কাগজে-কলমে তিনি তিনটি দফতরের চেয়ারম্যান পারিষদ। অথচ, গত পাঁচ বছরে সশরীরে তাঁকে পুরসভায় দেখা যায়নি বলে অভিযোগ। তিনি রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার সাত নম্বর ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধি তথা জনস্বাস্থ্য কারিগরি, স্বাস্থ্য ও জঞ্জাল অপসারণ— এই তিন দফতরের চেয়ারম্যান পারিষদ রঞ্জিত মণ্ডল। গত পাঁচ বছরে চেয়ারম্যান পরিষদের নানা পরিকল্পনা-বৈঠকেও তাঁকে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ বিরোধীদের। পাশাপাশি, চেয়ারম্যান পারিষদের সমস্ত দায়িত্ব ও কার্যভার পুরপ্রধান পল্লব দাস পালন করেন বলে পুরসভা সূত্রের খবর।
২০০৯ সালে বামফ্রন্ট পরিচালিত রাজপুর-সোনারপুর পুর বোর্ড দখল করে তৃণমূল। তখন থেকেই পুরপ্রতিনিধি রঞ্জিত। ২০১৫ সালের পরে তিনি চেয়ারম্যান পারিষদের পদও পান। পুরসভা সূত্রের খবর, ২০১৫ সালের পর থেকেই রঞ্জিতের পুরসভায় যাতায়াত কমতে শুরু করেছিল। ২০২০ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত নির্বাচন না হওয়ায় পুরসভায় প্রশাসনিক বোর্ড গঠন হয়েছিল। ২০২২ সালের নির্বাচনে ফের ক্ষমতায় আসে তৃণমূল।
বিরোধীদের অভিযোগ, শপথ গ্রহণের পর থেকেই পুরসভার হরিনাভির কেন্দ্রীয় অফিসে রঞ্জিতকে আর দেখা যায়নি। চেয়ারম্যান পারিষদ হিসেবে কোনও বৈঠকে যোগ দেওয়া বা তাঁর দফতরের বিভিন্ন কর্মসূচি রূপায়ণের ক্ষেত্রেও তিনি কোনও আগ্রহ দেখান না বলে অভিযোগ। পুরপ্রধানই নিজের দায়িত্বের পাশাপাশি রঞ্জিতের অধীনে থাকা বিভিন্ন দফতরের সমস্ত কাজ করেন।
বিরোধীদের অভিযোগ, কলকাতা শহর লাগোয়া ৩৫টি ওয়ার্ড নিয়ে রাজপুর-সোনারপুর পুরসভা। স্বাস্থ্য এবং জঞ্জাল অপসারণ ওই বৃহৎ পুরসভার দু’টি গুরুত্বপূর্ণ দফতর। সে দু’টিরই দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পারিষদের এই অনুপস্থিতি চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়। পুর কর্তৃপক্ষেরও কোনও হেলদোল নেই। শুধু বিরোধী মহলেই নয়, এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি নিয়ে গুঞ্জন রয়েছে শাসকদলের অন্দরেও।
সূত্রের খবর, বিরোধী থাকাকালীন রঞ্জিত এলাকায় ডাকাবুকো নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু চেয়ারম্যান পারিষদের পদ পাওয়ার পরে তিনি নিজের ওয়ার্ডের কাজ ছাড়া আর কোনও বিষয়ে আগ্রহী নন বলে জল্পনা পুরসভার অন্দরেই। পুরপ্রধান পল্লব দাস অবশ্য বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘দীর্ঘ কয়েক বছর চেয়ারম্যান পারিষদের কাজে রঞ্জিত মণ্ডল অনাগ্রহী হয়ে পড়ার পরে আমি তাঁর দফতরের কাজ দেখাশোনা করি।’’ প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে রাজপুর-সোনারপুর পুরসভায় বোর্ড গঠন হওয়ার পরে জনস্বাস্থ্য কারিগরি, স্বাস্থ্য এবং জঞ্জাল অপসারণের চেয়ারম্যান পারিষদ ছিলেন পল্লবই।
পুরসভার একটি সূত্রের দাবি, কার্যত কিছুটা অভিমানের কারণেই পুরসভায় যাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন রঞ্জিত। সূত্রের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে এক মাসে নরেন্দ্রপুর থানার পুলিশ ১৩টি এফআইআর দায়ের করেছিল বলে অভিযোগ। ওই সময়ে পুরসভার সহকর্মী এবং তাঁর দলীয় নেতাদের পাশে পাননি রঞ্জিত। গোষ্ঠী কোন্দলের কারণে ওই সব এফআইআর পুলিশের তরফে করা হয়েছে বলে ঘনিষ্ঠ মহলে অভিযোগও করেছেন তিনি।
বৈঠকে অনুপস্থিত থাকা ও দায়িত্ব পালন না করার বিষয়টি স্বীকার করে রঞ্জিত বলেন, ‘‘সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। সোনারপুর উত্তর ও দক্ষিণ বিধানসভা নিয়ে রাজপুর-সোনারপুর পুরসভা। দু’টি ক্ষেত্র সামাল দেওয়া মুশকিল। তা ছাড়া, মিথ্যা
অভিযোগে আমার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা করা হয়েছে। হাই কোর্টের নির্দেশে জামিনে রয়েছি। মামলা নিয়ে ব্যস্ত থাকি। তবে আমার ওয়ার্ডের সব কাজ করছি।’’ যদিও অভিমানের কারণে পুরসভায় যাতায়াত বন্ধ করেছেন কিনা, সেই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘‘অনেক বিষয় নিশ্চয়ই রয়েছে। কিন্তু সে সব সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলোচনা করা যাবে না।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)