ছোটবেলায় ছিল শিকারের নেশা। ছর্রা গুলিতে শালিখ-সাপ থেঁতলে দেওয়ার পরে তাদের ছটফট করতে করতে মরে যাওয়াটা ‘অসহ্য’ ঠেকায় এক সময়ে তাদেক বুক দিয়ে বাঁচিয়ে তোলা শুরু করেছিলেন।
চল্লিশ বছর ধরে মন দিয়ে সে কাজটাই করে চলেছেন তিনি। সাপ বাঁচিয়ে চুয়ান্ন বছরের সুপ্রভাত দাস এখন ‘সাপ ধরা সুপে’। রায়দিঘির গ্রামে এটাই তাঁর পরিচয়।
গ্রামীণ পথে বাদাবনের তেড়াবেঁকা ডাল আর নিজের হাতে গড়া ছোট খাঁচা কিংবা সাঁড়াশি নিয়ে পাঁচ সেলের টর্চ হাতে ঘোর বাদলা রাতেও হন্যে হয়ে সাপ খুঁজে বেড়ান সুপে।
বাড়ির উঠোনে, সাপের খাঁচার পাশেই সহজ সহবাস অসুস্থ কুকুর, খোঁড়া বেড়াল কিংবা ডানা ভাঙা পাখির। আর খাটের পাশে রাখা তাঁর সস্তা মোবাইলে অনর্গল আসছে খবর— ‘কাকু একটু আসবেন, একটা প্রকাণ্ড সাপ বেরিয়েছে!’ কিংবা ‘স্যার বাগানে একটা কেউটে ঘুরছে , বাঁচান স্যার!’ দ্বিতীয়বার ভাবেন না সুপ্রভাতবাবু। বলছেন, “যাব না, হয় কখনও? আরে, না গেলে যে ওরা সাপটাকে মেরে ফেলবে। বেচারা খাবার খুঁজতে এসে মানুষের বিষ নজরে পড়েছে যে!”
নিজের উদ্যোগেই তৈরি করা সাপ ধরার সাড়াশি, বিশেষ লোহার ফ্রেমে জাল বসিয়ে খাঁচা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সাপের ছোবলে পাঁচ দিন হাসপাতালেও কাটাতে হয়েছে। তবে সুপেকে রোখা যায়নি।
স্ত্রী ভারতীদেবী সারাক্ষণ গজ গজ করছেন— ‘‘শত্রুর শেষ নেই, আর উনি চললেন সাপ ধরে ঘরে আনতে!’’ সাপের ভয়ে এ বাড়িতে পা-ই রাখেন না ছোট মেয়ে বা নাতি। আত্মীয়েরাও আসতে ভয় পান। সুপ্রভাতবাবু বলছেন, ‘‘তা কী আর করা যাবে, আমার কাজটা তো করে যেতে হবে।’’
তাঁর দাবি ১৯৯৮ সাল থেকে এ যাবত ২২৩টি নানা জাতের সাপ তুলে দিয়েছেন বন দফতরের হাতে। স্থানীয় বনাধিকারিক সৌমেন মণ্ডল বলেন, “সুপ্রভাতবাবুর দেওয়া সাপগুলিকে আমরা সোয়ান আইল্যান্ডে ছেড়ে দিয়ে আসি। তি যে ভাবে কাজ করে চলেছেন এক কথায় তা অতুলনীয়। আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি সাপ নিয়ে এলাকায় প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বাড়াতে ওঁকে নিয়ে প্রচার চালাতে।’’
আর সুপে বলছেন, ‘‘যা শিখেছি, সবই হাতে-কলমে। সাপেদের সহ্গে মিশে। এখন অবশ্য টিভিতে এই সংক্রান্ত চ্যানেলগুলো দেখি। সেখান থেকেও কিছু শিখেছি।’’
সব সময়ে নীল রঙের পোশাক পরেন বলে পাড়ায় অনেকে তাঁরে ‘নীলকন্ঠ’ বলেও ডাকেন। পড়শি গৌতম দাস বললেন, “সুপ্রভাতবাবু আমার বাড়ি থেকেই তিন বার কেউটে ধরেছেন। কিন্তু বিনিময়ে কিছুই নেন না। বরং উল্টে ধন্যবাদ জানান সাপটিকে না মেরে ওঁকে ডাকার জন্য।” স্থানীয় বাসিন্দা জীববিজ্ঞানের শিক্ষক প্রলয় মণ্ডল বলেন, “বাস্তুতন্ত্র টিঁকিয়ে রাখতে ও জীব বৈচিত্র ধরে রাখতে সুপ্রভাতবাবুর কাজ আমাদের অনুপ্রেরণা।”