Advertisement
E-Paper

প্রদীপ গড়ে নিজের জীবনেও আলো খুঁজে পেয়েছেন নিমাই

একটা সময় ছিল, যখন উঠোনের তুলসিতলায় প্রদীপ জ্বলত না তেলের অভাবে। কচু, শালুক ডাঁটা, শাক পাতা সেদ্ধ করে খাওয়াতেন অন্ধ বাবা আর ভিক্ষাজীবী মা। তাঁরা মৃদঙ্গভাঙা নদীতে মীন ধরে বা কখনও দিনমজুরি করলে একবেলা পেট ভরে খাবার জুটত।

অমিত কর মহাপাত্র

শেষ আপডেট: ১৪ নভেম্বর ২০১৫ ০১:০২
নিমাই পাত্র।

নিমাই পাত্র।

একটা সময় ছিল, যখন উঠোনের তুলসিতলায় প্রদীপ জ্বলত না তেলের অভাবে। কচু, শালুক ডাঁটা, শাক পাতা সেদ্ধ করে খাওয়াতেন অন্ধ বাবা আর ভিক্ষাজীবী মা। তাঁরা মৃদঙ্গভাঙা নদীতে মীন ধরে বা কখনও দিনমজুরি করলে একবেলা পেট ভরে খাবার জুটত। আশেপাশের গ্রামে অনুষ্ঠানের খবর পেলে সেখানে গিয়ে ফেলে দেওয়া এঁটো পাতা কুকুরের সঙ্গে কাড়াকাড়ি করে খেয়েছেন, এমন দিনও গিয়েছে। এই যখন সংসারের হাল, অক্ষর পরিচয়ের সুযোগ ঘটেনি বলাইবাহুল্য। সেই আট বছর বয়সেই কাজ খুঁজতে গ্রামেরই এক ব্যক্তির সঙ্গে পাড়ি দিয়েছিলেন কলকাতায়। কখনও পরিচারকের কাজ কখনও বা সাইকেল গ্যারাজে কাজ শেখেন। কিন্তু মন টেঁকেনি। অবশেষে কালীঘাটের পটুয়াপাড়ায় মূর্তিশিল্পী দীনেশচন্দ্র গুহর কাছে নাড়া বেঁধে জীবনটাই বদলে গিয়েছে নিমাই পাত্রের।

ন’বছর বয়স থেকে ছাঁচের মূর্তি তৈরির খুঁটিনাটি শিখে নেন তিনি। বছর পনেরো কাজ করার পরে গুরুর নির্দেশে গড়িয়ায় স্বাধীন ব্যবসা করেন। সাফল্যের সেই শুরু। মথুরাপুর ২ ব্লকের ছাতুয়া গ্রামের নিমাই পাত্র এখন পাঁচ পাঁচটি প্রদীপ কারখানা গড়ে মাসে গড়ে দু’লক্ষ প্রদীপ রফতানি করছেন উত্তর ও পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে। আর বছরভর কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন প্রায় দেড়শো জনের।

সুন্দরবনের নিমাইবাবুর জীবনের এই সাফল্যের কাহিনী এখনও আশেপাশের গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তাঁর হাত ধরেই পাশের নারায়ণপুর গ্রামে লক্ষ্মী-গণেশের মূর্তি তৈরি করে গ্রামের অর্থনৈতিক চিত্রটাই বদলে দিয়েছে। স্থানীয় নন্দকুমারপুর পঞ্চায়েতের প্রধান মুজিবর রহমান খান বলেন, “নিমাইবাবু অনেকের কাছেই রোল মডেল। তাঁর পরিশ্রমনির্ভর সাফল্যের এই উড়ানে কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে বহু মানুষের। ওঁর সাফল্য আমাদের সকলকে গর্বিত করে।”

এত কিছুর পরেও একেবারেই নিমাইবাবু যথেষ্ট বিনয়ী। বললেন, “ছেলেবেলার সেই কষ্টের দিনগুলির কথা মনে পড়লে আজও চোখে জল আসে। এক সময়ে ভাবতাম, বাবা-মায়ের মতো আমাকেও ভিক্ষা করতে বেরোতে হবে। সেই জীবন আমি চাইনি বলেই বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলাম। কিন্তু সেই কষ্টই আমাকে বড় হওয়ার জেদ জুগিয়েছে। এতজন মানুষকে সারা বছর কাজের সুযোগ করে দিতে পারাটা আমার জীবনের সব থেকে আনন্দের বিষয়।”

বছর তিপান্নর নিমাইবাবু জানালেন, গুরুর আশীর্বাদ নিয়ে কাজ লক্ষ্মী-গণেশের মূর্তি গড়া শুরু করেছিলেন। নিত্য-নতুন আঙ্গিক বদলে সেই মূর্তি বাজার ধরতে শুরু করে। আর ব্যবসায়ীদের কাছে তাঁর গুরুর কাজের থেকেও তাঁর কাজ কদর পেতে থাকে। গুরুর সমালোচনা সহ্য করতে না পেরে তখন দিশেহারা দশা নিমাইবাবুর। অনেক ভেবে ঠিক করেন, মূর্তি তৈরি বন্ধই করে দেবেন। তারপরেই প্রদীপ গড়ার পরিকল্পনা। একে একে গড়ে তুলছেন পাঁচটি কারখানা।

প্রথমে টেরাকোটা ধাঁচের প্রদীপ গড়লেও পরে তার আমূল পরিবর্তন ঘটান শিল্পী নিমাই। কৃষ্ণনগর ও বিষ্ণুপুর ঘরানার আদল মিশিয়ে নিজস্ব আঙ্গিকে তৈরি করে প্রদীপে। সূক্ষ্ম কারুকাজ আনেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন রং নিয়েও। প্রদীপে বসানো হয় রঙিন পাথর, জরি, চুমকি ইত্যাদি। বর্তমানে তাঁর কারখানায় একশো কুড়ি ধরনের প্রদীপ তৈরি হয়।

গ্রামের কারখানাগুলি দেখভাল করেন ভাইপো সুশোভন পাত্র। তিনি বলেন, “গ্রীষ্মের শুরু থেকে দীপাবলীর আগে পর্যন্ত উৎপাদনের চাপ এত বেশি থাকে যে দিনরাত কাজ করেও ফুরসত পাওয়া যায় না। প্রদীপ পাড়ি দেয় দিল্লি, লক্ষ্ণৌ, বেঙ্গালুরু, মুম্বই-সহ বিভিন্ন শহরে।’’

পাইকারি হিসাবে একেকটি প্রদীপের দর ২৫ পয়সা থেকে তিনশো টাকা পর্যন্ত। কাজে নিযুক্ত বিহারের কিশোর শচীন রাজবংশী, নটবর রাজবংশী থেকে শুরু করে কলেজ পড়ুয়া সুখেন্দু পাত্র, সুকেশ পাত্ররা। দশ বছর ধরে কাজ করছেন প্রতিমা হালদার, পদ্ম গায়েন, মায়া ঘরামিরা।

কালীঘাটে আগে কাজ করলেও এখন গ্রামে কাজ করছেন বাপন ঘরামি, রবীন্দ্রনাথ মণ্ডল। নিমাইবাবুর কাছে পনেরো বছর ধরে কাজ শিখে এখন নন্দকুমারপুরের কারখানায় চৌত্রিশ জন শ্রমিকের দেখভালের দায়িত্বে অলোকেশ মণ্ডল। সকলেই কৃতজ্ঞ এই সংস্থার তথা নিমাইবাবুর প্রতি। অনেকে বললেন, ‘‘এক সময়ে যাঁর ঘরে প্রদীপ জ্বলত না আজ তাঁর হাত ধরেই গ্রামে ও গ্রামের বাইরে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রদীপ জ্বালাচ্ছেন।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy