাজে যুক্ত হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা। তবে তাঁরা জানান, ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্রদের অনুপস্থিতির সংখ্যা অনেক কম।

শিক্ষক শিক্ষিকাদের আশঙ্কা, পরীক্ষায় না বসা ছাত্রছাত্রীদের আর স্কুলমুখী করানো সম্ভব হবে না।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy