ওঁদের কেউ সদ্য স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছেন। কেউ বা এখনও স্কুলে পড়ে। বানভাসি এলাকায় তাদেরই মতো বহু পড়ুয়া অভিভাবকদের সঙ্গে ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। রয়েছে অনেক শিশু। চোখের সামনে সেই দুর্ভোগ দেখে হাতগুটিয়ে বসে থাকতে পারেননি পূজা বিশ্বাসরা। একদিনের জন্য হলেও স্কুলের শিবিরে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলির কাছে ত্রাণ পৌঁছে দিতে টাকা তুলছেন গাইঘাটার পাঁচপোতা ভারাডাঙা উচ্চ বিদ্যালয়ের সদ্য প্রাক্তন ও বর্তমান কিছু পড়ুয়া।
নিজেদের টিফিনের খরচ বাঁচিয়ে, কেউ আবার নিজের গৃহশিক্ষকতার আয়ের টাকা দান করেছেন ত্রাণ তহবিলে। গোটা কর্মকাণ্ডে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পূজা বিশ্বাস বছর উনিশের ওই তরুণী। পূজা অশোকনগরের নেতাজি শতবার্ষিকী মহাবিদ্যায়ের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। বাড়ি পাঁচপোতা এলাকাতেই। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের এখানে বেশিরভাগ এলাকা জলমগ্ন। বহু মানুষ ত্রাণ শিবিরে উঠে আসতে বাধ্য হয়েছেন। আমাদের অবশ্য ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়নি। কৃষি প্রধান এলাকায় বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। চোখের সামনে ওই সব বানভাসি মানুষের সমস্যা দেখে সিদ্ধান্ত নিই, ওঁদের জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা করতে হবে।’’ পূজা গৃহশিক্ষকতা করেন। আয়ের টাকা ত্রাণ তহবিলে দিয়েছেন। ওই তরুণীর কথায়, ‘‘যারা স্কুলে এক সঙ্গে লেখাপড়া করেছি, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। স্কুলে পড়া ভাইদেরও সঙ্গে নিয়ে আমরা টাকা তোলার কাজ শুরু করেছিলাম। সকলেই প্রচুর সহযোগিতা করছে। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও আমাদের উৎসাহ দিয়েছেন।’’ পূজার সঙ্গে এই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন শম্পা দাস, ইমরান পাল, অজয় মণ্ডল, আখিঁ বিশ্বাসের মতো বেশ কিছু স্কুল-কলেজের পড়ুয়া।
ভারাডাঙা স্কুলের ত্রাণশিবিরে ৭০টির বেশি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। বৃহস্পতিবার স্কুলের ওই সব প্রাক্তন এবং বর্তমান পড়ুয়ারা ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলির কাছে পৌঁছে দিলেন চিঁড়ে, গুড়, সাবান, শিশুদের জন্য কেক, দুধ ও বিস্কুট। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে ওই ত্রাণ পেয়ে খুশি আশ্রয় নেওয়া পরিবারের সদস্যরাও। স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক পরিতোষ সরকার বলেন, ‘‘স্কুলের প্রাক্তন ও বর্তমান পড়ুয়াদের এই উদ্যোগ সমাজের পক্ষে খুবই সদর্থক ভূমিকা। আমরা তাদের পাশে থেকে সাহায্য করব।’’
পনেরো দিনেরও বেশি সময় ধরে স্কুলে চলছে ত্রাণ শিবির। তার মধ্যেই নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাস চলছে। পরীক্ষাও নেওয়া হচ্ছে ধাপে ধাপে। পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণির ক্লাস অবশ্য বন্ধ রাখতে হয়েছে।
এ দিন স্কুলে গিয়ে দেখা গেল, তিনতলা ভবনের বেশ কিছু ঘরে বানভাসি মানুষেরা আশ্রয় নিয়েছেন। তার মধ্যেই চলছে স্কুল। প্রাক্তনী শম্পা দাসের কথায়, ‘‘জলমগ্ন মানুষদের পাশে দাঁড়াতে পেরে ভাল লাগছে।’’ ইমরান আখিঁরা বললেন, ‘‘চাষিদের খেত জলের তলায় চলে গিয়েছে। তিন বেলা কারও ঠিকমতো খাওয়া হচ্ছে না। তাই নিজেদের টিফিন খরচ বাঁচিয়ে ওঁদের জন্য টাকা দিয়েছি। যদি তাতে ওঁদের কষ্ট একটু কমে।’’ ত্রাণ শিবিরে থেকেই স্কুল করছে দশম শ্রেণির সুজন মণ্ডল, নবম শ্রেণির রূপালি সরকার, দশম শ্রেণির রেখা বিশ্বাসের মতো অনেকে। রেখার মা শচীরানিদেবী আক্ষেপের সুরে বললেন, ‘‘উঠোনে এখনও হাঁটু সমান জল। বৃষ্টি না হলেও ঘরে ফিরতে তাঁদের আরও দিন দ’শেক লাগবে। আগে হাফ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে মেয়েকে স্কুলে আসতে হতো। এখন বাড়ি-স্কুল সবই এক ছাদের তলায়।’’ শিবিরে আশ্রয় নেওয়া শ্রীধাম সরকার, প্রবীর বিশ্বাস, কৃষ্ণ মণ্ডলরা জানালেন, সরকারি ভাবে বা কোনও সংস্থার পক্ষ থেকে ত্রাণ পেয়েছেন। কিন্তু নিজেদের ছেলেমেয়েদের বয়সী পড়ুয়াদের থেকে যে ভাবে সাহায়্য পেলেন, তাতে সকলেই অভিভূত।