Advertisement
E-Paper

নিজের বাড়িতেই প্রত্ন সংগ্রহশালা গড়েছেন মথুরাপুরের দেবীশঙ্কর

স্কুলজীবন থেকে নিজের এলাকার ইতিহাসের খোঁজ নিতে শুরু করেছিলেন নেহাতই কৌতূহলবশত। সেই কৌতূহলই এক সময়ে নেশা হয়ে দাঁড়ায়। চারদিকে অবহেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকা রাজ্যের অমূল্য প্রত্নসম্পদ ও সংস্কৃতির নিদর্শন সংগ্রহ করে নিজের বাড়িরই অপরিসর ঘরে ‘সুন্দরবন প্রত্ন গবেষণা কেন্দ্র’ গড়ে তুলেছেন দেবীশঙ্কর মিদ্যা।

অমিত কর মহাপাত্র

শেষ আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০১৫ ০১:৪৬
গবেষকদের টান সংগ্রহ নিয়েই। —নিজস্ব চিত্র।

গবেষকদের টান সংগ্রহ নিয়েই। —নিজস্ব চিত্র।

স্কুলজীবন থেকে নিজের এলাকার ইতিহাসের খোঁজ নিতে শুরু করেছিলেন নেহাতই কৌতূহলবশত। সেই কৌতূহলই এক সময়ে নেশা হয়ে দাঁড়ায়। চারদিকে অবহেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকা রাজ্যের অমূল্য প্রত্নসম্পদ ও সংস্কৃতির নিদর্শন সংগ্রহ করে নিজের বাড়িরই অপরিসর ঘরে ‘সুন্দরবন প্রত্ন গবেষণা কেন্দ্র’ গড়ে তুলেছেন দেবীশঙ্কর মিদ্যা। যেখানে স্থান পেয়েছে কয়েক হাজার প্রত্নবস্তু। সরকারি ভাবেও সে সব নিবন্ধীকৃত। যার ভিত্তিতে প্রাচীন বঙ্গের অবস্থান ও তার সংস্কৃতির রূপরেখা নির্ণয়ে গবেষণার ফলে ইতিহাসের নবদিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে। কেন্দ্রটি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী গবেষণা কেন্দ্র হিসাবে কাজ করলেও সরকারি সহায়তা পায় না। ফলে উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে হাজার বছরেরও প্রাচীন প্রত্নসম্পদ।

মথুরাপুরের কাশীনগরের সরবেড়িয়া গ্রামে অবস্থিত এই সংগ্রহশালা তথা প্রত্ন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা প্রত্ন গবেষক দেবীশঙ্করবাবুর আক্ষেপ, “শুধু জেলা নয়, রাজ্যের বিভিন্ন প্রত্ন গবেষকদের সঙ্গে সেতু রচনা করে অন্ধকারাচ্ছন্ন ইতিহাসের উপরে আলোকপাত করা হচ্ছে। প্রমাণিত হচ্ছে, সুন্দরবন প্রত্নতত্ত্বে অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধশালী অঞ্চল। এর সংস্কৃতি প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শুরু হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা।’’ তাঁর দাবি, এই কেন্দ্রের মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছেন বাংলার বাইরের গবেষকেরাও। তবুও সরকার বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পক্ষ থেকে যথোপযুক্ত সহানুভূতি, মর্যাদা বা সহায়তা পাওয়া যায় না।

২০০৮ সালে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ রাজ্য সরকারের কাছ থেকে সংবর্ধিত হয়েছেন দেবীশঙ্করবাবু। তাঁর সম্পর্কে অসমের গবেষক তুষার নাথের মূল্যায়ন, “প্রত্নবঙ্গের আদি সংস্কৃতির রূপরেখা নির্ণয়ে এই সংস্থার ভূমিকা সর্বজনস্বীকৃত। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণাকে সদর্থক করার জন্য এঁদের অনুসন্ধান বৈচিত্রও লক্ষ্যণীয়।”

মিশন স্কুলে পড়ার সময়ে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় এলাকার প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যের প্রামাণ্য নেই বলে ব্যঙ্গের মুখে পড়তে হয়েছিল দেবীশঙ্করবাবুকে। প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টার সেই শুরু। ঐতিহাসিক কঙ্কনদিঘিতে পারিবারিক লাটবাড়ি ও খামারে বেড়াতে এসে ইতিহাসের বস্তুগত উপাদান সংগ্রহ করা শুরু করলেন তিনি। শুরু হল আঞ্চলিক ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা। ১৯৮৫ সাল থেকে লাগাতার কাজ করে যাওয়া দেবীশঙ্করবাবুর সংগ্রহে আছে বিভিন্ন ধরনের মৃৎ পাত্র, জলনালীযুক্ত পাত্র, লিপি-খোদিত পাত্র, হাতির শুঁড়ে ধরা পদ্মফুল-সহ ঢাকনাযুক্ত পাত্র, পেয়ালা-মাপক-অর্ঘ্য-ধুনুচি-প্রদীপ, অসংখ্য মুণ্ডমূর্তি, পক্ষীচঞ্চু-যুক্ত নারী মূর্তি, বিচিত্র ধরনের পশুপক্ষীর মূর্তি, শিশু কোলে মাতৃকা মূর্তি, পাথর-শিং-হাড়ের হাতিয়ার, পোড়ামাটির যন্ত্রপাতি। মাকু, বিভিন্ন পাথরের পুতি, সিলমোহর, মুদ্রা, উদ্ভিন্নযৌবনা যক্ষিণীর মূর্তি-সহ অনেক কিছু।

রাজ্য পুরাতত্ত্ব দফতরের পুরাবিদ প্রকাশ মাইতি বলেন, ‘‘কয়েক হাজার বছরের অসাধারণ বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রত্নসম্পদ ওঁর সংগ্রহে আছে। অনেক প্রত্নবস্তু তিনি সরকারের হাতেও তুলে দিয়েছেন। প্রতিটি প্রত্নবস্তু নিয়ে তাঁর গবেষণালব্ধ তত্ত্ব-তথ্য-ব্যাখ্যা ইতিহাস চর্চায় গুরুত্ব পেয়েছে।’’ বিশেষ করে দুই ২৪ পরগনার আদি ঐতিহাসিক যুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত ইতিহাসের নানা তথ্য উঠে এসেছে দেবীশঙ্করবাবুর গবেষণায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক রূপেন্দ্রকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘পুরাতত্ত্ব ও লোকসংস্কৃতি নিয়ে তাঁর গবেষণামূলক প্রবন্ধগুলিও মূল্যবান। প্রত্নবস্তুসাপেক্ষে বিভিন্ন জাতির উপরে তাঁর গবেষণা গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়িয়েছে। আমাদের ছাত্র ছাত্রী, গবেষক এমনকী আমরাও তাঁর কাছ থেকে অনেক সহায়তা পাই।” বেহালা মিউজিয়ামে রয়েছে তাঁর সংগ্রহ করা অনেক প্রত্ন সামগ্রী। জেলার নতুন নতুন প্রত্নস্থল আবিষ্কার ও সরকারি বা বিশ্ববিদ্যালয়গত ভাবে উৎখননের নানা কাজে যুক্ত থেকেছেন তিনি।

রাজ্য প্রত্ন সংগ্রহশালার সদ্য প্রাক্তন ‘কিপার’ তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়ও উচ্ছ্বসিত তাঁর কাজ নিয়ে। বললেন, ‘‘এ রকম প্রত্যন্ত গ্রামে থেকে এই কাজ করা, দুর্লভ প্রত্নবস্তুগুলোর সংরক্ষণ করা খুবই কঠিন কাজ। যদিও তা বৈজ্ঞানিক ভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে না। কিন্তু তাঁর উদ্যোগ ও উদ্যম অকল্পনীয়।’’

বাড়ির তিনতলায় অ্যাসবেস্টসের ছাদের তলায় দু’টি ঘরে রয়েছে ওই প্রত্নসামগ্রী। অকৃতদার দেবীবাবু বলেন, ‘‘তাপ, আর্দ্রতা ও নোনা বাতাসে বস্তুগুলির ক্ষয় হচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে ঔজ্জ্বল্য, রং। ভয় রয়েছে চুরির। সরকারি ভাবে অর্থ সাহায্য না পেলে যথাযথ ভাবে সংরক্ষণ সম্ভব নয়। কিন্তু বারবার আবেদন করেও কিছু পাইনি।” এক সময়ে নিজের জমিতে সরকারি অর্থে সংগ্রহশালা ও গবেষণাকেন্দ্র গড়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি। পেয়েছিলেন আশ্বাস। কিন্তু অর্থ পাননি। প্রকাশবাবু বলেন, ‘‘সুন্দরবনে প্রত্ন গবেষণাকেন্দ্র সংরক্ষণের জন্য টাকা মেলেনি ভাবতে অবাক লাগছে। আসলে ২০১১ সাল থেকে বেসরকারি সংগ্রহশালাগুলির প্রত্নবস্তু সংরক্ষণের জন্য সহায়তা দেওয়া বন্ধ রয়েছে। আগামী বছর ফের তা চালু হওয়ার সম্ভাবনা আছে।’’

দেবীশঙ্করবাবুর স্বপ্ন, সরকারি সাহায্য পেলে তিনি নবকলেবরে সংগ্রহশালা গড়ে গবেষক ও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করবেন। বহু অনালোকিত ইতিহাস আকর্ষণ করতে পারে পর্যটকদেরও।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy