প্রথমে বাবা, পরে স্বামীর হাত ধরে সেই যে নৌকার হাল ধরেছিলেন, আজ পঞ্চান্ন বছর বয়সেও সেই হাতে হাল। তফাৎ শুধু একটাই, আগে ছিল কাঠের হাল। এখন ইঞ্জিন নৌকায় লোহার দণ্ড। দিন-রাতের পরোয়া করেন না। ডাক দিলে বা ফোন করলেই হাজির নেওজান বেওয়া। নৌকা ছোটে মণিনদীর এ পাড়ে অঞ্চি ঘাট থেকে ও পাড়ে মধুসূদনচক (সূর্যপুর) পর্যন্ত।
মণিনদীর বাঁধেই খড়ের চালা ছিটে বেড়ার ঘরে একাই থাকেন নেওজান। এলাকার পাঁচ জনের কাছে যিনি পরিচিত ‘নানি’। আদতে বাড়ি কেওড়াতলা গ্রামের মোল্লার মোড়ে। সেখানেই পরিবার নিয়ে থাকেন চার ছেলে। নানির কথায়, “ছেলেরা খোরাকি দেয় না। কাজ না করলে খাব কী?” জানালেন, বাবা ফটিক সর্দার দীর্ঘ তিরিশ বছর খেয়া পারাপারের কাজ করতেন। তাঁর কাছেই এই কাজে হাতেখড়ি নেওজানের। অল্প বয়সে বিয়ের পরে স্বামী হজরত গায়েনকেও দেখেছেন খেয়া চালাতে। স্বামীর অসুস্থতার সময়ে ভরা সংসারকে ডুবে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে সেই দায়িত্ব কিছু দিন নিজের ঘাড়ে নেন। নদীতে পড়ে স্বামীর যখন মৃত্যু হয়, তখন তিনি বছর পঁয়ত্রিশের। বাড়িতে পিঠোপিঠি পাঁচ সন্তান। জমি নেই। নেওজানের কথায়, “সংসারের হাল ধরতে সেই যে নৌকার হাল ধরলাম, তার থেকে আর মুক্তি পেলাম না।”
মথুরাপুর ২ ব্লকের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা মণিনদীর দুই পাড়ে নগেন্দ্রপুর পঞ্চায়েতের অঞ্চি ও নন্দকুমারপুর পঞ্চায়েতের মধুসূদনচক। পঞ্চায়েত ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেল, বর্তমান অঞ্চি খেয়াঘাট থেকে কিছুটা দূরে মোল্লার মোড়েই ছিল প্রাচীন ঘাট। সেখানেই নৌকো বাইতেন চালাতেন নেওজানের বাবা ও স্বামী। ওই জায়গায় নদীতে পলি পড়ে গভীরতা কমে যাওয়ায় ও নৌকোয় উঠতে কাদা পেরোতে হতো বলে ওই ঘাট গুরুত্ব হারায়। সরকারি ভাবেও ডাক দেওয়া বন্ধ হয়। অন্য দিকে, সড়কপথে রায়দিঘির সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটতে থাকায় এ পথে যাত্রীসংখ্যা কমতে থাকে। কিন্তু নিত্য প্রয়োজনে ও দিনে রাতে গ্রামবাসীদের যাওয়া আসার ক্ষেত্রে ঘাটের গুরুত্ব ছিল। সময় বাঁচত, খরচও পড়়ত কম। চাহিদার কথা মাথায় রেখে সরকারি ভাবে কয়েক বছর আগে অঞ্চিতে নতুন করে জেটিঘাট নির্মাণ করা হয়। আর স্থানীয় ভাবে দুই পাড়ের গ্রামবাসীরা নানিকেই দায়িত্ব দেন খেয়া চালানোর। তাই খেয়াঘাট-লাগোয়া নদীবাঁধই এখন নানির আস্তানা। বললেন, “আগে গায়ে-গতরে জোর ছিল, দাঁড় বাইতে পারতাম। কয়েক বছর ধরে আর পারি না। বছর সাতেক আগে নৌকায় ইঞ্জিন লাগিয়েছি।”
নগেন্দ্রপুরের রুহিত ঘোড়াই, নরেন্দ্রপুরের বৃষকেতু হালদাররা বলেন, “মাঝখানে তো নানি পারাপার বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ভাড়া কম ছিল বলেই আর নৌকো টানতে পারছিলেন না। আমরা সকলে বিপদে পড়ি। শেষে গ্রামবাসীরা আলোচনায় বসে, যাত্রী-পিছু ৫ টাকা ভাড়া ধার্য করায় ফের খেয়া চালু হয়।” মধুসূদনচকের বাসিন্দা পেশায় চিকিৎসক অশোক জানা বলেন, “রাতে যে কোনও সময়ে জরুরি প্রয়োজনে নদী পেরোনোর দরকার হলে নানির মোবাইলে একটা ফোন করলেই সাড়া মেলে। কখনও বিরক্ত হন না।” আবার এক ঘাটে নৌকো থাকলে অন্য ঘাট থেকে যাত্রীরা ফোন করে ডেকে নেন। নানির কথায়, “এরাই মোবাইল কিনিয়ে ছাড়ল। তবে ফোন ধরতে পারি। কিন্তু এখনও করতে শিখিনি।’’ নানিও জানালেন, ফোনে তাঁর নৌকো ‘বুকিং’ হয় বলেই রাত-বিরেতে বহু মানুষের অনেক উপকারও হয়। অঞ্চি গ্রামের রাধারানি মাইতি, নমিতা প্রধানরা বলেন, “এ রকম একজন বয়স্ক মহিলা রাতে নৌকা চালাচ্ছেন, তা-ও একা। ঝড়-ঝঞ্ঝার রাত বা ঘোর অমাবস্যার কোটালেও ভয় পান না। ওঁর যেমন সাহস, তেমনি সকলের উপরে দরদ।”
আর নানির কথায়, ‘‘এই নদী, এই নৌকা, এই মানুষজনে আমার বড় মায়া। সকলকে বলি, আমি মরলে এখানেই গোর দিও। অন্য কোথাও মরেও আমি শান্তি পাব না।”