Advertisement
E-Paper

ভূকম্পনে ঝরে গিয়েছে ‘নস্ট্যালজিক’ কাগজফুল

ভূকম্পনে ঝরে গিয়েছে ফুল। সুবাস নেই, সে ফুলে শুধুই বাহার। গোল, বাহারি শিকলি, বৃত্তাকার বহুরূপী। গত আশ্বিনেও হাওড়া, পূর্ব মেদিনীপুর কিংবা দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রান্তিক গ্রাম থেকে বস্তা বোঝাই হয়ে তারা পাড়ি দিত সুদূর নেপাল, ভুটান কিংবা পড়শি ঝাড়খণ্ডে। কিন্তু গত গ্রীষ্মে নেপালে ভূকম্পনের পরে বাজারটা তার একেবারে ধসে গিয়েছে।

অমিত কর মহাপাত্র

শেষ আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০১৫ ০২:৩৩
তৈরি হচ্ছে কাগজফুল। —নিজস্ব চিত্র।

তৈরি হচ্ছে কাগজফুল। —নিজস্ব চিত্র।

ভূকম্পনে ঝরে গিয়েছে ফুল।

সুবাস নেই, সে ফুলে শুধুই বাহার। গোল, বাহারি শিকলি, বৃত্তাকার বহুরূপী। গত আশ্বিনেও হাওড়া, পূর্ব মেদিনীপুর কিংবা দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রান্তিক গ্রাম থেকে বস্তা বোঝাই হয়ে তারা পাড়ি দিত সুদূর নেপাল, ভুটান কিংবা পড়শি ঝাড়খণ্ডে। কিন্তু গত গ্রীষ্মে নেপালে ভূকম্পনের পরে বাজারটা তার একেবারে ধসে গিয়েছে।

হাওড়ার শিবপুর, কলকাতার গঙ্গাপাড়ের কাশীপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বরদানগর, সূর্যপুর কিংবা পূর্ব মেদিনীপুরের কোলাঘাট, চণ্ডীপুরের খান পঞ্চাশেক গ্রামে পুজোর আগে নাওখা-খাওয়া ভুলে সেই ফুলঘরা তৈরিতে ব্যস্ত থাকত, যে শিল্পীরা গলায় তাঁদের এখন বেজায় হা-হুতাশ। জানাচ্ছেন, নেপালের বাজার ভেঙে দিয়েছে ভূকম্পন, পাহাড়ের অন্যত্র, দার্জিলিং, কালিম্পঙেও সে বাজার এ বার নিভু নিভু। টিম টিম করে জ্বলছে ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশের গোবলয়ের বাজার।

কলকাতার বড়বাজারের ফুলঘরার পট্টি থেকে উঠে আসছে— চাহিদা তলানিতে এসে ঠেকেছে। ফলে এই পেশায় থাকা কারিগরেরা এখন অন্য পেশায় দিনগুজরান করছেন। কাগজের সেই বাহারি ফুলের দিন প্রায় অস্তাচলে।

শিবপুরের এক কাগজ-ফুল তৈরির কারখানার মালিক বিশ্বজিৎ সর বলেন, “এমনিতেই আমাদের কাঁচামাল কেনা ও শ্রমিকদের মজুরি মেটাতে মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়। মাল বেচেই সেই ঋণ শোধ করি। উৎপাদন কমে যাওয়ায় এখন নুন আনতে পান্তা পুরানোর অবস্থা।’’ সতেরো বছর ধরে শ্রমিক হিসেবে এ কাজ করছেন বরদানগরের সঞ্জয় গিরি। বলছেন, “আগে এমন মন্দা দেখিনি। নেপালে প্রাকৃতিক বিপর্যয় হলে উৎপাদন সামান্য কমেছে, তবে সেটাই সব নয়। দেশের বাজারে চাহিদাও কমে গিয়েছে।’’

প্রদীপ সর এ পেশায় কারিগর বহু দিনের। নিজেই ফুলঘরার কারখানাও খুলেছিলেন। সেখানে নিজের পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও বছরভর কাজ করেন ২০ জন। তা ছাড়া ওই গ্রাম ও আশপাশের গ্রামের শতাধিক মহিলা পরোক্ষ ভাবে কাজ করেন নিজেদের বাড়িতে। পুজোর মুখে তাঁদেরও আয় থমকে গিয়েছে প্রায়। কর্মী পিন্টু সামন্ত, দেবনারায়ণ সামন্তরা জানান, আগে তাঁরা শিবপুরে কাজ করতেন। গ্রামে কারখানা হওয়ায় যোগ দিয়েছিলেন সেখানে। এখন দু’কূল ভেসেছে।

কল্পনা বেরা, সুনীতি সাউ-রা বলছে, ‘‘এ কাজে বাড়ির সকলেই সময় বের করে হাত লাগাই। এক একজন বছরে ১০-২০ কুড়ি হাজার টাকার কাজ করি। এ বার পরিস্থিতি অন্য রকম।’’

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, গত দশ বছরে বরদানগরেই গড়ে উঠেছিল তিনটি বড় কাগজ ফুল তৈরির কারখানা। তারই একটির মালিক প্রদীপ সর বলেন, ‘‘এই শিল্পসামগ্রীর চাহিদা ছিল। ভূমিকম্প আমনাদেরও তছনছ করে দিয়ে গিয়েছে।’’ ট্রলারে মাছ ধরার ব্যবসা ছেড়ে সাত বছর আগে এই কাগজ ফুলের ব্যবসায় এসেছেন ওই গ্রামের প্রভাস মাইতি। তাঁর অভিজ্ঞতা, ‘‘বড়বাজার থেকে কাঁচামাল কিনে আনতে হয় নগদে। এ দিকে বাজারে চাহিদা কম। রং নষ্ট ও পোকায় কেটে দেওয়ার সম্ভাবনার কারণে উৎপাদিত শিল্পসামগ্রী মজুত করে রাখা যায় না। ফলে আমাদের আর্থিক ক্ষতি ক্রমশ বাড়ছে।’’ ব্যবসায়ীরা জানান, উজ্জ্বল রং ও স্থায়ীত্বের কারণে এখন ধীরে ধীরে কাগজ ফুলের জায়গা নিচ্ছে রোলেক্স পেপারের ফুল ও চেন।

এ সব ব্যাপারে কী বলছেন পুজো কমিটির কর্মকর্তারা ও থিম শিল্পীরা?

মণ্ডপশিল্পী সোমনাথ মাইতি বলেন, ‘‘কাগজ ফুলের সঙ্গে ছোটবেলার অনেক স্মৃতি, নস্ট্যালজিয়া জড়িয়ে আছে। এখন এই জিনিস মণ্ডপ সজ্জার কাজে ব্যবহার করলে জৌলুস কমবে। কারণ, বাজার ছেয়ে গিয়েছে প্লাস্টিকের বাহারি ফুল-পাতায়, অর্কিডের ফুলও তৈরি হচ্ছে। তার কী জৌলুস। নিতান্ত সাদামাঠা কাগজফুল আর কে কিনবে!’’ তাঁর গলায় স্পষ্ট হতাশা।

তবে রায়দিঘির একটি পুজো কমিটির সদস্য সুবোধ হালদার বললেন, ‘‘কাগজ ফুলের এখনও জবাব নেই। ছোট বাজাটের পুজোয়, বিশেষ করে গ্রামের দিকে তার একটা চাহিদা এখনও আছে।’’ ডায়মন্ড হারবারের একটি পুজো কমিটির কর্তা শঙ্কর সরকার বলছেন, ‘‘আমরা লোকশিল্প ও সংস্কৃতিকে বরাবর উৎসাহ দিয়ে এসেছি। সে জন্য আমাদের কাছে কাগজ ফুলের এখনও চাহিদা রয়েছে।’’

বড়বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী সঞ্জয় কুসুয়া অবশ্য জানাচ্ছেন, এ বার নেপালে ভূমিকম্পের জন্য প্রায় অর্ধেক মাল রফতানি করা য়ায়নি। বলছেন, ‘‘তার উপর বাজারে প্লাস্টিকের ফুর এমন ছেয়ে গিয়েছে যে লোকে আর কাগজে ঝঁকছেন না। প্রতিযোগিতার মুখে কাগজ ফুল তাই হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমেই।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy