Advertisement
E-Paper

অভিষেকের সোনারপুর অভিযান পাশ কাটিয়ে গিয়েছিলেন ওই এলাকার তাবড় তৃণমূল নেতারা! হামলায় ধৃতেরা ‘লাভলির লোক’

শনিবার বিকেলে যেখানে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের তিন বারের সাংসদ হামলার মুখে পড়েন, সেই এলাকাটি রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার ৯ নম্বরের ওয়ার্ডের। সেখানকার কাউন্সিলরকেও অভিষেকের আশপাশে দেখা যায়নি।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ৩১ মে ২০২৬ ১৯:১৫
Abhishek Banerjee

শনিবার সোনারপুরে রোষের মধ্যে পড়েন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: পিটিআই।

বিধানসভা ভোটের আগের ছবি মনে করা যাক। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে কোনও জেলা সফরের খবর পেলেই শশব্যস্ত হয়ে পড়তেন সেখানকার তৃণমূল নেতারা। মঞ্চে অভিষেকের পাশে কে থাকবেন, তা নিয়ে চলত প্রতিযোগিতা। সেই অভিষেক ‘ভোট-পরবর্তী হিংসায় নিহত’ কর্মীর বাড়িতে যাচ্ছেন, আগে থেকে জানানোর পরেও দেখা মেলেনি স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের!

শনিবার বিকেলে যেখানে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের তিন বারের সাংসদ হামলার মুখে পড়েন, সেই এলাকাটি রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যে পড়ে। সেখানকার কাউন্সিলরকেও অভিষেকের আশপাশে দেখা যায়নি। এর মধ্যে সোনারপুর কাণ্ডে যে কয়েক জন গ্রেফতার হয়েছেন, তাঁদের তিন জন ‘তৃণমূলের লোক’ বলে দাবি করছে বিজেপি। আরও স্পষ্ট করে বললে সোনারপুর দক্ষিণের প্রাক্তন বিধায়ক লাভলি মৈত্রের অনুগামী। যদিও অভিযোগ নস্যাৎ করে দিয়েছেন লাভলি। কিন্তু কেন পাশে দেখা গেল না এলাকার তাবড় তৃণমূল নেতাদের কাউকে? কেন ছিলেন না রাজপুর-সোনাপুরের কোনও তৃণমূল কাউন্সিলর?

বিধানসভা ভোটের ফলপ্রকাশের ২৫ দিন পর প্রথম রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়েছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। উত্তর কলকাতা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ‘ভোট-পরবর্তী হিংসায় নিহত’ দুই পরিবারের সঙ্গে দেখা করবেন, সে কথা আগেই স্থানীয় নেতাদের জানানো হয়েছিল। উত্তর কলকাতার বেলেঘাটায় নিহত বিশ্বজিৎ পট্টনায়েকের পরিবারের সঙ্গে অভিষেক দেখা করেন স্থানীয় বিধায়ক কুণাল ঘোষের বাসভবনে। সেখানে অপ্রীতিকর কোনও ঘটনার মুখোমুখি না হলেও অভিষেক দাবি করেছিলেন, প্রতিনিয়ত হুমকির মধ্যে পড়ছে পট্টনায়েক পরিবার। কিন্তু সোনারপুরে নিহত সঞ্জু কর্মকারের বাড়িতে যখন তিনি গেলেন সেখানকার তৃণমূল প্রার্থী লাভলি অনুপস্থিত ছিলেন। দেখা যায়নি পরিচিত প্রায় কোনও তৃণমূল নেতাকেই। মানুষের ক্ষোভ-বিক্ষোভের মাঝে অভিষেকের পাশে দেখা গিয়েছিল একটিই চেনা মুখকে। তিনি বলাইচন্দ্র বারিক। রাজপুর-সোনারপুর পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি।

রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার কাউন্সিলর সংখ্যা ৩৫। তাঁদের মধ্যে ৩৪ জনই তৃণমূলের। শনিবার অভিষেকের কর্মসূচি যে এলাকায় ছিল সেটি ৯ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত। সেখানকার পুরমাতা অনীতা বসু। তাঁর স্বামী হেমন্ত বসু তৃণমূলের ‘আদি নেতাদের’ একজন। অভিষেক যাওয়ার আগে বাড়িতে ছিলেন না বসু দম্পতি। হেমন্ত-ঘনিষ্ঠেরা জানিয়েছেন, ক্যামাক স্ট্রিট থেকে ফোন গিয়েছিল। তখন তিনি নাকি জানিয়েছিলেন, এখন পরিস্থিতি ভাল নয়। তাঁর এলাকায় আপাতত অভিষেকের কর্মসূচি না-হওয়াই ভাল। অভিষেক জানান, তিনি যাবেনই এবং গিয়েছেন। কিন্তু হেমন্ত এবং তাঁর কাউন্সিলর স্ত্রী কাউকেই অভিষেকের ত্রিসীমানায় দেখা যায়নি।

শুধু হেমন্ত বা অনীতাই নন, রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার বাকি ৩৩ জন তৃণমূল কাউন্সিলরের কাউকেই দেখা যায়নি অভিষেকের আশপাশে। শনিবার অভিষেকের উপর ইট-পাটকেল, ডিম-জুতো পড়ার পরে তাঁদের কেউ প্রকাশ্যে মন্তব্য করতেও রাজি হচ্ছেন না। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার এক তৃণমূল কাউন্সিলর বলেন, ‘‘আগে থেকেই খবর ছিল যে জায়গায় জায়গায় বিক্ষোভ প্রদর্শনের জন্য তৈরি হচ্ছেন বিজেপির লোকজন। সে কথা আমরা জানিয়েছিলাম। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর হামলা পূর্বপরিকল্পিত। তবে এলাকার পরিস্থিতি এমন ছিল যে বাইরে বার হওয়ার মতো সাহস পাইনি।’’

সংশ্লিষ্ট পুরসভার একটি সূত্রে খবর, শনিবার দুপুর ৩টে নাগাদ কাউন্সিলরদের নিয়ে বৈঠক ডেকেছিলেন চেয়ারম্যান পল্লবকুমার দাস। কোনও অজ্ঞাত কারণে সেই বৈঠকও হয়নি। পল্লব কেন অভিষেকের কর্মসূচিতে ছিলেন না, কেন পুরসভার বৈঠক হল না, সে নিয়েও ধোঁয়াশা। তিনিও প্রকাশ্যে কিছু বলতে রাজি নন। অন্য কাউন্সিলরদের কেউ জানিয়েছেন, ব্যস্ত ছিলেন। কেউ বলেছেন, বাইরে ছিলেন। তবে দু’বারের বিধায়ক এবং সোনারপুর উত্তরের এ বারের তৃণমূল প্রার্থী ফিরদৌসি বেগম জানিয়েছেন, তিনি অভিষেকের সঙ্গে তাঁদের দলের মৃত কর্মীর বাড়িতে যেতে চেয়েছিলেন। ফিরদৌসির বাড়িও ওই এলাকার কাছাকাছি। কিন্তু অভিষেকের আসার খবর পেয়েই নাকি তাঁর বাড়ির সামনে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। ওই অবস্থায় বাড়ি থেকে বার হওয়ার সাহস দেখাতে পারেননি তিনি।

এর মধ্যে অভিষেকের উপর হামলায় ধৃতদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে শুরু হয়েছে চাপানউতর। অভিযোগ উঠেছে, প্রাক্তন বিধায়ক তথা সোনারপুর দক্ষিণের পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী লাভলির আশপাশে যাঁদের দেখা যেত, তাঁদেরই কয়েক জন অভিষেককে ‘চোর-চোর’ স্লোগান দিয়েছেন। ডিম ছুড়েছেন। লাভলি এই মুহূর্তে কলকাতার বাইরে। তাঁর ঘনিষ্ঠদের সূত্রে খবর, কয়েক দিন আগেই চিকিৎসা সংক্রান্ত কারণে রাজ্যের বাইরে রয়েছেন অভিনেত্রী-নেত্রী। অভিষেকের উপর হামলা নিয়ে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের মন্তব্য, ‘‘তৃণমূলের কয়েক জন বিধায়ক, কয়েক জন প্রাক্তন মন্ত্রী লিঞ্চিং-এর শিকার হতেন। আমরা সেই পরিস্থিতি তৈরি হতে দিইনি। কিন্তু দীর্ঘ দিনের না-পাওয়ার ক্ষোভ এবং না-পাওয়ার ব্যথা যদি তৃণমূলের একাংশকে তৃণমূলের আর এক অংশ আক্রমণে উদ্যত করে সেখানে প্রশাসন কী করবে? তবে তিনি বলেন, ‘‘যে ঘটনা ঘটেছে, তা কোনও সভ্য সমাজে হওয়া উচিত নয় এবং ওই ঘটনার সঙ্গে বিজেপির কোনও সম্পর্ক নেই।’’

এর মধ্যে সংবাদমাধ্যমকে লাভলি ফোনে বলেছেন, ‘‘যে কয়েক জন গ্রেফতার হয়েছেন, তাঁদের কেউ তৃণমূল নন। এঁরা বিজেপির লোকজন। আমার কাছে ভিডিয়ো ফুটেজ আছে।’’ তিনি জানিয়েছেন, অভিযুক্তদের বিষয়ে আইসি-কে জানিয়েছেন। দলকেও তিনি জানিয়েছেন যে, ধৃত ব্যক্তিরা কখনওই তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু তৃণমূলের কোনও নেতাকে কেন অভিষেকের কর্মসূচিতে দেখা গেল না? লাভলির জবাব, ‘‘না জেনে কিছু মন্তব্য করব না। গত কয়েক দিন ধরে আমি বাইরে আছি।’’ নিহত সঞ্জুকে নিয়ে স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ প্রসঙ্গে লাভলির মন্তব্য, ‘‘এখন তৃণমূল করলেই রেপুটেশন খারাপ। বিজেপি যাঁরাই করবেন, তাঁদের রেপুটেশন ভাল হবে এলাকায়। বিজেপির একাধিক লোক রয়েছেন ওই এলাকায় যাঁরা নারী নির্যাতন থেকে নানা অপরাধে অভিযুক্ত। এখন সকলেই সাধু।’’

Abhishek Banerjee Sonarpur TMC
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy